শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

সমুদ্রপথের নিরাপত্তায় সৌদির জোটে বাংলাদেশসহ ১৪ দেশ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬, ২:৩৫ অপরাহ্ণ
সমুদ্রপথের নিরাপত্তায় সৌদির জোটে বাংলাদেশসহ ১৪ দেশ

লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও গালফ অব এডেন অঞ্চলে নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করতে বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশকে নিয়ে নতুন একটি বহুজাতিক সমুদ্র প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে সৌদি আরব। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করাই নতুন এই জোটের প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছে রিয়াদ।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলার কারণে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এই নৌপথ ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো হামলা ও নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়ায় বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহন, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি বাণিজ্যের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন এই জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।

জোটে বাংলাদেশসহ ১৪ দেশ

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ নামে নতুন এই জোটে বাংলাদেশসহ মোট ১৪টি দেশ যুক্ত হয়েছে। সদস্য দেশগুলো হলো—বাংলাদেশ, সৌদি আরব, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও কোমোরোস।

ভৌগোলিক অবস্থান ও কৌশলগত গুরুত্বের দিক থেকে এসব দেশের অনেকগুলোই লোহিত সাগর, আরব সাগর, গালফ অব এডেন এবং বাব আল-মান্দেব অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব দেশের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত এই জোটের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি সমুদ্রপথে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় সমন্বিতভাবে কাজ করবে বলে জানানো হয়েছে।

নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন এই জোটের প্রধান লক্ষ্য হলো বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর এবং গালফ অব এডেন এলাকায় নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন নৌ-চলাচল নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করতেও সদস্য দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করবে।

এ লক্ষ্যে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যৌথ কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

জোটের আওতায় যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনার পাশাপাশি সমুদ্রপথে কোনো ধরনের নিরাপত্তা হুমকি দেখা দিলে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দ্রুত সমন্বয় করে পরিস্থিতি মোকাবিলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে এ জোটের সামরিক কাঠামো, নেতৃত্বের ধরন এবং সদস্য দেশগুলোর নির্দিষ্ট দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

‘কোনো দেশকে লক্ষ্য করে নয়’

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানিয়েছে, নতুন এই বহুজাতিক সমুদ্র প্রতিরক্ষা জোট সম্পূর্ণরূপে প্রতিরক্ষামূলক। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে গঠন করা হয়নি।

সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অন্য দেশগুলোও চাইলে এই জোটে যোগ দিতে পারবে।

এতে ধারণা করা হচ্ছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জোটটির সদস্য সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এবং লোহিত সাগর ও আশপাশের সমুদ্রপথের নিরাপত্তায় এটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামো হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

হুথি হামলায় বেড়েছে নিরাপত্তা উদ্বেগ

লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নিরাপত্তা উদ্বেগের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলা। গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হুথিরা ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করে আসছে।

এসব হামলার কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে চলাচলকারী অনেক জাহাজকে বিকল্প দীর্ঘ সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে হয়েছে। এতে জাহাজ চলাচলের সময় ও ব্যয় বেড়েছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এর প্রভাব ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বাণিজ্য ব্যবস্থাতেও পড়তে পারে।

বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ

লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনে এই নৌপথের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চলাচলকারী বহু বাণিজ্যিক জাহাজকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রম করতে হয়। ফলে এ অঞ্চলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও জ্বালানি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবহনের ক্ষেত্রেও লোহিত সাগর ও আশপাশের নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে এই রুটে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।

সদর দপ্তর হবে সৌদি আরবে

সৌদি আরব জানিয়েছে, নতুন এই বহুজাতিক সমুদ্র প্রতিরক্ষা জোটের সদর দপ্তর সৌদি আরবেই স্থাপন করা হবে। তবে সদর দপ্তরের নির্দিষ্ট অবস্থান এবং জোটের প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

এ ছাড়া সদস্য দেশগুলো কী ধরনের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে এই জোটে অংশ নেবে, কতসংখ্যক যুদ্ধজাহাজ বা বিমান মোতায়েন করা হবে কিংবা যৌথ অভিযানে কোন দেশের কী ধরনের ভূমিকা থাকবে—এসব বিষয়েও এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জোটটি কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার হতে পারে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি কমাতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন সমীকরণ

সৌদি আরবের নেতৃত্বে ১৪ দেশের এই নতুন সমুদ্র প্রতিরক্ষা জোট মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোয় নতুন একটি সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশেষ করে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের মতো কৌশলগত নৌপথে নিরাপত্তা জোরদারে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে জোটটির বাস্তব কার্যক্রম, সামরিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ ভূমিকা কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা ও বাস্তবসম্মত সমন্বয়ের ওপর।

এদিকে বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের অংশগ্রহণ নতুন এই উদ্যোগকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো সমুদ্রনির্ভর বাণিজ্যিক দেশের জন্য আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই জোটের কার্যক্রম ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সামুদ্রিক নিরাপত্তায় কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেদিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের।

Ads small one

সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু বেড়েই চলেছে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু বেড়েই চলেছে

এম শফিকুল ইসলাম: পানিতে ডুবে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে কোমলমতি শিশুরা। অসতর্কতার কারণে শিশুদের অকাল মৃত্যু নিয়ে দিন দিন উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। ডিজাস্টার ফোরাম জেলা ভিত্তিক অনুসন্ধান চালিয়ে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর পরিসংখ্যান তৈরি করেছে। পরিসংখ্যানে সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা উঠে এসেছে।

 

পরিসংখ্যানে তথ্যমতে, গত ২৬ জুলাই ২০২৬ দেবাহাটা উপজেলার দক্ষিণ সখিপুর গ্রামের একটি মাছের ঘেরের পানিতে পড়ে আসমাউল হুসনা (২) নামে এক কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ওই মাসে ১৪ জুলাই তালা উপজেলার ধামসা ঢ্যামসাখোলা গ্রামের বাড়ির পাশের পুকুরের পানিতে ডুবে রুমানা খাতুন (৫) নামক এক কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৩ জুন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নে পৃথক দুটি ঘটনায় শান্ত (৫) এবং ফাহিম (৩) নামের দুটি শিশুর পুকুর ও বেতনা নদীতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে।

 

২২ মে কালীগঞ্জ উপজেলার মাগরি গ্রামে পুকুরে গোসল করতে নেমে জান্নাতুল (১১) নামে এক শিশু প্রাণ হারায়। একই উপজেলার ২৩ মার্চ সন্ন্যাসীচক গ্রামের নানা বাড়িতে এসে মাছের ঘেরের পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার আশাশুনি, কলারোয়া, শ্যামনগর ও কালীগঞ্জে একই দিনে পৃথক ঘটনায় ৪টি শিশু ও ১ জন কিশোর পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

ডিজাস্টার ফোরামের একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পানিতে ডুবে ৫৮২ জন শিশু প্রান হারিয়েছে। ডুবে মৃত্যুর মধ্যে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী ২৫২ জন এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ১৫১ জন ছেলে ও কন্যাশিশু রয়েছে। ডিজাস্টার ফোরামের আরেকটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পানিতে ডুবে ১ হাজার ৩১১ জন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১৮৪ জন। যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৯১ শতাংশ। মৃত শিশুদের মধ্যে ছেলে ৭৬১ জন এবং মেয়ে ৪২৩ জন।

 

মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬৩১ জনের বয়স ছিল ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে। ওই সময়ে পুকুরে ডুবে ৭৬৫ জন, নদীতে ডুবে ১৮৫ জন এবং মাছের ঘের ও ডোবার পানিতে ডুবে ১০৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ জুলাই দেশব্যাপী ‘বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হয়েছে। যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল,’ ইউনাইট টু টার্ন দ্য টাইট’ বাস স্্েরাতের মোড় ঘোরাতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান”।

 

ডব্লিউএইচও এর পরিসংখ্যান বলেছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৩৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞমহলের দাবি, গ্রাম, শহর ও নগরকেন্দ্রীক পরিবারদের সচেতনতার অভাব, গাফিলতি, অন্যমনস্ক এবং অজ্ঞতার অভাবে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা কমানো যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

 

প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩৪ অপরাহ্ণ
প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

দীপঙ্কর বিশ্বাস

সংবাদপপত্রের প্রথম পাতা থেকে শুরু করে সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমের ‘নোটিফিকেশন ফিড’ সাংবাদিকতার রূপান্তর ঘটেছে চোখে পড়ার মতো গতিতে। হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন আর দ্রুতগতির ইন্টারনেট বদলে দিয়েছে তথ্য দেওয়া-নেওয়ার পুরো ব্যাকরণ। কিন্তু এই পরিবর্তনের স্্েরাতে ভেসে ওঠা বড় প্রশ্নটি হলো: প্রযুক্তি কি সাংবাদিকতাকে সমৃদ্ধ করেছে, নাকি এর পেশাদারিত্বকে ঠেলে দিয়েছে অবক্ষয়ের দিকে?

একদিক থেকে বিচার করলে, প্রযুক্তি সাংবাদিকতার জন্য নিয়ে এসেছে এক নতুন দিগন্ত। এখন আর কোনো ঘটনা ঘটলে পরদিনের খবরের কাগজের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না; মুহূর্তের মধ্যেই তথ্য পৌঁছে যায় কোটি কোটি মানুষের কাছে। মাঠপর্যায়ের জটিল ডেটা বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ড্রোন ও স্যাটেলাইট কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিশাল নথিপত্র ঘেঁটে তথ্য বের করার কাজ প্রযুক্তি সংবাদকর্মীদের ক্ষমতা ও সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তথ্যের এই বাঁধভাঙা জোয়ারে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হয়েছে, তা হলো বস্তুনিষ্ঠতা এবং সংবাদের নির্ভুলতার পরীক্ষা। ‘সবার আগে খবর দেওয়া’র এক প্রতিযোগিতায় সংবাদের যাচাই-বাছাই বা ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ এর স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি গুরুত্ব হারাচ্ছে। সংবেদনশীলতা আর চটকদার শিরোনাম এখন গভীর ও মানসম্পন্ন অনুসন্ধানের জায়গা দখল করে নিয়েছে। অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের চেয়ে ভুয়া খবর এবং গুজব অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা সাধারণ মানুষের মনে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুগে এসে মৌলিক কনটেন্ট বা লেখালেখির ধরণে এক ধরনের যান্ত্রিকতা কাজ করছে। সাংবাদিকতা তো কেবল কিছু তথ্যের সমাহার নয়; এর পেছনে থাকে মানবিক আবেদন, সহমর্মিতা, নীতি-নৈতিকতা এবং সমাজকে বুঝতে পারার প্রজ্ঞা, যা কোনো প্রযুক্তির পক্ষে হুবহু তৈরি করা সম্ভব নয়। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যখন কেবল পেজভিউ কিংবা রিচ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলে, তখন সাংবাদিকতা তার মহৎ সামাজিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হতে বাধ্য হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রযুক্তি নিজেই নিজের মধ্যে কোনো অবক্ষয় বয়ে আনে না; অবক্ষয় ঘটে তখন, যখন প্রযুক্তিকে পেশাগত নীতি ও নৈতিকতার উপরে স্থান দেওয়া হয়। প্রযুক্তিকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে যদি সংবাদের মূল ভিত্তি সত্যতা, দায়িত্বশীলতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ধরে রাখা যায়, তবেই কেবল সাংবাদিকতা তার গৌরব বজায় রাখতে পারবে।

 

দিনশেষে, আধুনিকতম প্রযুক্তিও একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের বিবেক ও অনুসন্ধানী দৃষ্টির বিকল্প হতে পারে না।

 

 

পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:২৩ অপরাহ্ণ
পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

একসময় গ্রামবাংলার সন্ধ্যা মানেই ছিল উৎসবের আমেজ। হাটের পাশে কিংবা গ্রামের খোলা মাঠে বাঁশের খুঁটি পুঁতে কাপড়ের পর্দা টাঙিয়ে তৈরি হতো ছোট্ট একটি মঞ্চ। সন্ধ্যা নামতেই ভিড় জমাতেন শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে প্রবীণরাও। পর্দার আড়াল থেকে ভেসে আসত ঢোল, করতাল, বাঁশি কিংবা হারমোনিয়ামের সুর। তারপর শুরু হতো পুতুলের অভিনয়। সুতোয় বাঁধা কাঠের পুতুল কখনো রাজা, কখনো রানি, কখনো বীর যোদ্ধা, আবার কখনো হাস্যরসের চরিত্র হয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করত।

 

সেই পুতুল নাচ ছিল শুধু বিনোদন নয়, ছিল গ্রামীণ সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের এক অনন্য বাহক। বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রাচীন শিল্পগুলোর মধ্যে পুতুল নাচ অন্যতম। বহু শতাব্দী ধরে এই শিল্প মানুষের আনন্দ, শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ধর্মীয় কাহিনি, রূপকথা, লোকগাঁথা, নৈতিক শিক্ষা কিংবা সামাজিক সমস্যার গল্পÑসবই উঠে আসত পুতুল নাচের মঞ্চে।

 

শিল্পীরা কণ্ঠস্বর বদলে একাই একাধিক চরিত্রের সংলাপ বলতেন, যা দর্শকদের বিস্মিত করত। পুতুল নাচের পুতুলগুলো তৈরি হতো কাঠ, কাপড়, রঙ ও সুতা দিয়ে। একজন দক্ষ কারিগর দিনের পর দিন পরিশ্রম করে একটি পুতুল তৈরি করতেন। এরপর সেই পুতুলে প্রাণ সঞ্চার করতেন শিল্পী। হাতের নিপুণ কৌশলে সুতো টেনে পুতুলকে হাঁটানো, নাচানো, হাসানো কিংবা কান্নার অভিনয় করানো ছিল এক অসাধারণ শিল্প।

 

একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুতুল নাচের দল ছিল বেশ পরিচিত। শীতের মৌসুমে কিংবা গ্রামীণ মেলায় তাদের ব্যস্ততা থাকত সবচেয়ে বেশি। একটি দল কয়েক মাস ধরে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ঘুরে অনুষ্ঠান করত। দর্শকদের দেওয়া অর্থেই চলত তাদের সংসার। সেই সময় এই শিল্প শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, ছিল অনেক পরিবারের জীবিকার উৎস। কালের পরিক্রমায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।

 

টেলিভিশন, সিনেমা, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতায় মানুষের বিনোদনের ধরন পাল্টে গেছে। গ্রামের মাঠে এখন আর আগের মতো পুতুল নাচের আসর বসে না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাস্তবে পুতুল নাচ দেখেনি। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প।শুধু দর্শক কমে যাওয়াই নয়, শিল্পীদের জীবনও হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত। আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন।

 

কেউ দিনমজুর, কেউ কৃষিকাজ, কেউ আবার ছোটখাটো ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। নতুন প্রজন্মের সদস্যরা আর এই শিল্পকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী নন। কারণ এতে নেই আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক স্বীকৃতি। লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, পুতুল নাচ কেবল একটি বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একটি পুতুল নাচের প্রদর্শনীতে যেমন থাকে অভিনয়, তেমনি থাকে সংগীত, সাহিত্য, চিত্রকলা, কারুশিল্প ও নাট্যকলার সম্মিলন। অর্থাৎ এটি একটি সমন্বিত লোকশিল্প।

 

বর্তমান সময়ে কিছু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়মিত লোকজ উৎসব আয়োজন, পুতুল নাচের দলকে আর্থিক সহায়তা, শিল্পীদের প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে এই শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে। পর্যটনের সঙ্গেও পুতুল নাচকে যুক্ত করা সম্ভব।

 

দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র, ঐতিহ্যবাহী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত পুতুল নাচের আয়োজন করলে শিল্পীরা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীরাও বাংলার লোকঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। ডিজিটাল যুগেও এই শিল্পের নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। পুতুল নাচের ভিডিও ধারণ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচার, শিশুদের জন্য অ্যানিমেশনধর্মী উপস্থাপনা কিংবা আধুনিক গল্পের সঙ্গে লোকজ উপাদানের সমন্বয় ঘটিয়ে নতুনভাবে এই শিল্পকে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

 

এতে ঐতিহ্যও রক্ষা পাবে, আবার নতুন দর্শকও তৈরি হবে। একটি জাতির পরিচয় শুধু তার উন্নত ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও লোকজ শিল্পেও নিহিত থাকে। পুতুল নাচ সেই পরিচয়েরই এক উজ্জ্বল অংশ। এই শিল্প হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে আমাদের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়, গ্রামীণ জীবনের এক টুকরো স্মৃতি এবং বহু শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার উত্তরাধিকার।

 

তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পুতুল নাচকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ পুতুলের সুতোয় বাঁধা সেই ছোট্ট মঞ্চে লুকিয়ে আছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক বিশাল ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

লেখক: সংবাদকর্মী