সংযুক্ত পৃথিবী, বিচ্ছিন্ন মানুষ/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
দরজাটি কয়েক দিন ধরে বন্ধ। ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই। বারান্দার বাতিও নিভে আছে। একই ভবনের বাসিন্দারা বিষয়টি লক্ষ করলেও বিশেষ গুরুত্ব দেননি। কারণ আধুনিক নগরজীবনে অন্যের ব্যক্তিগত পরিসরে উঁকি দেওয়াকে অনেকেই অশোভন মনে করেন। কিন্তু কয়েক দিন পর যখন দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, তখন সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে।
সেখানে পাওয়া যায় কয়েক দিন আগেই মারা যাওয়া এক মানুষের অর্ধগলিত মরদেহ। এটি শুধু একটি ঘটনার বিবরণ নয়; এটি আমাদের সময়ের এক নির্মম সামাজিক প্রতিচ্ছবি। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন ঘটনা বারবার ঘটছে। একা বসবাসকারী প্রবীণ নারী-পুরুষ, প্রবাস ফেরত ব্যক্তি কিংবা নিঃসঙ্গ জীবন যাপন কারী মানুষ মৃত্যুর পর দিনের পর দিন পড়ে থাকছেন নিজ বাসভবনে।
তাদের অনুপস্থিতি টের পাচ্ছে না পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশী কিংবা সমাজ। দুর্গন্ধই শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর সংবাদ বহন করে আনছে। এই ঘটনাগুলো কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এগুলো আমাদের সমাজ, পরিবার ও সভ্যতার সামনে এক গভীর প্রশ্ন তুলে ধরছেÑপ্রযুক্তির এই যুগে আমরা কি সত্যিই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত, নাকি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন? বাংলাদেশের সমাজ দীর্ঘদিন ধরে পরিবারকেন্দ্রিক সমাজ হিসেবে পরিচিত ছিল। এই ভূখ-ের সামাজিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি ছিল পারিবারিক বন্ধন।
দাদা-দাদি, নানা-নানি, বাবা-মা, সন্তানÑসবাই মিলে একই ছাদের নিচে বসবাস করতেন। পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা শুধু সম্মানিতই ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু। সন্তানদের বড় করা, নাতি-নাতনিদের গল্প শোনানো, পারিবারিক সিদ্ধান্তে মতামত দেওয়াÑসবকিছুতেই তাঁদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল।কিন্তু গত কয়েক দশকে এই চিত্র দ্রুত বদলে গেছে। নগরায়ণ, বিশ্বায়ন, উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অভিবাসনের কারণে পরিবারগুলো ভৌগোলিক ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
আজকের বাংলাদেশে এমন অসংখ্য পরিবার আছে, যেখানে বাবা-মা ঢাকায় কিংবা গ্রামের বাড়িতে থাকেন, আর সন্তানরা কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য বা মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত। আবার দেশের মধ্যেই একজন ঢাকায়, অন্যজন চট্টগ্রামে, কেউ রাজশাহীতে, কেউ বিদেশে। এ পরিবর্তন স্বাভাবিক এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়ও। মানুষের উন্নত জীবন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য স্থানান্তর অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এর সামাজিক মূল্যও রয়েছে। সেই মূল্য সবচেয়ে বেশি দিচ্ছেন প্রবীণরা এবং একা বসবাসকারী মানুষরা।
সমাজ বিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, মানুষের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা অর্থ নয়, সম্পর্ক। ব্যাংক হিসাব, বাড়ি-গাড়ি কিংবা আর্থিক সচ্ছলতা জীবনের অনেক সমস্যা সমাধান করতে পারে, কিন্তু নিঃসঙ্গতা দূর করতে পারে না। একজন মানুষের প্রয়োজন আরেকজন মানুষের উপস্থিতি। প্রয়োজন খোঁজ নেওয়া, কথা বলা, পাশে দাঁড়ানো। আমাদের সমাজে এখন এমন অনেক প্রবীণ আছেন, যাঁদের সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত। কেউ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ চিকিৎসক, কেউ বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরি করেন। কিন্তু তবুও বাবা বা মা জীবনের শেষ সময়ে একা। সন্তানরা অর্থ পাঠান, ভিডিও কলে কথা বলেন, চিকিৎসার খরচ বহন করেন। কিন্তু মানুষের জীবনে কিছু প্রয়োজন আছে, যা অর্থ দিয়ে পূরণ হয় না।
অসুস্থতার সময় পাশে বসে থাকা, এক কাপ চা হাতে নিয়ে গল্প করা কিংবা হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে খোঁজ নেওয়ার বিকল্প নেই। প্রযুক্তির অগ্রগতি মানব সভ্যতার অন্যতম বড় অর্জন। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পৃথিবীকে ছোট করে এনেছে। কয়েক সেকেন্ডে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে থাকা প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলা যায়। ছবি, ভিডিও, অনুভূতি মুহূর্তেই ভাগাভাগি করা যায়। কিন্তু এই প্রযুক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। আমরা যোগাযোগের সবচেয়ে উন্নত যুগে বাস করছি, অথচ সম্পর্কের গভীরতায় সংকট তৈরি হয়েছে।
একসময় সন্ধ্যা মানেই ছিল পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসা। গল্প, আড্ডা, আলোচনা, হাসি-আনন্দে কেটে যেত সময়। এখন একই পরিবারের সদস্যরা একই ঘরে থাকলেও আলাদা আলাদা পর্দার জগতে হারিয়ে যান। বাবা মোবাইলে সংবাদ পড়ছেন, মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত, সন্তান ভিডিও দেখছে বা গেম খেলছে। শারীরিকভাবে কাছাকাছি থাকলেও মানসিক দূরত্ব বাড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শত শত বন্ধু, হাজার হাজার অনুসারী থাকতে পারে। কিন্তু বাস্তব জীবনে সংকটের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ অনেক সময় একজনও থাকে না। এটাই আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি। নগরজীবনের আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো প্রতিবেশী সংস্কৃতির অবক্ষয়। একসময় প্রতিবেশী ছিলেন আত্মীয়ের মতো। কারও বাড়িতে অসুস্থতা হলে খবর নেওয়া হতো। কারও দরজা দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে খোঁজ নেওয়া হতো। উৎসব-পার্বণে সবাই একে অপরের বাড়িতে যেতেন।
আজকের বহুতল ভবনের জীবন সেই সম্পর্ককে দুর্বল করে দিয়েছে। একই ভবনে বছরের পর বছর বসবাস করেও অনেকেই পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দার নাম জানেন না। লিফটে দেখা হলে সৌজন্য মূলক হাসি বিনিময় হয়, কিন্তু সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। নিরাপত্তা, ব্যস্ততা ও ব্যক্তি কেন্দ্রিক জীবনযাত্রা মানুষকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন করে তুলছে। ফলে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে, কেউ মানসিক সংকটে ভুগলে কিংবা কেউ মৃত্যুবরণ করলেও তা জানার মতো সামাজিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে নিঃসঙ্গতা কেবল মানসিক সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা।
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি একাকীত্ব মানুষের শরীরে এমন প্রভাব ফেলে, যা ধূমপান, স্থূলতা বা শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতোই ক্ষতিকর হতে পারে। নিঃসঙ্গ মানুষের মধ্যে বিষণœতা, উদ্বেগ, অনিদ্রা, স্মৃতিভ্রংশ, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি থাকে। এমনকি দীর্ঘদিনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানুষের আয়ুষ্কালও কমিয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণের ফলে এই ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ আজ যে সংকট সীমিত আকারে দেখা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে তা আরও বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে। তবে নিঃসঙ্গতা শুধু প্রবীণদের সমস্যা নয়। তরুণরাও ক্রমশ এর শিকার হচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, একা থাকা চাকরিজীবী, প্রবাস ফেরত ব্যক্তি কিংবা সম্পর্ক ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষদের মধ্যে একাকীত্ব বাড়ছে।
প্রতিযোগিতা মূলক জীবন ব্যবস্থা মানুষকে ব্যস্ত করেছে, কিন্তু সুখী করতে পারেনি। কর্মক্ষেত্রের চাপ, অনিশ্চয়তা, সামাজিক প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ অনেক তরুণকে মানসিক ভাবে বিচ্ছিন্ন করে তুলছে। অনেকে নিজের সমস্যার কথা কাউকে বলতে পারেন না। ফলে বিষণœতা, আত্মহত্যা প্রবণতা ও মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জটিলতা বাড়ছে। প্রথমত, পরিবারকে আবার সম্পর্কের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে।
প্রযুক্তি যোগাযোগের মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু সম্পর্কের বিকল্প নয়। নিয়মিত ফোন করা, খোঁজ নেওয়া, দেখা করতে যাওয়া এবং প্রবীণ সদস্যদের জীবনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া জরুরি। দ্বিতীয়ত, প্রতিবেশী সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। একই ভবনে বা এলাকায় বসবাসকারী মানুষের মধ্যে পরিচয় ও যোগাযোগ বাড়াতে হবে। সামাজিক অনুষ্ঠান, কমিউনিটি কার্যক্রম এবং পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রবীণদের জন্য সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একা বসবাসকারী প্রবীণদের নিয়মিত খোঁজ নেওয়া, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং কমিউনিটি সাপোর্ট নেটওয়ার্ক তৈরি করা সময়ের দাবি।
চতুর্থত, মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিঃসঙ্গতা ও বিষণœতা নিয়ে কথা বলার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কাউন্সেলিং, কমিউনিটি সাপোর্ট এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য করা প্রয়োজন। সবশেষে, আমাদের প্রত্যেকের নিজের কাছে একটি প্রশ্ন রাখা উচিতÑশেষ কবে আমরা একা থাকা কোনো আত্মীয়ের খোঁজ নিয়েছি? শেষ কবে কোনো প্রবীণ প্রতিবেশীর দরজায় কড়া নেড়ে জিজ্ঞেস করেছি, ‘কেমন আছেন?’ সম্ভবত সমাজের বড় পরিবর্তন শুরু হয় ছোট ছোট মানবিক আচরণ থেকে।
কংক্রিটের নগর যত উঁচু হচ্ছে, মানুষের ভেতরের শূন্যতাও যেন তত বিস্তৃত হচ্ছে। ফ্ল্যাটের দরজা, লিফট, সিসিটিভি আর ডিজিটাল পর্দার আড়ালে আমরা হয়তো ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি সম্পর্কের সেই উষ্ণতা, যা একসময় আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল। পল্লবীর সেলিনা আফরোজ, মিরপুরের নূরজাহান বেগম কিংবা খিলক্ষেতের ফারুক কবির বাদলÑতাঁদের মৃত্যু শুধু কয়েকজন মানুষের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এগুলো আমাদের সময়ের সতর্কবার্তা।
এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না; উন্নয়নের একটি মানবিক মাত্রাও আছে। প্রশ্নটি তাই কেবল স্বজনহীন মৃত্যুর নয়। প্রশ্নটি আমাদের সমাজ, আমাদের পরিবার এবং আমাদের ভবিষ্যৎকে ঘিরে। প্রযুক্তির এই যুগে আমরা কি সত্যিই সংযুক্ত, নাকি নিঃশব্দে একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়াই হয়তো এখন আমাদের সবচেয়ে বড় সামাজিক দায়িত্ব।
লেখক: সংবাদকমী









