মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩

জলবায়ু সহনশীলতায় স্থানীয় বাস্তবতা: উপকূলীয় বাংলাদেশের একটি দৃষ্টিভঙ্গি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৩৬ পূর্বাহ্ণ
জলবায়ু সহনশীলতায় স্থানীয় বাস্তবতা: উপকূলীয় বাংলাদেশের একটি দৃষ্টিভঙ্গি

মৃত্তিকা এলাহী

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি তাদের দৈনন্দিন জীবন, জীবিকা, শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ।

বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী—সবাই মিলে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সহায়তায় বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে। জরুরি ত্রাণ, জীবিকা সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জলবায়ু অভিযোজনমূলক বিভিন্ন কার্যক্রম কঠিন সময়ে বহু পরিবারকে সহায়তা করেছে। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমরা যখন সহনশীলতার কথা বলি, তখন হয়তো শুধু কতটা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তার বাইরে গিয়েও ভাবতে হবে। আমাদের দেখতে হবে, সেই সহায়তা মানুষের জীবনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি টেকসই পথ তৈরি করে দিতে পারছে কি না।

আমার একটি প্রকল্পের সময় একটি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর নারীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তাদের কয়েকজন বলেছিলেন, তাদের বাড়িতে ইতোমধ্যে পর্যাপ্ত সেলাই মেশিন রয়েছে। কিন্তু সেই সেলাই মেশিনে উৎপাদিত পণ্য কেনার মতো পর্যাপ্ত ক্রেতা নেই। একটি ছোট্ট গ্রাম, যেখানে অধিকাংশ মানুষই মোটামুটি দারিদ্র্েযর মধ্যে বসবাস করে। তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার উদ্দেশ্যে সবাইকে সেলাই মেশিন ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—তারা যে পণ্য তৈরি করবে, সেগুলো কিনবে কে? সেই পণ্য বিক্রির জন্য পর্যাপ্ত ক্রেতা বা বাজার কি আদৌ ওই এলাকায় আছে?

অর্থাৎ, তাদের উৎপাদন ক্ষমতা তৈরি করা হলেও সেই পণ্য বিক্রি করার জন্য প্রয়োজনীয় বাজারব্যবস্থা কি তৈরি করা হয়েছে? আমরা জানি, শুধু দক্ষতা বা উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করলেই একটি উদ্যোগ সফল বা টেকসই হয় না; উৎপাদিত পণ্যের জন্য বাজার, ক্রেতা এবং কার্যকর বাজারসংযোগও প্রয়োজন। একটি জীবিকার সুযোগ তখনই টেকসই হয়ে ওঠে যখন মানুষ শুধু প্রশিক্ষণ বা কোনো সম্পদ নয় ; বরং তখনই সেটি টেকসই হয়, যখন সেই সুযোগ ব্যবহার করে বাস্তবে আয় করার একটি পথও তৈরি হয়। তাই বাজারে প্রবেশের সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি জনগোষ্ঠীর উৎপাদন করার দক্ষতা ও সম্পদ থাকতে পারে, কিন্তু ক্রেতা এবং উপযুক্ত বাজারের সঙ্গে সংযোগ না থাকলে টেকসই আয় তৈরি করা কঠিন হতে পারে। আমার সেই প্রকল্পে সেই মানুষগুলো তাই জানতে চেয়েছিলেন, এর পরিবর্তে তাদের কমিউনিটিতে থাকা পুকুরগুলোকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করার বিষয়ে কোনো সহায়তা দেওয়া সম্ভব কি না। তাদের কাছে সেটি জীবিকার জন্য আরও বেশি কার্যকর, বলে মনে হয়েছিল।

তাদের এই কথা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষ শুধু সহায়তা গ্রহণকারী নন; তারা নিজেদের পরিবেশ, সম্পদ এবং প্রয়োজন সম্পর্কে অনেক বেশি অভিজ্ঞ, তাই আমাদের কার্যকর ও টেকসই সমাধানের শুরু হওয়া উচিত তাদের কথা তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে শোনা এবং তাদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে।

দুর্যোগের সময় এবং দুর্যোগের পরপরই ত্রাণ অবশ্যই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়। খাবার, আশ্রয়, নগদ অর্থ ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা একটি সংকটের সময়ে পরিবারগুলোকে টিকে থাকতে সাহায্য করে। কিন্তু ত্রাণের প্রকৃতিই হলো এটি সাময়িক। জরুরি পরিস্থিতি শেষ হওয়ার পরও মানুষকে ঘরবাড়ি পুনর্গঠন করতে হয়, পরিবারের ভরণপোষণ করতে হয়, সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয় এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার জন্য প্রস্তুত হতে হয়। তাই দীর্ঘমেয়াদি সহনশীলতা তৈরি করতে শুধু স্বল্পমেয়াদি সহায়তা যথেষ্ট নয় এর বাইরে গিয়েও আমাদের ভাবা উচিত।

দক্ষতা উন্নয়ন ও জীবিকা সহায়তা তাদের জন্য মূল্যবান সুযোগ নিশ্চয়ই তৈরি করতে পারে, তবে, কোনো উদ্যোগ সফল করতে হলে সেটিকে অবশ্যই সেই এলাকার বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, তা ঠিক করার আগে স্থানীয় পরিবেশ, বিদ্যমান সম্পদ, মানুষের দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক সুযোগগুলো বোঝা যেমন জরুরি, তেমনি স্থানীয় মানুষের কথা শোনা এবং তাদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তাই জলবায়ু সহনশীলতার কথা ভাবার সময় শুধু মানুষ কী উৎপাদন করতে পারবে তা নয়, সেই উৎপাদন কীভাবে বাস্তব অর্থনৈতিক সুযোগের সঙ্গে যুক্ত হবে, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। সেই পণ্য কীভাবে তারা বিক্রি করবে এবং তাদের উৎপাদিত পণ্যের জন্য পর্যাপ্ত বাজারব্যবস্থা ও ক্রেতা রয়েছে কি না, সেটি বিবেচনা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।.

একইভাবে আমাদের মাথায় রাখতে হবে, এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি জীবিকা কার্যক্রমকে একই পদ্ধতিতে পরিচালনা করতে হবে। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীগুলো একে অপরের থেকে ভিন্ন, এবং এক জায়গায় যে পদ্ধতি কার্যকর, অন্য জায়গায় সেটি একইভাবে কাজ নাও করতে পারে। কোনো কোনো এলাকায় পুকুর, কৃষিজমি, স্থানীয় জ্ঞান বা অন্যান্য সম্পদ থাকতে পারে, যেগুলো জলবায়ু সহনশীল জীবিকার ভিত্তি হিসেবে কাজে লাগানো সম্ভব। যেখানে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিকভাবে উপযোগী, সেখানে নতুন দক্ষতা ও অর্থনৈতিক সুযোগের পাশাপাশি এসব স্থানীয় সম্পদের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা যেতে পারে। মূল বিষয় হলো—কোনো একটি এলাকায় বাস্তবে কী করা সম্ভব, সেটি বোঝা এবং তারপর সেই সম্ভাবনাকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান, সহায়তা ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেই মানুষগুলোর কথা শোনা, যারা ভবিষ্যতে এই জীবিকার ওপর নির্ভর করবে। কারণ, তারাই সবচেয়ে ভালো জানে—তাদের নিজেদের কমিউনিটিতে কীভাবে বেঁচে থাকা এবং জীবিকা নির্বাহ করা তাদের জন্য বেশি কার্যকর ও ফলপ্রসূ হবে।

সবশেষে যে কথাটা বলতে চাই, সহনশীলতা বলতে শুধু পরবর্তী ঘূর্ণিঝড় থেকে বেঁচে যাওয়াকে বোঝানো উচিত নয়। সহনশীলতা মানে হলো একটি দুর্যোগের পর মর্যাদার সঙ্গে জীবন পুনর্গঠন করার সক্ষমতা ও সুযোগ থাকা। অর্থাৎ, উপকূলীয় মানুষগুলোর কথা শুনে তাদের মতো করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করাটাও খুব জরুরি। এক্ষেত্রে তারা শুধু সহায়তা গ্রহণকারী হবেন না; বরং তাদের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন সমাধান তৈরির প্রক্রিয়াতেও তারা সক্রিয়ভাবে অংশ নেবেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অসাধারণ সক্ষমতা ও উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিয়েছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো যখন ক্রমেই পরিবর্তিত ও জটিল হচ্ছে, তখন কমিউনিটি পর্যায়ে সহনশীলতা বলতে আমরা কী বুঝি—সেটি নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। প্রতিটি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য হয়তো একই সমাধান কার্যকর হবে না। সবচেয়ে অর্থবহ সমাধানগুলো হয়তো সেখান থেকেই আসতে পারে, যেখানে স্থানীয় মানুষের কথা শোনা হবে, তাদের বিদ্যমান সম্পদ ও চ্যালেঞ্জগুলো বোঝা হবে এবং সহায়তাকে বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদি সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।

উপকূলীয় মানুষের জন্য জলবায়ু সহনশীলতা শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত এমন একটি ভবিষ্যতের দিকে তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরিতে সাহায্য করা, যেখানে তাদের নিজেদের জীবন ও ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার বাস্তব সুযোগ থাকবে।

লেখক: সেক্রেটারি, প্রগতি, ফেলোশিপ: ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট ফেলো (কমিউনিটি সলিউশন প্রোগ্রাম)

Ads small one

টাকার মলিন ময়লা চেহারা আর ভিন্ন দেশের মুদ্রা!

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:১২ অপরাহ্ণ
টাকার মলিন ময়লা চেহারা আর ভিন্ন দেশের মুদ্রা!

আল মুতাসিম বিল্লাহ সুমন

সেদিন সকালে সাতক্ষীরা শহরের লাবনী মোড় যাওয়ার জন্য ইজিবাইক থেকে নামার পর ইজিবাইক চালককে একটি পঞ্চাশ টাকার নোট দিলাম। তিনি ভাড়া কেটে আমাকে যে বিশ টাকার নোটটি ফেরত দিলেন, সেটি হাতে নিয়েই আমার মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। নোটটির মাঝ বরাবর একটি বড় ছিদ্র, কিনারায় স্বচ্ছ কসটেপ লাগানো, আর সারা গায়ে ময়লার কালচে আস্তরণ। নোটটি থেকে এক ধরনের ভ্যাপসা গন্ধও আসছিল। আমি রিকশাচালককে বললাম, “এই ছেঁড়া টাকাটা তো কেউ নিতে চাইবে না, অন্য একটা নোট দেন।” তিনি মলিন হেসে বললেন, “আমার কাছেও তো কেউ একজন এই টাকাটাই দিছে। আমি গরিব মানুষ, এই ছেঁড়া টাকা নিয়ে কই যাব?”

তার কথা শুনে আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। টাকাটা পকেটে রেখে দিলাম। কিন্তু সারা রাস্তা একটা বিষয়ই আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, কেন আমাদের দেশের টাকার এমন করুণ অবস্থা? বাংলাদেশের কাগুজে মুদ্রা, বিশেষ করে ছোট মানের নোটগুলোর (যেমন: ২, ৫, ১০, ২০ এবং ৫০ টাকা) দিকে তাকালে মাঝে মাঝে খুব হতাশা কাজ করে। এই টাকাগুলো এত বেশি ময়লা, ছেঁড়া আর ফাটা থাকে যে, অনেক সময় এগুলো ব্যবহার করাই মুশকিল হয়ে পড়ে।

আজ আমি আপনাদের সাথে এই বিষয়টি নিয়েই বিস্তারিত কিছু কথা বলতে চাই। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার মনে হয়েছে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এই পরিচিত সমস্যাটি নিয়ে আলোচনা হওয়া খুব প্রয়োজন।

আমাদের দেশের টাকার এই জরাজীর্ণ অবস্থার পেছনে কোনও একটি নির্দিষ্ট কারণ নেই, বরং আমাদের বেশ কিছু বদভ্যাস এবং অসচেতনতাই এর জন্য প্রধানত দায়ী। আমি যদি কারণগুলো একটু গুছিয়ে বলি, তবে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে মানিব্যাগ বা ওয়ালেট ব্যবহারের প্রবণতা তুলনামূলক ভাবে কম। অনেকেই টাকা ভাঁজ করে শার্টের বুক পকেটে, প্যান্টের পকেটে বা লুঙ্গির গিঁটে রাখেন। বারবার এভাবে মুড়িয়ে বা কুঁচকে রাখার ফলে কাগুজে নোটের ফাইবার বা তন্তু খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। একটা নতুন নোট বাজারে আসার কয়েক মাসের মধ্যেই মাঝখান থেকে ছিঁড়তে শুরু করে স্্েরফ এই বারবার ভাঁজ করার কারণে।

কাঁচাবাজার, মাছের বাজার বা মাংসের দোকানগুলোতে গেলে একটি সাধারণ দৃশ্য চোখে পড়ে। বিক্রেতারা মাছ বা মাংস কাটছেন, হাত রক্ত বা কাদায় মাখামাখি, আর সেই অবস্থাতেই তারা ক্রেতার কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন বা ভাংতি দিচ্ছেন। এই রক্ত, পানি এবং কাদা টাকার গায়ে লেগে যায়। এরপর সেই টাকা যখন অন্যের হাতে যায়, তখন সেটিতে আরও ধুলাবালি জমতে থাকে। ধীরে ধীরে নোটটি তার আসল রঙ হারিয়ে কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যায়।

এটি আমাদের দেশের আরেকটি অদ্ভুত এবং ক্ষতিকর বদভ্যাস। অনেক সময় দেখা যায় টাকার গায়ে কেউ নিজের নাম লিখে রেখেছেন, কেউ ফোন নম্বর লিখেছেন, আবার কেউবা কলম ঠিকমতো কালি দিচ্ছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য টাকার ওপর হিজিবিজি দাগ কেটেছেন। ব্যাংকগুলোতেও অনেক সময় হিসাব মেলানোর সুবিধার জন্য টাকার বান্ডিলের ওপর সিল মারা হয় বা পেনসিল দিয়ে লেখা হয়। এই লেখালেখির কারণে নোটটি দ্রুত তার মান হারায়।

আগে ব্যাংক থেকে টাকার বান্ডিল দেওয়ার সময় মাঝখানে এমনভাবে স্টেপলারের পিন মারা হতো যে, পিন খুলতে গেলেই টাকা ছিঁড়ে যেত। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে টাকায় পিন মারার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তবুও এর রেশ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। অনেক সময় পিনের ছিদ্র থাকা টাকাগুলো হাতবদল হতে হতে সেই ছিদ্র বড় হয়ে টাকা দুই টুকরো হয়ে যায়।

টাকা একটু ছিঁড়ে গেলেই আমরা তার ওপর আঠালো কসটেপ লাগিয়ে দিই। কিছুদিন পর কসটেপের নিচের আঠা কালো হয়ে যায় এবং পুরো নোটটি শক্ত হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

আমাদের টাকার এই বেহাল দশার কথা ভাবতে গিয়ে আমার মনে হলো, উন্নত দেশগুলোর মুদ্রার অবস্থা কেমন সেটি জানা দরকার। আমরা যদি মার্কিন ডলার, ব্রিটিশ পাউন্ড বা ইউরোপের ইউরোর দিকে তাকাই, তাহলে আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখতে পাবো।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডলার মূলত সাধারণ কাগজ দিয়ে তৈরি হয় না। এটি ৭৫ শতাংশ তুলা এবং ২৫ শতাংশ লিনেন-এর মিশ্রণে তৈরি। ফলে এটি সাধারণ কাগজের চেয়ে অনেক বেশি টেকসই হয়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, একটি এক ডলারের নোট ছিঁড়ে যাওয়ার আগে প্রায় ৪,০০০ বার ভাঁজ করা যায়। এছাড়া আমেরিকানদের মধ্যে মানিব্যাগ ব্যবহারের হার প্রায় শতভাগ। তারা নোটগুলো ভাঁজ না করে সোজা অবস্থায় মানিব্যাগে রাখেন। ফলে একটি নোট বছরের পর বছর নতুনের মতো থাকে।

বিশ্বের অনেক দেশ এখন কাগুজে নোটের বদলে পলিমার বা প্লাস্টিকের নোট ব্যবহার করছে। ১৯৮৮ সালে অস্ট্রেলিয়া প্রথম তাদের দেশে পলিমার নোট চালু করে। এরপর যুক্তরাজ্য, কানাডা, নিউজিল্যান্ডসহ বহু দেশ এই পথে হেঁটেছে। পলিমার নোটের সুবিধা হলো এটি পানিতে ভেজে না, সহজে ছেঁড়ে না এবং ময়লা হলে মুছে ফেলা যায়। যুক্তরাজ্যের ব্যাংক অব ইংল্যান্ড যখন পলিমার নোট চালু করে, তখন তারা দেখিয়েছিল যে এই নোটগুলো সাধারণ কাগজের নোটের চেয়ে অন্তত আড়াই গুণ বেশি টেকসই। আমাদের দেশেও ২০০০ সালের দিকে একবার ১০ টাকার পলিমার নোট চালু করা হয়েছিল, কিন্তু অজানা কারণে সেটি বেশিদিন টেকেনি এবং বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়।

জানলে অবাক হবেন, বিশ্বের অনেক দেশে তাদের মুদ্রার যতœ নেওয়া শুধু নাগরিক দায়িত্বই নয়, বরং এটি আইনের অংশ। আপনি চাইলেই অন্য কোনও দেশের মুদ্রার সাথে যথেচ্ছ আচরণ করতে পারবেন না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, সে দেশের মুদ্রাকে ইচ্ছাকৃত ভাবে কাটা, ছিঁড়ে ফেলা, লেখালেখি করা, ময়লা করা, বা যে কোনোভাবে বিকৃত করা সম্পূর্ণ বেআইনি। যদি কেউ এই আইন ভঙ্গ করে, তবে তাকে মোটা অঙ্কের জরিমানা এমনকি ৬ মাস পর্যন্ত কারাদন্ড ভোগ করতে হতে পারে।

তুরস্কেও তাদের মুদ্রা ‘লিরা’র অবমাননা বা ইচ্ছাকৃত ভাবে নষ্ট করাকে রাষ্ট্রীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ মুদ্রার গায়ে তাদের জাতির পিতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের ছবি থাকে। ভারতেও রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) “ক্লিন নোট পলিসি” বা পরিচ্ছন্ন নোট নীতি গ্রহণ করেছে, যার অধীনে টাকার ওপর কিছু লেখা সম্পূর্ণ বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে এই ধরনের কড়া আইন বা তার সঠিক প্রয়োগ নেই। মুদ্রা যে একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক, এই বোধটুকু আমাদের অনেকের মাঝেই অনুপস্থিত।
অনেকেই হয়তো ভাবছেন, টাকা একটু ময়লা হলে সমস্যা কী? এটি তো আর আমরা খাচ্ছি না! কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা।

ময়লা, স্যাঁতসেঁতে এবং ফাটা টাকা জীবাণুর এক বিশাল আস্তানা। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পুরনো কাগুজে নোটে প্রায় ৩,০০০ ধরণের ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যার মধ্যে ই. কোলাই এবং সালমোনেলার মতো মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াও রয়েছে, যা ডায়রিয়া এবং ফুড পয়জনিংয়ের কারণ হতে পারে। আমাদের দেশে যক্ষ্মা বা চর্মরোগে আক্রান্ত কোনও ব্যক্তি যদি তার ব্যবহৃত ময়লা টাকা আরেকজনকে দেন, তবে সেই জীবাণু খুব সহজেই সুস্থ মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে শিশুরা অনেক সময় না বুঝে টাকা মুখে দিয়ে ফেলে, যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত হুমকিস্বরূপ।

এছাড়া এর একটি বড় অর্থনৈতিক দিকও রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা খরচ করে পুরনো, ছেঁড়া নোট পুড়িয়ে ফেলে নতুন নোট ছাপাতে হয়। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় অপচয়। আমরা যদি একটু যতœশীল হয়ে আমাদের নোটগুলো ব্যবহার করি, তাহলে এই বিশাল অংকের সরকারি অর্থ বেঁচে যায়, যা দেশের অন্য কোনও উন্নয়নমূলক কাজে লাগানো সম্ভব।

এই সমস্যা থেকে মুক্তির উপায় কী? আমি মনে করি, সরকার এবং জনগণ উভয়কেই এখানে সমান দায়িত্ব পালন করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংককে “ক্লিন নোট পলিসি” আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। টাকার গায়ে লেখা বা পিন মারা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া, ছোট মানের নোটগুলো (যেমন ১০, ২০, ৫০ টাকা) যা সবচেয়ে বেশি হাতবদল হয় এবং দ্রুত নষ্ট হয়, সেগুলোর জন্য উন্নতমানের কাগজ বা পুনরায় পলিমার নোট চালু করার কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত।

আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। টাকা শুধু বিনিময়ের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের স্বাধীন দেশের একটি প্রতীক। টাকার ওপর আমাদের জাতির পিতার ছবি থাকে, জাতীয় স্মৃতিসৌধ বা শহীদ মিনারের ছবি থাকে। একটি ছেঁড়া বা ময়লা টাকা দেশের ভাবমূর্তির সাথেও বেমানান। আমাদের উচিত ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের শেখানো যে টাকাকে কীভাবে সম্মান করতে হয়।

সবাইকে মানিব্যাগ ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। টাকা ভাঁজ করে বা দুমড়ে-মুচড়ে পকেটে রাখার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। যারা কাঁচাবাজারে কাজ করেন, তাদের উচিত একটি শুকনো কাপড় বা তোয়ালে রাখা, যাতে ভেজা বা ময়লা হাতে সরাসরি টাকা ধরতে না হয়।
বর্তমানে আমাদের দেশে বিকাশ, নগদ, রকেট-এর মতো মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারও বাড়ছে। আমরা যদি ছোটখাটো কেনাকাটায় কাগুজে নোটের পরিবর্তে ডিজিটাল পেমেন্টের অভ্যাস গড়ে তুলি, তবে কাগুজে নোটের ওপর চাপ অনেক কমে যাবে এবং টাকা দীর্ঘদিন পরিষ্কার থাকবে।

একটি দেশের মুদ্রা সে দেশের সভ্যতার আয়না। বিদেশ থেকে আসা কোনও পর্যটক যখন তার হাতে একটি পরিষ্কার, ঝকঝকে টাকা পান, তখন দেশের প্রতি তার এক ধরনের ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। বিপরীতভাবে, কসটেপ লাগানো, দুর্গন্ধযুক্ত একটি ছেঁড়া টাকা আমাদের সম্পর্কে একটি নেতিবাচক বার্তাই দেয়।

আমি আশা করি, আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। আমরা শিখব কীভাবে নিজের দেশের সম্পদের যতœ নিতে হয়। প্রতিদিন সকালে রিকশা ভাড়া বা চায়ের বিল দেওয়ার সময় যেন আমাদের কোনও ছেঁড়া বা ময়লা নোট নিয়ে বিতর্কে জড়াতে না হয়, সেই সুদিনের অপেক্ষায় রইলাম। আসুন, আজ থেকেই আমরা নিজের পকেটের টাকাটার যতœ নিতে শুরু করি। কারণ, পরিবর্তনটা শুরু হতে হবে আমার এবং আপনার হাত ধরেই।

লেখক: আল মুতাসিম বিল্লাহ সুমন, রাজার বাগান, সাতক্ষীরা।

তানযীমূল উম্মাহ হিফয মাদ্রাসার বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:৫৯ অপরাহ্ণ
তানযীমূল উম্মাহ হিফয মাদ্রাসার বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী

তানযীমূল উম্মাহ ফাউন্ডেশন পরিচালিত তানযীমূল উম্মাহ হিফয মাদ্রাসা, সাতক্ষীরা (রাজার বাগান ও বাইপাস) শাখার বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান-২০২৬ আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (০৭ সেপ্টেম্বর) ‘জেলা শিল্পকলা একাডেমি’ সাতক্ষীরায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার প্রদান করা হয়। তাছাড়া অনুষ্ঠানে সারাবছরের মেধা ও কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেরিট অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়, পাশাপাশি ইবতেদায়ী বৃত্তি পরীক্ষা-২০২৫-এ বৃত্তিপ্রাপ্ত ০৬ শিক্ষার্থীদের বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়।

 

এছাড়াও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে দেওয়া হয় শুভেচ্ছা পুরস্কার। পুরস্কার বিতরণীর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ছিল কবিতা আবৃত্তি, হামদ, নাত, দেশের গান, জুলাইয়ের গান, কিরাত এবং আরবি, ইংরেজি, বাংলা বক্তৃতা ও নাটিকাসহ প্রাণবন্ত ও সুশৃঙ্খল পরিবেশনা উপস্থিত অতিথি, অভিভাবক ও দর্শকদের মুগ্ধ করে এবং পুরো অনুষ্ঠানকে আরও উৎসবমুখর করে তোলে।

 

অনুষ্ঠানে ১ম সেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের সম্মানিত অধ্যক্ষ প্রফেসর মো: আবুল হাশেম এবং প্রধান আলোচক ছিলেন আগরদাঁড়ী আমিনিয়া কামিল মাদ্রাসার সম্মানিত অধ্যক্ষ ড. মো. রুহুল আমীন। এবং অনুষ্ঠানের ২য় সেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শেখ মইনুল ইসলাম মইন এবং প্রধান আলোচক ছিলেন সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর শহীদুল ইসলাম মুকুল।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন তানযীমূল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর এম এম রবিউল ইসলাম। শাখা প্রধান আবু বকর সিদ্দীক, সহকারী প্রধান হাফিজুর রহমান ও মো. হাবীবুল্লাহ’র সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন তানযীমূল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের সম্মানিত ডিরেক্টর ও খুলনা জোনের জোনাল ইনচার্জ আ ল ম মাসুম বিল্লাহ। প্রেসবিজ্ঞপ্তি

 

কপিলমুনিতে ভ্রাম্যমান আদালতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:৫৩ অপরাহ্ণ
কপিলমুনিতে ভ্রাম্যমান আদালতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা

কপিলমুনি (পাইকগাছা) খুলনা: কপিলমুনিতে ভ্রাম্যমান আদালতে ২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে জরিমানা করা হয়েছে।

খুলনা জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোঃ ওয়ালিদ বিন হাবিব ও জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মোখলেছুর রহমান মঙ্গলবার দুুপর ১ টার দিকে কপিলমুনি বাজারের পালপাড়া সড়কে অভিযান চালিয়ে ২টি প্রতিষ্ঠানে এ জরিমান করেন। এসময় তপন মন্ডলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে খাদ্য ও পন্যে নকল প্যাকেজাত করার অভিযোগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে ৩০ হাজার টাকা জরিমান করা হয়।

 

উত্তম কুমার সাহার কর্ণফুলী টি হাউজে খাদ্য- পন্যে নকল প্যাকেজাত ও ঘন চিনি বিক্রির অভিযোগে ৪০ হাজার টাকা জরিমান করা হয়। অভিযান চলাকালে উপস্থিত ছিলেন, পাইকগাছা উপজেলা স্যনিটারী ও নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা উদয় কুমার মন্ডল।

অভিযান চলাকালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, মানুষকে কোন ভাবেই কুখাদ্য খাওয়ানো যাবে না, কোন ভাবেই খাবার বা পণ্যের লেভেল নকল করা যাবে না। এটা অন্যায় ও দন্ডনীয়। এধরণের অপকর্মে লিপ্ত থাকলে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তাঁরা।