কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য এর জন্মশত বার্ষিকীতে স্মরণ
মো.জয়নাল আবেদীন
১৫ আগষ্ট, ২০২৬ ছিল সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশত বার্ষিকী। তিনি জন্মগ্রহন করেছিলেন ১৫ আগষ্ট ১৯২৬। বাঙালি কবিদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বকবি,নজরুলকে বিদ্রোহী কবি আর সুকান্তকে কিশোর কবি বলা হয়। মাত্র ২১ বছরের কিশোরকালে তাঁর মৃত্যু হয়। এ জন্যই তিনি কিশোর কবি হিসেবে পরিচিতি পান। সুকান্তের কবি প্রতিভা সম্পর্কে বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন “১৯৪০ এর দশকে শ্রেণিচেতনার যে বিকাশ ঘটেছিলো তার প্রমাণ আমরা পাই ক্রমবর্ধমান শিল্প ধর্মঘট, বিক্ষোভ এবং কৃষক আন্দোলনে, যে আন্দোলন ১৯৪৬-৪৭ এর দিকে তেভাগজন্মশতবর্ষে কিশোর কবি সুকান্তকে স্মরণ আন্দোলনের মধ্যে একটা পরিণতি লাভ করে। সুকান্তের কবিতা মোটামুটি এই প্রভাবেই নিয়ন্ত্রিত হয়েছিলো এবং তিনি মূলতই ছিলেন এই নুতন যুগ চেতনার প্রতিনিধি। সুকান্ত প্রথম শ্রেণির কবি ছিলেন, না দ্বিতীয় শ্রেণির কবি ছিলেন,তিনি কি হতে পারতেন এবং একুশ বছরে মৃত্যু বরণ করায় কি হতে পারেননি ইত্যাদি আলোচনা বাদ দিয়ে বলা চলে যে, বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে তিনি একটা নোতুন ধারা প্রবর্তন করেছিলেন,কাব্যের একটা নিদিষ্ট দিক নির্দেশ করেছিলেন। সুকান্ত প্রতিভার এটাই বৈশিষ্ট। বাংলা কবিতার ইতিহাসে এজন্যেই তিনি অবিস্মরণীয়। সুকান্ত ভট্টাচার্য ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অবিভক্ত বাংলার কিশোর বাহিনীর প্রধান সংগঠক হিসেবে দায়িত্বপালনকালে বামপন্থি ধারার শিল্পী সাহিত্যিক সাংবাদিক রাজনীতিবিদদের সাথে ওঠাবসার সুযোগ পেয়ে, তাঁদের বক্তৃতা- আলোচনা শুনে ও বই পত্রিকা পড়ে নিজের জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করে শ্রেণি সচেতন হয়ে ওঠে- যার বহি:প্রকাশ ঘটেছে তাঁর কবিতা ও চিঠিপত্রে। রনেশ দাসগুপ্ত ‘এক ঝলক দেখেছিলাম’ স্মৃতিচারণে লিখেছেন” চল্লিশের দশকের প্রথমদিকে ঢাকা জেলা প্রগতি লেখক সংঘের মুখপত্র ছিল’ প্রতিরোধ’। আমরা যারা এই ছিমছাম গণমুখী সংগ্রামী সাহিত্য পত্রিকাটি চালাতাম,তারা সাধারনত নিজেরাই এর আদ্যোপান্ত লিখতাম। একদিন ডাকের চিঠি এলে একটা চৌকো খাম খুলে পাওয়া গেল একটি কবিতা। গোটা গোটা অক্ষরে খুব যতœ করে সাজিয়ে লেখা। কবির নাম সুকান্ত ভট্টাচার্য। কবিতার নাম’ আগামী’। কলকাতা থেকে এই ‘আগামী’এসেছিল অযাচিত ভাবে। নামটা অজানা ছিল না। কারন সুকান্ত তখন তদানিন্তন সারা বাংলার কিশোর বাহিনীর প্রধান সংগঠক। তা ছাড়া সুভাষ মুখাপাধ্যায়ের উত্তরসূরী হিসেবে কিছুটা পরিচিতি হতে শুরু করেছে। যুদ্ধ, নিপীড়ন, অনৈক্য, দুর্ভিক্ষ আর স্বাধীনতা সংগ্রামের গণমুখী নতুনতর প্রস্ত্ততির পটভূমিতে আমাদের মনে দোলা দিল’আগামী’ কবিতার শেষ চার পংক্তি।
হানো যদি কঠিন কুঠার তবুও তোমায় আমি হাতছানি দেব বারে বারে ফল দেব,ফুল দেব, দেব আমি পাখীর কূজন একই মাটিতে পুষ্ট তোমাদের আপনার জন। আগামীর’সারল্য আর আত্মোৎসর্গের ভাবটি আমাদের খুব ভাল লেগেছিল। কারন, আধুনিক বাংলা কবিতা সে সময়ে নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করছে,তবু যেন মন ভরছে না। বিদ্রুপ আক্ষেপ আর আর্তনাদ খুঁজে ফিরছিলো গণমুখী প্রতীককে।
সুকান্তের কবিতাটির গণমুখী প্রতীকাশ্রয়ী। কিন্তু সে যেন একটা আশ্চর্য প্রশান্তির ভাব নিয়ে এসে দাঁড়ালো জনতার মাঝখানে। আমাদের মধ্যে তখন যারা কবিতা লিখছে,তারা পছন্দ করলো কবিতাটিকে।
এর পরই ওকে সামনা সামনি দেখলাম যতদূর মনে পড়ে ১৯৪৪ সালের শুরুতে কলকাতায় প্রগতি লেখক সংঘের সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে। বিষয় নির্বাচনী সভায় অন্যান্য অনেকের মধ্যে বসে ছিলেন বাংলা সাহিত্যের তদানীন্তন প্রগতিশীল দিকপাল শিল্প সাহিত্যিকদের মধ্যে কয়েকজন। ধর্মতলা স্ট্রিটের একটা বাড়ীর তেতলায় ফরাসের উপর ঘন হয়ে বসেছিলাম আমরা। আমার পাশে একটা কিশোরের ফিস ফিস আওয়াজ। ’আমার নাম সুকান্ত, আপনাকে দু একটা কথা জিজ্ঞেস করবো। মনে পড়ে গেল,আগামী কবিতার কথা। এই সে-ই সুকান্ত?” বাঙালি কবিদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল সর্বপ্রধান অসাম্প্রদায়িক কবি। আর সুকান্ত অসাম্প্রদায়িক ও শ্রেণি সচেতন বিপ্লবী কবি। রবীন্দ্রনাথের নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ ,দুই বিঘা জমি কবিতা আর নাটক রক্ত করবীতে বিদ্রোহের সুর আছে। আর নজরুলের কুলি মজুর, মানুষ কবিতায় গরীবের প্রতি মমত্ত্ববোধ থাকলেও শোষনমুক্তির পথ সম্পর্কে বিপ্লবী দিক নির্দেশনা নেই। কারন রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল সমাজতন্ত্রী ছিলেন না। কিন্তু সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন কিশোর বয়সের বাম ঘরোনার কর্মী। তাই শ্রেণি চেতনায় তিনি ছিলেন সমৃদ্ধ -সচেতন। তাঁর কবিতায় শোষণ বঞ্চনা থেকে মুক্তির পথ নির্দেশনা আছে সুস্পস্টভাবে। সুকান্ত সমাজের শোষণ বঞ্চনা দেখে কবিতায় তা তুলে ধরেই ক্ষান্ত হননি সমাধানের পথও বাতলে দিয়েছেন। ছাড়পত্র কবিতায় লিখেছেন- এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান; জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত্যু আর ধ্বংস্তুপ- পিঠে চলে যেতে হবে আমাদের। চলে যাব-তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি-নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ অঙ্গীকার। সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রায় সকল কবিতায় সমাজের শোষন বঞ্চনা থেকে মুক্তির পথ যে শোষিত মানুষদের ঐক্য ও বিদ্রোহ তা স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠেছে। কলম কবিতায় কবির আহবান-
মজুর দেখ নি তুমি? হে কলম, দেখনি বেকার? বিদ্রোহ দেখ নি তুমি? রক্তে কিছু পাওনি শেখার?
তাই যত লেখো, তত পরিশ্রম হয় এসে জড়ো: কলম! বিদ্রোহ আজ!দল বেঁধে ধর্মঘট করো।
রানার কবিতায় স্বল্প বেতনের কর্মচারীদের,অভাব অনটনের চিত্র তুলে ধরে কবি মুক্তির দিক নির্দেশনা দিয়ে আহবান জানিয়েছন- রানার! রানার! কি হবে এ বোঝা ব’য়ে?
কি হবে ক্ষুধার ক্লান্তিতে ক্ষ’য়ে ক্ষ’য়ে? রানার! রানার! ভোরতো হয়েছে- আকাশ হয়েছে লাল
আলোর স্পর্শে কবে কেটে যাবে এই দুঃখের কাল? রানার! গ্রামের রানার! সময় হয়েছে নতুন খবর আনার;
শপথের চিঠি নিয়ে চল আজ ভীরুতা পিছনে ফেলে-
পৌঁছে দাও এ নতুন খবর
অগ্রগতির’মেলে’, দেখা দেবে বুঝি গ্রভাত এখুনি- নেই, দেরী নেই আর, ছুটে চলো,ছুটে চলো, আরো বেগে দুর্দম, হে রানার। সুকান্তের কবিতায় শ্রেণি চেতনা ও সমাজ পরিবর্তনের জন্য শ্রেণি সংগ্রামের কথা স্পষ্ট ভাবেই ফুটে উঠেছে।আপোষকামিতা কবির চিন্তায় ছিল না বিন্দু পরিমানে। এ টা সম্ভব হয়েছিলো চল্লিশের দশকে বাংলার রাজনৈতিক অবস্থার দরুন। ব্যাপক আন্দোলন সংগ্রামের যে বিদ্রোহ ঘনিভূত হয়েছিল তা চিত্রিত করেছেন কবি এ ভাবে-বেজে উঠলো কি সময়ের ঘড়ি? এসো তবে আজ বিদ্রোহ করি, আমরা সবাই যে যার প্রহরী উঠুক ডাক। উঠুক তুফান মাটিতে পাহাড়ে জ্বলুক আগুন গরীবের হাড়ে কোটি করাঘাত পৌঁছাক দ্বারে-ভীরুরা থাক। মানব না বাধা, মানব না ক্ষতি; চোখে যুদ্ধের দৃঢ সম্মতি রুখবে কে আর এ অগ্রগতি, সাধ্য কার?
দেখব, ওপরে আজো আছে কারা, খসাব আঘাতে আকাশের তারা, সারা দুনিয়াকে দেব শেষ নাড়া, ছড়াব ধান। জানি রক্তের পিছনে ডাকবে সুখের বান। (বিদ্রোহের গান)
সুকান্তের কবিতার সাথে অন্য কবিদের কবিতার পার্থক্য রয়েছে- যা বদরুদ্দীন উমরের মতে”নজরুল ইসলাম সহ অন্যান্য যে সমস্ত কবি সামাজিক শোষণের উপর কবিতা রচনা করেছেন তাঁদের কাছে সুকান্তর দুই দিক দিয়ে পার্থক্য। প্রথমত তাঁরা কেউই যথার্থভাবে শ্রেণি সচেতন ছিলেন না। তাঁরা কেউই শোষিত জনতার সাথে উপযুক্তভাবে একাত্মতাবোধ করেননি। দ্বিতীয়ত এই কারনেই তাঁদের এ জাতীয় রচনা তাঁদের সামগ্রিক রচনার মধ্যে একটা ক্ষুদ্র অংশ অধিকার করে ছিলো। সুকান্তর সমগ্র কাব্য প্রচেষ্টাই কিন্ত্ত শ্রেণি চেতনার দ্বারা উদ্বোদ্ধ।তিনি শ্রেণি সংগ্রামেরই কবি। এজন্যে বাংলাদেশের,ভারতবর্ষের এবং সারা পৃথিবীর বিস্তীর্ণ পরিসরে নানা সমস্যাকে কেন্দ্র করে এবং নানাভাবে তিনি শ্রেণি শোষণ ও শ্রেণি সংগ্রামের কথাই নিজের কবিতায় চিত্রিত ও প্রতিফলিত করেন। সুকান্তের কাব্যচর্চা মোটামুটিভাবে শুরু হয় ১৯৪০ এর দিকে,তাক চৌদ্দ বছর বয়সে। সারা ভারতবর্ষে এবং বিশেষত বাংলাদেশে রাজনীতিক্ষেত্রে কংগ্রেস লীগের আধিপত্য সত্ত্বেও সেই পর্য়ায়ে শ্রমিক কৃষকেরাও একটা স্বাধীনসত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে।ট্রেড ইউনিয়ন ও কৃষক সভার মাধ্যমে তারা ব্যাপকভাবে শুরু করে নিজেদেরকে সংগঠিত করার কাজে।তাদের মধ্যে দেখা দেয় এক নতুন চেতনা ও প্রানের এক নতুন স্পন্দন। পূর্বাভাসে এই নতুন চেতনার কথাই শোনা যায়ঃ হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছাসে,
সে কোলাহলের রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ জলে ও মাটিতে ভাঙ্গনের বেগ আসে। হঠাৎ নিরীহ মাটিতে কখন জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান গত আকালের মৃত্যুকে মুছে আবার এসেছে বাংলাদেশের পাণ। (দুর্মর) এই চেতনা মানুষকে চোখবুজে আর সব কিছুকে সহ্য করতে শেখাবে না। এবার লোকের ঘরে ঘরে যাবে সোনালী নয়কো, রক্তে রঙ্গীন ধান দেখবে সকলে সেখানে জ্বলছে দাউ দাউ করে বাংলাদেশের প্রাণ। ( দুর্মর) বদরুদ্দীন উমর সুকান্তের চিন্তা চেতনা চিত্রায়িত করেছেন এভাবে,”চারিদিকে নিদারুণ শোষণ আর শাসনের শৃঙ্খল যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে খসে পড়বে না,তাঁর জন্যে যে ব্যাপক প্রস্তুতি ,দীর্ঘস্থায়ী এবং রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, অপরিহার্য, এ বিষয়ে সুকান্তের কোন সন্দেহ ছিলো না,যেমন তাঁর সন্দেহ ছিলো না রক্তাক্ত বিপ্লবের পর বিশ্ব শান্তির অনিবার্যতায়। এই মহাবিদ্রোহও বিপ্লবের নেতা লেনিনের সার্বিক চরিত্রের প্রতি দৃস্টি রেখে তাই তিনি বলেনঃ হাজার লেনিন যুদ্ধ কওে মুক্তির সীমান্ত ঘিরে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে। বিদ্যুৎ ইশারা চোখে, আজকেও অযুত লেনিন ক্রমশ সংক্ষিপ্ত করে বিশ্বব্যাপী প্রতিক্ষীত দিন- আশ্চর্য উদ্দাম বেগে বিপ্লবের প্রত্যেক আকাশে লেনিনের সূর্যদীপ্তি রক্তের তরঙ্গে ভেসে আসে; ইতালী, জার্মান, জাপান, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, চীন যেখানে মুক্তির যুদ্ধ সেখানেই কমরেড লেনিন সুকান্ত শুধু কবিই নন। তিনি লিখেছেন গান, ছডা, গল্প, গীতিনাট্য। পুরানো ধাঁধা ছড়াতে তিনি প্রশ্ন রেখেছেন-বলতে পারো বড়মানুষ মোটর কেন চড়বে? গরীব কেন সেই মোটরের তলায় চাপা পড়বে?
হিং-টিং-ছট’প্রশ্ন এসব, মাথার মধ্যে কামড়ায়, বড়লোকের ঢাক তৈরি গরীব লোকের চামড়ায়।
হরতাল গল্পে সভা ভাঙ্গতে দালাল প্রসঙ্গে সুকান্ত লিখেছেন, এদিকে কতকগুলো ইস্টিশানের ঘড়ি আর বাঁশী এসেছিল কর্তাদের দালাল হয়ে সভা ভাঙবার জন্যে। সভার কাজ ঠিক মতো হচ্ছে দেখে বাঁশীগুলো টিক টিক করে টিটকারি মেরে হট্টোগোল করতে লাগল। অমনি সবাই হৈ হৈ করে তেরে মেরে মারতে গেল ঘড়ি আর বাঁশীদের। ঘড়িরা আর কি করে,প্রাণের ভয়ে তাড়াতাড়ি ছ’টা বাজিয়ে দিল। অমনি সূর্য উঠে পড়ল। দিন হতেই সকলে ছুটে চলে গেল যার যার জায়গায়। সভা আর সেদিন হল না। সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন জনতার কবি। মেঝ বৌদি (জেঠাতুত মেঝদা শ্রী রাখাল ভট্টাচার্যের স্ত্রী রেনু দেবী) কে লেখা চিঠিতে সুকান্ত লিখেছেন” আমি যে জনতার কবি হতে চাই, জনতা বাদ দিলে আমার চলবে কি করে? তাছাড়া কবির চেয়ে বড় কথা আমি কমিউনিস্ট, কমিউনিস্টদের কাজ- কারবার সব জনতা নিয়েই।” বাংলার কবিদের মধ্যে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, স্বভাব কবি গোবিন্দ দাস, কাজী নজরুল ইসালাম জীবনে অনেক আর্থিক অনটনের সম্মুখীন হয়েছেন। এক্ষেত্রে সুকান্ত ভট্টাচার্যও ব্যতিক্রম নন।
২৮ শে জ্যৈষ্ঠ, ১৩৫৩ কলকাতা থেকে বন্ধুকে লেখা চিঠিতে সুকান্তের আর্থিক সংকটের কথা জানা যায়। সুকান্ত লিখেছেন, ”শরীর মন দুই-ই দুর্বল। অবিশ্রান্ত প্রবনচনার আঘাতে আঘাতে মানুষ যে সময় পৃথিবীর ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে, ঠিক সেই সময় এসেছে আমার জীবনে। হয়তো এইটাই মহত্তর সাহিত্য সৃষ্টির সময় (ভয় নেই, আঘাতটা প্রেমঘটিত নয়)। আজকাল চারিদিকে কেবল হতাশার শকুনি উড়তে দেখছি। হাজার হাজার শকুনি ছেয়ে ফেলেছে ভবিষ্যৎ আকাশ। গত বছরের আগের বছর থেকে শরীর বিশেষভাবে স্বাস্থ্যহীন হবার পর আর বিশ্রাম পাই নি ভালমতো। একান্ত প্রয়োজনীয় বায়ু” পরিবর্তনও” ঘটেনি আমার সময় ও অর্থের অভাবে। পার্টি আর পরীক্ষার জন্যে উঠে দাঁড়ানোর পর থেকেই খাটতে আরম্ভ করেছি;তাই ভেতরে অনেক ফাঁক থেকে গিয়েছিল।পরীক্ষা দিয়ে উঠেই গত তিন মাস ধরে খাটছি-বুঝতে পারিনি স্বাস্থ্যের অযোগ্যতা। হঠাৎ গত সপ্তাহে হৃদযন্ত্রের দুর্বলতায় শয্যা নিলুম। একটু দাঁড়াতে পেরেই গত দেড় মাস ধরেৃৃৃৃজন্যে অবিরাম আন্তরিক খাটুনির পুরস্কার হিসাবে..কতৃপক্ষের কাছ থেকে পেলুম যাতায়াতী খরচের জন্যে পাঁচটি টাকা। আর পেলুম চারদিনের জন্যে পার্টি হাসপাতালের’ অষুধপথ্যিবিহীন’ কোমল শজ্জা। এতবড় পরিহাসের সম্মুখীন জীবনে আর কখনও হই নি। আমার লেখকসত্তা অভিমান করতে চায়, কর্মীসত্তা চায় আবার উঠে দাঁড়াতে। দুই সত্তার দ্বন্দ্বে কর্মীসত্তা জয়ী হতে চলেছে; কিন্তু কি করে ভুলি, দেহে আর মনে আমি দুর্বলঃ একান্ত অসহায় আমি? আমার প্রেম সম্পর্কে সম্প্রতি আমি উদাসিন? অর্থোপার্জন সম্পর্কেই কেবল আগ্রহশীল। কেবলই অনুভব করছি টাকার প্রয়োজন। শরীর ভাল করতে দরকার অর্থের, ঋনমুক্ত হতে দরকার অর্থের; একখানাও জামা নেই, সে জন্যও যে বস্ত্তর প্রয়োজন তা হচ্ছে অর্থ।সুতরাং অভাবে কেবলই নিরর্থক মনে হচ্ছে জীবনটা। তাইতো “হে মহাজীবন” কবিতায় কবি মায়াময়ি পূর্ণিমা চাঁদকে দেখেছেন অন্য আঙ্গিকে-হে মহা জীবন, আর এ কাব্য নয় এবার কঠিন কঠোর গদ্যে আনো,
পদ-লালিত্য- ঝঙ্কার মুছে যাক গদ্যের কড়া হাঁতুড়িকে আজ হানো। প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা-কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়ঃ পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি। সুকান্ত ছিলেন বাংলার কিশোর বাহিনীর কর্মসচিব। ০৭ জানুয়ারি ১৯৪৪ তারিখে কিশোর বাহিনীর একজন সদস্যের চিঠির জবাবে সুকান্ত লিখেন,
প্রিয় বন্ধু,
তোমরা কী ধরনের কাজ করবে জানতে চেয়েছ তাই জানাচ্ছি, তোমরা প্রথমে নিজের লেখাপড়া ও আচার- ব্যবহার- চরিত্রের উন্নতির দিকে নজর দেবে। নিজেদের স্বাস্থ্য ও খেলাধুলার দিকেও নজর দিবে সেইসঙ্গে।তোমরা গরীব ও অসুস্থ ছেলেদের সব সময় সাহায্য ও সেবা করার চেষ্টা করবে, নিজের পাড়ার বা গ্রামের উন্নতির জন্য প্রাণপণ খাটবে। আর এই সমস্ত কাজ দেখিয়ে অভিভাবকদের মন জয় করার চেষ্টা করবে। কার্ড এখনও অনেক আছে। যে ক’খানা দরকার জানিও আর কার্ড পিছু এক আনা পাঠিয়ে দিও।
সব সময় চিঠি পাঠাবে।
কিশোর অভিনন্দন নিও
কর্মসচিব।
সুকান্তর এ চিঠির আবেদন কোনদিনই শেষ হবে না। তাঁর অকাল মৃত্যু আমাদের কাঁদায়। রনেশ দাশগুপ্তের কথা “তবে তাঁকে আমরা সর্বদাই পাবো তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে।আমরা তাঁর বক্তব্য বুঝতে চেস্টা করবো এবং তাঁকে পাবো। এজন্যে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের কবিতা ও অন্যান্য লেখার সাথে সুকান্তের লেখা কবিতা, ছড়া, গল্প, পত্র নিয়মিত পড়তে হবে। আরো একটি কাজ খুবই জরুরী। সেটি হলো সুকান্তের লেখা প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উঁচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ্য বইয়ে অর্থাৎ সিলেবাস স্থান দিতে হবে। কারন সুকান্ত বাঙালি জাতিসত্ত্বার একজন কবি।
তথ্যসূত্র: সুকান্ত সমগ্র, মাওলা ব্রাদার্স, তৃতীয় মুদ্রণ, আশ্বিন, ১৩৮০
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক, ডিএমডি (অবসরপ্রাপ্ত) কৃষি ও রুপালী ব্যাংক, পরিচালক,ইসলামী ব্যাংক, সদস্য, সম্পাদনা পরিষদ, নতুন দিগন্ত (সাহিত্য-সংস্কৃতির ত্রৈমাসিক )।







