শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

৮১ বছরে জাতিসংঘ: বিশ্ব চায় প্রতিশ্রুতির কার্যকর বাস্তবায়ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:০৫ অপরাহ্ণ
৮১ বছরে জাতিসংঘ: বিশ্ব চায় প্রতিশ্রুতির কার্যকর বাস্তবায়ন

নিকোলাস বিশ্বাস

২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ দিবস। ২০২৬ সালে বিশ্ব এমন এক সময়ে দিবসটি পালন করছে, যখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গভীর সংকটের মুখে। যুদ্ধ বেসামরিক মানুষের জীবন বিপন্ন করছে, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্মিলিত উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করছে, মানবাধিকার সুরক্ষায় দেখা যাচ্ছে দ্বৈতনীতি এবং জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও আর্থিক চাপও টেকসই উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করা এবং সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার ৮১ বছর পরও এই লক্ষ্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তবে প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ ও মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যকার ব্যবধান প্রশ্ন তুলছে—জাতিসংঘ কি তার প্রতিশ্রুতি পূরণে সক্ষম?

প্রতিনিধিত্ব ও কার্যকারিতার সংকট

বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যা ১৯৩। ভ্যাটিকান সিটি ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য নয়; তারা পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা ভোগ করছে। ১৯৪৫ সালে ৫১টি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা সংস্থাটিতে বাংলাদেশ যোগ দেয় ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। সর্বশেষ সদস্যরাষ্ট্র দক্ষিণ সুদান, যা ২০১১ সালের ১৪ জুলাই জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে।

সাধারণ পরিষদে প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রের একটি করে ভোট থাকলেও বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সব রাষ্ট্রের প্রভাব সমান নয়। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোয় ক্ষমতার অসম বণ্টন স্পষ্ট। তাই প্রশ্নটি জাতিসংঘের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়; বরং সংস্থাটি কতটা কার্যকর, প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক হতে পারে, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

বিশ্বে যুদ্ধ প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। অথচ ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা প্রায়ই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। যখন সম্মিলিত দায়িত্বের চেয়ে জাতীয় ও কৌশলগত স্বার্থ প্রাধান্য পায়, তখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। পরিবার হারায় স্বজন, মানুষ হারায় ঘরবাড়ি, শিশুরা হারায় শিক্ষার সুযোগ এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।

শান্তি মানে শুধু যুদ্ধ বন্ধ হওয়া নয়; এর অর্থ নিরাপদে ঘরে ফেরা, ভয়মুক্ত জীবনযাপন এবং মর্যাদার সঙ্গে নতুন করে জীবন গড়ে তোলার সুযোগ পাওয়া। সংঘাত প্রতিরোধে আগাম সতর্কতা, কূটনৈতিক উদ্যোগ ও মধ্যস্থতা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদে স্বল্প প্রতিনিধিত্ব পাওয়া অঞ্চলগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং ব্যাপক নৃশংসতার ঘটনায় ভেটো ব্যবহারে সংযম প্রতিষ্ঠা জরুরি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রয়োজন প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

বহুপাক্ষিকতায় আস্থা ফেরানো

জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার অবক্ষয় বৈশ্বিক সহযোগিতাকে দুর্বল করছে। কিছু সরকার আন্তর্জাতিক চুক্তিকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখে; অন্যদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সব ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করে না। আস্থা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও দৃশ্যমান ফলাফল। অন্যদের কাছে জবাবদিহি দাবি করা ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোকেও নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে এই বিতর্ক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেই জাতিসংঘকে ‘অকার্যকর সংস্থা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং সংস্থাটির কর্মকর্তাদের ‘অহংকারী পরজীবী’ বলে সমালোচনা করেন বলে দ্য টাইমস অব ইসরায়েল-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, জাতিসংঘ সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ নিরাপত্তা পরিষদে সব অঞ্চলের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংস্কারের আহ্বান জানান এবং স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা বিলুপ্ত করার পক্ষে মত দেন বলে আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন ও সাইবার হুমকি প্রমাণ করে, স্বার্থের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য। দায়িত্বশীল বহুপাক্ষিকতা জাতীয় স্বার্থকে অস্বীকার করে না; বরং তা সুরক্ষায় সহায়তা করে। এ জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জাতিসংঘের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হওয়া উচিত।

মানবাধিকার হতে হবে সর্বজনীন

মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সমতার অভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন এখনো অসম। কোনো কোনো সরকার সমালোচনা এড়াতে সার্বভৌমত্বের যুক্তি তুলে ধরে। অন্যদিকে, নজরদারি, অনলাইন সেন্সরশিপ ও ডিজিটাল দমন-পীড়ন ব্যক্তি-স্বাধীনতার জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে।

রাজনৈতিক সুবিধা বিবেচনা না করে সর্বক্ষেত্রে মানবাধিকার রক্ষা করতে পারলেই জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের দৃষ্টিতে সমতা কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার হাতিয়ার হতে পারে না। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

টেকসই উন্নয়নে বৈশ্বিক সংহতি

জাতিসংঘের ২০৩০ সালের এজেন্ডা ও ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা দারিদ্র্য, বৈষম্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ সুরক্ষায় একটি অভিন্ন কাঠামো তৈরি করেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক অভিঘাত, ঋণসংকট, অপর্যাপ্ত অর্থায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন অগ্রগতিকে মন্থর করছে। পরিবেশগত সংকটে যাদের অবদান সবচেয়ে কম, অনেক ক্ষেত্রে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সহজলভ্য জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ন্যায্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার, স্বল্পসুদে উন্নয়ন অর্থায়ন এবং অসহনীয় ঋণের বোঝা কমানো জরুরি। উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু বিষয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব আর্থিক সহায়তার সমন্বয় ঘটাতে হবে।

তবে শুধু বৈদেশিক সহায়তাই যথেষ্ট নয়। জাতীয় নেতৃত্ব, সুশাসন ও জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের দায়িত্ব হলো অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এবং উন্নয়নের সুফল যেন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করা।

ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন মোকাবিলা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’—বর্তমান চ্যালেঞ্জের সারকথা তুলে ধরে। মানুষের জীবনে দৃশ্যমান অগ্রগতিই আস্থা ফেরানোর প্রধান শর্ত। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, ফলাফলের জন্য জবাবদিহি এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার বাড়াতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জনসেবা উন্নত করতে পারে, তবে এর ব্যবহার মানবাধিকার ও স্বচ্ছতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি।

সদস্যরাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম, গবেষক ও সাংবাদিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর উচিত শুধু আন্তর্জাতিক বৈঠকে অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ন্যায্য বৈশ্বিক নিয়ম প্রতিষ্ঠা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখা।

মানবতার প্রতি নতুন অঙ্গীকার

জাতিসংঘ দিবস কেবল বার্ষিকী উদ্‌যাপনের দিন নয়; বরং প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান পর্যালোচনার উপলক্ষ। জাতিসংঘ নিখুঁত কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, কিন্তু রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার জন্য একটি অভিন্ন বৈশ্বিক মঞ্চের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। বহুপাক্ষিক সহযোগিতা পরিত্যাগ করলে বৈশ্বিক সংকট দূর হবে না; বরং সেগুলো মোকাবিলা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

৮১ বছরে পদার্পণ করা জাতিসংঘের প্রয়োজন প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শের প্রতি নতুন অঙ্গীকার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন এবং সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে মানবতাকে স্থান দেওয়ার মানসিকতা। এর সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু গৃহীত প্রস্তাব দিয়ে নয়; বরং যুদ্ধের দুর্ভোগ কমছে কি না, মানবাধিকার সুরক্ষিত হচ্ছে কি না, উন্নয়নশীল দেশগুলো ন্যায্য সুযোগ পাচ্ছে কি না এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত হচ্ছে কি না—তার ভিত্তিতে।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহের বক্তব্যের মর্মার্থ হলো, ‘শান্তির পরিমাপ শুধু স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং মানুষের জীবনে আসা পরিবর্তনের মাধ্যমেও করতে হবে।’ বিশ্বের প্রয়োজন এমন একটি জাতিসংঘ, যা কেবল মুষ্টিমেয় মানুষের স্বার্থে নয়, বরং সবার জন্য কাজ করবে এবং বাস্তব ফলাফল নিশ্চিত করতে সচেষ্ট থাকবে।

লেখক পরিচিতি: নিকোলাস বিশ্বাস একজন ফ্রিল্যান্স গণমাধ্যমকর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত।
যোগাযোগ: gonomaddzam@gmail.com

Ads small one

যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর খুলনা সফর ২৫ অক্টোবর

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৫০ অপরাহ্ণ
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর খুলনা সফর ২৫ অক্টোবর

পত্রদূত ডেস্ক: যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মোঃ আমিনুল হক এক দিনের সফরে আগামী ২৫ অক্টোবর খুলনা আসছেন।

সফরসূচি অনুযায়ী, ওই দিন বেলা দেড়টায় তিনি খুলনা জেলা স্টেডিয়াম পরিদর্শন করবেন। বিকেল ৩টায় বিভাগীয় কমিশনারের সম্মেলনকক্ষে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬-২৭’ (সিজন-২) উদ্বোধনের প্রস্তুতি নিয়ে খুলনা বিভাগের মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন।

সভা শেষে প্রতিমন্ত্রী ঢাকার উদ্দেশে খুলনা ত্যাগ করবেন।

জাতিসংঘ দিবস: বিশ্বশান্তি, মানবাধিকার ও উন্নয়নে ঐক্য

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৪০ অপরাহ্ণ
জাতিসংঘ দিবস: বিশ্বশান্তি, মানবাধিকার ও উন্নয়নে ঐক্য

সাকিবুর রহমান বাবলা

২৪ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় জাতিসংঘ দিবস। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘ। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২৪ অক্টোবরকে জাতিসংঘ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৪৮ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। একই দিনে পালিত হয় বিশ্ব উন্নয়ন তথ্য দিবস। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য জাতিসংঘের লক্ষ্য, অর্জন ও কার্যক্রম সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত লিগ অব নেশনসের ব্যর্থতা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা বিশ্বনেতাদের একটি নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনে উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৪১ সালের ১২ জুন লন্ডনের সেন্ট জেমস প্রাসাদে গৃহীত ঘোষণা, একই বছরের ১৪ আগস্ট আটলান্টিক সনদ এবং ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি প্রকাশিত ‘ডিক্লারেশন বাই ইউনাইটেড নেশনস’-এর মাধ্যমে নতুন সংস্থা প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ‘ইউনাইটেড নেশনস’ নামটি প্রস্তাব করেন। ১৯৪৩ সালের মস্কো ও তেহরান সম্মেলন এবং ১৯৪৪ সালের ডাম্বার্টন ওকস সম্মেলনে সংস্থাটির কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়।

১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইয়াল্টা সম্মেলনে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো ও স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা নিয়ে সমঝোতা হয়। এরপর ২৫ এপ্রিল থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে ৫০টি দেশের প্রতিনিধিরা জাতিসংঘ সনদ প্রণয়ন ও স্বাক্ষর করেন। পরে পোল্যান্ডের স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫১। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যসহ প্রয়োজনীয়সংখ্যক রাষ্ট্রের অনুমোদনের পর ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে সংস্থাটির প্রধান লক্ষ্য আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি, মানবাধিকার রক্ষা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

বর্তমান বিশ্বে জাতিসংঘের ভূমিকা একই সঙ্গে অপরিহার্য ও সমালোচনাবিদ্ধ। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা ও লেবাননের সংকট এবং সুদানের গৃহযুদ্ধের মতো সংঘাত মোকাবিলায় সংস্থাটির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের ভেটো ক্ষমতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ সম্প্রসারণের দাবি, অর্থসংকট এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় কার্যকর জবাবদিহির অভাবও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়েছে। তবে জাতিসংঘ কোনো বিশ্বসরকার নয়; সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ ও সদিচ্ছার ওপরই এর কার্যকারিতা নির্ভরশীল।

রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মানবিক সহায়তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণে জাতিসংঘের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি খাদ্যসহায়তা দেয়, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সুরক্ষায় কাজ করে এবং ইউনিসেফ শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষা নিয়ে কাজ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মহামারি প্রতিরোধ ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে, ইউনেস্কো শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে এবং ইউএন উইমেন নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি দারিদ্র্য বিমোচন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করে। পাশাপাশি জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি পরিবেশ সংরক্ষণে এবং জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলনগুলো বৈশ্বিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

জাতিসংঘের আরেকটি প্রধান উদ্যোগ হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন। দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূরীকরণ, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, সুস্বাস্থ্য, লিঙ্গসমতা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং বৈষম্য হ্রাস এই কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। একই সঙ্গে শান্তিরক্ষা মিশন, নিরস্ত্রীকরণ উদ্যোগ, সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে সংঘাত প্রশমনের চেষ্টা চালানো হয়। যুদ্ধ ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে জরুরি খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয় পৌঁছে দেওয়াও জাতিসংঘের অন্যতম মানবিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সম্পর্কও অত্যন্ত নিবিড়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা এবং স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ভূমিকা রাখে। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে যোগ দেয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ অর্জনে বাংলাদেশের উদ্যোগ বিশেষভাবে স্মরণীয়। ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনবিষয়ক ট্রাইব্যুনালের রায়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধের নিষ্পত্তিও বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

জাতিসংঘে বাংলাদেশ ১৯৭৯–১৯৮০ এবং ২০০০–২০০১ মেয়াদে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। ২০২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তাঁর পূর্বসূরি ছিলেন জার্মানির আনালেনা বেয়ারবক। ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর পর তিনি দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব লাভ করেন।

বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক মিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান, লেবানন, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশের দুই লক্ষাধিক শান্তিরক্ষী বিভিন্ন সময়ে জাতিসংঘের মিশনে অংশ নিয়েছেন। ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সামরিক ও পুলিশ সদস্য পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অবদানকারী দেশ। বর্তমানে বাংলাদেশ জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সহযোগিতা কাঠামো, জলবায়ু কূটনীতি, পরিবেশ সংরক্ষণ, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তা, শিশুস্বাস্থ্য, শিক্ষা, সুশাসন ও নিরাপদ অভিবাসনের মতো ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশে জাতিসংঘের প্রায় ২৪টি যৌথ কর্মসূচি চলমান রয়েছে।

জাতিসংঘ দিবস কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়; এটি মানবতা, সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক সংহতির অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার দিন। যুদ্ধ বন্ধ, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, জলবায়ু সংকট মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের সংস্কার ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি জরুরি। একই সঙ্গে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সদিচ্ছা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য। মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সহযোগিতার পথ সুদৃঢ় করতে পারলেই জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাকালীন স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা—জাতিসংঘ হোক সবার জন্য শান্তি, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও উন্নয়নের কার্যকর মঞ্চ।

কলারোয়া সীমান্তে ৮ লাখ ২০ হাজার টাকার চোরাচালানি মালামাল জব্দ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৩২ অপরাহ্ণ
কলারোয়া সীমান্তে ৮ লাখ ২০ হাজার টাকার চোরাচালানি মালামাল জব্দ

পত্রদূত ডেস্ক: সাতক্ষীরার কলারোয়া সীমান্তে চোরাচালানবিরোধী বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৮ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় ঔষধ ও মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়ন (৩৩ বিজিবি) এর অধীনস্থ কাকডাঙ্গা ও মাদরা বিওপির বিশেষ আভিযানিক দল পৃথক অভিযান চালিয়ে এসব মালামাল জব্দ করে।

বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, কাকডাঙ্গা বিওপির আভিযানিক দল সীমান্ত পিলার ১৩/৩-এস-এর ৬ আরবি থেকে আনুমানিক ৩০০ গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভাদিয়ালি এলাকা থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় ঔষধ জব্দ করে।

অন্যদিকে, মাদরা বিওপির আভিযানিক দল একই সীমান্ত পিলারের ৮ আরবি থেকে আনুমানিক ৫০০ গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তেতুলতলা এলাকা থেকে ৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ জব্দ করে। দুই অভিযানে জব্দ করা মালামালের মোট মূল্য ৮ লাখ ২০ হাজার টাকা।

বিজিবি জানায়, শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে ভারত থেকে এসব পণ্য বাংলাদেশে পাচার করা হচ্ছিল। এ ধরনের চোরাচালানের ফলে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

চোরাচালান প্রতিরোধ, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি রোধ এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশে বিজিবির এ ধরনের অভিযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অভিযানে স্থানীয় জনগণ সন্তোষ প্রকাশ করে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।