বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩

নেপালের বন্যা কি সাতক্ষীরার জন্যও এক সতর্ক ঘণ্টা?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ
নেপালের বন্যা কি সাতক্ষীরার জন্যও এক সতর্ক ঘণ্টা?

মো: মামুন হাসান

হিমালয়ের কান্না, সমতলের শঙ্কা

আগস্ট মাসের এক সকালে হিমালয়ের কোলে ঘুমিয়ে থাকা একটি জনপদ চোখের পলকে বদলে গেল ধ্বংসস্তূপে। ২৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে নেপালের লাংটাং জাতীয় উদ্যানে হিমবাহের একাংশ ধসে পড়ার ফলে সৃষ্ট এক ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক প্রবাহ ও বন্যা শুরু হয়, যা চীন সীমান্তের কাছে ঘটে। সেই ধস থেকে সৃষ্ট প্রবল স্রোত ত্রিশূলী নদী ধরে প্রায় একশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে একের পর এক গ্রাম ভাসিয়ে নেয়, বহু সেতু ও সড়ক গুঁড়িয়ে দেয় এবং হাজার হাজার স্থাপনা তলিয়ে দেয়। এক সপ্তাহের মাথায় জানা যায়, সরকারি হিসাবে তেরো শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ তখনো নিখোঁজ ছিলেন। এমনকি কিছু মৃতদেহ স্রোতের টানে দেড়শ কিলোমিটার দূরে প্রতিবেশী ভারতের সীমানা পর্যন্ত ভেসে যায়।

এই বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে প্রথমে বিভ্রান্তি ছিল। প্রাথমিক খবরে ভূমিকম্পের কথা বলা হলেও পরে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে হিমালয়ের গভীরে বরফ ও পাথরের বিশাল একটি খণ্ড ধসে পড়ে ভোতেকোশি নদীর গতিপথে প্রবল জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি করে। হিমবাহের নিচের শিলাস্তরের ভাঙনই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, নেপালের এই ট্র্যাজেডি কি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন পার্বত্য দুর্যোগ, নাকি এটি গোটা দক্ষিণ এশিয়ার নদীব্যবস্থার জন্য এক গভীরতর বার্তা বহন করছে, যে বার্তা সাতক্ষীরার মতো উপকূলীয় জনপদেও অনুরণিত হওয়ার কথা।

দুই ভূগোল, দুই বিপদ, একই শিকড়

সততার সঙ্গে বলতে হয়, নেপালের হিমবাহ বিধ্বস্ত পাহাড় আর সাতক্ষীরার লবণাক্ত উপকূল ভৌগোলিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের এলাকা। নেপালে বিপদ আসে উচ্চতা থেকে, বরফগলা হ্রদ ফেটে যাওয়া বা হিমবাহ ধসে যাওয়ার মাধ্যমে। সাতক্ষীরায় বিপদ আসে সমুদ্রের দিক থেকে, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর বাঁধ ভাঙার মাধ্যমে। তাই সরাসরি হাইড্রোলজিক্যাল অর্থে নেপালের বন্যার পানি সাতক্ষীরার কোনো নদীতে পৌঁছায় না।

কিন্তু এই দুটি বিপর্যয়ের নেপথ্যে একটি অভিন্ন চালিকাশক্তি কাজ করছে, আর তা হলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চরম আবহাওয়ার তীব্রতা বৃদ্ধি। হিমালয়ের হিমবাহ ও হিমবাহী হ্রদগুলো উষ্ণায়নের কারণে দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে, আর সেই একই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়াচ্ছে, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়াচ্ছে এবং বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ততা সাতক্ষীরার ভেতরে ঠেলে দিচ্ছে। অর্থাৎ উৎস আলাদা হলেও কারণ একটাই, আর সেই কারণ দুই প্রান্তের মানুষকেই সমান ঝুঁকিতে ফেলছে।

সাতক্ষীরা ইতিমধ্যেই এক নীরব দুর্যোগের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে

সাতক্ষীরার দুর্যোগচিত্র কোনো কল্পনার বিষয় নয়। এই উপকূলীয় জেলায় লবণাক্ততা দিনে দিনে বাড়ছে, ফলে আগের মতো অনেক ফসল আর আবাদ করা যাচ্ছে না এবং কৃষকদের চাষপদ্ধতি বদলাতে বাধ্য হতে হচ্ছে। একই সঙ্গে এখানকার বহু মানুষ নিরাপদ খাবার পানির সংকটে ভুগছেন, অনেক পরিবারকে টাকা দিয়ে পানি কিনে খেতে হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যে নতুন সংকট তৈরি করছে।এই বাস্তবতা মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোগও চোখে পড়ছে। সম্প্রতি উপকূলীয় জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সাতক্ষীরায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে পাঁচ হাজার গাছের চারা রোপণের মতো কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এটি প্রশংসনীয়, কিন্তু বৃক্ষরোপণ একা কোনো বাঁধ শক্ত করতে পারে না, কোনো জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে পারে না।

কেন এই সতর্কতা উপেক্ষা করা যায় না

সাতক্ষীরা নদীমাতৃক ব-দ্বীপীয় ভূগোলের একেবারে প্রান্তে দাঁড়ানো একটি জেলা। ইছামতি, কালিন্দী, কপোতাক্ষের মতো নদী এই জেলাকে ঘিরে রেখেছে, আর এসব নদীর ওপর নির্মিত বাঁধ বহু ক্ষেত্রেই বছরের পর বছর ধরে ক্ষয়প্রাপ্ত ও দুর্বল। আয়লা ও সিডরের মতো ঘূর্ণিঝড় এই বাঁধগুলোর দুর্বলতা বহুবার প্রকাশ করে দিয়েছে। শ্যামনগর ও তালার মতো উপজেলায় পানি ঢুকে বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা লেগে থাকার ঘটনা নতুন কিছু নয়।

নেপালের বিপর্যয় থেকে যে শিক্ষা নেওয়া জরুরি তা হলো, প্রকৃতি কোনো পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি মেনে চলে না। ভূতাত্ত্বিক ও জলবায়ুগত পরিবর্তনের গতি এখন এতটাই দ্রুত যে বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাসও প্রায়ই পিছিয়ে পড়ছে। যে হিমবাহ শত বছর স্থিতিশীল ছিল, তা একদিনের মধ্যে ধসে পড়তে পারে। একইভাবে যে বাঁধ কয়েক দশক টিকে ছিল, তা একটি অস্বাভাবিক জোয়ার বা একটি তীব্র ঘূর্ণিঝড়ে ভেঙে পড়তে পারে।

করণীয় কী

প্রথমত, সাতক্ষীরার বাঁধ ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত ও বৈজ্ঞানিক তদারকি প্রয়োজন, কেবল দুর্যোগ ঘটার পর মেরামতের চিরাচরিত সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে একটি কার্যকর পূর্বসতর্কীকরণ ব্যবস্থা দরকার, যা কেবল আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঢাকা কেন্দ্রিক তথ্যের ওপর নির্ভর না করে গ্রাম পর্যায়ে দ্রুত পৌঁছাতে সক্ষম হয়।

তৃতীয়ত, নিরাপদ পানীয় জলের সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ দরকার, কারণ এই সংকট প্রতিদিনের জীবনযাত্রাকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং যেকোনো বড় দুর্যোগের সময় মানুষের সহনক্ষমতাও কমিয়ে দেয়।

চতুর্থত, আঞ্চলিক পর্যায়ে হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত পুরো গঙ্গা ব্রহ্মপুত্র মেঘনা অববাহিকার তথ্য আদানপ্রদান জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে উজানের একটি ঘটনা ভাটির জনগোষ্ঠীর কাছে সময়মতো সতর্কবার্তা হয়ে পৌঁছাতে পারে।

নেপালের পাহাড়ে যে বরফখণ্ড ভেঙে পড়েছিল তার সরাসরি পানি সাতক্ষীরার মাটি স্পর্শ করবে না, এটা ঠিক। কিন্তু যে জলবায়ু ব্যবস্থা সেই বরফখণ্ডকে অস্থির করে তুলেছিল, সেই একই ব্যবস্থা সাতক্ষীরার সমুদ্র, নদী আর বাঁধকেও প্রতিনিয়ত অস্থির করে তুলছে। দূরত্বের বিভ্রমে যদি আমরা এই সতর্ক ঘণ্টা না শুনি, তাহলে হয়তো আগামী কোনো এক ভরা কটালের রাতে সাতক্ষীরার মানুষকেও একই রকম আকস্মিকতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে, যে আকস্মিকতার মুখোমুখি নেপালের রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলার মানুষ দাঁড়িয়েছিল এক আগস্টের সকালে।

লেখক : মো: মামুন হাসান,ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান,ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

Ads small one

দুই প্রজন্মের পাঠশালা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৪৪ অপরাহ্ণ
দুই প্রজন্মের পাঠশালা

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

শিক্ষা শুধু পাঠ্যবই শেষ করা কিংবা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার নাম নয়। শিক্ষা মানুষের ভেতরে বিবেক, মূল্যবোধ, আত্মবিশ্বাস ও মানবিকতা তৈরি করে। আর সেই মানুষ তৈরির কাজে শিক্ষকের ভূমিকা অনন্য। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষক–শিক্ষার্থী সম্পর্কেও এসেছে বড় পরিবর্তন। সেই পরিবর্তন আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সেটিই এখন ভাবার বিষয়।

 

একজন প্রবীণ শিক্ষক রফিকুল স্যার। বয়স আশির কোঠায়। শরীর নুয়ে গেছে, কিন্তু চোখে এখনো শিক্ষকের সেই মমতা। একদিন তাঁর পুরোনো ছাত্র মিজান দেখা করতে এলেন।  মিজান এখন নিজেও একজন কলেজ শিক্ষক। মিজানকে দেখে বৃদ্ধ শিক্ষকের চোখ ভিজে উঠল। কথায় কথায় ফিরে এল বহু বছর আগের স্মৃতি। মিজান তখন পড়াশোনায় দুর্বল ছিলেন। রফিকুল স্যার শুধু শ্রেণিকক্ষে পড়িয়ে দায়িত্ব শেষ করেননি। বাড়িতে গিয়ে পড়িয়েছেন, প্রয়োজন হলে খাতা-কলম কিনে দিয়েছেন, অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেছেন। অর্থাৎ শিক্ষক তখন শুধু শিক্ষক ছিলেন নাÑছিলেন অভিভাবক, পরামর্শদাতা এবং কখনো কখনো পরিবারের একজন আপনজন।

 

কিন্তু সময় বদলেছে। মিজানের ছেলে তানভীর এখন কলেজে পড়ে। দাদার মতো শ্রদ্ধেয় সেই শিক্ষককে দেখে সে-ও শিক্ষকতা সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা জানায়। তার কথায় উঠে আসে নতুন বাস্তবতাÑশিক্ষকরা পড়ান, কিন্তু অনেক সময় শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষার্থীর জন্য সময় থাকে না। কোনো প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে কখনো বলা হয়, ‘কোচিংয়ে এসো।’ এই ছোট্ট কথোপকথনের মধ্যেই বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় পরিবর্তনের ছবি ফুটে ওঠে।

 

একসময় শিক্ষক–শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ভিত্তি ছিল শ্রদ্ধা, স্নেহ, বিশ্বাস ও দায়বদ্ধতা। এখন অনেক ক্ষেত্রে সেখানে যুক্ত হয়েছে ফলাফল, প্রতিযোগিতা, নম্বর, ভর্তি পরীক্ষা এবং আর্থিক লেনদেনের বাস্তবতা। তবে অতীতকে পুরোপুরি আদর্শ আর বর্তমানকে পুরোপুরি খারাপ হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে যাওয়া যাবে না। আগের সময়ের শিক্ষাব্যবস্থারও সীমাবদ্ধতা ছিল। আজকের শিক্ষকরা আগের চেয়ে অনেক বেশি চাপের মধ্যে কাজ করেন। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, পাঠ্যসূচি বিস্তৃত হয়েছে, মূল্যায়ন ব্যবস্থা জটিল হয়েছে, প্রশাসনিক দায়িত্ব বেড়েছে।

 

প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনও শিক্ষকদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়Ñশিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর জন্য সময়ই না পান, তাহলে শিক্ষা কতটা পূর্ণতা পাবে? বাংলাদেশে শিক্ষার সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো অবকাঠামোর ঘাটতি নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা কেন দেওয়া হচ্ছে, সেই দর্শনের সংকট। আমরা শিক্ষাকে ক্রমেই পরীক্ষাকেন্দ্রিক করে ফেলছি। শিশুর হাতে বই দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সামনে ফলাফল ও প্রতিযোগিতার চাপও তুলে দিচ্ছি।

 

শিক্ষার্থীর প্রশ্ন করার আনন্দ, নতুন কিছু আবিষ্কারের আগ্রহ কিংবা ভুল থেকে শেখার সুযোগের চেয়ে নম্বর বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে শিখছেÑ‘কত নম্বর পেলাম?’ কিন্তু সে হয়তো জানতে পারছে নাÑ‘আমি কী শিখলাম?’ এখানেই শিক্ষকতার প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। একজন শিক্ষক শুধু গণিতের সূত্র, বিজ্ঞানের সংজ্ঞা, ইতিহাসের সাল কিংবা ব্যাকরণের নিয়ম শেখাবেনÑএতেই তাঁর দায়িত্ব শেষ নয়। তিনি শেখাবেন কীভাবে ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করতে হয়। কীভাবে ভিন্নমতকে সম্মান করতে হয়। কীভাবে অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে হয়। কীভাবে নিজের সাফল্যের পাশাপাশি অন্যের প্রয়োজনকেও গুরুত্ব দিতে হয়। একটি ভালো শিক্ষকতা একজন শিক্ষার্থীর পুরো জীবনকে বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশে এমন শিক্ষকের অভাব নেই।

 

প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিক্ষক সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সময় দেন। দরিদ্র শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ান, ঝরে পড়া ঠেকাতে পরিবারকে বোঝান, মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেন। তাঁদের অবদান কোনো পরীক্ষার ফলাফলের তালিকায় ধরা পড়ে না। অথচ দেশের মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা অপরিসীম। সমস্যা হচ্ছে, এই মানবিক শিক্ষকতার জায়গাটি অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। একজন শিক্ষককে যদি কেবল পাঠ্যসূচি শেষ করা এবং পরীক্ষার ফল ভালো করার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই ফলাফলকেন্দ্রিক হয়ে উঠবেন। কিন্তু শিক্ষকের মূল্যায়নে যদি শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ, নৈতিক শিক্ষা, সৃজনশীলতা, সহমর্মিতা এবং শ্রেণিকক্ষের পরিবেশও গুরুত্ব পায়, তাহলে শিক্ষকতার পরিধিও বদলাবে। এখানে অভিভাবকদেরও দায়িত্ব রয়েছে।

 

অনেক অভিভাবক সন্তানের সাফল্যকে শুধু পরীক্ষার নম্বর দিয়ে বিচার করেন। সন্তান প্রথম হয়েছে কি না, জিপিএ কত, ভর্তি পরীক্ষায় কোথায় সুযোগ পেয়েছেÑএসব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু সন্তান কেমন মানুষ হচ্ছে, তার মধ্যে সহমর্মিতা আছে কি না, সে অন্যকে সম্মান করতে শেখেছে কি নাÑএসব প্রশ্ন অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি মানুষ তৈরি করা হয়, তাহলে পরিবার ও বিদ্যালয়কে একই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোচিংনির্ভরতা। অতিরিক্ত কোচিং যখন শ্রেণিকক্ষের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তখন শিক্ষার মূল প্রতিষ্ঠানই দুর্বল হয়ে পড়ে। কোচিং থাকবে কি থাকবে নাÑএই বিতর্কের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কেন একজন শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষের বাইরে অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রয়োজন অনুভব করছে? শ্রেণিকক্ষে যদি পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা, প্রশ্ন করার সুযোগ এবং ব্যক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে অতিরিক্ত নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। তবে এর জন্য শিক্ষকদের ওপর শুধু দায় চাপালে চলবে না। তাঁদের প্রয়োজন পর্যাপ্ত সময়, প্রশিক্ষণ, সম্মানজনক কর্মপরিবেশ এবং বাস্তবসম্মত দায়িত্ববণ্টন।

 

আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তিও বড় পরিবর্তন এনেছে। একজন শিক্ষার্থী এখন কয়েক সেকেন্ডে বিশ্বের নানা প্রান্তের তথ্য পেতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল কনটেন্টÑসবই শিক্ষার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। কিন্তু তথ্য পাওয়া আর জ্ঞান অর্জন এক বিষয় নয়। ইন্টারনেট তথ্য দিতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উত্তর দিতে পারে; কিন্তু কোন তথ্য সত্য, কোনটি মিথ্যা, কোনটি নৈতিক এবং কোন সিদ্ধান্তটি মানবিকÑসেটি বোঝানোর ক্ষেত্রে একজন ভালো শিক্ষকের প্রয়োজন এখনো অটুট। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষককে প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে না; বরং প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে আরও মানবিক শিক্ষক হতে হবে। দুই প্রজন্মের এই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি এখানেই। রফিকুল স্যার তাঁর ছাত্র মিজানকে শুধু পড়াননি; তিনি তাঁর মধ্যে একজন শিক্ষক হওয়ার বীজ বপন করেছিলেন। মিজান যদি তাঁর নিজের ছাত্রদের মধ্যে সেই একই মানবিকতা ছড়িয়ে দিতে পারেন, তাহলে একটি প্রজন্মের শিক্ষকতা পরবর্তী প্রজন্মে উত্তরাধিকার হিসেবে পৌঁছে যাবে। এটাই শিক্ষার সবচেয়ে সুন্দর উত্তরাধিকার।

 

আমাদের মনে রাখতে হবে, ভালো শিক্ষা মানে শুধু ভালো ফল নয়; ভালো মানুষ তৈরি করাও ভালো শিক্ষার মাপকাঠি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের পুরোনো রূপ হয়তো আর হুবহু ফিরবে না। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, শিক্ষার পদ্ধতি বদলেছে। কিন্তু সম্পর্কের মূল ভিত্তিÑশ্রদ্ধা, বিশ্বাস, স্নেহ ও দায়িত্ববোধÑকেন হারিয়ে যাবে? একজন শিক্ষক যদি তাঁর শিক্ষার্থীর নাম মনে রাখেন, তার সমস্যার কথা শোনেন, ভুল করলে শুধরে দেন এবং সবচেয়ে কঠিন সময়ে বলেনÑ‘তুমি পারবে’, তাহলে সেই শিক্ষার্থী হয়তো বহু বছর পরও সেই শিক্ষককে ভুলবে না।

 

রফিকুল স্যারের মতো শিক্ষকরা তাই শুধু অতীতের স্মৃতি নন; তাঁরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে একটি প্রশ্নও রেখে যানÑআমরা কি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে পারছি, যেখানে একজন শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, জীবনের জন্যও শিক্ষকের কাছে যেতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে।কারণ পাঠশালা বদলাবে, বই বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, শিক্ষার পদ্ধতি বদলাবে। কিন্তু একজন শিক্ষকের হৃদয় থেকে শিক্ষার্থীর হৃদয়ে যে আলো পৌঁছে যায়, তার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার ভবিষ্যৎ আধুনিক হোক, কিন্তু তার হৃদয় যেন মানবিক থাকে।

লেখক: সংবাদকর্মী

 

শ্যামনগর সরকারি মহসীন ডিগ্রী কলেজে আইসিটি ল্যাব উদ্বোধন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:০৯ অপরাহ্ণ
শ্যামনগর সরকারি মহসীন ডিগ্রী কলেজে আইসিটি ল্যাব উদ্বোধন

সুন্দরবনাঞ্চল (শ্যামনগর) প্রতিনিধি: ‘ডিজিটাল শিক্ষায় সমৃদ্ধ হোক আগামীর প্রজন্ম’ এ স্লোগানকে সামনে রেখে শ্যামনগর সরকারি মহসীন ডিগ্রী কলেজে আইসিটি ল্যাব উদ্বোধন করা হয়েছে।

সম্প্রতি কলেজে এ আইসিটি ল্যাব উদ্বোধন করেন কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড.এ কে এম আব্দুর রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কলেজের একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য সচিব ড.প্রতাপ কুমার রায়, শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক মোহাম্মদ আলমোকাররম বিল্লাহ, আইসিটি শিক্ষক রাফজান জানিসহ কলেজের সকল শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীবৃন্দ।

গত রোববার আইসিটি ল্যাব উদ্বোধনসহ আইসিটি বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড.এ কে এম আব্দুর রহমান।

কর্মশালায় তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারিক দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি ল্যাব ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। আয়োজকরা বলেন শুধু পাঠ্য বই নির্ভর না হয়ে প্রযুক্তি নির্ভর দক্ষতা বাড়ানো এ কর্মশালার উদ্দেশ্য।

প্রথম দিনে ল্যাব ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীরা বলেন আইসিটি শুধু একটি বিষয় নয়, লেখাপড়া থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

৫৮ বছরের কলেজ, ৩ হাজার শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষ মাত্র ১৫টি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:০৩ অপরাহ্ণ
৫৮ বছরের কলেজ, ৩ হাজার শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষ মাত্র ১৫টি

মনিরামপুর (যশোর) প্রতিনিধি: প্রতিষ্ঠার ৫৮ বছর পেরিয়ে গেলেও অবকাঠামোগত সংকট কাটেনি যশোরের মনিরামপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজে। তিন হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর জন্য ব্যবহারযোগ্য শ্রেণিকক্ষ রয়েছে মাত্র ১৫টি। এর মধ্যে একটি পুরোনো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ফলে শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি পরীক্ষা, ল্যাবরেটরি, গ্রন্থাগার ও আবাসন সুবিধার সংকটও রয়েছে।

১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজটি ২০১৮ সালে সরকারিকরণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। সরকারি নথি অনুযায়ী, ওই বছরের ৮ আগস্ট থেকে বেসরকারি আমলে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের সরকারি কাঠামোয় অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বরের প্রজ্ঞাপনে কলেজটির ৬৩ জন শিক্ষককে সরকারিকৃত কলেজে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে সরকারি পরিচয় পেলেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন সে তুলনায় হয়নি বলে কলেজ-সংশ্লিষ্টরা জানান।

প্রতিষ্ঠানপ্রধানের ভাষ্য অনুযায়ী, কলেজের তিনটি ভবনের একটি পরিত্যক্ত। বর্তমানে একটি দুইতলা ও একটি চারতলা ভবনের প্রায় ১৫টি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলছে। উচ্চমাধ্যমিক, ডিগ্রি, অনার্স ও বিএম/কারিগরি শাখার বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীদের ক্লাস পরিচালনায় এসব কক্ষ নিয়ে চরম চাপ তৈরি হয়েছে।

নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা, অনার্স, ডিগ্রি ও বিএম পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবেও কলেজটি ব্যবহৃত হয়। এতে সীমিত অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। আধুনিক ল্যাবরেটরি, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ও ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগও প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত।

কলেজে কোনো আবাসিক সুবিধা না থাকায় দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন একাডেমিক ভবন, কেন্দ্রীয় পরীক্ষা হল, আধুনিক ল্যাবরেটরি ও ছাত্রাবাস নির্মাণ এখন জরুরি।

সরেজমিনে এমপি গাজী এনামুল

২৪ আগস্ট মনিরামপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ পরিদর্শন করেন যশোর-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হক। তিনি কলেজের শিক্ষার পরিবেশ ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেন এবং জরাজীর্ণ ভবন পরিদর্শন করেন। কলেজ-সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ সময় তিনি অবকাঠামোগত উন্নয়নের আশ্বাস দেন।

কলেজ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট দূর করে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও আধুনিক শিক্ষা-পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।