নেপালের বন্যা কি সাতক্ষীরার জন্যও এক সতর্ক ঘণ্টা?
মো: মামুন হাসান
হিমালয়ের কান্না, সমতলের শঙ্কা
আগস্ট মাসের এক সকালে হিমালয়ের কোলে ঘুমিয়ে থাকা একটি জনপদ চোখের পলকে বদলে গেল ধ্বংসস্তূপে। ২৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে নেপালের লাংটাং জাতীয় উদ্যানে হিমবাহের একাংশ ধসে পড়ার ফলে সৃষ্ট এক ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক প্রবাহ ও বন্যা শুরু হয়, যা চীন সীমান্তের কাছে ঘটে। সেই ধস থেকে সৃষ্ট প্রবল স্রোত ত্রিশূলী নদী ধরে প্রায় একশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে একের পর এক গ্রাম ভাসিয়ে নেয়, বহু সেতু ও সড়ক গুঁড়িয়ে দেয় এবং হাজার হাজার স্থাপনা তলিয়ে দেয়। এক সপ্তাহের মাথায় জানা যায়, সরকারি হিসাবে তেরো শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ তখনো নিখোঁজ ছিলেন। এমনকি কিছু মৃতদেহ স্রোতের টানে দেড়শ কিলোমিটার দূরে প্রতিবেশী ভারতের সীমানা পর্যন্ত ভেসে যায়।
এই বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে প্রথমে বিভ্রান্তি ছিল। প্রাথমিক খবরে ভূমিকম্পের কথা বলা হলেও পরে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে হিমালয়ের গভীরে বরফ ও পাথরের বিশাল একটি খণ্ড ধসে পড়ে ভোতেকোশি নদীর গতিপথে প্রবল জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি করে। হিমবাহের নিচের শিলাস্তরের ভাঙনই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, নেপালের এই ট্র্যাজেডি কি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন পার্বত্য দুর্যোগ, নাকি এটি গোটা দক্ষিণ এশিয়ার নদীব্যবস্থার জন্য এক গভীরতর বার্তা বহন করছে, যে বার্তা সাতক্ষীরার মতো উপকূলীয় জনপদেও অনুরণিত হওয়ার কথা।
দুই ভূগোল, দুই বিপদ, একই শিকড়
সততার সঙ্গে বলতে হয়, নেপালের হিমবাহ বিধ্বস্ত পাহাড় আর সাতক্ষীরার লবণাক্ত উপকূল ভৌগোলিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের এলাকা। নেপালে বিপদ আসে উচ্চতা থেকে, বরফগলা হ্রদ ফেটে যাওয়া বা হিমবাহ ধসে যাওয়ার মাধ্যমে। সাতক্ষীরায় বিপদ আসে সমুদ্রের দিক থেকে, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর বাঁধ ভাঙার মাধ্যমে। তাই সরাসরি হাইড্রোলজিক্যাল অর্থে নেপালের বন্যার পানি সাতক্ষীরার কোনো নদীতে পৌঁছায় না।
কিন্তু এই দুটি বিপর্যয়ের নেপথ্যে একটি অভিন্ন চালিকাশক্তি কাজ করছে, আর তা হলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চরম আবহাওয়ার তীব্রতা বৃদ্ধি। হিমালয়ের হিমবাহ ও হিমবাহী হ্রদগুলো উষ্ণায়নের কারণে দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে, আর সেই একই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়াচ্ছে, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়াচ্ছে এবং বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ততা সাতক্ষীরার ভেতরে ঠেলে দিচ্ছে। অর্থাৎ উৎস আলাদা হলেও কারণ একটাই, আর সেই কারণ দুই প্রান্তের মানুষকেই সমান ঝুঁকিতে ফেলছে।
সাতক্ষীরা ইতিমধ্যেই এক নীরব দুর্যোগের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে
সাতক্ষীরার দুর্যোগচিত্র কোনো কল্পনার বিষয় নয়। এই উপকূলীয় জেলায় লবণাক্ততা দিনে দিনে বাড়ছে, ফলে আগের মতো অনেক ফসল আর আবাদ করা যাচ্ছে না এবং কৃষকদের চাষপদ্ধতি বদলাতে বাধ্য হতে হচ্ছে। একই সঙ্গে এখানকার বহু মানুষ নিরাপদ খাবার পানির সংকটে ভুগছেন, অনেক পরিবারকে টাকা দিয়ে পানি কিনে খেতে হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যে নতুন সংকট তৈরি করছে।এই বাস্তবতা মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোগও চোখে পড়ছে। সম্প্রতি উপকূলীয় জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সাতক্ষীরায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে পাঁচ হাজার গাছের চারা রোপণের মতো কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এটি প্রশংসনীয়, কিন্তু বৃক্ষরোপণ একা কোনো বাঁধ শক্ত করতে পারে না, কোনো জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে পারে না।
কেন এই সতর্কতা উপেক্ষা করা যায় না
সাতক্ষীরা নদীমাতৃক ব-দ্বীপীয় ভূগোলের একেবারে প্রান্তে দাঁড়ানো একটি জেলা। ইছামতি, কালিন্দী, কপোতাক্ষের মতো নদী এই জেলাকে ঘিরে রেখেছে, আর এসব নদীর ওপর নির্মিত বাঁধ বহু ক্ষেত্রেই বছরের পর বছর ধরে ক্ষয়প্রাপ্ত ও দুর্বল। আয়লা ও সিডরের মতো ঘূর্ণিঝড় এই বাঁধগুলোর দুর্বলতা বহুবার প্রকাশ করে দিয়েছে। শ্যামনগর ও তালার মতো উপজেলায় পানি ঢুকে বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা লেগে থাকার ঘটনা নতুন কিছু নয়।
নেপালের বিপর্যয় থেকে যে শিক্ষা নেওয়া জরুরি তা হলো, প্রকৃতি কোনো পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি মেনে চলে না। ভূতাত্ত্বিক ও জলবায়ুগত পরিবর্তনের গতি এখন এতটাই দ্রুত যে বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাসও প্রায়ই পিছিয়ে পড়ছে। যে হিমবাহ শত বছর স্থিতিশীল ছিল, তা একদিনের মধ্যে ধসে পড়তে পারে। একইভাবে যে বাঁধ কয়েক দশক টিকে ছিল, তা একটি অস্বাভাবিক জোয়ার বা একটি তীব্র ঘূর্ণিঝড়ে ভেঙে পড়তে পারে।
করণীয় কী
প্রথমত, সাতক্ষীরার বাঁধ ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত ও বৈজ্ঞানিক তদারকি প্রয়োজন, কেবল দুর্যোগ ঘটার পর মেরামতের চিরাচরিত সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে একটি কার্যকর পূর্বসতর্কীকরণ ব্যবস্থা দরকার, যা কেবল আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঢাকা কেন্দ্রিক তথ্যের ওপর নির্ভর না করে গ্রাম পর্যায়ে দ্রুত পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
তৃতীয়ত, নিরাপদ পানীয় জলের সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ দরকার, কারণ এই সংকট প্রতিদিনের জীবনযাত্রাকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং যেকোনো বড় দুর্যোগের সময় মানুষের সহনক্ষমতাও কমিয়ে দেয়।
চতুর্থত, আঞ্চলিক পর্যায়ে হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত পুরো গঙ্গা ব্রহ্মপুত্র মেঘনা অববাহিকার তথ্য আদানপ্রদান জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে উজানের একটি ঘটনা ভাটির জনগোষ্ঠীর কাছে সময়মতো সতর্কবার্তা হয়ে পৌঁছাতে পারে।
নেপালের পাহাড়ে যে বরফখণ্ড ভেঙে পড়েছিল তার সরাসরি পানি সাতক্ষীরার মাটি স্পর্শ করবে না, এটা ঠিক। কিন্তু যে জলবায়ু ব্যবস্থা সেই বরফখণ্ডকে অস্থির করে তুলেছিল, সেই একই ব্যবস্থা সাতক্ষীরার সমুদ্র, নদী আর বাঁধকেও প্রতিনিয়ত অস্থির করে তুলছে। দূরত্বের বিভ্রমে যদি আমরা এই সতর্ক ঘণ্টা না শুনি, তাহলে হয়তো আগামী কোনো এক ভরা কটালের রাতে সাতক্ষীরার মানুষকেও একই রকম আকস্মিকতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে, যে আকস্মিকতার মুখোমুখি নেপালের রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলার মানুষ দাঁড়িয়েছিল এক আগস্টের সকালে।









