শ্যামনগরে বেড়িবাঁধ প্রকল্প: চাঁদা না পেয়ে বাধার অভিযোগ, তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত দাবি ইউপি চেয়ারম্যানের
সংবাদদাতা: শ্যামনগরে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন উপকূল রক্ষা বেড়িবাঁধ প্রকল্প নিয়ে চলা বিতর্কের অবসান ঘটেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জমি দখলের যে অভিযোগ তুলে বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মো. নজরুল ইসলাম আন্দোলন করছিলেন, সরকারি তদন্তে তার কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান যে জমিটিকে নিজের লিজ নেওয়া সম্পত্তি বলে দাবি করেছিলেন, প্রকৃতপক্ষে সেটি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জায়গা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তদন্তের এই ফলাফলের পর প্রকল্প কর্তৃপক্ষের সেই পুরোনো অভিযোগটিই সামনে আসছেÑমোটা অঙ্কের চাঁদা না পেয়েই উন্নয়ন কাজে বারবার বাধা দেওয়া হচ্ছিল।
জানা যায়, জাইকার অর্থায়নে শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ও কাশিমারী ইউনিয়নে প্রায় আড়াই কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করছে ‘মেসার্স আর-রাদ করপোরেশন’। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে কাজে বাধা দিচ্ছেন। এ নিয়ে পাউবোর প্রকল্প পরিচালক জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগও করেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে পানি সম্পদ মন্ত্রীর নির্দেশে গত ১ জুন শ্যামনগর উপজেলা পরিষদে একটি বিশেষ সভা হয়। সেখানে স্থানীয় সংসদ সদস্য, পাউবো কর্মকর্তা, প্রশাসন এবং বিএনপি-জামায়াত ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় চেয়ারম্যান দাবি করেন, প্রকল্পের সিসি ব্লক তৈরির ইয়ার্ডটি তার লিজ নেওয়া জমিতে করা হয়েছে। এই দাবির সত্যতা যাচাইয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ওসিসহ সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
গত ৪ জুন সরেজমিন পরিদর্শন শেষে ৮ জুন কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে দেখা যায়, সিসি ব্লক তৈরির জায়গাটি মূলত বিআরএস ৭০০১ ও ৭০০২ দাগের অন্তর্ভুক্ত, যা যথাক্রমে সরকারি খাস জমি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মালিকানাধীন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম লিজের কোনো বৈধ বা হালনাগাদ দলিল দেখাতে পারেননি। নিয়ম অনুযায়ী, পাউবোর জমি কোনো ইউপি চেয়ারম্যানকে লিজ দেওয়ার এখতিয়ার উপজেলা খাস জমি বন্দোবস্ত কমিটির নেই। ওই জমিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে কাজ করছে। তবে এই তদন্ত প্রতিবেদনে জামায়াতে ইসলামী ও চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি স্বাক্ষর করেননি।
শ্যামনগরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাশেদ হোসাইন বলেন, নির্ধারিত পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যেই তদন্ত সম্পন্ন করে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। তদন্তে যা পাওয়া গেছে, তা-ই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তের সময় জামায়াত ও চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকায় তাদের স্বাক্ষর নেওয়া সম্ভব হয়নি।
পাউবো ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, মূলত চাঁদা না পেয়েই এই বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল। আর-রাদ করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সবুজ আলী খান জানান, গত ফেব্রুয়ারিতে তার কাছে ১২ লাখ টাকা কমিশন দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় শ্রমিক ও সাব-ঠিকাদারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় গত ২৫ মে শ্যামনগর থানায় চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও তার ছেলেসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ১৯ মে চেয়ারম্যান ১৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন এবং ২৩ মে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে প্রকৌশলী জাহিদ হাসানকে মারধর করে স্মার্টওয়াচ ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেন। ঘটনার পর থেকে চেয়ারম্যান পলাতক রয়েছেন। তবে শুরু থেকেই সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম। তার দাবি, তিনি বনায়ন রক্ষা ও পরিবেশগত কারণে আপত্তি তুলেছিলেন, কোনো চাঁদা চাননি।
পাউবো কর্মকর্তারা জানান, বর্ষার আগে এই বাঁধের কাজ শেষ না হলে খোলপেটুয়া, মালঞ্চ ও কালিন্দী নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়বে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়নে চলা প্রকল্প এভাবে আটকে থাকায় সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণœ হচ্ছিল।









