ডিজিটাল অগ্রযাত্রার অদৃশ্য শত্রু: সাইবার নিরাপত্তায় কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রযাত্রা মানুষের জীবনযাত্রাকে যেমন সহজ, দ্রুত ও আধুনিক করেছে, তেমনি এর অপব্যবহার নতুন নতুন ঝুঁকিরও জন্ম দিয়েছে। আজ ঘরে বসেই শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যাংকিং, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি নানা সেবা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির এই অগ্রগতির পাশাপাশি সাইবার অপরাধও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো, আর্থিক প্রতারণা, সাইবার বুলিং ও ব্ল্যাকমেইলিং এখন ব্যক্তি, পরিবার এবং রাষ্ট্র সবার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ এগিয়ে চলছে, সেই যাত্রাপথকে নিরাপদ রাখতে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আজ সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। প্রযুক্তির সুফল তখনই অর্থবহ হবে, যখন এর ব্যবহার হবে দায়িত্বশীল, নিরাপদ এবং সচেতনতার সঙ্গে।
প্রযুক্তির অপব্যবহারের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও ভুয়া তথ্যের বিস্তার। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটি অসত্য তথ্য লক্ষাধিক মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, যা সামাজিক বিভ্রান্তি, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কিংবা অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য শেয়ার করার প্রবণতা সমাজের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
সাইবার বুলিংও বর্তমানে উদ্বেগজনক সমস্যা। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী, শিক্ষার্থী ও নারীরা প্রায়ই অনলাইন হয়রানি, অপমানজনক মন্তব্য, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার কিংবা ব্যক্তিগত ছবি বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো অপরাধের শিকার হচ্ছে।
এর ফলে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন এবং সামাজিক জীবন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। একই সঙ্গে প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত আসক্তিও নীরব সংকটে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম বা ভিডিওতে ডুবে থাকার কারণে অনেক তরুণের পড়াশোনা, কর্মক্ষমতা, পারিবারিক যোগাযোগ এবং মানসিক সুস্থতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রযুক্তি মানুষের সময় বাঁচানোর কথা থাকলেও অসচেতন ব্যবহারে সেটিই অনেক সময় অপচয় ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি হলো অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং।
প্রতারকচক্র বিভিন্ন ফিশিং লিংক, ভুয়া ওয়েবসাইট বা প্রতারণামূলক বার্তার মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের পাসওয়ার্ড ও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল বা আর্থিক সেবার অ্যাকাউন্ট অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। আর্থিক প্রতারণাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ওটিপি, পিন নম্বর বা গোপন তথ্য হাতিয়ে নিয়ে মোবাইল ব্যাংকিং কিংবা অন্যান্য আর্থিক সেবা থেকে অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। কখনো চাকরির প্রলোভন, কখনো লটারিতে পুরস্কার পাওয়ার মিথ্যা আশ্বাস, আবার কখনো পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে প্রতারণা চালানো হচ্ছে।
সচেতনতার অভাবে সাধারণ মানুষ সহজেই এসব প্রতারণার শিকার হচ্ছেন ব্ল্যাকমেইলিং বর্তমানে আরেকটি বড় সামাজিক সমস্যা। ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা তথ্য চুরি করে অর্থ দাবি কিংবা মানহানির হুমকি দেওয়ার ঘটনা বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা এ ধরনের অপরাধের শিকার হয়ে চরম মানসিক সংকটে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক লজ্জার ভয়ে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও যেতে সাহস পান না, যা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করে। সাইবার অপরাধের ক্ষতি শুধু আর্থিক নয়, এর গভীর মানসিক ও সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। অনলাইন হয়রানি বা প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভুগছে।
পারিবারিক সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, কর্মজীবন ও শিক্ষাজীবনও ব্যাহত হচ্ছে। তাই সাইবার নিরাপত্তাকে কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে নয়, সামাজিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্ব দিতে হবে। এই সংকট মোকাবিলায় প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো ব্যক্তিগত সচেতনতা। শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার, টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (২ঋঅ) চালু রাখা, অপরিচিত লিংকে ক্লিক না করা, ব্যক্তিগত তথ্য বা ওটিপি কারও সঙ্গে শেয়ার না করা এবং তথ্য যাচাই করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা এসব অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকর ভূমিকা, সাইবার অপরাধ দমনে দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগীদের সহজে অভিযোগ জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে আরও সক্রিয় হতে হবে। পরিবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানরা ইন্টারনেটে কী দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কত সময় অনলাইনে কাটাচ্ছে এসব বিষয়ে মা-বাবার ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল নজরদারি প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সচেতনতা ও পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ গড়ে তুললে শিশুরা নিরাপদ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তুলতে পারবে। লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা









