আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতির এই সময়ে অনেক কর্মীর মনেই একটা ভয় জেঁকে বসেছে, যন্ত্র কি তবে মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে? তবে কর্মক্ষেত্র বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, মানুষের এমন কিছু সহজাত গুণ রয়েছে যা এআই সহজে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। সহমর্মিতা, যৌক্তিক চিন্তাভাবনা ও নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো মানবিক দক্ষতা চর্চা করলে কর্মীরা যেকোনও পরিস্থিতিতে অপরিহার্য হয়ে উঠবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থানবিষয়ক অলাভজনক সংস্থা জবস ফর দ্য ফিউচার-এর প্রধান নির্বাহী মারিয়া ফ্লিন বলেন, এআই-এর কারণে যে দক্ষতাগুলো সবচেয়ে কম ঝুঁকিতে আছে, সেগুলো মূলত খাঁটি মানবিক গুণ। যেমন- সম্পর্ক তৈরি, দ্বন্দ্ব নিরসন, অন্যকে অনুপ্রাণিত করা এবং নৈতিক বিচারবুদ্ধি।
বিশেষজ্ঞরা এগুলোকে টেকসই দক্ষতা বলছেন, যা অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত যেকোনও পরিবর্তনের মুখেও নিজের মূল্য ধরে রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত পাঁচটি ক্ষেত্রে মানুষের দক্ষতা এআই-এর চেয়ে অনেক এগিয়ে:
সহমর্মিতা: মানুষের শারীরিক ভাষা বোঝা বা কথার আড়ালের অর্থ উদ্ধার করার কাজে মানুষের বিকল্প নেই। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক মার্কো ইয়ানসিটি নিজের হাসপাতালে থাকার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, একজন নার্স রোগীর সঙ্গে যেভাবে আত্মিক যোগাযোগ তৈরি করেন, কোনও রোবট তা পারবে না।
এআই বড়জোর কাগজপত্রের মতো বিরক্তিকর কাজগুলো করে দিয়ে নার্সদের সেবা করার জন্য বাড়তি সময় এনে দিতে পারে।
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা: সহকর্মী বা গ্রাহকদের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করা এআই-এর পক্ষে কঠিন। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে যারা আপনার থেকে পণ্য কিনছেন, সেই ব্যক্তিগত সম্পর্ক সহজে যন্ত্রে স্থানান্তর করা যায় না। এছাড়া কর্মক্ষেত্রের যেকোনও দ্বন্দ্ব মেটাতে বা কর্মীদের মানসিক অস্থিরতা দূর করতে একজন দক্ষ মানবসম্পদ ম্যানেজারের ভূমিকা অপরিসীম, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনও করতে পারেনি।
যৌক্তিক চিন্তাভাবনা: এআই তথ্য সংগ্রহ করে উত্তর দিলেও অনেক সময় ভুল তথ্য দেয়। ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির ইন্সট্রাক্টর আমালিয়া কাউফম্যান বলেন, এআই কখন ভুল করছে তা ধরার জন্য আপনার নিজস্ব বিষয়ে গভীর জ্ঞান ও যৌক্তিক চিন্তাভাবনা থাকতে হবে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, চ্যাটবটগুলো ব্যবহারকারীদের খুশি করতে মানুষের চেয়ে ৪৯ শতাংশ বেশি তাদের ভুল কাজেও তোষামোদ করে। এই তোষামোদ থেকে বাঁচতে মানুষের নিজস্ব বিচারবুদ্ধি প্রয়োজন।
বিবেক থাকা: ভালো-মন্দের পার্থক্য করার ক্ষমতা বা অন্তরের বিবেক কেবল মানুষেরই আছে। অনেক সময় মানুষ তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নেয়, যা এআই-এর পক্ষে অসম্ভব। অধ্যাপক ইয়ানসিটি বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে মারাত্মক সামরিক শক্তি ব্যবহারের মতো জীবন-মরণের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আবেগহীন কোনও যন্ত্রের ওপর ভরসা করা যায় না। এআই বিবেকের ওপর লেখা বই পড়ে তা থাকার ভান করতে পারে, কিন্তু তার আসলে কোনও বিবেক নেই।
বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত: কোনও জটিল বা অস্পষ্ট পরিস্থিতিতে সৃজনশীল ধারণা তৈরি কিংবা কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মানুষেরই একচেটিয়া। ম্যাককিনসে-র কর্মকর্তা হিদার স্টেফানস্কি বলেন, সবাই যদি সমস্যা সমাধানের জন্য কেবল এআই-এর উত্তর ব্যবহার করে, তবে আপনার স্বকীয়তা কোথায় থাকবে?
মানুষ তার জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্ত নেয়, যা এআই-এর বিশাল ডেটাবেজ দিয়ে হুবহু তৈরি করা সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনন্য মানবিক গুণগুলোই ভবিষ্যৎ সমাজকে টিকিয়ে রাখবে এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মক্ষেত্রে মানুষকে মূল্যবান করে তুলবে।
সূত্র: এপি