সন্তানের হৃদয়ে সাতক্ষীরাকে প্রতিষ্ঠিত করবার প্রশ্নে
আখলাকুর রহমান
মানুষের সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি জাতি, প্রতিটি জনপদ, এমনকি প্রতিটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীও তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে তার সন্তানদের চেতনার ভেতর দিয়ে। কোনো ভূখন্ড তার নিজস্ব শক্তিতে অগ্রসর হয় না, অগ্রসর হয় সেই ভূখন্ডের মানুষের চেতনার অগ্রগতির মধ্য দিয়ে। আর চেতনার সেই যাত্রা শুরু হয় শৈশবেই, পরিবারের অভ্যন্তরে, মা-বাবার কণ্ঠস্বরের ভেতর দিয়ে। সাতক্ষীরার ভবিষ্যৎ নিয়ে যদি আমরা প্রকৃতপক্ষে চিন্তিত হই, তাহলে আমাদের প্রথম দৃষ্টি ফেরাতে হবে সেই পরিবারগুলোর দিকে, যেখানে আজ একটি শিশু প্রথমবারের মতো তার মাতৃভাষায় কথা বলতে শিখছে, প্রথমবারের মতো তার চারপাশের জগৎকে চিনতে শিখছে।
আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, একটি শিশুর মস্তিষ্ক কোনো শূন্য পাত্র নয় যেখানে যা খুশি তা ঢেলে দেওয়া যায়। বরং এটি এক জীবন্ত ক্ষেত্র, যেখানে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অভিজ্ঞতা, প্রতিটি নীরবতা পর্যন্ত বীজ হয়ে বপিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর শিক্ষাচিন্তায় বারংবার বলেছেন যে, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগহীন শিক্ষা মানুষকে তার নিজের ভূমি থেকেই বিচ্ছিন্ন করে তোলে। এই সত্য আজও প্রাসঙ্গিক, বিশেষত সাতক্ষীরার মতো একটি অঞ্চলে, যার ভূগোল, জলবায়ু এবং জীবনযাত্রা এতটাই স্বতন্ত্র যে এখানকার শিশুর শিক্ষা যদি এই মাটির বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে সে বেড়ে উঠবে ঠিকই, কিন্তু শিকড়হীন হয়ে।
পিতামাতার প্রথম ও প্রধান কর্তব্য এই যে, তাঁরা সন্তানের সামনে উপদেশের পাহাড় গড়ে তুলবেন না, বরং আখ্যানের মাধ্যমে তার চেতনাকে জাগ্রত করবেন। মানবজাতির ইতিহাসে জ্ঞান চিরকালই আখ্যানের মধ্য দিয়ে সঞ্চারিত হয়েছে, শাস্ত্র থেকে শুরু করে লোককথা পর্যন্ত। একটি শিশু যখন শোনে যে এই অঞ্চলের নদীতে একদিন মিষ্টি জল প্রবাহিত হতো, যখন শোনে যে তার প্রপিতামহেরা এই মাটিতে সোনার ফসল ফলাতেন, তখন সেই শোনা কথাগুলো তার চেতনায় কোনো তথ্য হিসেবে জমা হয় না, জমা হয় এক গভীর আত্মপরিচয়ের অংশ হিসেবে। এই আত্মপরিচয়ই ভবিষ্যতে তাকে তার ভূমির প্রতি দায়বদ্ধ করে তুলবে, কোনো আরোপিত নির্দেশ নয়।
দ্বিতীয়ত, একটি শিশুর কৌতূহলকে হত্যা করা সমতুল্য তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে হত্যা করার। আমাদের সমাজে বহু অভিভাবক শিশুর অবিরাম প্রশ্নের মুখে বিরক্ত হয়ে ওঠেন, এবং সেই বিরক্তি প্রকাশ করেন এমন সব বাক্যে যা আসলে একটি ক্ষুদ্র মনের অনুসন্ধিৎসাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে পারে। অথচ প্রকৃত শিক্ষা শুরু হয় ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন একটি শিশু জিজ্ঞাসা করে কেন সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, কেন তাদের নলকূপের জল লবণাক্ত, কেন প্রতিবছর নদীর পাড় ভেঙে মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। এই প্রশ্নগুলোর সৎ ও গভীর উত্তর দেওয়াই পিতামাতার প্রকৃত দায়িত্ব, এমনকি সেই উত্তর যদি জটিল হয়, এমনকি সেই উত্তর যদি একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে উন্মোচিত করে দেয়। কারণ সত্যকে এড়িয়ে গিয়ে কখনো কোনো সচেতন প্রজন্ম গড়ে তোলা যায়নি, যায় না।
তৃতীয় বিবেচনার বিষয় হলো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার গুরুত্ব। কথায় বলে, শোনা কথার চেয়ে দেখা বস্তু অধিক বিশ্বাসযোগ্য, এবং শিশুমনের ক্ষেত্রে এই প্রবচন আক্ষরিক অর্থেই সত্য। একটি শিশুকে যদি কেবল মৌখিকভাবে বলা হয় যে সুন্দরবন আমাদের গর্বের বিষয়, সে কথাটি তার স্মৃতিতে থাকবে বটে, কিন্তু তার অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশ করবে না। কিন্তু যদি তাকে একবার নিয়ে যাওয়া হয় নদীর তীরে, যদি তাকে দেখানো হয় মৎস্যচাষের ঘের, যদি তাকে বসিয়ে শোনানো হয় কোনো প্রবীণ মানুষের মুখে আইলা কিংবা সিডরের রাতের বিভীষিকাময় স্মৃতি, তাহলে সেই অভিজ্ঞতা তার সমগ্র সত্তায় প্রোথিত হয়ে যাবে। এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই ভবিষ্যতে তাকে প্রকৃত অর্থে দায়বদ্ধ নাগরিকে রূপান্তরিত করবে।
চতুর্থত, আমাদের সমাজে একটি বহুল প্রচলিত এবং সুগভীর ভ্রান্তি বিদ্যমান, যা হলো এই ধারণা যে শিশুর সামনে কেবল সৌন্দর্যের চিত্র তুলে ধরাই কল্যাণকর, দুঃখ ও সংকটের কথা তার থেকে গোপন রাখাই শ্রেয়। এই ধারণা বস্তুত এক প্রকার আত্মপ্রতারণা। লবণাক্ততার অভিশাপ, নদীভাঙনের নিষ্ঠুরতা, প্রান্তিক কৃষকের নিরন্তর সংগ্রাম, সুন্দরবনের উপর নেমে আসা পরিবেশগত হুমকি, এই সমস্ত বাস্তবতা শিশুর বয়স অনুযায়ী সহজ ভাষায় হলেও তার সামনে উন্মোচিত করা আবশ্যক। কেননা যে শিশু সংকটের স্বরূপ জানে না, সে কখনো সমাধানের স্বপ্নও দেখতে শিখবে না। আর যে শিশু জানে তার জন্মভূমির ক্ষতস্থান কোথায়, সে বড় হয়ে সেই ক্ষত নিরাময়ের ব্রত নিয়েই পরিণত বয়সে পদার্পণ করবে।
পঞ্চম বিবেচ্য বিষয় হলো, শিশুর মুখ থেকে উচ্চারিত ক্ষুদ্র প্রতিজ্ঞাগুলোকে যথাযথ মর্যাদা প্রদান করা। একটি শিশু যখন ঘোষণা করে যে সে বৃহৎ হয়ে চিকিৎসক হয়ে ফিরে আসবে তার নিজের গ্রামে, অথবা সে সুন্দরবনকে রক্ষা করবে বিলুপ্তির হাত থেকে, তখন এই উচ্চারণকে কোনোক্রমেই লঘু কৌতুক মনে করে উড়িয়ে দেওয়া চলবে না। ইতিহাস সাক্ষী যে, বৃহৎ পরিবর্তনের সূচনা প্রায় সর্বদাই ঘটেছে এইরূপ ক্ষুদ্র, অপরিণত, কিন্তু আন্তরিক প্রতিজ্ঞার মধ্য দিয়ে। পিতামাতার একটি স্বীকৃতিসূচক হাসি, একটি উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্য, শিশুর অন্তরে সেই স্বপ্নের ভিত্তিকে দৃঢ় করে তোলে।
ষষ্ঠত, আমাদের স্মরণ রাখা আবশ্যক যে শিশু কখনোই পিতামাতার বাক্য দ্বারা গঠিত হয় না, গঠিত হয় পিতামাতার আচরণ দ্বারা। যদি আমরা মুখে সাতক্ষীরার প্রতি ভালোবাসার কথা প্রচার করি, অথচ নিজেরা রাস্তায় আবর্জনা নিক্ষেপ করি, জলের অপচয় করি, স্থানীয় সংকটের প্রতি ঔদাসীন্য প্রদর্শন করি, তাহলে সন্তান আমাদের বাক্যকে অগ্রাহ্য করে আমাদের আচরণকেই অনুকরণ করবে। কারণ শিশুর অনুকরণপ্রবণতা তার সহজাত প্রকৃতি, এবং এই সহজাত প্রকৃতির বিরুদ্ধে কোনো উপদেশ কার্যকর হতে পারে না।
সপ্তম ও অন্তিম বিবেচনা হলো, শিশুর স্বপ্নের ওপর কোনো পূর্বনির্ধারিত পথ আরোপ না করা। তাকে বলা চলবে না যে তাকে অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট পেশা গ্রহণ করতে হবে, অথবা একটি নির্দিষ্ট সংকটেরই সমাধান করতে হবে। বরং তার সম্মুখে উন্মোচিত করে দিতে হবে বহুবিধ সম্ভাবনার দ্বার, কৃষি, চিকিৎসাবিজ্ঞান, পরিবেশবিজ্ঞান, শিক্ষকতা কিংবা প্রকৌশলবিদ্যা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাতক্ষীরার নিজস্ব প্রয়োজন বিদ্যমান, নিজস্ব সংকট বিদ্যমান। তাকে এই সম্ভাবনাগুলি অবগত করানোর পর তাকেই বেছে নিতে দিতে হবে তার নিজস্ব পথ। কারণ বলপূর্বক আরোপিত স্বপ্ন কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না, কিন্তু স্বেচ্ছায় নির্বাচিত স্বপ্নই মানুষকে সমগ্র জীবন ধরে সম্মুখে পরিচালিত করে।
আহমদ ছফা তাঁর রচনায় বারংবার এই সত্য উচ্চারণ করেছেন যে, একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্য ঘোচে না কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে, ঘোচে তখনই, যখন প্রতিটি পরিবার তার সন্তানের অন্তরে প্রশ্ন করবার সাহস, সত্যকে গ্রহণ করবার ক্ষমতা এবং স্বপ্ন দেখবার স্পর্ধা জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়। সাতক্ষীরার প্রেক্ষাপটেও এই সত্য সমান প্রযোজ্য। এই জনপদের ভবিষ্যৎ কোনো বৃহৎ প্রশাসনিক পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে না, নির্ধারিত হবে সেই অগণিত পরিবারের মধ্য দিয়ে, যেখানে আজ একটি শিশু প্রথমবারের মতো তার শহরের নাম উচ্চারণ করতে শিখছে।
একটি জনপদ কখনো নিজের শক্তিতে পরিবর্তিত হয় না। পরিবর্তিত হয় তার সন্তানদের চেতনার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। আর সেই চেতনার প্রথম স্ফুলিঙ্গ প্রজ্বলিত হয় কোনো বৃহৎ মঞ্চে নয়, প্রজ্বলিত হয় একটি ক্ষুদ্র গৃহে, সান্ধ্যকালীন কোমল আলোকে, একজন জননীর কণ্ঠস্বরে, একজন পিতার ধৈর্যশীল উত্তরে। অতএব, আজ, এই মুহূর্ত থেকেই আমাদের অঙ্গীকার করা আবশ্যক যে, আমরা আমাদের সন্তানকে কেবল সাতক্ষীরা নামটি শিখাব না, তাকে শিখাব এই মাটিকে ভালোবাসতে, তার ক্ষতকে অনুভব করতে, এবং তার ভবিষ্যৎকে স্বপ্ন দেখতে। কেননা আজকের এই ক্ষুদ্র শিশুরাই, নিঃসন্দেহে, আগামী দিনের সাতক্ষীরা।
লেখক: উদ্যোক্তা








