আজ আইসক্রিম দিবস: জানেন কি সে ইতিহাস?
আখলাকুর রহমান
মানুষের জীবনটা আসলে এক অদ্ভুত ধাঁধা। এই যেমন ধরুন, সাতক্ষীরার প্রখর গ্রীষ্মে যখন মাথার ওপর সূর্যটা ঠিক যেন একটা জ্বলন্ত কড়াইয়ের মতো খাড়া হয়ে থাকে, তখন আমরা সবাই ছায়া খুঁজি, একটুখানি শীতলতা খুঁজি। প্রকৃতির এই তীব্র দাবদাহের মধ্যে মানুষের তৈরি সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার কী, তা কি আপনারা জানেন? এটার উত্তর কোনো রকেট সায়েন্স নয়, উত্তরটা খুবই সরল এবং সুস্বাদু-আইসক্রিম। আজ জুলাই মাসের তৃতীয় রবিবার, বিশ্ব আইসক্রিম দিবস। দিনটি যখন এসেছেই, তখন আমার প্রিয় সাতক্ষীরার পাঠকদের জন্য আইসক্রিমের কিছু চমৎকার এবং আনন্দময় ইতিহাস না বললেই নয়। আপনারা হয়তো ভাবছেন, এই হিমশীতল বস্তুটি বুঝি সেদিনের আধুনিক কোনো কারখানার সৃষ্টি। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মানুষের এই ঠান্ডার প্রতি মোহ হাজার বছরের পুরোনো।
গল্পের শুরুটা করা যাক আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের পারস্য সাম্্রাজ্য থেকে। তখনকার দিনে তো আর আমাদের ঘরের কোণের মতো আধুনিক রেফ্রিজারেটর ছিল না। পারস্যের রাজারা গরমের দিনে পাহাড়ি বরফ আনিয়ে তার ওপর আঙুরের রস, জাফরান এবং নানা পদের ফল ছড়িয়ে এক বিশেষ ধরনের খাবার খেতেন। এটাকে ঠিক আজকের আইসক্রিম বলা না গেলেও, হিমায়িত মিষ্টান্ন বা ডেজার্টের আদিপুরুষ বলাই যায়। রোমান সম্্রাট নিরোর একটা মজার কান্ড ছিল। তিনি তাঁর দাসদের পাঠাতেন আল্পস পর্বতমালায়, শুধুমাত্র সেখান থেকে তাজা বরফ কুড়িয়ে আনার জন্য। সেই বরফ এনে তাতে মধু এবং ফলের রস মিশিয়ে তিনি পরম তৃপ্তিতে খেতেন। ভেবে দেখুন, এক বাটি বরফ-মিষ্টির জন্য মানুষের কী বিপুল আয়োজন!
তবে আমরা আজকে যে ক্রিমি এবং মোলায়েম আইসক্রিম খাই, তার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান কিন্তু চীনের। প্রায় দুই হাজার বছর আগে চীনের তাং রাজবংশের রাজারা দুধ আর চালের গুঁড়োর মিশ্রণকে বরফে জমিয়ে এক ধরনের খাবার তৈরি করতেন, যা বর্তমান আইসক্রিমের খুব কাছাকাছি। এই গোপন রেসিপিটি কিন্তু দীর্ঘদিন প্রাচীর ঘেরা চীনেই বন্দি ছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বিখ্যাত পরিব্রাজক মার্কো পোলো যখন চীন ভ্রমণ শেষে ইতালিতে ফিরে গেলেন, তখন তিনি সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন আইসক্রিম তৈরির এই জাদুকরী কৌশল। ব্যস, ইউরোপের রাজপরিবারে হইচই পড়ে গেল। ইতালির রাজকন্যা ক্যাথরিন ডি মেডিসি যখন ফ্রান্সের রাজাকে বিয়ে করলেন, তখন তিনি নিজের সঙ্গে করে শেফ নিয়ে গিয়েছিলেন, যেন ফ্রান্সে গিয়েও তিনি এই রাজকীয় খাবারের স্বাদ থেকে বঞ্চিত না হন।
আইসক্রিমের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, এটি দীর্ঘদিন ছিল শুধু রাজা-বাদশাহদের বিলাসী খাদ্য। সাধারণ মানুষের এই অমৃত ছোঁয়ার সাধ্য ছিল না। কিন্তু আমেরিকা আবিষ্কারের পর এবং শিল্প বিপ্লবের ছোঁয়ায় আইসক্রিম আমূল বদলে গেল। জ্যাকব ফুসেল নামের এক ভদ্রলোক যখন প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আইসক্রিম তৈরি শুরু করলেন, তখন এটি সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে চলে এলো। এরপর এলো আইসক্রিম কোনের যুগ। ১৯০৪ সালের সেন্ট লুইস বিশ্ব মেলায় এক আইসক্রিম বিক্রেতার বাটি ফুরিয়ে গিয়েছিল। পাশেই এক সিরিয়ান ভদ্রলোক ওয়াফেল বিক্রি করছিলেন। তিনি বুদ্ধি করে তাঁর ওয়াফেলটিকে কোণের মতো মুড়িয়ে তার ওপর আইসক্রিম বসিয়ে দিলেন। এভাবেই জন্ম নিল আমাদের অতি পরিচিত এবং ভালোবাসার আইসক্রিম কোণ, যা খেতে কোনো বাটি বা চামচের প্রয়োজন হয় না।
আমাদের এই সাতক্ষীরা অঞ্চলে গরমের দিনে যখন ‘আইসক্রিম’ বলে কোনো ফেরিওয়ালা ডাক দেন, তখন ছোট-বড় সবার মনেই এক তীব্র চঞ্চলতা তৈরি হয়। শৈশবের সেই কাঠি আইসক্রিম, লাল-সবুজ রঙের বরফ গলা পানি, কিংবা আজকের দিনের আধুনিক কুলফি—সবকিছুর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত ভালো লাগা। জীবনটা আসলে খুব জটিল কিছু নয়। কখনো কখনো এক কাপ ভ্যানিলা কিংবা চকোলেট আইসক্রিম মানুষের সমস্ত ক্লান্তি এবং দুঃখকে এক পলকে ভুলিয়ে দিতে পারে। তাই এই বিশেষ দিবসে সাতক্ষীরার সমস্ত ব্যস্ত মানুষকে আমার অনুরোধ, জীবনের সব জটিলতা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যান। বাজার থেকে নিজের পছন্দের আইসক্রিম কিনে এনে মুখে পুরে দিন, এবং অনুভব করুন কীভাবে ফ্রিজের ঠান্ডার মাঝেও এক চিলতে অকৃত্রিম ও উষ্ণ আনন্দ লুকিয়ে থাকে। শুভ আইসক্রিম দিবস, সবার জীবন আইসক্রিমের মতোই মিষ্টি আর শীতল হোক।
লেখা : আখলাকুর রহমান, উদ্যোক্তা









