লেখকের পাঠানো ছবি
মোঃ নাজির হোসেন
প্রযুক্তির এই যুগে মোবাইল ফোন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। একসময় মোবাইল ছিল কেবল দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম। সময়ের সঙ্গে সেই মোবাইলই হয়ে উঠেছে ক্যামেরা, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, ব্যাংক, বাজার, পাঠশালা, অফিস ও বিনোদনের বিশাল প্ল্যাটফর্ম। একটি ছোট যন্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের তথ্য মুহূর্তেই পাওয়া যাচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-এই প্রযুক্তির সুবিধা আমরা কতটা গ্রহণ করছি, আর এর অপব্যবহারে কতটা ক্ষতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?
বিশেষ করে কিশোর ও যুবসমাজের দিকে তাকালে বিষয়টি উদ্বেগজনক। মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার অনেকের পড়াশোনা, কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগ এবং মানসিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে মোবাইল নিজে সমস্যার মূল নয়; সমস্যার বড় অংশ তৈরি হয় অতিরিক্ত, অনিয়ন্ত্রিত ও উদ্দেশ্যহীন ব্যবহারে।
প্রয়োজনের প্রযুক্তি যখন নেশায় পরিণত হয়:
প্রযুক্তি মানুষের সময় বাঁচানোর কথা। অথচ মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহারে অনেক কিশোর-তরুণের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। পড়ার টেবিলে বই খোলা থাকলেও চোখ আটকে থাকে স্ক্রিনে। ঘুমাতে যাওয়ার আগে কয়েক মিনিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অভ্যাস কখন যে ঘণ্টায় পরিণত হয়, অনেকেই বুঝতে পারেন না।
একটি ভিডিও শেষ হওয়ার পর আরেকটি ভিডিও, একটি পোস্টের পর আরেকটি পোস্ট-এভাবেই কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয় কাজ পিছিয়ে যায়। সময় ব্যবস্থাপনা নষ্ট হয় এবং ধীরে ধীরে তৈরি হয় নির্ভরশীলতার প্রবণতা।
মোবাইল গেম: বিনোদন থেকে আসক্তি:
মোবাইল গেম শিশু-কিশোরদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। সীমিত সময় বিনোদনের জন্য গেম খেলা ক্ষতিকর না হলেও দীর্ঘ সময় গেমিংয়ের অভ্যাস উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
অনেক কিশোর পড়াশোনা, খেলাধুলা কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিবর্তে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেমে ব্যস্ত থাকে। রাত জেগে গেম খেলার কারণে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়। পরদিন স্কুল-কলেজে মনোযোগ কমে যায়, পড়াশোনায় অনীহা তৈরি হয় এবং দৈনন্দিন জীবনেও বিরূপ প্রভাব পড়ে।
কখনো কখনো গেমের ভেতরের প্রতিযোগিতা, পুরস্কার ও অর্জনের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ বাস্তব জীবনের লক্ষ্যকেও আড়াল করে দেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: যোগাযোগ বাড়ছে, নাকি দূরত্ব?:
মোবাইলের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের যোগাযোগকে সহজ করেছে। বিদেশে থাকা স্বজনের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা, খবর জানা, ব্যবসা পরিচালনা কিংবা শিক্ষামূলক তথ্য পাওয়া—এসব নিঃসন্দেহে বড় সুবিধা।
কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের বাস্তব সামাজিক সম্পর্ককে দুর্বলও করতে পারে। একই ঘরে বসে পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে কথা না বলে নিজ নিজ ফোনে ব্যস্ত থাকেন-এ দৃশ্য এখন অস্বাভাবিক নয়।
‘লাইক’, ‘কমেন্ট’, ‘শেয়ার’ ও অনুসারীর সংখ্যা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা অনেক তরুণের মধ্যে অন্যের জীবন ও নিজের জীবনের তুলনা করার প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে হতাশা, হীনম্মন্যতা কিংবা অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
অশিক্ষা ও ঝরে পড়ার পেছনে মোবাইল কতটা দায়ী?:
কিশোরদের শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ার জন্য শুধু মোবাইল ফোনকে দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়। দারিদ্র্য, পারিবারিক সমস্যা, শিক্ষার পরিবেশ, অর্থনৈতিক চাপ, বিদ্যালয় থেকে দূরত্ব এবং সামাজিক নানা কারণও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার এসব সমস্যাকে আরও জটিল করতে পারে। একজন শিক্ষার্থী যদি প্রতিদিন দীর্ঘ সময় বিনোদনমূলক কনটেন্ট, গেম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করে, তাহলে পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ কমে যাওয়াই স্বাভাবিক।
অতএব, মোবাইলকে একমাত্র কারণ না বানিয়ে মোবাইল ব্যবহারের ধরনকে গুরুত্ব দিতে হবে।
অশ্লীল ও ক্ষতিকর কনটেন্টের ঝুঁকি:
ইন্টারনেটের বিশাল জগতে ভালো কনটেন্টের পাশাপাশি ক্ষতিকর কনটেন্টও রয়েছে। বয়স-অনুপযোগী ভিডিও, সহিংসতা, অশ্লীলতা, প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন ও নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য কিশোরদের সহজেই প্রভাবিত করতে পারে।
কৌতূহলী বয়সে কোনো শিশু বা কিশোর যদি নিয়মিত অনুপযুক্ত কনটেন্টের সংস্পর্শে আসে, তার চিন্তাভাবনা ও আচরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই শুধু মোবাইল কেড়ে নেওয়া সমাধান নয়; তাকে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার শেখানোও জরুরি।
ভুয়া তথ্যের ভয়াবহতা:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য পাওয়া সহজ, কিন্তু সব তথ্য সত্য নয়। গুজব, ভুয়া সংবাদ, বিভ্রান্তিকর ভিডিও ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
অনেক কিশোর-তরুণ যাচাই না করেই কোনো পোস্ট বিশ্বাস করে এবং অন্যদের কাছে ছড়িয়ে দেয়। এতে ব্যক্তিগত ক্ষতি থেকে শুরু করে সামাজিক অস্থিরতা পর্যন্ত সৃষ্টি হতে পারে।
তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন ডিজিটাল সাক্ষরতা-কোন তথ্য বিশ্বাস করতে হবে, কোনটি যাচাই করতে হবে এবং কোনটি শেয়ার করা উচিত নয়, তা শেখানো।
ঘুম হারাচ্ছে প্রজন্ম:
মোবাইল ব্যবহারের আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাত জাগার প্রবণতা। ঘুমের সময় মোবাইল হাতে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখা, ভিডিও দেখা কিংবা গেম খেলার অভ্যাস অনেক কিশোর-তরুণের মধ্যে দেখা যায়।
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে পরদিন ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিক্ষার্থী হলে পড়াশোনায়ও তার প্রভাব পড়ে।
বই থেকে স্ক্রিনে:
একসময় অবসর সময়ে কিশোরদের হাতে বই, পত্রিকা কিংবা গল্পের সংকলন দেখা যেত। মাঠে খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ছিল বিনোদনের অংশ।এখন সেই জায়গার বড় একটি অংশ দখল করেছে স্ক্রিন।
বই পড়ার অভ্যাস কমে গেলে শুধু পরীক্ষার ফল নয়, চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি ও ভাষার দক্ষতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই মোবাইলের পাশাপাশি বই ও বাস্তব অভিজ্ঞতার জগতকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
পরিবারে অভিভাবকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ:
শিশুর হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে অভিভাবকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং সেখান থেকেই দায়িত্ব শুরু।
অভিভাবকদের উচিত-
★ বয়স অনুযায়ী মোবাইল ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করা;
★ পড়াশোনা ও ঘুমের সময় মোবাইল থেকে দূরে রাখা;
★শিশু কী ধরনের অ্যাপ ও কনটেন্ট ব্যবহার করছে, তা সম্পর্কে সচেতন থাকা;
★বয়স-অনুপযোগী কনটেন্ট থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা;
★সন্তানকে ভয় দেখানোর বদলে প্রযুক্তির ভালো-মন্দ বোঝানো;
★নিজেরাও পরিবারের সামনে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার না করা;
★ সন্তানকে খেলাধুলা, বই পড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে উৎসাহিত করা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও প্রয়োজন সচেতনতা:
বিদ্যালয় ও কলেজে শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের নৈতিকতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কেও শিক্ষা দিতে হবে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা, সাইবার হয়রানি, ভুয়া তথ্য শনাক্তকরণ, অনলাইন প্রতারণা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং স্ক্রিন-টাইম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো যেতে পারে।
মোবাইল নিষিদ্ধ নয়, ব্যবহার হোক নিয়ন্ত্রিত:
মোবাইল ফোনকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার দাবি বাস্তবসম্মত নয়। কারণ আধুনিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও যোগাযোগে মোবাইলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজন হলো সচেতন ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার।
শিশু-কিশোরদের বোঝাতে হবে—মোবাইল হলো একটি হাতিয়ার; এটি যেন জীবনের নিয়ন্ত্রক হয়ে না ওঠে।
প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে শিক্ষা, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও যোগাযোগের জন্য। বিনোদন থাকবে, কিন্তু সেটি যেন জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য না হয়ে যায়।
সমাজ ও রাষ্ট্রের করণীয়:
কিশোর-যুবসমাজকে নিরাপদ রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র-সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
শিশুদের জন্য নিরাপদ বিনোদনের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত খেলাধুলার মাঠ, পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শিশুদের সুরক্ষা এবং ক্ষতিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
শেষ কথা:
মোবাইল ফোন আমাদের শত্রু নয়। এটি একই সঙ্গে আশীর্বাদ ও ঝুঁকির বাহন। আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি, তার ওপরই নির্ভর করে এটি আমাদের উন্নতির হাতিয়ার হবে, নাকি সময় ও সম্ভাবনা নষ্ট করার কারণ হবে।
আজকের কিশোরই আগামী দিনের নাগরিক, কর্মী, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, সাংবাদিক ও রাষ্ট্রনায়ক। তাদের হাতে শুধু স্মার্টফোন নয়—স্মার্ট চিন্তা, সঠিক শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধও তুলে দিতে হবে।
মনে রাখতে হবে—
“মোবাইল আমাদের জীবনকে পরিচালনা করবে না; আমরাই মোবাইলকে পরিচালনা করব।”
প্রযুক্তির ব্যবহার হোক জ্ঞানের জন্য, সৃজনশীলতার জন্য এবং উন্নত ভবিষ্যতের জন্য। তাহলেই মোবাইল হবে আশীর্বাদ-অভিশাপ নয়।
মোঃ নাজির হোসেন, সোনাবাড়ীয়া, কলারোয়া, সাতক্ষীরা।