রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: মৃত্যুফাঁদে নার্সিং কলেজ!

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:২২ অপরাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: মৃত্যুফাঁদে নার্সিং কলেজ!

সাতক্ষীরা সরকারি নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কলেজের বর্তমান চিত্র সংবাদপত্রের পাতা ছাড়িয়ে যেন কোনো এক ভৌতিক গল্পের প্রেক্ষাপট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিম থেকে বেরিয়ে আসা মরিচা ধরা রড, ছাদ চুইয়ে পড়া বৃষ্টির পানি আর পড়ার টেবিলে খসে পড়া পলেস্তারাÑসব মিলিয়ে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থীর জীবন এখানে আক্ষরিক অর্থেই এক ‘মৃত্যুফাঁদে’র মধ্যে বন্দি। কিন্তু সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও বিচিত্র বিষয় হলো, শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের কাছ থেকে ‘দায়মুক্তি’ স্বাক্ষর গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ, ভবন ধসে শিক্ষার্থী মারা গেলে বা আহত হলে কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। একটি স্বাধীন ও সভ্য দেশে উচ্চশিক্ষার প্রাঙ্গণে এমন প্রশাসনিক অমানবিকতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা অকল্পনীয়।
গণপূর্ত অধিদপ্তর গত ৩০ মার্চ ভবনটিকে ‘অতিঝুঁকিপূর্ণ’ ও ‘সংস্কার অযোগ্য’ বলে ঘোষণা করেছে। বিশেষজ্ঞ দলও নতুন ভবন নির্মাণের সুপারিশ দিয়েছেন। যখন একটি সরকারি সংস্থা ভবনটিকে বসবাসের অযোগ্য বলছে, তখন সেখানে শিক্ষার্থীদের অবস্থান করতে বাধ্য করা কি ফৌজদারি অপরাধের শামিল নয়? বিকল্প আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী মেসে উঠে বাড়তি আর্থিক চাপে পড়েছেন, আবার নারী শিক্ষার্থীরা পড়েছেন নিরাপত্তা সংকটে। আর যারা বাধ্য হয়ে হোস্টেলে থাকছেন, তারা প্রতি মুহূর্ত কাটাচ্ছেন মরণাতঙ্কে।
কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসক ও গণপূর্তকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন বিষয়টি ‘প্রক্রিয়াধীন’ বা ‘বাজেট সাপেক্ষে’। প্রশ্ন হলো, একটি বড় ধরনের দুর্ঘটনার পর কি তবে আমাদের টনক নড়বে? অতীতে আমরা দেখেছি, ভবন ধসে বা ছাদ খসে প্রাণহানি হওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন ও তড়িঘড়ি করে বরাদ্দ দেওয়ার তোড়জোড় চলে। কিন্তু সাতক্ষীরা সরকারি নার্সিং কলেজের ক্ষেত্রে সেই লাশের মিছিলের অপেক্ষা কেন করা হচ্ছে?
শিক্ষার্থীরা এখানে আসছেন সেবার মহান ব্রত নিয়ে দক্ষ নার্স হতে। কিন্তু পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা ও শ্রেণিকক্ষের অভাবে তাদের শিক্ষা কার্যক্রমও এখন ধুঁকছে। এটি শুধু সাতক্ষীরার সংকট নয়, বরং দেশের নার্সিং শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর এক বড় আঘাত।
আমরা মনে করি, শুধু ‘বাজেট আসছে’ বা ‘জায়গা দেখা হচ্ছে’Ñএমন আশ্বাস দিয়ে এই ভয়াবহ ঝুঁকিকে আর আড়াল করার সুযোগ নেই। অনতিবিলম্বে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও অস্থায়ী বিকল্প আবাসন এবং অ্যাকাডেমিক ভবনের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে আগামী জাতীয় বাজেটের অপেক্ষায় না থেকে জরুরি তহবিল থেকে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা হোক। মনে রাখতে হবে, কোনো প্রশাসনিক ‘দায়মুক্তি’ পত্রই একটি তাজা প্রাণের বিনিময় হতে পারে না। আমরা চাই নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ।

Ads small one

জলবায়ু পরিবর্তন ও কার্বনের ‘ছয় রং’: সংকট ও উত্তরণের পথ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:১৫ অপরাহ্ণ
জলবায়ু পরিবর্তন ও কার্বনের ‘ছয় রং’: সংকট ও উত্তরণের পথ

তারিক ইসলাম

বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক যেকোনো আলোচনা কিংবা আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি হলো ‘কার্বন’। সাধারণ পাঠকের মনে কার্বন বলতে ধোঁয়া, বায়ুদূষণ, তাপ আটকে রাখা গ্যাস এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মতো নেতিবাচক ধারণা ভেসে ওঠে। কিন্তু পরিবেশবিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণা আমাদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সন্ধান দেয়। কার্বন মানেই যে শুধু পরিবেশের শত্রু, তা নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার ‘কার্বনের রংধনু’ কাঠামো এবং গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘রঙের মাধ্যমে কার্বন’ শীর্ষক গবেষণাপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কার্বনের উৎপত্তি, স্থায়িত্ব ও পরিবেশগত ভূমিকার ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের কার্বনকে ভিন্ন ভিন্ন রং বা শ্রেণির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়। জলবায়ু সংকটের প্রকৃতি বুঝতে এবং তা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে কার্বনের এসব শ্রেণি সম্পর্কে জানা গুরুত্বপূর্ণ।

কার্বনের ‘রংধনু’: ধরন ও প্রভাব

প্রকৃতি ও মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত কার্বনের ছয়টি রূপ নিয়ে নিচে আলোচনা করা হলো।

১. কালো কার্বন: কয়লা, ডিজেল, কাঠসহ বিভিন্ন জ্বালানি ও জৈব পদার্থের অসম্পূর্ণ দহনের ফলে কালো কার্বনের সূক্ষ্ম কণা তৈরি হয়। বায়ুমণ্ডলে ভাসমান অবস্থায় এসব কণা সূর্যের আলো ও তাপ শোষণ করে। ফলে বায়ুমণ্ডল উষ্ণ হয়। একই সঙ্গে কালো কার্বন মানুষের শ্বাসতন্ত্রের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

২. বাদামি কার্বন: প্রধানত কাঠ, খড় ও অন্যান্য জৈব পদার্থ পোড়ানোর সময় নির্গত কিছু জৈব বায়ুকণা বাদামি কার্বনের উৎস। কালো কার্বনের মতো বাদামি কার্বনও সূর্যালোক শোষণ করতে পারে। এর ফলে বায়ুমণ্ডলের বিকিরণ ভারসাম্য, আঞ্চলিক আবহাওয়া ও জলবায়ুর ওপর প্রভাব পড়ে।

৩. নীল কার্বন: সামুদ্রিক ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র—যেমন ম্যানগ্রোভ বন, সামুদ্রিক ঘাসের বন এবং উপকূলীয় জলাভূমিতে সঞ্চিত কার্বনকে নীল কার্বন বলা হয়। এসব বাস্তুতন্ত্রের উদ্ভিদ ও মাটি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে কার্বন সঞ্চয় করে রাখে। বাংলাদেশের সুন্দরবন নীল কার্বন সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ভাণ্ডার।

৪. সবুজ কার্বন: স্থলভাগের বনভূমি, গাছপালা ও অন্যান্য উদ্ভিদ এবং সংশ্লিষ্ট মাটিতে সঞ্চিত কার্বনকে সবুজ কার্বন হিসেবে অভিহিত করা হয়। উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে কার্বন সঞ্চয় করে। কিন্তু নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও বন উজাড়ের ফলে সঞ্চিত কার্বনের একটি অংশ পুনরায় বায়ুমণ্ডলে মুক্ত হতে পারে। এতে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আরও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

৫. লাল কার্বন: ‘লাল কার্বন’ শব্দটি কার্বনের প্রচলিত ও সর্বজনস্বীকৃত শ্রেণিবিন্যাসের অংশ নয়। তবে বরফ ও তুষারের ওপর জন্মানো লালচে শৈবাল বা অণুজীবের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তুষারের ওপর এসব অণুজীবের লালচে স্তর তৈরি হলে তুষারের সূর্যালোক প্রতিফলনের ক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে তুষার বেশি সূর্যালোক শোষণ করে এবং গলনের হার বাড়তে পারে। এটি বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলের পরিবেশগত পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

৬. ধূসর কার্বন: ‘ধূসর কার্বন’ শব্দটিও কার্বনের সর্বজনস্বীকৃত বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাসের অংশ নয়। তবে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, শিল্পকারখানা, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও যানবাহন থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন তাপ আটকে রাখা গ্যাস বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অন্যতম প্রধান কারণ। এসব গ্যাস বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রাখে এবং পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

প্রকৃতির কার্বন চক্র পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অবিচ্ছেদ্য অংশ। উদ্ভিদ, বনভূমি, সমুদ্র ও মাটি প্রাকৃতিকভাবে কার্বন শোষণ ও সঞ্চয় করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। কিন্তু শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী সময়ে অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং বনাঞ্চল ধ্বংসের ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন তাপ আটকে রাখা গ্যাসের ঘনত্ব বেড়েছে। পাশাপাশি কালো ও বাদামি কার্বনের মতো বায়ুদূষণকারী কণাও পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করছে।

অন্যদিকে, বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলে শৈবালের বিস্তার এবং তুষারের প্রতিফলন ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তনের জটিল প্রভাবগুলো বুঝতে সহায়তা করে। এসব পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। তাই কার্বনের বিভিন্ন ধরন, তাদের পরিবেশগত ভূমিকা এবং কার্বন নিঃসরণের উৎস সম্পর্কে জানা আমাদের জন্য শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়; বরং পরিবেশনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, কালো ও বাদামি কার্বন এবং তাপ আটকে রাখা গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে হবে। ইটভাটা, পুরোনো যানবাহন ও শিল্পকারখানায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষিবর্জ্য না পুড়িয়ে তা সার তৈরি, জৈব জ্বালানি উৎপাদনসহ পরিবেশসম্মত কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে বায়ুদূষণ কমানোর পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

দ্বিতীয়ত, নীল ও সবুজ কার্বনের প্রাকৃতিক ভাণ্ডার সংরক্ষণ করতে হবে। সুন্দরবনসহ উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বন রক্ষায় কার্যকর আইন প্রয়োগ, অবৈধ বন উজাড় বন্ধ এবং পরিবেশসম্মত উপকূলীয় বনায়ন জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের সমতল ও পাহাড়ি বনাঞ্চল সংরক্ষণ এবং শহরাঞ্চলে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নিতে হবে।

তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো পরিচ্ছন্ন শক্তির প্রসার ঘটানো গেলে তাপ আটকে রাখা গ্যাসের নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, উপযুক্ত বিনিয়োগ এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।

প্রকৃতিতে কার্বনের উপস্থিতি নিজে থেকেই বিপদের কারণ নয়; বরং কার্বন চক্রে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত হস্তক্ষেপ এবং অতিরিক্ত তাপ আটকে রাখা গ্যাসের নিঃসরণই বর্তমান জলবায়ু সংকটকে তীব্র করেছে। পৃথিবীর পরিবেশগত স্থিতিশীলতা ও নতুন প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে ক্ষতিকর বায়ুদূষণকারী কণা ও তাপ আটকে রাখা গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ কার্বন ভাণ্ডার—বিশেষ করে বনভূমি, ম্যানগ্রোভ বন, জলাভূমি ও সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র—সংরক্ষণ করতে হবে।

কার্বন সম্পর্কে সঠিক বৈজ্ঞানিক ধারণা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমেই জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকার, গবেষক, পরিবেশকর্মী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: তারিক ইসলাম, তরুণ কবি ও লেখক, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষক এবং সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সাতক্ষীরার বাদাবন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:০৯ অপরাহ্ণ
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সাতক্ষীরার বাদাবন

শ্যামল শীল

সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাদাবন বা ম্যানগ্রোভ বন। পৃথিবীর বৃহত্তম একক প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সাতক্ষীরা জেলায় অবস্থিত। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব কমানো এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এই বন।

সাতক্ষীরার শ্যামনগরসহ সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার মানুষের জন্য বাদাবন প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রবল ঢেউয়ের শক্তি কমাতে ম্যানগ্রোভ গাছপালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গাছের শিকড় মাটি আঁকড়ে ধরে উপকূলীয় ভূমিক্ষয় কমাতে সহায়তা করে। তবে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বাদাবনের পাশাপাশি টেকসই বেড়িবাঁধ, আগাম সতর্কতা, আশ্রয়কেন্দ্র ও কার্যকর দুর্যোগ প্রস্তুতিও জরুরি।

সুন্দরবন জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া, পশুর ও বাইনসহ নানা প্রজাতির ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ এখানে জন্মে। এ বনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, বানর, বন্য শূকর, কুমির, ডলফিন, অজগর ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাস রয়েছে। বনের নদী, খাল ও জলাভূমি মাছ, চিংড়ি ও কাঁকড়ার গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র। এই জীববৈচিত্র্য পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরার বহু মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছে। বনসংলগ্ন এলাকার মানুষ মাছ ও কাঁকড়া আহরণ, অনুমতি সাপেক্ষে মধু ও গোলপাতা সংগ্রহ এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত। তবে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণ বনের স্বাভাবিক পুনরুৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। তাই সরকারি বিধিনিষেধ মেনে সম্পদ আহরণ এবং বননির্ভর মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায়ও বাদাবনের গুরুত্ব অপরিসীম। ম্যানগ্রোভ বন বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ধারণ করে গাছপালা ও মাটিতে সঞ্চয় করে। তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার পরিবর্তন, নদীভাঙন ও ঘূর্ণিঝড় সুন্দরবনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় বনভূমি সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

সুন্দরবনের অসাধারণ জীববৈচিত্র্য ও বৈশ্বিক গুরুত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের সুন্দরবন ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এই স্বীকৃতি বনটির আন্তর্জাতিক গুরুত্ব তুলে ধরে। তাই সুন্দরবন রক্ষা করা বাংলাদেশের জাতীয় দায়িত্বের পাশাপাশি বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণেরও অংশ।

সুন্দরবন রক্ষায় অবৈধভাবে বনজ সম্পদ আহরণ, বন্য প্রাণী শিকার ও নদী-খাল দূষণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি বন বিভাগের নজরদারি বাড়ানো, স্থানীয় জনগণকে সংরক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনের প্রসার ঘটানো প্রয়োজন। বননির্ভর মানুষের জীবিকা ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই হতে পারে টেকসই ব্যবস্থাপনার ভিত্তি।

সাতক্ষীরার বাদাবন শুধু উপকূলের প্রাকৃতিক ঢাল নয়, এটি জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল এবং হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন। এই বন ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিবেশের ভারসাম্য, স্থানীয় অর্থনীতি ও উপকূলীয় মানুষের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। তাই সুন্দরবন সংরক্ষণে সরকার, বন বিভাগ, স্থানীয় জনগণ, গবেষক ও পরিবেশকর্মীদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাদাবন রক্ষাকে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি সাতক্ষীরার টেকসই উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

তরুণদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে হবে: চিফ হুইপ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৫৯ অপরাহ্ণ
তরুণদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে হবে: চিফ হুইপ

সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে তরুণদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। এ জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

রোববার (২৫ অক্টোবর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের মিলনায়তনে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘মায়ের হাসি’ মানসিক স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র এ সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারে জানানো হয়, বাংলাদেশে প্রতি ছয়জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে প্রায় একজন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। তাঁদের প্রায় ৯২ শতাংশ চিকিৎসাসেবা পান না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যায় ৪ হাজার ৭১৪ জনের মৃত্যু হয়।

বক্তারা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার দূর করা, সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সময়ে মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সভাপতি অধ্যাপক গোলাম রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দীন হায়দার। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংস্থাটির স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদ। প্রেসবিজ্ঞপ্তি