বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

সুন্দরবনের বাঘ-বিধবা: কেমন আছেন তারা?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:১৯ পূর্বাহ্ণ
সুন্দরবনের বাঘ-বিধবা: কেমন আছেন তারা?

মো. মামুন হাসান

সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত গুরুত্বের কারণে এই বন বাংলাদেশের অনন্য সম্পদ। তবে সুন্দরবনের আরেকটি বাস্তবতা রয়েছে, যা এর নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আড়ালে অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যায়। বন ও মানুষের সম্পর্ক এখানে সব সময় সহাবস্থানের নয়। জীবিকার প্রয়োজনে বনে যাওয়া মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সংঘাত কখনো কখনো কেড়ে নেয় একটি পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটিকে। আর সেই মৃত্যুর পর যে নারীরা স্বামীহারা হয়ে সন্তান ও পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামে নামেন, স্থানীয় সমাজে তাঁদের পরিচয় হয় বাঘবিধবা হিসেবে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ও গাবুরার মতো সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় এমন নারীর সংখ্যা কম নয়। তাঁদের জীবন কেবল স্বামী হারানোর বেদনায় থেমে থাকে না। শোকের সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক অবজ্ঞা, কুসংস্কার এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণা। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই নারীদের জীবনসংগ্রাম জাতীয় পর্যায়ের নীতি ও গণমাধ্যমের আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

সম্প্রতি নেচার গ্রুপের হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস কমিউনিকেশনস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা সুন্দরবনের বাঘবিধবাদের এই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ও গাবুরা এলাকায় পরিচালিত গবেষণায় বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীদের সামাজিক অবস্থান, কুসংস্কার, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক যন্ত্রণা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, বাঘবিধবাদের জীবিকা সংগ্রাম কেবল অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত রয়েছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কলঙ্ক।

এই কলঙ্কের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের লোকবিশ্বাস। সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় বাঘের আক্রমণকে কখনো কখনো অতীতের পাপের শাস্তি কিংবা অলৌকিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এমন বিশ্বাসের কারণে স্বামী হারানো নারীদেরও অনেক সময় দুর্ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাঁদের জীবনের স্বাভাবিক আচরণ পর্যন্ত সামাজিক সন্দেহের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে একজন নারী স্বামী হারানোর পর যে শোক, নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যান, তার সঙ্গে যুক্ত হয় সমাজের তৈরি আরেকটি অদৃশ্য দেয়াল।

এখানেই সংকটটি আরও গভীর। একজন বনজীবী যখন বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান, তখন কেবল একটি জীবনই শেষ হয় না, একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও ভেঙে পড়ে। স্বামী হারানো নারীকে একদিকে সন্তানদের দায়িত্ব নিতে হয়, অন্যদিকে জীবিকার নতুন পথ খুঁজে নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের শিক্ষা, দক্ষতা ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকে। ফলে স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁদের সামনে যে জীবন তৈরি হয়, সেটি এক দীর্ঘ অনিশ্চয়তার জীবন।

এই অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত হয় মানসিক আঘাত। গবেষণায় বাঘবিধবাদের মধ্যে গভীর শোক, বিষণ্নতা এবং পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেসের মতো মানসিক সমস্যার উপসর্গের কথা উঠে এসেছে। প্রিয়জনকে ভয়াবহভাবে হারানোর অভিজ্ঞতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং আর্থিক সংকট একসঙ্গে একজন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। অথচ আমাদের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় এই বিশেষ ধরনের মানসিক ও সামাজিক সংকটের জন্য আলাদা কোনো কাঠামো খুব একটা দৃশ্যমান নয়।

বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চল নিয়ে প্রকাশিত আরও কিছু গবেষণাতেও বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীদের সামাজিক বাস্তবতা উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, সামাজিক কুসংস্কার ও পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর কারণে তাঁদের জীবন অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে। তবে একই সঙ্গে গবেষণাগুলো একটি আশাব্যঞ্জক দিকও দেখিয়েছে। যথাযথ সহযোগিতা, সংগঠিত উদ্যোগ এবং জীবিকার সুযোগ পেলে এসব নারী নিজেদের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারেন। তাঁরা শুধু নিজেদের পরিবারকে টিকিয়ে রাখেন না, অন্য নারীদেরও স্বনির্ভর হওয়ার পথ দেখান।

এই জায়গাটিই আমাদের নীতিনির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। বাঘবিধবাদের কেবল অসহায় মানুষ হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। তাঁরা সহায়তা পাওয়ার পাশাপাশি নিজেদের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে পরিবার ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। প্রয়োজন তাঁদের সেই সক্ষমতাকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং উপযুক্ত সুযোগ তৈরি করা।

প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র এই নারীদের জন্য কী করছে। সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ নিঃসন্দেহে জরুরি। রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু বাঘ সংরক্ষণের মানবিক মূল্যও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। একটি বন ও তার বন্যপ্রাণী রক্ষার দায়িত্ব যেমন রাষ্ট্রের, তেমনি সেই বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

প্রথম প্রয়োজন বাঘবিধবাদের একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা। তাঁদের প্রকৃত সংখ্যা, অবস্থান, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি, সন্তানদের অবস্থা এবং জীবিকার ধরন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলে কার্যকর নীতি প্রণয়ন কঠিন। বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজকল্যাণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে এ উদ্যোগ নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, কুসংস্কার ও সামাজিক কলঙ্ক দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রম প্রয়োজন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজকে এই কাজে যুক্ত করা যেতে পারে। কারণ আইন বা সরকারি সহায়তা একা সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তন করতে পারে না।

তৃতীয়ত, বাঘবিধবাদের পুনর্বাসনে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আর্থিক সহায়তা তাঁদের জীবিকার সংকট কিছুটা কমাতে পারে, কিন্তু স্বামী হারানোর গভীর মানসিক আঘাত নিরসনে প্রয়োজন কাউন্সেলিং ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সহায়তা। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা, বিকল্প জীবিকা ও সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

সবচেয়ে বড় কথা, স্থানীয় পর্যায়ে ইতিমধ্যে যেসব সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান বাঘবিধবাদের নিয়ে কাজ করছে, তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। তাঁদের কার্যকর উদ্যোগগুলোকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বৃহত্তর পরিসরে নেওয়া গেলে এই নারীদের জীবনমান উন্নয়নে বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব।

সুন্দরবন রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। কিন্তু সুন্দরবন রক্ষার অর্থ শুধু বন, নদী ও বাঘকে রক্ষা করা নয়। এই বনের সঙ্গে যাঁদের জীবন ও জীবিকা জড়িয়ে আছে, তাঁদেরও রক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীদের জীবনকে করুণা নয়, অধিকার ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতে হবে। বাঘবিধবা কোনো অভিশপ্ত পরিচয় নয়। এটি একটি ভয়াবহ মানবিক অভিজ্ঞতার ফল। তাঁদের প্রতি সমাজের সন্দেহ নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা। অবহেলা নয়, প্রয়োজন সামাজিক নিরাপত্তা। সাময়িক সহায়তা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও স্বনির্ভরতার সুযোগ।

সুন্দরবনের বাঘ বাঁচুক, বন বাঁচুক। একই সঙ্গে সুন্দরবনের প্রান্তিক মানুষগুলোর জীবনও নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হোক। প্রকৃতি সংরক্ষণ তখনই সত্যিকার অর্থে মানবিক হবে, যখন বন্যপ্রাণী রক্ষার সঙ্গে মানুষের জীবন ও অধিকারকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।

লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

Ads small one

সুন্দরবনের ‘সুন্দরী’ কি হারিয়ে যাবে?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩১ অপরাহ্ণ
সুন্দরবনের ‘সুন্দরী’ কি হারিয়ে যাবে?

তারিক ইসলাম

‎‘সুন্দরবন’—নামটির সঙ্গে গভীর রক্তের টান যেন ‘সুন্দরী’ গাছের। যে বৃক্ষের সমৃদ্ধি আর বিশালতায় টিকে আছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের মূল সৌন্দর্য ও পরিচয়, সেই সুন্দরী গাছই আজ আক্রান্ত এক মরণব্যাধিতে। বনজুড়ে চলছে গাছগুলোর নীরব বিদায়ের করুণ সুর। কেবল পাতা আর ডালপালা শুকিয়ে যাওয়া নয়, মড়ক ছড়িয়ে পড়ছে মূল কাণ্ড পর্যন্ত। এর পাশাপাশি আশঙ্কাজনকভাবে কমছে নতুন চারা গজানোর হারও। সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র যে বড় ধরনের পরিবেশগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সুন্দরী গাছের এই অসুস্থতা তারই এক মারাত্মক বার্তা।

‎সম্প্রতি সুন্দরবনের পরিবেশ নিয়ে প্রকাশিত একটি সমীক্ষার ফলাফল পুরো দেশকে শঙ্কিত করে তুলেছে। ২০২৪–২৫ সালে পরিচালিত ‘সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থার পরিবীক্ষণ’ শীর্ষক দুই বছর মেয়াদি সমীক্ষা অনুযায়ী, বনের প্রায় ৩৯ শতাংশ সুন্দরী গাছই এখন ‘আগামরা’ বা ‘টপ-ডাইং’ (Top-Dying) রোগে আক্রান্ত। সব মিলিয়ে আক্রান্ত গাছের আনুমানিক সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ কোটি ৯৫ লাখ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মধ্যে দুই কোটিরও বেশি গাছ গুরুতরভাবে মরে যাওয়ার মুখোমুখি।

‎পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশনের যৌথ পরিচালনায় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক স্বপন কুমার সরকারসহ বিশেষজ্ঞ দলের গবেষণায় এই ভয়াল চিত্র উঠে এসেছে।

‎সুন্দরবনের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রধান বৃক্ষ যখন একযোগে রোগাক্রান্ত হয়, তখন এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট উদ্ভিদের সমস্যা থাকে না; পুরো বনের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়। গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, উজান থেকে আসা মিষ্টি পানির প্রবাহ হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের নোনা পানির অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশ এবং মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি—এসব মিলেই সুন্দরী গাছের জীবনীশক্তি শুষে নিচ্ছে। সুন্দরবনের মিষ্টি পানি ও মৃদু লবণাক্ত পরিবেশের ভারসাম্য বজায় না থাকায় মাটির বায়ুসঞ্চালন কমছে, যা গাছগুলোর গোড়া ও কাণ্ডকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তার ওপর ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ও পলি জমার কারণে বন নিজের প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন ক্ষমতা হারাচ্ছে।

‎

‎সুন্দরবন কেবল নান্দনিক সৌন্দর্যের আধার নয়, এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন ও সম্পদের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবর্ম। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের থাবা থেকে বছরের পর বছর বুক দিয়ে বাংলাদেশকে আড়াল করে রেখেছে এই ম্যানগ্রোভ বন। আর সেই বনের মূল কাঠামোর অন্যতম স্তম্ভ সুন্দরী গাছ যদি একে একে উজাড় হয়ে যায়, তবে গোটা উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারসহ দুর্লভ জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।

‎

‎সুন্দরবনের এই নীরব আর্তনাদ আর উপেক্ষা করার সময় নেই। সময় এসেছে সুনির্দিষ্ট ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার:

‎

‎১. মিষ্টি পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার: উজান থেকে সুন্দরবনমুখী নদ-নদীগুলোতে মিষ্টি পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে আন্তঅঞ্চলীয় ও জাতীয় পানিসম্পদ নীতিতে বিশেষ জোর দিতে হবে।

‎

‎২.পলি নিরসন ও নদী-খাল খনন: বনের অভ্যন্তরীণ যে নদ-নদী ও খালগুলো পলি ভরাট হয়ে মিষ্টি ও নোনা পানির ভারসাম্য নষ্ট করছে, সেগুলো পরিবেশবান্ধব উপায়ে পুনঃখননের উদ্যোগ নিতে হবে।

‎

‎৩.রোগ প্রতিরোধে জোরালো গবেষণা: আগামরা রোগের সঠিক জীবাণু বা অণুজীব শনাক্ত করে তা থেকে সুন্দরী গাছকে রক্ষায় বন অধিদপ্তর এবং বিজ্ঞানীদের সমন্বিত গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন।

‎

‎৪.সুরক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা ও নজরদারি: বনের যেসব এলাকায় রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি, সেগুলোকে বিশেষ নজরদারির আওতায় এনে নতুন চারা উৎপাদন ও বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

‎

‎সুন্দরবন ছাড়া আমাদের মানচিত্রের এক বিরাট অংশকে কল্পনা করা যায় না, আর সুন্দরী গাছ ছাড়া সুন্দরবনের অস্তিত্ব অসম্পূর্ণ। ১২ কোটি ৯৫ লাখ সুন্দরী গাছের রোগাক্রান্ত হওয়া কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের প্রকৃতির বিপন্নতার স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এখনই যদি কার্যকর ও বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, তবে হয়তো মানচিত্রে ‘সুন্দরবন’ নামটি থেকে যাবে, কিন্তু হারিয়ে যাবে তার আসল রূপকার—আমাদের ‘সুন্দরী’।

‎লেখক : তারিক ইসলাম, ‎সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।

ডিসেম্বরে খুলনায় চালু হচ্ছে বর্জ্য রিসাইক্লিং প্লান্ট

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৭ অপরাহ্ণ
ডিসেম্বরে খুলনায় চালু হচ্ছে বর্জ্য রিসাইক্লিং প্লান্ট
পত্রদূত ডেস্ক: খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার সলুয়ায় দেশের প্রথম বর্জ্য রিসাইকেল প্ল্যান্টের পাইরোলাইসিস প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। গত ৩ অক্টোবর এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় এবং ফলাফল সন্তোষজনক বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। ফলে সবঠিক থাকলে ডিসেম্বরে প্রকল্পটির কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে চালু হবে।
প্রকল্পটি চালু হলে একইসঙ্গে মিলবে সার, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ। এটি পরিচালনার জন্য দেশের স্বনামধন্য বেসরকারি একটি কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
খুলনা সিটি কর্পোরেশন প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, প্রকল্পটি এলজিইডি এবং কেসিসির যৌথ সমন্বয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ফাস্ট ট্রায়াল দেওয়া হয়েছে, এটি চলমান থাকবে।
তিনি বলেন, এটি চালাবে প্রফেশনাল প্রাইভেট অপারেটর। ইতোমধ্যে কোম্পানি নিযুক্ত করা হয়েছে। এটি থেকে সার, জ্বালানি তেল ও বায়োগ্যাসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ, প্লান্টের চাহিদা মেটাতে সহায়তা করবে। আশা করছি, আগামী ডিসেম্বরে চালু করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্লান্টের কম্পোস্ট ও পাইরোলাইসিস প্লান্টের যন্ত্রকৌশল ম্যাটারিয়ালস এ্যান্ড ম্যাটালোজিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল বিষয়ে কারিগরি সহায়তার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অভিজ্ঞ পাঁচ প্রকৌশলীকে নিয়ে গঠিত হয়েছে একটি টিম। টিমের সদস্যরা প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সরজমিনে পর্যবেক্ষণে গত ১ অক্টোবর খুলনায় আসেন। ৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় পরীক্ষা শেষে তারা ঢাকায় ফিরে যান।
টিমের সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্রের (বিটাক) প্রাক্তন মহাপরিচালক ড. ইনসানুল করিম, প্রাক্তন সিনিয়র প্রকৌশলী একেএম শামসুল হুদা, প্রাক্তন নির্বাহী প্রকৌশলী, সানইয়ার্ড গ্রুপ বর্তমানে ন্যাশনাল কেমিক্যাল ম্যানুফাকচারিং কোঃ লিঃ-এর ডিএমডি প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল জব্বার, প্রাক্তন সিনিয়র প্রকৌশলী মোঃ আশরাফ উদ্দিন, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) প্রাক্তন চিফ সাইন্টিফিক অফিসার ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. মোঃ আব্দুল গফুর। প্রতিনিধি দলের চারজন বুয়েট এবং বাকি একজন চুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। যারা সবাই শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্লান্ট মেশিনারি ডিজাইনার।
প্রতিনিধি দলের সদস্যরা কার্যক্রমের ফলাফল পর্যালোচনা করে মতামত প্রকল্প পরিচালককে অবহিত করবেন বলে জানিয়েছেন প্রকল্প ম্যানেজার প্রকৌশলী পিন্টু মন্ডল। তিনি বলেন, প্রকল্পের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সরজমিনে পর্যবেক্ষণের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধি দল এসেছিলেন। তারা ২/৩ দিন এখানে ছিলেন। তাদের ক্লান্তির কারণে ৩৬ ঘণ্টা পাইরোলাইসিস করা হয়নি।
পাইরোলাইসিসের প্রসেস অনুযায়ী ৬ ঘণ্টা পর তেল আসা শুরুর ২/৩ ঘণ্টা মেশিন চালানোর পর বন্ধ করা হয়। এ সময়ের মধ্যে পলিথিন এবং প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে পাইরোলাইসিস প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত জ্বালানি তেলের মধ্য থেকে ১০ লিটার তেল পরীক্ষার জন্য স্যারেরা ঢাকায় নিয়ে গেছেন। সেখানে তারা নিজেদের মধ্যে পর্যালোচনা করে মিটিং করে মতামত প্রকল্পের পরিচালক স্যারকে জানাবেন। প্রকল্পের পরীক্ষামূলক ফলাফল সফল হয়েছে বলা যায়।
এর আগে গত ১ অক্টোবর পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। এরপর মেশিনারিজ সম্পূর্ণ সেট আপের পর শনিবার সকালে পরীক্ষামূলকভাবে এ প্রযুক্তির কার্যক্রম শুরু হয়। শেষ হয় সন্ধ্যায়।
বিগত ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শলুয়া বাজার-সংলগ্ন ১৭ একর জমিতে প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয়। খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) যৌথভাবে প্রকল্পটির উদ্যোক্তা। দ্বিতীয় নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প (সিআরডিপি-২)’র আওতায় এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে এটিতে অর্থায়ন করেছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৫৩ কোটি টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড কাজটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, তিন ধরনের বর্জ্য থেকে তিন ধরনের পণ্য উৎপাদন হবে। গৃহস্থালির পচনশীল বর্জ্য থেকে তৈরি হবে জৈব সার, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিন ও প্লাস্টিক রিসাইকেল করে উৎপাদন করা হবে জ্বালানি তেল এবং কাঁচাবাজার থেকে সংগৃহীত বর্জ্য থেকে তৈরি বায়োগ্যাস দিয়ে উৎপাদন করা হবে বিদ্যুৎ। অত্যাধুনিক পাইরোলাইসিস প্রযুক্তি ব্যবহারে বায়ু দূষণের কোনো শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পটি চালু হলে প্রতিদিন ২০ টন জৈব সার, ৪ হাজার ৮০০ লিটার জ্বালানি তেল এবং উৎপাদিত বায়োগ্যাস থেকে সাড়ে ৪০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। উৎপাদিত তেল ও বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে অন্যত্র সরবরাহ করা হবে। প্রতি ব্যাচ বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণে সময় লাগবে এক সপ্তাহ।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ডুমুরিয়া উপজেলার সলুয়ায় স্থাপিত বর্জ্য রিসাইক্লিং প্লান্ট আগামী ডিসেম্বরে চালু হচ্ছে। একইসঙ্গে বটিয়াঘাটা উপজেলার মাথাভাঙ্গায় আরও একটি বর্জ্য রিসাইক্লিং প্লান্ট চালুর অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে রাজবাঁধ ট্রেন্সিং গ্রাউন্ডে মেডিকেল বর্জ্য শোধনাগার প্লান্টও শিগগিরই চালু হচ্ছে। এই তিনটি রিসাইক্লিং প্লান্ট চালু হলে মহানগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।

কয়রায় অনলাইন জুয়া খেলার অভিযোগে ৬ জনকে আটক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২১ অপরাহ্ণ
কয়রায় অনলাইন জুয়া খেলার অভিযোগে ৬ জনকে আটক
কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি: খুলনার কয়রা উপজেলায় ভাগবা গ্রামের ছয়জনকে আটক করেছে পুলিশ। ১২ অক্টোবর বিশেষ অভিযানে অনলাইন জুয়া খেলার অভিযোগে তাদেরকে আটক করা হয়।
আটককৃতরা হলেন ভাগবা গ্রামের  মোঃ আব্বাস গাজীর পুত্র ,মোঃ জিয়ারুল ইসলাম (২২), মোঃ মাসুদ সরদারের পুত্র মোঃ জাহিদুল ইসলাম (২০), মোঃ কেনা গাজীর পুত্র, মোঃ আব্দুল আলিম গাজী (২১), মোঃ শহিদুল গাজীর পুত্র মোঃ আলী হোসেন (২১),মোঃ আয়ুব আলী মোড়লের  পুত্র, মোঃ সিফাত হোসাইন (২৪), মোঃ নজরুল শেখের পুত্র মোঃ জাকারিয়া শেখ।
কয়রা থানার অফিসার ইনচার্জ রাশেদুল আলম জানিয়েছেন, অনলাইন জুয়া খেলায়  ১২ অক্টোবর ভাগবা গ্রাম থেকে তাদেরকে আটক করা হয়। অনলাইন জুয়া মামলায় আসামিদের আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।