বাংলার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের চিরপ্রস্থান/ এম.এম হায়দার আলী
এম.এম হায়দার আলী
বাংলা ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও মননশীল চিন্তার আকাশ থেকে আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে গেল। লেখক, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও প্রজ্ঞার আলোকবর্তিকা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর আমাদের মাঝে নেই। তাঁর প্রস্থান শুধু একটি মানুষের মৃত্যু নয়; এটি বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর মৃত্যুতে জাতি হারাল একজন চিন্তাশীল শিক্ষক, একজন নির্ভীক গবেষক এবং বাংলা ভাষার এক নিবেদিতপ্রাণ সাধক। গত রোববার রাজধানীর মিরপুরের একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার পাকুন্দিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া আবুল কাসেম ফজলুল হক জ্ঞানের সাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। সদ্য প্রয়াত এই মনীষীর জীবনি ঘেঁটে যতটুকু জানা সম্ভব হল, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে কেবল পাঠদানই করাননি, তাঁদের মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিলেন মুক্তচিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ ও সাহিত্যবোধের দীপ্তি। বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে তিনি দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে অসামান্য অবদান রাখেন। তাঁর লেখনী ছিল সময় সচেতন, বিশ্লেষণধর্মী এবং সমাজমনস্ক।
মুক্তিসংগ্রাম, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি, একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন, ‘উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণী ও বাংলা সাহিত্য, মানুষ ও তার পরিবেশ, সাহিত্যজিজ্ঞাসা, সাহিত্যসৃষ্টি ও সাহিত্যবিচার, ‘জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, বিশ্বায়ন ও ভবিষ্যৎ, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ও উত্তরকাল, আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা’,এসব গ্রন্থ আজও গবেষক, শিক্ষার্থী ও পাঠকের কাছে মূল্যবান সম্পদ।
দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের রাজনৈতিক আদর্শের বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে তিনি বিশ্বচিন্তার দুয়ারও বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য উন্মুক্ত করেছিলেন। সম্পাদক হিসেবেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘মোতাহের হোসেন চৌধুরীর নির্বাচিত প্রবন্ধ, ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং স্বদেশচিন্তা সহ একাধিক গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। পাশাপাশি সুন্দরম ও লোকায়ত’ সাময়িকীর মাধ্যমে তিনি নতুন চিন্তা, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন।
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো পুরস্কার নয়; তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন একজন মুক্তবুদ্ধির মানুষ, যিনি সত্য, যুক্তি এবং মানব কল্যাণের পক্ষে আজীবন কলম ধরেছিলেন। একজন প্রকৃত মনীষীর মৃত্যু কখনো তাঁর চিন্তার মৃত্যু নয়। মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি, তাঁর দর্শন এবং তাঁর আলোকিত চিন্তা যুগের পর যুগ বেঁচে থাকে। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের রচনা, গবেষণা ও চিন্তার আলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পথ দেখাবে,এটাই আমাদের বিশ্বাস।
আজ তাঁর শূন্যতায় বাংলা সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গভীরভাবে শোকাহত। মহান আল্লাহ যেন এই প্রাজ্ঞ মনীষীকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন এবং তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবার, সহকর্মী, ছাত্রছাত্রী ও অসংখ্য গুণগ্রাহীকে এই শোক বহনের শক্তি দান করেন।বিদায় প্রাজ্ঞ মনীষী। আপনার কলম থেমে গেছে, কিন্তু আপনার চিন্তার আলো বাংলার আকাশে দীর্ঘদিন জ্বলে থাকবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।






