ব্রহ্মরাজপুরে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা: সম্প্রীতির আঙিনায় নতুনের আবাহন
জি এম আমিনুল হক: বিদায়ী সূর্যের শেষ আভায় পুরাতনকে বিদায় আর নতুনের আগমনে মেতেছে সাতক্ষীরার ব্রহ্মরাজপুর। জীর্ণতা আর ধুলোবালি ঝেড়ে নতুনের কেতন উড়িয়ে আজ সোমবার শেষ হচ্ছে শ্রী শ্রী কালভৈরব মন্দিরের ঐতিহ্যবাহী চৈত্রসংক্রান্তি মেলা। দুই শতাধিক বছরের এই লোকজ উৎসব এখন আর কেবল নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়ের উপাসনা নয়; বরং তা রূপ নিয়েছে অসাম্প্রদায়িক এক প্রাণের মিলনমেলায়।
ব্রহ্মরাজপুর কালভৈরব মন্দিরের ইতিহাস যেন সময়ের এক দীর্ঘ পথচলা। স্থানীয় প্রবীণদের বয়ানে উঠে আসে দুই শতক আগে জমিদার আমলে এই মন্দির প্রতিষ্ঠার কথা। শিবের উগ্র রূপ ‘কালভৈরব’ এখানে ভক্তের বিশ্বাসে বিপদবারণকারী হিসেবে সমাদৃত। মন্দির কমিটির সভাপতি তরুণ কুমার সাহা বলেন, “প্রায় ২০০ বছর ধরে জীর্ণতা ধুয়ে নতুন বছরকে বরণ করার এই রীতি আমরা বয়ে চলেছি। এটি আমাদের এলাকার প্রধান সাংস্কৃতিক বাতায়ন।”
মেলার প্রথম দিন থেকেই মন্দিরে ঘট স্থাপন ও আরতির মাধ্যমে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। তবে আজ সোমবার চৈত্রসংক্রান্তির মূল দিনে ব্রহ্মরাজপুর সেজেছে ভিন্ন সাজে। ভোরে মঙ্গলারতি আর দুপুর গড়িয়ে বেলা বাড়তেই শুরু হয় ‘চড়ক পূজা’ ও ‘গাজন’। পিঠে বড়শি গেঁথে সন্ন্যাসীদের চড়ক গাছে ঘোরার সেই রোমহর্ষক দৃশ্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ভিড় করেছেন হাজারো মানুষ। সন্ধ্যায় নীল পূজার নীল বাতি জ্বালিয়ে মহাদেবের আরতির মধ্য দিয়ে যখন রাত ১২টা ১ মিনিটে নতুন বছর ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ পদার্পণ করবে, তখনই ঘটবে মেলার সাঙ্গ।
মেলার মাঠ থেকে আশপাশের মেঠো পথ—সবখানেই এখন উৎসবের পসরা। টিনের বাঁশি, মাটির হাঁড়ি-পাতিল, বাঁশ-বেতের নিপুণ কারুকাজ আর নাগরদোলার কিড়কিড় শব্দে মুখর চারপাশ। স্থানীয় ইউপি সদস্য আরশাদ আলী জানান, প্রায় তিন শতাধিক দোকানে চলছে বেচাকেনা। জিলিপি-মিষ্টির সুবাস আর সোনামণিদের হাতে নতুন খেলনা মেলাকে দিয়েছে পূর্ণতা। ব্রহ্মরাজপুর বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ বাদশা ফয়সালের মতে, এই মেলাকে কেন্দ্র করে এলাকায় প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার অর্থনৈতিক লেনদেন ঘটে।
ব্রহ্মরাজপুরের এই মেলা শুধু ধর্মের নয়, বরং হৃদয়ের টানে মানুষের কাছে আসার জায়গা। মেলায় আসা আব্দুর রহিম বলেন, “এই মেলা আমাদের গ্রামের প্রাণ। হিন্দু-মুসলিম সব ভেদাভেদ ভুলে আমরা এখানে উৎসবে শামিল হই।” ঠিক একই সুরে শিক্ষক তনয় সাহা বলেন, মেলা মানেই শৈশবের সেই ফুচকা খাওয়া আর বন্ধুদের সাথে অবিরাম পথ চলা। এটি আমাদের আবেগ।
বিশাল এই জনসমাগম সামলাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও রয়েছে কড়া নজরদারি। সাতক্ষীরা সদর থানার পাশাপাশি ব্রহ্মরাজপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে মোতায়েন রয়েছে পুলিশ, গ্রাম পুলিশ ও আনসার সদস্য। বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা।
আজ রাত পোহালেই নতুন বর্ষ। কালভৈরবের চরণে মানত আর প্রার্থনার মধ্য দিয়ে সাতক্ষীরাবাসী বিদায় দিচ্ছে পুরাতনকে। চৈত্রসংক্রান্তির এই মেলা যেন বার বার মনে করিয়ে দেয়—ধর্ম যার যার, উৎসব ও সম্প্রীতির এই আঙিনা সবার।









