শতবর্ষের দোরগোড়ায় শামসুর রাহমান
তারিক ইসলাম
২৩ অক্টোবর কবি শামসুর রাহমানের ৯৭তম জন্মবার্ষিকী। আর মাত্র তিন বছর পর, ২০২৯ সালে, বাংলা সাহিত্যের এই দিকপাল পা দেবেন জন্মশতবর্ষে। কবির মৃত্যুর প্রায় দুই দশক পর তাঁর জন্মবার্ষিকী নিয়ে আলোচনা কেবল প্রথাগত শ্রদ্ধা নিবেদন কিংবা স্মৃতিচারণের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, থাকাও উচিত নয়। বরং কালপঞ্জির এই বিশেষ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তাঁর সৃষ্টি ও বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকারের আলোকে আমাদের বর্তমানকে বোঝার আন্তরিক চেষ্টা চালানো জরুরি। একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন—কবির জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনে আমাদের জাতীয় প্রস্তুতি কতটুকু?
শামসুর রাহমান কেবল বিপুল সৃষ্টিশীলতার অধিকারী একজন কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন আধুনিক বাঙালির আত্মপরিচয় ও মুক্তবুদ্ধির অন্যতম আলোকবর্তিকা। নাগরিক জীবন ও নিভৃত প্রেমের সূক্ষ্ম অনুভূতির পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকে তাঁর কলম ছিল সোচ্চার। ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামেই তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি।
‘স্বাধীনতা তুমি’ কিংবা ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’—এগুলো শুধু কালজয়ী কবিতা নয়; স্বাধীন বাংলাদেশের রক্তঝরা ইতিহাস ও চেতনার অমর দলিল।
কোনো নির্দিষ্ট সংকীর্ণ মতাদর্শে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে তিনি আজীবন অন্যায়, ধর্মান্ধতা ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মুক্তচিন্তার পক্ষে অবস্থান নিতে গিয়ে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিতেও তিনি কখনো দ্বিধা করেননি।
আজকের জটিল সামাজিক মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে শামসুর রাহমানের অবদানের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি স্পষ্ট। আমরা যখন নৈতিক সংকট, সহনশীলতার অভাব এবং মতপ্রকাশের নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি, তখন কবির সেই আপসহীন সামাজিক দায়বদ্ধতা আমাদের পথ দেখাতে পারে। তাঁর সাহিত্য বারবার মনে করিয়ে দেয়, একজন কবির কাজ কেবল নান্দনিক শব্দমালা সাজানো নয়; বরং সমাজের কল্যাণ ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি দায়বদ্ধ থাকাও শিল্পের অন্যতম দায়িত্ব।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ২০২৯ সালে কবির জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনে আমরা কতটা প্রস্তুত? শামসুর রাহমানের বিপুল সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ এবং বিশ্বদরবারে নতুন করে তুলে ধরার উদ্যোগ এখনো প্রত্যাশিত গতি পায়নি। জন্মশতবর্ষের এই গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলককে সামনে রেখে এখনই কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
১. ডিজিটাল আর্কাইভ ও প্রামাণ্য রচনাবলি: কবির ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কবিতা, গদ্য, কলাম, অনুবাদ ও সাক্ষাৎকার প্রামাণ্যভাবে সংকলন করে আধুনিক ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ করা।
২. আন্তর্জাতিক মানের অনুবাদ: বিশ্বের প্রধান ভাষাগুলোতে তাঁর নির্বাচিত কবিতা ও গদ্যের মানসম্মত অনুবাদের ব্যবস্থা করা, যাতে আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর সাহিত্যকর্ম নতুন করে মূল্যায়িত হয়।
৩. তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছানো: বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গভীর গবেষণার পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর মুক্তচিন্তা ও সাহিত্যকর্মের মূল বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
৪. স্মৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ: পুরান ঢাকার যে পরিবেশে কবি তাঁর কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন, সেই ঐতিহাসিক স্থানগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা এবং সেগুলোকে সাহিত্যচর্চা ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।
শামসুর রাহমান আমাদের কাছে কেবল অতীতের কোনো ধ্রুপদি স্মৃতি নন; তিনি বর্তমানকে অনুধাবন করা এবং ভবিষ্যতের পথ খুঁজে নেওয়ার এক অবিনশ্বর বাতিঘর। তাঁর ৯৭তম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—তাঁকে কেবল আনুষ্ঠানিকতার ফ্রেমে আটকে রাখব না। বরং তাঁর অসাম্প্রদায়িক দর্শন, মুক্তচিন্তা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে আমাদের চিন্তা ও সংস্কৃতিতে জীবন্ত রাখব। জন্মশতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এই বোধ ধারণ করাই হবে কবির প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা।
লেখক: তারিক ইসলাম, সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।









