সংবাদ যখন রায় হয়ে যায়/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
গণমাধ্যমকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। মানুষ বিশ্বাস করে, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য সত্য, নিরপেক্ষ এবং যাচাই করা। এই বিশ্বাসই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সম্পদ। কিন্তু যখন একটি ভুল শব্দ, অসতর্ক একটি শিরোনাম কিংবা প্রেক্ষাপটহীন একটি ক্যাপশন কোনো মানুষের পরিচয় বদলে দেয়, তখন শুধু একজন ব্যক্তি নন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাও।
ম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অপরাধসংক্রান্ত সংবাদে একটি বিষয় ক্রমেই বেশি চোখে পড়ছে। কোনো ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হলেই অনেক ক্ষেত্রে সবাইকে একই পরিচয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অথচ তদন্তে দেখা যায়, একজনের বিরুদ্ধে মূল অপরাধের অভিযোগ, আরেকজনের বিরুদ্ধে সহযোগিতার অভিযোগ, আবার অন্য কারও বিরুদ্ধে চোরাই মাল কেনা বা সংরক্ষণের অভিযোগ। কিন্তু সংবাদে এই পার্থক্য অনেক সময় হারিয়ে যায়। এক শব্দেই সবাই হয়ে যানÑ‘চোর’, ‘ডাকাত’ কিংবা ‘প্রতারক’।
এটি শুধু ভাষাগত ভুল নয়; এটি একটি গুরুতর পেশাগত ত্রুটি। আইনের ভাষায় প্রতিটি অপরাধের সংজ্ঞা আলাদা। চুরি করা, চুরিতে সহায়তা করা এবং চোরাই মাল জেনেশুনে ক্রয় করাÑতিনটি ভিন্ন অপরাধ। প্রত্যেকটির জন্য আইনে পৃথক বিধান রয়েছে। ফলে একজনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, আরেকজনের বিরুদ্ধে সেই একই অভিযোগ নাও থাকতে পারে।
সাংবাদিকতারও উচিত সেই পার্থক্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। সংবাদের কাজ তথ্য দেওয়া, বিচার করা নয়। আদালতের আগে কোনো ব্যক্তিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা উচিত নয়, যাতে পাঠকের কাছে মনে হয় তার অপরাধ ইতোমধ্যেই প্রমাণিত। কারণ আইন একটি মৌলিক নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছেÑঅপরাধ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তি অভিযুক্ত, দোষী নন। এই নীতি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
একটি ভুল শিরোনাম বা অসতর্ক শব্দচয়ন একজন মানুষের সামাজিক পরিচয়কে মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে। ব্যবসা, পেশা, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক মর্যাদাÑসবকিছুই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যেতে পারে। পরে আদালত যদি তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে, তবুও প্রথম সংবাদে সৃষ্ট নেতিবাচক ধারণা সহজে মুছে যায় না। এই কারণেই বিশ্বজুড়ে দায়িত্বশীল গণমাধ্যম ‘অভিযুক্ত’, ‘গ্রেপ্তার’, ‘চোরাই মাল ক্রয়ের অভিযোগ’, ‘সহযোগিতার অভিযোগ’Ñএ ধরনের নির্দিষ্ট ও সতর্ক শব্দ ব্যবহার করে। কারণ প্রতিটি শব্দের আলাদা আইনি ও সামাজিক অর্থ রয়েছে।
বর্তমানে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো কপি-পেস্ট সাংবাদিকতা। কোনো একটি সংবাদ প্রকাশের পর সেটি যাচাই না করেই বহু গণমাধ্যম একই ভাষায় প্রকাশ করে। অনেক সময় থানার প্রেস বিজ্ঞপ্তির ভাষাও হুবহু সংবাদে স্থান পায়। অথচ একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি তথ্যের উৎস হতে পারে, কিন্তু সেটিই পূর্ণাঙ্গ সংবাদ নয়। একজন সাংবাদিকের কাজ হলো তথ্য যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া, ঘটনার প্রেক্ষাপট বোঝা এবং নিজের ভাষায় পাঠকের সামনে তুলে ধরা। সাংবাদিকতা কখনোই শুধু দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতা নয়। এটি সত্য অনুসন্ধানের পেশা।
একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার নিজস্ব অনুসন্ধান, ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার এবং নিরপেক্ষতা। বিশেষ করে অপরাধবিষয়ক সংবাদে আরও বেশি সতর্ক হওয়া জরুরি। কারণ এখানে একটি শব্দের ভুল ব্যবহারও মানুষের মৌলিক অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একজন ব্যক্তি যদি চোরাই মাল কেনার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন, তবে তাকে ‘চোর’ বলা তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। আবার কেউ যদি তদন্তাধীন থাকেন, তবে তাকে নিশ্চিত অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করাও অনুচিত। সংবাদের ভাষা কখনো আবেগের ভাষা হতে পারে না; হতে হবে তথ্যের ভাষা।
সেখানে ব্যক্তিগত রাগ, পক্ষপাত, অনুমান কিংবা অতিরঞ্জনের কোনো স্থান নেই। কারণ সংবাদপত্রের প্রতিটি শব্দই ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।আজকের ডিজিটাল যুগে একটি ভুল সংবাদ কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পরে সেটি সংশোধন করা হলেও প্রথম ভুল তথ্যই মানুষের মনে বেশি স্থায়ী হয়। তাই প্রকাশের আগে প্রতিটি তথ্য ও প্রতিটি শব্দ বারবার যাচাই করা সাংবাদিকতার ন্যূনতম দায়িত্ব।
সমালোচনা সাংবাদিকতার শত্রু নয়; বরং আত্মসমালোচনাই পেশাটিকে শক্তিশালী করে। ভুল হলে তা স্বীকার করা এবং ভবিষ্যতে সংশোধনের চেষ্টা করাই একজন পেশাদার সাংবাদিকের বৈশিষ্ট্য। কারণ সাংবাদিকের কলমের শক্তি তার সততায়, উচ্চস্বরে নয়। গণমাধ্যমকে মানুষ এখনো সমাজের বিবেক হিসেবে দেখতে চায়। সেই মর্যাদা ধরে রাখতে হলে উত্তেজনাপূর্ণ শিরোনামের চেয়ে নির্ভুল তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। জনপ্রিয়তার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা বড়Ñএই উপলব্ধিই সাংবাদিকতার প্রকৃত ভিত্তি।শেষ পর্যন্ত একটি কথাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণÑসংবাদে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ একজন মানুষের জীবন, সম্মান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।
তাই কাউকে যে পরিচয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটি যেন তথ্য, আইন ও বাস্তবতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। কারণ একটি ভুল শব্দ মুহূর্তে একজন মানুষকে সমাজের চোখে অপরাধী বানিয়ে দিতে পারে, কিন্তু সেই ভুলের ক্ষত সারতে অনেক সময় একটি জীবনও যথেষ্ট হয় না। সাংবাদিকতার সার্থকতা তখনই, যখন সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা শব্দের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। আর সেই দায়বদ্ধতাই গণমাধ্যমকে মানুষের আস্থার সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছে দেয়।



