ঘটিগরম: স্বাদে-স্মৃতিতে এক ঐতিহ্য/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
এক সময় গ্রামের হাট, শহরের স্কুলের গেট, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড কিংবা বিকেলের পার্কÑযেখানেই মানুষের ভিড়, সেখানেই শোনা যেত এক পরিচিত ডাকÑ”ঘটিগরম… ঘটিগরম!” এই ডাক শুধু একটি খাবারের আহ্বান ছিল না, ছিল এক টুকরো শৈশব, এক চিলতে আনন্দ আর পথচলার সঙ্গী। আজ আধুনিক ফাস্টফুড, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস ও অনলাইন খাবারের ভিড়ে সেই ঘটিগরম বিক্রেতার কণ্ঠস্বর যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।ঘটিগরম মূলত একটি ঝাল-মশলাদার মিশ্রণ।
ভাজা ছোলা, চানাচুর, মটর, বাদাম, মুড়ি, চিঁড়া, চানাচুর, পেঁয়াজ কুচি, কাঁচা মরিচ, ধনেপাতা, শসা, টমেটো, লেবুর রস, বিট লবণ ও সরিষার তেলÑসবকিছু একসঙ্গে মিশিয়ে তৈরি হয় এর অনন্য স্বাদ। বিক্রেতার হাতের দ্রুত মিশ্রণ আর মশলার পরিমিত ব্যবহারই ঘটি গরমকে অন্য সব খাবার থেকে আলাদা করে তোলে। এক সময় স্কুল ছুটির পর শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত খাবারের তালিকায় থাকত ঘটিগরম। হাতে দুই বা পাঁচ টাকা থাকলেই কাগজের ঠোঙায় ভরে মিলত এক ঠোঙা আনন্দ।
বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে খাওয়ার মধ্যে ছিল অন্যরকম উচ্ছ্বাস। কেউ বেশি ঝাল চাইত, কেউ আবার বেশি লেবু। বিক্রেতাও ক্রেতার পছন্দ বুঝে মুহূর্তেই তৈরি করে দিতেন কাক্সিক্ষত স্বাদের ঘটিগরম।গ্রামের সাপ্তাহিক হাটেও ঘটিগরম ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাজার করতে এসে কিংবা মেলা ঘুরতে ঘুরতে অনেকেই এক ঠোঙা ঘটিগরম খেয়ে নিতেন। শিশু থেকে বৃদ্ধÑসব বয়সের মানুষের কাছে এটি ছিল সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। দাম ছিল কম, স্বাদ ছিল বেশি, আর পেটও কিছুটা ভরত।ঘটিগরমের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর সহজলভ্যতা।
খুব বেশি পুঁজি ছাড়াই একজন মানুষ এই ব্যবসা শুরু করতে পারতেন। একটি টিনের বা অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র, কয়েক ধরনের শুকনো উপকরণ, কিছু সবজি আর একটি ছোট স্ট্যান্ডÑএই ছিল মূল পুঁজি। তাই অনেক নি¤œআয়ের পরিবারের জীবিকার অন্যতম অবলম্বন ছিল ঘটিগরম বিক্রি।এই পথ খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক ধরনের সামাজিক সম্পর্কও। নিয়মিত ক্রেতাদের পছন্দ-অপছন্দ বিক্রেতারা মনে রাখতেন। কেউ ঝাল কম খেতেন, কেউ বাদাম বেশি চাইতেন, আবার কেউ বাড়তি লেবু ছাড়া খেতেন না।
এই আন্তরিক সম্পর্ক আজকের যান্ত্রিক খাদ্য সংস্কৃতিতে খুব একটা দেখা যায় না।তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘটি গরমের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করেছে। এর অন্যতম কারণ মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন। নতুন প্রজন্ম এখন বার্গার, পিজ্জা, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই কিংবা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত খাবারের প্রতি বেশি আকৃষ্ট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবও এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।এ ছাড়া স্বাস্থ্যবিধি নিয়েও অনেকের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেক পথ খাবার বিক্রেতা খোলা পরিবেশে খাবার প্রস্তুত করেন। ধুলাবালি, মাছি কিংবা বিশুদ্ধ পানির অভাবের কারণে অনেক সচেতন মানুষ এসব খাবার এড়িয়ে চলেন। যদিও সব বিক্রেতা একই রকম নন, তবুও কয়েকজনের অসচেতনতা পুরো পেশাটির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
অন্যদিকে, প্রশাসনের বিভিন্ন সময়ে ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযান কিংবা নির্দিষ্ট জায়গার অভাবে অনেক ঘটিগরম বিক্রেতা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে এই ঐতিহ্যবাহী পেশায় নতুন মানুষও আর তেমন আসছেন না। তবুও আশার কথা হলো, এখনো দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও গ্রামীণ হাটে ঘটিগরমের দেখা মেলে। বিশেষ করে মেলা, ধর্মীয় উৎসব, খেলাধুলার আয়োজন কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এই খাবারের চাহিদা এখনো রয়েছে। অনেকেই নস্টালজিয়ার টানে এক ঠোঙা ঘটিগরম কিনে পুরোনো দিনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনেন।
বর্তমানে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ঘটিগরম পরিবেশনের উদ্যোগ নেওয়া গেলে এর জনপ্রিয়তা আবারও বাড়তে পারে। পরিচ্ছন্ন পোশাক, ঢাকনাযুক্ত পাত্র, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যকর উপকরণ ও পরিবেশ বান্ধব কাগজের ঠোঙা ব্যবহার করলে ক্রেতাদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে স্থানীয় উদ্যোক্তারাও এই ঐতিহ্যবাহী খাবারকে আধুনিক উপস্থাপনায় নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। বাংলাদেশের পথ খাবারের ঐতিহ্যে ঘটিগরম একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। এটি শুধু একটি খাবার নয়; এটি আমাদের শৈশব, সংস্কৃতি, গ্রামীণ জীবন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সংগ্রামের প্রতীক।
একটি ঠোঙা ঘটিগরমে যেমন থাকে ঝাল, টক ও মশলার অনন্য সমন্বয়, তেমনি থাকে অসংখ্য মানুষের স্মৃতি, আবেগ ও জীবিকার গল্প। আধুনিকতার এই সময়ে আমাদের উচিত দেশীয় ঐতিহ্যবাহী পথ খাবারগুলোর প্রতি নতুন করে নজর দেওয়া। স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশে পরিবেশন করা গেলে ঘটিগরম আবারও মানুষের প্রিয় খাবারের তালিকায় জায়গা করে নিতে পারে। কারণ স্বাদের সঙ্গে যখন স্মৃতি মিশে যায়, তখন একটি সাধারণ খাবারও হয়ে ওঠে একটি সময়ের জীবন্ত ইতিহাস। ঘটিগরম সেই ইতিহাসেরই এক সুস্বাদু, প্রাণবন্ত এবং চিরচেনা অধ্যায়।
লেখক: সংবাদকর্মী






