খালের গলায় ফাঁসি, ভোগান্তিতে পুরো জনপদ
দীপঙ্কর বিশ্বাস
একটু বৃষ্টি হলেই চারপাশ থৈ থৈ, রাস্তায় হাঁটু জল আর বাসাবাড়িতে নোংরা জলের অনুপ্রবেশ আমাদের চেনা প্রতিচ্ছবি। আমরা ভাবি, বৃষ্টিটাই বুঝি সব নষ্টের মূল। কিন্তু আসল সত্যিটা আমরা অনেকেই এড়িয়ে যাই। আমাদের তৈরি কৃত্রিম বাঁধ ও অবৈধ উপায়ে খাল দখলেই লুকিয়ে আছে এই জলাবদ্ধতার আসল রহস্য।
সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে খালের পর খালে অবাধে বসানো হচ্ছে আড়াআড়ি বাঁশের খুঁটি। তার সঙ্গে ঝুলছে নিষিদ্ধ কারেন্ট বা বিভিন্ন ধরনের চীনানি জাল। খালের স্বাভাবিক জলপ্রবাহকে পুরোপুরি রুদ্ধ করে চলেছে একদল অসাধু চক্র।
এর ফলে যে অপপূরণীয় ক্ষতিগুলো হচ্ছে, তা কেবল জলাবদ্ধতায় সীমাবদ্ধ নয়:
১. সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল ব্যবহারের ফলে রুই-কাতলার মতো বড় মাছের পোনা থেকে শুরু করে দেশীয় ছোট মাছ (যেমন- পুঁটি, টেংরা, কৈ, বাইন) এবং জলজ কীটপতঙ্গ ও ছোট প্রাণীদের ডিম অবাধে ধ্বংস হচ্ছে। ফলে নদী-খালের স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে।
২. খালের জল সময়মতো নদীতে নামতে পারছে না, আর সেই জমা জল ভাসিয়ে দিচ্ছে হাজার হাজার মানুষের চাষের জমি ও ঘরবাড়ি। অতিরিক্ত জল জমে থাকার কারণে ফসলি জমি দীর্ঘদিন জলের নিচে আটকে থাকে, ফলে ফসল পচে গিয়ে কৃষকরা সর্বশান্ত হচ্ছেন।
৩. খালের তলদেশে জমে থাকা পলি ও ময়লা-আবর্জনা অবৈধ বাঁধের কারণে সরতে পারে না। এতে খালের নাব্য হ্রাস পায় এবং স্বাভাবিক সেচ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
৪. দীর্ঘদিন বাসাবাড়ি ও আশপাশে পচা জল জমে থাকার ফলে মশার উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। এছাড়া ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও ডেঙ্গুর মতো পানিবাহিত ও মশাবাহিত রোগের মারাত্মক প্রাদুর্ভাব ঘটে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নটা এখানেই উঠে আসে। বিভিন্ন সময় লোকদেখানো কিছু অভিযান বা কয়েকটা জাল বাজেয়াপ্ত করেই কি দায়িত্ব শেষ? অভিযান শেষ হতে না হতেই অলক্ষ্যে আবারও বসে যায় বাঁশের খুঁটি, আবার টানা হয় বিষাক্ত জাল। এই খেলা দিয়ে একটি জনপদকে বছরের পর বছর জলাবদ্ধ করে রাখা যায় না। কেবল চিঠি দেওয়া কিংবা দু-একটি মোটাদাগের অভিযান চালিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। দরকার নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা, খালের স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং স্থানীয় তদারকি কমিটি গঠন করে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা।
খাল কোনো ব্যক্তি বিশেষের উপার্জনের পৈতৃক জোগান নয়; খাল একটি অঞ্চলের নিঃশ্বাস নেওয়ার স্বাভাবিক ধমনী। আইন অমান্যকারীদের কঠোর হাতে দমন না করলে এবং খালের মুখ থেকে সমস্ত অবৈধ জাল ও বাঁধ স্থায়ীভাবে অপসারণ না করলে আগামী দিনে জলাবদ্ধতার এই নরকযন্ত্রণা ও পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো দ্বিতীয় পথ নেই।
প্রশাসনের সদিচ্ছা ও কঠোর পদক্ষেপের অপেক্ষায় পুরো এলাকা। খালগুলোকে বাঁচতে দিন, পরিবেশ রক্ষা করুন, মানুষকে একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে দিন।









