নোনা জলের থাবা থেকে উপকূলকে রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি
সম্পাদকীয়
সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদের মানুষের কাছে বেড়িবাঁধ কেবল একটি অবকাঠামো নয়, বরং এটি তাদের জীবন-মৃত্যুর সীমারেখা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও সঠিক তদারকি, কাজের ধীরগতি এবং একশ্রেণির অসাধু মানুষের লোপাটের কারণে এই রক্ষাকবচই এখন উপকূলবাসীর আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি আশাশুনির হাজরাখালী এবং শ্যামনগরের গাবুরায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মানববন্ধন সেই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও আশঙ্কারই বহিঃপ্রকাশ।
আশাশুনির হাজরাখালীর চিত্রটি উপকূলীয় উন্নয়নের এক করুণ চিত্র তুলে ধরে। ২০২২ সালে জাইকার অর্থায়নে বাঁধ সংস্কারের কাজ শুরু হলেও তিন বছরেও তা শেষ হয়নি। বর্ষা মৌসুম দরজায় কড়া নাড়ছে, অথচ বাঁধের বড় অংশ এখনো অরক্ষিত। ফাটল আর নদীগর্ভে বিলীন হওয়া বাঁধের দিকে তাকিয়ে শত শত পরিবার এখন ঘরবাড়ি ও মৎস্য ঘের হারানোর শঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে।
যখন কাজ হওয়ার কথা, তখন কাজ ঝুলে থাকে; আর যখন নোনা জল লোকালয়ে ঢোকে, তখন শুরু হয় নামমাত্র ‘জরুরি সংস্কার’। এই চক্রাকার অবহেলা আর কতকাল চলবে?
অন্যদিকে, শ্যামনগরের গাবুরায় যে চিত্র দেখা গেছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয় বরং অপরাধমূলক। বাঁধ রক্ষার প্রধান উপকরণ ‘জিও ব্যাগ’ বা বস্তা রাতের আঁধারে চুরি হয়ে যাচ্ছে। সরকারি সম্পদ এবং জননিরাপত্তার এমন অবমাননা মেনে নেওয়া যায় না।
সম্প্রতি পুকুর থেকে বিপুল পরিমাণ চোরাই জিও ব্যাগ উদ্ধার প্রমাণ করে যে, একটি অসাধু চক্র ব্যক্তিগত লাভের জন্য পুরো এলাকার হাজার হাজার মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
উপকূলীয় বাঁধ রক্ষা কেবল পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের রুটিন মাফিক কাজ হওয়া উচিত নয়। এটি একটি জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু। হাজরাখালীর ঝুলে থাকা কাজগুলো বর্ষার আগেই দ্রুত শেষ করতে হবে। একইসাথে গাবুরার মতো এলাকাগুলোতে জিও ব্যাগ চুরি রোধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আমরা মনে করি, কেবল বরাদ্দ বাড়ানোই সমাধান নয়; প্রয়োজন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা এবং নিয়মিত তদারকি। সাতক্ষীরার সংশ্লিষ্ট আসনের জনপ্রতিনিধি ও জেলা প্রশাসনের প্রতি আমাদের আহ্বানÑবর্ষা শুরুর আগেই টেকসই বাঁধ নির্মাণে কার্যকর পদক্ষেপ নিন। উপকূলের মানুষকে বারবার ত্রাণপ্রার্থী না বানিয়ে, তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু নিরাপদ রাখার স্থায়ী বন্দোবস্ত করুন। নোনা জলের থাবা থেকে উপকূলকে রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।









