দুর্যোগ ঝুঁকিতে আশাশুনির লাখো মানুষ, নেই আধুনিক ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র
ফাইল ফটো
সচ্চিদানন্দ দে সদয়, আশাশুনি: উপকূলীয় জনপদ আশাশুনিতে বৈশাখ এলেই বাড়তে থাকে উৎকণ্ঠা। কালো মেঘ, উত্তাল নদী আর ঝোড়ো বাতাসের আভাস পেলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মধ্যে। কারণ স্বাধীনতার এত বছর পরও দুর্যোগপ্রবণ এই এলাকায় গড়ে ওঠেনি কোনো আধুনিক ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র। ফলে দুর্যোগের আগাম বার্তা দ্রুত পৌঁছানো না গেলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যায়।
আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, “আইলার সময় আমরা বুঝতেই পারিনি কত বড় বিপদ আসছে। যখন খবর পেলাম, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখনো যদি আগাম সতর্কতার ভালো ব্যবস্থা না হয়, তাহলে আবারও বড় বিপদ হতে পারে।” একই এলাকার গৃহবধূ নাছিমা খাতুন বলেন, “আকাশ একটু খারাপ হলেই ভয় লাগে। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাব, কী করবÑএ নিয়েই চিন্তায় থাকি। আগে যদি খবর পাওয়া যেত, তাহলে প্রস্তুতি নিতে সুবিধা হতো।”
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বছর বর্ষা ও কালবৈশাখী মৌসুমে নদীভাঙন, বেড়িবাঁধ ধস ও জলোচ্ছ্বাসের আতঙ্কে থাকতে হয় তাদের। বিশেষ করে বেতনা, খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থানীয় এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আশাশুনি ও শ্যামনগর অঞ্চলের প্রায় ৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২৩ কিলোমিটার এলাকা চরম ঝুঁকিতে। তিনি বলেন, “জলোচ্ছ্বাস বা বড় ধরনের নিম্নচাপ হলে এসব বাঁধ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।”
বুধহাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক মাহাবুবুল হক ডাবলু বলেন, “নদীর পানি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উত্তাল। উপকূলের মানুষ সব সময় আতঙ্কে থাকে। কিন্তু এখানে কোনো আধুনিক ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র না থাকায় আগাম বার্তা দ্রুত পৌঁছানো যায় না।” আশাশুনি উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এড. সহিদুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, “আইলার ভয়াবহতা আমরা নিজের চোখে দেখেছি। তখন অনেক মানুষ সময়মতো আশ্রয় নিতে পারেনি। এখনো সেই অভিজ্ঞতা মানুষকে তাড়া করে বেড়ায়।”
আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই উপকূলে একটি পূর্ণাঙ্গ ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র স্থাপন অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে স্থানীয় আবহাওয়া অফিসগুলো মূলত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও বাতাসের গতি রেকর্ড করে ঢাকায় পাঠায়। পরে কেন্দ্রীয় অফিস থেকে তথ্য বিশ্লেষণ করে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। এতে অনেক সময় বিলম্ব ঘটে।
পরিবেশবিদ আশাশুনি সরকারী কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রধান সজল কুমার বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক একটি আধুনিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।” উপকূলবাসীর দাবি, শুধু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করলেই হবে না; দুর্যোগের আগাম তথ্য দ্রুত পৌঁছে দিতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সতর্কীকরণ ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে যেকোনো বড় দুর্যোগে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে আশাশুনিসহ পুরো উপকূল অঞ্চল।









