শঙ্কা ও সাহসের দোলাচলে সুন্দরবনে নতুন মধু-যাত্রা
এমএ হালিম, উপকূলীয় অঞ্চল (শ্যামনগর): বাঘের গর্জন আর বনদস্যুর আতঙ্কÑসবকিছুকে তুচ্ছ করেই আবারও সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে পা বাড়াচ্ছেন মৌয়ালরা। প্রথম দফার অভিযান শেষ করে কিছুদিন বিরতি নিয়ে এখন চলছে দ্বিতীয় দফার প্রস্তুতি। অনিশ্চয়তা আর জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে শুরু হচ্ছে তাদের এই নতুন মধু-যাত্রা।
সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ সংলগ্ন গাবুরা ডুমুরিয়া গ্রামের সামাদ মাঝী। মৌয়াল বাবার এই উত্তরসূরি এবারও মধু সংগ্রহে যাচ্ছেন। তবে তার কণ্ঠে সাহসের চেয়ে শঙ্কার সুরই বেশি। সামাদ বলেন, “দ্বিতীয়বার বনে যাওয়াটা অনেক বেশি ঝুকিপূর্ণ। প্রথম দফায় বোঝা যায় কোথায় চাক বেশি, তাই দস্যুদের নজরদারিও বেড়ে যায়। চাঁদা না দিলে বনে কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।”
স্থানীয় মৌয়ালদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে মৌয়ালদের শত্রু শুধু বাঘ বা বিষধর সাপ নয়; এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে বনদস্যু। অতীতে মুক্তিপণের জন্য অপহরণ বা নির্যাতনের বিভীষিকা এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় তাদের।
কেন এই মরণপণ ঝুঁকি? উত্তরটা খুব সহজÑপেটের টান। অধিকাংশ মৌয়াল মহাজনদের কাছ থেকে আগাম ঋণ বা ‘দাদন’ নিয়ে বনের সরঞ্জম কেনেন। মধু বিক্রি করে সেই ঋণ শোধ করতে না পারলে পুরো পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়তে হয় তাদের। তাই বাঘের ভয় থাকলেও জীবিকার তাগিদে বনে যাওয়াই তাদের একমাত্র পথ।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রথম দফায় বন থেকে মধু সংগ্রহের চিত্রটি বেশ ইতিবাচক। এতে মোট পাস (অনুমতিপত্র) ১৭৪টি, মৌয়ালের সংখ্যা ১,১৬৯ জন, সংগৃহীত মধু ৫৮৪.৫০ কুইন্টাল এবং সংগৃহীত মোম ১৭৫.৩৫ কুইন্টাল।
বন বিভাগ বলছে, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টহল জোরদার করা হয়েছে। তবে বনজীবীদের অভিযোগ, দস্যুরা আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। বনরক্ষীদের তৎপরতা আরও বাড়ানো না হলে এই মৌসুমে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন তারা।
সুন্দরবনের মৌচাকে মৌচাকে লুকানো সোনালি মধু আহরণ করতে গিয়ে প্রতি বছর কত প্রাণ ঝরে পড়ে, তার সঠিক হিসাব হয়তো থাকে না। তবুও বছরের পর বছর শঙ্কা আর সাহসকে সঙ্গী করেই চলে মৌয়ালদের এই আজন্ম লড়াই।









