সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩

লেখক, গায়ক ও সুরকার: সংস্কৃতির ত্রয়ী, সমাজের বিবেক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৪:২৫ অপরাহ্ণ
লেখক, গায়ক ও সুরকার: সংস্কৃতির ত্রয়ী, সমাজের বিবেক

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সভ্যতার ইতিহাসে মানুষ যতই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্জন করুক না কেন, তার আত্মপরিচয় নির্মিত হয় সংস্কৃতির ভিত্তিতে। রাষ্ট্রের অর্থনীতি, রাজনীতি বা প্রশাসনিক কাঠামো একটি জাতিকে টিকিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু তার আত্মাকে জীবন্ত রাখে সাহিত্য ও সংগীত। আর এই সাহিত্য ও সংগীতের প্রাণ ভোমরা হলেন লেখক, গায়ক ও সুরকার। এই তিন সৃজনশীল শক্তির সমন্বয়েই একটি গান জন্ম নেয়, একটি কবিতা সমাজকে আন্দোলিত করে, একটি সুর মানুষের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করে।

 

তাঁরা কেবল শিল্পী নন; তাঁরা সময়ের দালিলিক সাক্ষী, সমাজের নৈতিক দিক নির্দেশক এবং মানবিকতার অনন্ত প্রবাহের বাহক। একজন লেখক শব্দের মাধ্যমে সমাজের প্রতিচ্ছবি আঁকেন। তাঁর কলমে ধরা পড়ে মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, প্রতিবাদ ও আকাক্সক্ষা। একজন সুরকার সেই শব্দকে সুরের আবরণে নতুন জীবন দেন। তিনি অনুভূতির এমন এক ভাষা তৈরি করেন, যা শব্দ ছাড়িয়ে সরাসরি হৃদয়ে পৌঁছে যায়। আর একজন গায়ক সেই সৃষ্টি কণ্ঠে ধারণ করে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। এই তিনজনের সম্মিলিত সৃষ্টিই একটি গানকে কেবল বিনোদন নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করে।

 

বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের ইতিহাস এই ত্রয়ীর শক্তির উজ্জ্বল উদাহরণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ও কবিতা যেমন মানবিকতার গভীরতা শেখায়, তেমনি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টি শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। তাঁদের পরবর্তী যুগেও অসংখ্য লেখক, সুরকার ও গায়ক মানুষের জীবন ও সমাজকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছেন। একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি উৎসব, পারিবারিক আনন্দ-বেদনা এমনকি রাজনৈতিক চেতনার বিকাশেও গান ও সাহিত্য ছিল অবিচ্ছেদ্য অংশ।কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এই ত্রয়ীর ভূমিকা ও অবস্থান অনেকটাই বদলে গেছে। বর্তমানে প্রযুক্তির বিস্তার, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থান এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব সাহিত্য ও সংগীতকে এক নতুন বাস্তবতায় দাঁড় করিয়েছে।

 

এখন একটি গান বা লেখা মুহূর্তেই কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে এক বিশাল সুযোগ। কিন্তু একই সঙ্গে এটি শিল্পের গভীরতা ও মানের জন্য এক ধরনের চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে।আজকের দিনে জনপ্রিয়তা অনেকাংশে নির্ধারিত হচ্ছে ভিউ, লাইক, শেয়ার বা ট্রেন্ডের ওপর। ফলে অনেক সময় গভীর সাহিত্য গুণ সম্পন্ন লেখা বা সুর অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত থেকে যাচ্ছে, আর চটকদার ও দ্রুতগ্রাহ্য কনটেন্ট সহজেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

 

এই প্রবণতা ধীরে ধীরে শিল্পের মানদ-কে পরিবর্তন করছে। শিল্প এখন আর শুধু সৃষ্টিশীলতার প্রতিফলন নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে বাজার প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের একটি বড় সমস্যা হলো বাণিজ্যিকীকরণ। সাহিত্য ও সংগীত যখন কেবল বাজারের পণ্য হয়ে ওঠে, তখন তার মূল উদ্দেশ্যÑমানবিকতা, চিন্তার গভীরতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাÑঅনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। একটি গান কত দ্রুত ভাইরাল হলো, একটি বই কত বিক্রি হলোÑএই হিসাবই যেন অনেক ক্ষেত্রে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ প্রকৃত শিল্পের মূল্য কখনো তাৎক্ষণিক সাফল্যে নির্ধারিত হয় না; বরং সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকার মধ্যেই তার প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায়।

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট হলো স্বীকৃতির অসমতা। একটি গান জনপ্রিয় হলে সাধারণত গায়কের নামই বেশি আলোচিত হয়, অথচ সেই গানের পেছনে থাকা গীতিকার ও সুরকার অনেক সময় আড়ালেই থেকে যান। এটি শুধু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়, বরং শিল্পের সামগ্রিক মর্যাদার প্রশ্নও বটে। একটি গান কোনো একক ব্যক্তির সৃষ্টি নয়; এটি একাধিক সৃজনশীল মস্তিষ্কের সম্মিলিত ফল। তাই গীতিকার, সুরকার ও গায়কÑতিনজনেরই সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমান ডিজিটাল যুগে আরেকটি নতুন বাস্তবতা হলো কপিরাইট লঙ্ঘন।

 

অনেক সময় অনুমতি ছাড়া গান, লেখা বা সুর ব্যবহার করা হয়। এতে প্রকৃত স্রষ্টারা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এটি সৃজনশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি। যদি একজন শিল্পী তাঁর সৃষ্টির যথাযথ স্বীকৃতি ও সম্মান না পান, তবে নতুন সৃষ্টির প্রতি তাঁর আগ্রহও কমে যেতে পারে। প্রযুক্তির আরেকটি দিক হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার। এখন গান, সুর এমনকি লেখা পর্যন্ত এআই দিয়ে তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। এটি একদিকে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুললেও অন্যদিকে মৌলিক সৃষ্টির প্রশ্নে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করছে। প্রযুক্তি অবশ্যই সৃজনশীলতার সহায়ক হতে পারে, কিন্তু তা যদি মানুষের মৌলিক সৃষ্টিকে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করে, তবে সাংস্কৃতিক জগতের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

 

এই পরিস্থিতিতে লেখক, গায়ক ও সুরকারদের সামাজিক দায়বদ্ধতা আরও বেড়ে যায়। তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজের বাস্তবতা, অন্যায়, বৈষম্য, ভালোবাসা, মানবিকতা ও প্রতিবাদের ভাষা প্রকাশ পায়। তাঁরা কেবল বিনোদন দেন না; তাঁরা মানুষের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করেন। একটি ভালো গান বা লেখা মানুষের মনোভাব পরিবর্তন করতে পারে, সমাজে নতুন চেতনার জন্ম দিতে পারে। রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

 

কপিরাইট আইন কার্যকর করা, নতুন প্রতিভাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া, মানসম্মত শিল্পচর্চার পরিবেশ তৈরি করা এবং প্রকৃত শিল্পীদের স্বীকৃতি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি গণমাধ্যমকে কেবল জনপ্রিয়তার পেছনে না ছুটে গুণগত মানকেও গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেও দীর্ঘমেয়াদে সাংস্কৃতিক চর্চা গড়ে তোলা প্রয়োজন। শিশুদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস, সংগীত শোনার রুচি এবং সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটাতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেবল ভোক্তা হবে, স্রষ্টা নয়। সবশেষে বলা যায়, লেখক, গায়ক ও সুরকার কেবল শিল্পের মানুষ নন; তাঁরা সমাজের আত্মা। তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে একটি জাতি নিজের পরিচয় খুঁজে পায়, নিজের স্বপ্ন দেখে এবং ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করে।

 

যদি তাঁদের সৃষ্টি মানবিকতা, সত্য ও ন্যায়বোধে সমৃদ্ধ হয়, তবে সমাজও সমৃদ্ধ হবে। আর যদি শিল্প কেবল বাজারের চাপে পরিচালিত হয়, তবে তা ধীরে ধীরে তার আত্মা হারাবে। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কেবল জনপ্রিয়তাকে মনে রাখে না; ইতিহাস মনে রাখে তাঁদেরই, যাঁরা সময়কে ছাড়িয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেন। তাই এই ত্রয়ীর মর্যাদা রক্ষা করা, তাঁদের সৃজনশীল স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং শিল্পকে আবারও মানবিকতার পথে ফিরিয়ে আনা আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক দায়িত্ব।

লেখক: সংবাদকর্মী

Ads small one

বিশ্ব চকোলেট দিবস: ভালোবাসা, উপহার ও বৈশ্বিক সংস্কৃতির যাত্রা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৭:৫৬ অপরাহ্ণ
বিশ্ব চকোলেট দিবস: ভালোবাসা, উপহার ও বৈশ্বিক সংস্কৃতির যাত্রা

সাকিবুর রহমান বাবলা

৭ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব চকোলেট দিবস। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খাদ্যপণ্যের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, এর দীর্ঘ ইতিহাস এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অবদানকে স্মরণ করতেই দিনটি উদযাপিত হয়। ২০০৯ সাল থেকে দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ১৫৫০ সালের ৭ জুলাই ইউরোপে চকোলেটের বিস্তৃত পরিচিতির সূচনা হয়। সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করেই বিশ্ব চকোলেট দিবস পালিত হয়।

চকোলেটের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। মধ্য আমেরিকার মায়া ও অ্যাজটেক সভ্যতার মানুষ কোকো বীজ থেকে তৈরি পানীয়কে মূল্যবান সম্পদ ও বিনিময় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করত। বর্তমানে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ড ভোগের দিক থেকে শীর্ষে। উন্নত উৎপাদন ও ঐতিহ্যের কারণে সুইজারল্যান্ড ও বেলজিয়াম বিশেষভাবে সমাদৃত। সুইজারল্যান্ড এবং বেলজিয়াম চকোলেটকে তাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ও অন্যতম “জাতীয় প্রতীক” বা গৌরব হিসেবে গণ্য করে।

বিশ্বের বিলাসবহুল ও উচ্চমূল্যের চকোলেট ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে ইকুয়েডরের টো’আক চকোলেট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিরল ‘ন্যাসিওনাল’ কোকো বীজ দিয়ে তৈরি এই পণ্যটি বিশ্বের অন্যতম দামি ও অভিজাত চকোলেট হিসেবে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব নিপশিল্ট-এর তৈরি ‘লা মাদেলিন ও ট্রাফল’ বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল ট্রাফল চকোলেট হিসেবে খ্যাত। ইতালির আমেদেই ব্র্যান্ডের ‘আমেদেই পোর্সেলানা’ ডার্ক চকোলেট বিরল সাদা কোকো বীজ থেকে প্রস্তুত হওয়ায় এটি অত্যন্ত মূল্যবান ও সমাদৃত। সুইজারল্যান্ডের টয়শার ও লিন্ডট দীর্ঘ ঐতিহ্য, উৎকৃষ্ট মান এবং প্রিমিয়াম উৎপাদনের জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত।

 

একইভাবে বেলজিয়ামের গোদাইভা ও গাইলিয়ান তাদের আভিজাত্য, নান্দনিক উপস্থাপন এবং রাজকীয় স্বাদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। অন্যদিকে ফেরেরো রোশে, ক্যাডবেরি ডেইরি মিল্ক, কিন্ডার, হার্শেজ, টোব্লেরোন ও লিন্ডট-এর মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলো আজ বিশ্বজুড়ে উৎসব, উদ্যাপন, উপহার প্রদান এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

বাংলাদেশে আশির দশকে ‘মিমি’ চকোলেটের মাধ্যমে এ দেশে চকোলেট সংস্কৃতির পরিচিতি ঘটে। বর্তমানে দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের সমন্বয়ে বাজার বিস্তৃত হয়েছে। মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা ও উপহার সংস্কৃতির প্রসারে জন্মদিন, বিবাহোত্তর সংবর্ধনা, করপোরেট অনুষ্ঠান ও ভালোবাসা দিবসে চকোলেটের ব্যবহার বেড়েছে। একই সঙ্গে ‘ফেয়ার ট্রেড’ সার্টিফিকেশন কোকো চাষিদের ন্যায্য মূল্য ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখছে।

শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও অতিরিক্ত গ্রহণ দাঁতের ক্ষয় ও স্থূলতার কারণ হতে পারে। তবে ডার্ক চকোলেটে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষের সুরক্ষা, হৃদ্স্বাস্থ্যের উন্নতি, রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি ও মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। পরিমিতি বজায় রেখে সচেতন খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবেই এটি গ্রহণ করা শ্রেয়।

বিশ্ব চকোলেট দিবসে আমরা কোকো চাষি, শ্রমিক ও উৎপাদনশিল্পের সঙ্গে জড়িত লাখো মানুষের অবদানকে স্মরণ করি। একটি চকোলেট বারের পেছনে থাকে দীর্ঘ শ্রম ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিশাল শৃঙ্খল। এই দিবস কেবল স্বাদের উদযাপন নয়; বরং মানুষের সৃজনশীলতা, পরিশ্রম ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের এক অনন্য স্বীকৃতি।

ন্যায়বিচারের রাষ্ট্র, নাকি প্রতিহিংসার রাজনীতি?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৭:৪৬ অপরাহ্ণ
ন্যায়বিচারের রাষ্ট্র, নাকি প্রতিহিংসার রাজনীতি?

‎গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

‎‎বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল গণতন্ত্রের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু প্রতিটি ক্ষমতার পরিবর্তনের পর যদি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে গণগ্রেপ্তার, মামলা, হয়রানি, রাজনৈতিক প্রতিশোধ কিংবা বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ সামনে আসে, তাহলে একটি মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে আমরা কি সত্যিই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে এগোচ্ছি, নাকি প্রতিহিংসার এক অন্তহীন রাজনৈতিক চক্রের মধ্যেই আবর্তিত হচ্ছি?

‎বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতির কাঙ্খিত পরিবর্তন সব সময় ঘটেনি। যে দল বিরোধী অবস্থায় থেকে দমন-পীড়নের অভিযোগ করেছে, ক্ষমতায় গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। এই পুনরাবৃত্তি বাস্তবতা জনগণের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে এবং গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা দুর্বল করে।

‎আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক হয়রানি ও বিরোধী মত দমনের অভিযোগ তুলেছে। এসব অভিযোগের যেগুলো তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হবে, সেগুলোর অবশ্যই আইনানুগ বিচার হওয়া উচিত। একইভাবে বর্তমান সময়ে যে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠলে তারও স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ আইনের শাসনের মূলনীতি হলো আইন ব্যক্তি বা দলের পরিচয় নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে প্রয়োগ হবে।

‎বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন মহলে এমন অভিযোগও আলোচিত হচ্ছে যে, আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের কিছু নেতা-কর্মী, যাদের বিরুদ্ধে অতীতে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ ছিল না এবং যারা নিজ নিজ এলাকায় সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিলেন, তারাও বিভিন্ন মামলায় আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হচ্ছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের একমাত্র বৈধ ক্ষেত্র আদালত। তবে এ ধরনের আলোচনা যখন জনপরিসরে বিস্তৃত হয়, তখন বিচারব্যবস্থা ও আইনের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

‎একইভাবে আইনজীবী মহল ও রাজনৈতিক অঙ্গনে মাঝে মাঝে এমন অভিযোগও উঠে আসে যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আদালত থেকে জামিন লাভের পর অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে পুনরায় কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। এসব অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট আদালত ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অনুসন্ধান ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়। তবে এমন ধারণা যদি জনমনে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

‎একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অপরাধের দায় ব্যক্তির, কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের নয়। কোনো দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত বা কর্মকান্ডের দায় সেই দলের প্রতিটি সাধারণ কর্মীর ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বর্তায় না। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিচার অবশ্যই হতে হবে। আবার নির্দোষ ব্যক্তি যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানির শিকার না হন, সেটিও সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এটাই আইনের শাসনের প্রকৃত চেতনা।

‎বাংলাদেশের ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় প্রতিহিংসার রাজনীতি কখনো স্থায়ী সমাধান এনে দেয় না। আজ যারা ক্ষমতায়, কাল তারা বিরোধী দলে যেতে পারেন; আবার আজ যারা বিরোধী, ভবিষ্যতে তারাই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারেন। ফলে আজ যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হবে, আগামী দিনে তার প্রভাব পড়বে সব রাজনৈতিক দলের ওপরই।
‎গণতন্ত্রের শক্তি প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার মধ্যে নয়; বরং ভিন্নমতকে সাংবিধানিক ও আইনসম্মত কাঠামোর মধ্যে নিরাপদ রাজনৈতিক পরিসর দেওয়ার মধ্যেই নিহিত। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নিষ্পত্তি হওয়া উচিত জনগণের রায়ে, প্রশাসনিক প্রভাব বা প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে নয়।

‎বাংলাদেশের মানুষ বহু সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন লালন করেছে। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে তখনই, যখন আইনের শাসন বাস্তব অর্থে প্রতিষ্ঠিত হবে, বিচারব্যবস্থা হবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ, মানবাধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং কোনো নাগরিক তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে বৈষম্য বা অনিশ্চয়তার শিকার হবেন না।
‎আজ সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করা। সেই আস্থার ভিত্তি হতে পারে একটিই অপরাধীর বিচার হবে, কিন্তু নির্দোষের অধিকারও সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে; আইন হবে নিরপেক্ষ, বিচার হবে প্রমাণভিত্তিক এবং রাষ্ট্র হবে সব নাগরিকের সমান আশ্রয়স্থল।

‎প্রতিহিংসার রাজনীতি কোনো জাতির জন্য স্থায়ী সমাধান নয়। ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ওপর দাঁড়িয়েই একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠে।

‎‎‎লেখক: গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ, সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা

 

পাইকগাছায় পল্লী উন্নয়ন দিবস পালিত

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৭:৩৬ অপরাহ্ণ
পাইকগাছায় পল্লী উন্নয়ন দিবস পালিত

পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি: খুলনার পাইকগাছায় নানা আয়োজনে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস পালিত হয়েছে। উন্নত পল্লী, সমৃদ্ধ দেশ সবার আগে বাংলাদেশ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ৬ জুলাই সোমবার উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের যৌথ উদ্যোগে দিবসটি উপলক্ষে র‌্যালি, আলোচনা সভা এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

র‌্যালি শেষে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী। সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন, উপজেলা পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা ওয়াহিদ মুরাদ।

এসময়ে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন,উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা একরামুল হোসেন, সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সৈকত মল্লিক, উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ শোয়েব শাফিন, সমাজসেবা কর্মকর্তা অনাথ কুমার বিশ্বাস, উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা হুমায়ূন কবির, উপজেলা কেন্দ্রীয় সমিতির চেয়ারম্যান প্রাণকৃষ্ণ দাশ প্রমুখ।

অনুষ্ঠান শেষে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী সমবায়ীদের মাঝে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা বিতরণ করেন। এ সময় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, সমবায়ী, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।