শেষ বিদায়ে লাখো মানুষের ঢল, খামেনির পর মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কোথায়?
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত কেবল একটি মানুষের জীবনাবসানের সংবাদ বহন করে না; বরং একটি যুগের সমাপ্তির ঘোষণা দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিদায় তেমনই এক ঘটনা, যার অভিঘাত ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে সমগ্র অঞ্চলের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতায় প্রতিফলিত হবে বহুদিন।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর হাত ধরেই ইরান শুধু একটি রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পশ্চিমা আধিপত্যের বিরোধিতা, ফিলিস্তিন প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি এমন এক রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।
তাঁর মৃত্যুর পর রাজধানী তেহরান যেন পরিণত হয়েছে শোক, স্মৃতি ও ইতিহাসের এক বিশাল মঞ্চে। রাজপথ, চত্বর, ধর্মীয় কেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নেমে এসেছে মানুষের ঢল। কালো পতাকা, ব্যানার, প্রতিকৃতি এবং আবেগঘন স্লোগানে মুখরিত পুরো শহর। লাখো মানুষের উপস্থিতি শুধু একজন নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন নয়; বরং একটি রাজনৈতিক দর্শন ও দীর্ঘদিনের আদর্শিক যাত্রার প্রতিও সম্মান প্রদর্শন।
খামেনির রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় নিঃসন্দেহে ‘অ্যাক্সিস অব রেসিস্ট্যান্স’ বা ‘প্রতিরোধ অক্ষ’। তাঁর নেতৃত্বে ইরান এমন একটি আঞ্চলিক বলয় গড়ে তোলে, যা লেবানন থেকে সিরিয়া, ইরাক থেকে ইয়েমেন এবং ফিলিস্তিন পর্যন্ত বিস্তৃত প্রভাবের ক্ষেত্র তৈরি করে। সমর্থকদের কাছে এটি ছিল দখলদারিত্ব ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক; সমালোচকদের কাছে এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করার এক কৌশল। কিন্তু উভয় পক্ষই স্বীকার করে, এই নীতিই ইরানকে আঞ্চলিক রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনির ক্ষমতা ছিল বহুমাত্রিক। রাষ্ট্রের সামরিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর ভূমিকা ছিল নির্ধারক। বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর বিকাশ, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে তাঁর নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাঁর সময়েই ইরান এমন এক শক্তিতে পরিণত হয়, যার অবস্থানকে উপেক্ষা করে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো বড় রাজনৈতিক সমীকরণ কল্পনা করা কঠিন।
তাঁর শেষ বিদায়ে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, কূটনীতিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং ধর্মীয় নেতাদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে তাঁর প্রভাব কেবল ইরানের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি ছিলেন বহুল আলোচিত, সমর্থিত ও সমালোচিত এক শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব। তাই তাঁর জানাজা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি বিশ্বরাজনীতির দৃষ্টি আকর্ষণ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
আজ যখন তেহরানের রাজপথে মানুষের ঢল নেমেছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিয়েও শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। খামেনির পর ইরানের নেতৃত্ব কোন পথে এগোবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ চাপ এবং পরিবর্তন প্রত্যাশী নতুন প্রজন্ম-সবকিছু মিলিয়ে নতুন নেতৃত্বকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।
সম্ভবত ইরান পূর্বসূরির নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে, আবার সময়ের প্রয়োজনে নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতাও গ্রহণ করতে পারে। তবে যে পথই বেছে নেওয়া হোক না কেন, তার প্রভাব পড়বে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যের ওপর।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কিছু নেতার মৃত্যু তাঁদের প্রভাবকে মুছে দেয় না; বরং নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করে। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটছে। তাঁর সমর্থকরা তাঁকে স্মরণ করবেন প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে, সমালোচকরা মূল্যায়ন করবেন তাঁর নীতির পরিণতি দিয়ে। কিন্তু ইতিহাসের আদালতে একটি বিষয় অস্বীকার করার সুযোগ নেই-তিনি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন।
তেহরানের জনসমুদ্র আজ সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। একজন নেতার বিদায়ের মধ্য দিয়ে একটি যুগের অবসান ঘটেছে, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, কৌশলগত দর্শন এবং আঞ্চলিক প্রভাব আগামী বহু বছর ধরে আলোচিত হবে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে একটি পরিচিত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলেও ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের সূচনা ইতোমধ্যেই হয়েছে।
লেখক: গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা (গাজী বাজার)









