শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প: সম্ভাবনা, বিতর্ক ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ১২:৩৫ অপরাহ্ণ
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প: সম্ভাবনা, বিতর্ক ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন

এসকেএমডি বাহলুল আলম

বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপগুলোর একটি এবং নদীনির্ভর একটি দেশ। দেশের ভৌগোলিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। দেশের মোট কৃষিজমির একটি বড় অংশ, অভ্যন্তরীণ মৎস্যসম্পদ, নৌ-পরিবহন ব্যবস্থা, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় প্রতিবেশ নদীর প্রবাহ ও পানির প্রাপ্যতার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, বনজ সম্পদ এবং স্থানীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৫ সালে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর থেকে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা নদীর প্রবাহ হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়ে আসছে।

 

বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গঙ্গার প্রবাহ হ্রাসের ফলে গড়াইসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক শাখা নদীর নাব্যতা কমেছে, নদীগুলোতে পলি জমা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নদীর সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ, নৌ-যোগাযোগ এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষি, সুপেয় পানি এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, নদী ভরাট, অপরিকল্পিত পোল্ডার ব্যবস্থা এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফলে অঞ্চলের পানি সংকটের পাশাপাশি পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতাও বর্তমানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার দেশের অভ্যন্তরে গঙ্গা নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে পানি সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘গঙ্গা ব্যারাজ’ বা সাম্প্রতিক সময়ের ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রকল্পের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ করে গড়াই-মধুমতী, মাথাভাঙ্গা, বড়াল, চন্দনা-বারাশিয়া ও অন্যান্য নদীতে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। এর ফলে প্রায় ২৮.৮ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, নদী পুনরুজ্জীবন, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে বলে সরকার আশা করছে।

তবে প্রকল্পটি নিয়ে নদী বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ, গবেষক এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের মতে, পদ্মা নদীর মতো উচ্চ পলিবাহী নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের ফলে উজানে পলি জমা, নদীর গতিপ্রকৃতির পরিবর্তন, বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বৃদ্ধি, ভাটিতে পানির প্রবাহ হ্রাস এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া ভারত-বাংলাদেশ পানি বণ্টন, আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক পানিকূটনীতির ওপরও প্রকল্পটির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বর্তমানে কেবল একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন উদ্যোগ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নদী শাসন এবং আঞ্চলিক কূটনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নীতিগত আলোচনার বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

প্রকল্পের পটভূমি, উদ্দেশ্য ও প্রত্যাশিত সুফল:
বাংলাদেশে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের ধারণা নতুন নয়। ১৯৬০-এর দশক থেকেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি মোকাবিলা এবং নদীগুলোর প্রবাহ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এ ধরনের একটি বৃহৎ পানি অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে ১৯৭৫ সালে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়।

 

ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে গঙ্গার একটি উল্লেখযোগ্য অংশের পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীপথে সরিয়ে নেওয়া হলে বাংলাদেশের অংশে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যায় বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে গড়াই, মধুমতী, মাথাভাঙ্গা, বড়াল, ইছামতীসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদীর নাব্যতা হ্রাস পায়, অনেক নদী মৌসুমি চরিত্র ধারণ করে এবং কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে।

 

এই প্রেক্ষাপটে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) দীর্ঘদিন ধরে গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে। বিভিন্ন সময়ে একাধিক সম্ভাব্যতা ও কারিগরি সমীক্ষা পরিচালনার পর ২০১৬ সালে সর্বশেষ সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রকল্পটির নকশা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। পরবর্তীতে এটি ‘বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’-এ অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৩ মে ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটির প্রথম পর্যায় অনুমোদন লাভ করে।

 

প্রকল্পটির জন্য প্রায় ৩৪,৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ২০২৬-২০৩৩ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যারাজটি রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলা এবং পাবনা জেলার মধ্যবর্তী পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত হবে। প্রায় ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারাজে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারগ্লুইস, দুটি ফিশ পাস, একটি নৌ-লক, গাইড বাঁধ এবং অ্যাপ্রোচ বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি সংরক্ষণ করে তা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোতে প্রবাহিত করা।

 

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যারাজের মাধ্যমে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে এবং গড়াই-মধুমতী, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদীতে নিয়ন্ত্রিতভাবে পানি সরবরাহ করা হবে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, এর ফলে দেশের ১৯টি জেলার প্রায় ১২০টি উপজেলার ৭ কোটিরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে। প্রায় ২৮.৮ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।

 

সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২৪ লাখ টন ধান
উৎপাদন সম্ভব হবে। পাশাপাশি মৎস্য উৎপাদনও প্রায় ২.৫ লাখ টন বৃদ্ধি পেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমবর্ধমান খরা ও বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের সেচ সুবিধা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর পুনরুজ্জীবন।

 

দীর্ঘদিন ধরে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় গড়াই, মধুমতী, বড়াল ও অন্যান্য নদীর নাব্যতা এবং পরিবেশগত কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যারাজ থেকে নিয়ন্ত্রিত পানি সরবরাহের মাধ্যমে এসব নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা গেলে মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি, নৌ-পরিবহন উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকা-ের প্রসার ঘটতে পারে। এছাড়া প্রকল্পটি উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে অধিক পরিমাণ মিঠাপানি প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে সুন্দরবন ও উপকূলীয় কৃষি অঞ্চলে লবণাক্ততার আগ্রাসন কমবে। এর ফলে কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধি, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা উন্নত হওয়া এবং সুন্দরবনের প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা মিলতে পারে। জ্বালানি খাতেও প্রকল্পটির একটি সীমিত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। মূল ব্যারাজ এবং গড়াই গ্রহণ কাঠামোতে টারবাইন স্থাপনের মাধ্যমে মোট ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় এ পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম, তবুও এটি নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির উৎস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হতে পারে।

 

সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, কৃষি, মৎস্য, নৌ-পরিবহন, পরিবেশগত উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে প্রকল্পটি বছরে প্রায় ৭,১২৭ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে প্রকল্পটির অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রতিদান (ওহঃবৎহধষ জধঃব ড়ভ জবঃঁৎহ- ওজজ) প্রায় ১৭.০৫ শতাংশ হবে বলে দাবি করা হয়েছে, যা একে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক একটি অবকাঠামোগত বিনিয়োগ হিসেবে উপস্থাপন করে। সুতরাং, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে সরকার ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মহল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি উন্নয়ন, নদী পুনরুদ্ধার, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু অভিযোজনের একটি সমন্বিত সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফল বাস্তবে কতটুকু অর্জিত হবে, তা নির্ভর করবে এর কারিগরি বাস্তবায়ন, পানি প্রাপ্যতা, পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক পানিকূটনীতির ওপর।

পরিবেশগত, সামাজিক ও ভূ-রাজনৈতিক মূল্যায়ন: পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা সংকট মোকাবিলার একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও প্রকল্পটি শুরু থেকেই বিশেষজ্ঞ মহল, পরিবেশবিদ, নদী গবেষক এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, নদী পুনরুজ্জীবন, সেচ সম্প্রসারণ এবং লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণের মতো সম্ভাব্য সুফলের ওপর জোর দেওয়া হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত জনপরিসরে আলোচনা হয়নি। বিশেষত নদীকেন্দ্রিক বাংলাদেশের মতো একটি দেশে এত বৃহৎ হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন উন্নয়ন সুবিধার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

পানি সংকট নাকি পানি ব্যবস্থাপনার সংকট: পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের যৌক্তিকতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রথমেই যে প্রশ্নটি সামনে আসে তা হলো-দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রকৃত সমস্যা কি পানির অভাব, নাকি পানি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা? প্রকল্পের পক্ষে উপস্থাপিত যুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতিকে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা একটি স্থায়ী সমস্যা হিসেবে বিরাজ করছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, কেশবপুর, অভয়নগর, মনিরামপুর, পাইকগাছা ও তালা উপজেলার বহু এলাকা বর্ষা-পরবর্তী সময়েও দীর্ঘদিন পানির নিচে থাকে।

নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম কারণ হলো নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি। গত পাঁচ দশকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শতাধিক গ্লুইসগেট, রেগুলেটর, পোল্ডার এবং প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের ফলে নদী ও প্লাবনভূমির প্রাকৃতিক সংযোগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে নদী থেকে পলি বের হতে না পেরে নদীতল ভরাট হয়েছে এবং পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা কমেছে। অনেক গবেষকের মতে, নতুন একটি ব্যারাজ নির্মাণের আগে বিদ্যমান নদী ব্যবস্থার পুনরুদ্ধার এবং পানি নিষ্কাশন কাঠামোর সংস্কার অধিক কার্যকর সমাধান হতে পারে।
পলিবাহী পদ্মা ও ব্যারাজের স্থায়িত্ব প্রশ্ন: পদ্মা নদী পৃথিবীর অন্যতম গতিশীল এবং পলিবাহী নদী। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকা প্রতিবছর আনুমানিক ১ থেকে ১.২ বিলিয়ন টন পলি বঙ্গোপসাগরে বহন করে নিয়ে যায়, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ পলি পরিবহনকারী নদী ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম।

 

এই বাস্তবতায় পদ্মার মতো নদীতে স্থায়ী ব্যারাজ নির্মাণ একটি বড় প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ। প্রস্তাবিত ব্যারাজে পলি অপসারণের জন্য ১৮টি আন্ডারগ্লুইস রাখার পরিকল্পনা থাকলেও অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এত বিপুল পরিমাণ পলি দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হবে। ফারাক্কা ব্যারাজের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে উজানে পলি জমে নদীতল দ্রুত উঁচু হয়ে যায়। ভারতের বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কার উজান অংশে নদীতল কয়েক মিটার পর্যন্ত উঁচু হওয়ার তথ্য বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। একই ধরনের পরিস্থিতি পদ্মায় সৃষ্টি হলে রাজশাহী থেকে পাংশা পর্যন্ত এলাকায় বন্যা, নদীভাঙন এবং ভূমি ক্ষয়ের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।

নদীর জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব: নদী কেবল পানি পরিবহনের মাধ্যম নয়; এটি একটি জটিল জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। নদীর প্রবাহ, পলি পরিবহন, মাছের অভিবাসন, পুষ্টি উপাদানের বিস্তার এবং জলজ প্রাণীর জীবনচক্র পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। ব্যারাজ নির্মাণের ফলে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াগুলো ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় ২৬০ প্রজাতির স্বাদুপানির মাছ পাওয়া যায়, যার একটি বড় অংশ প্রজনন ও খাদ্য সংগ্রহের জন্য নদীর বিভিন্ন অংশে চলাচল করে। বৃহৎ জলকাঠামো নির্মাণের ফলে এই চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে মাছের প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

 

যদিও প্রকল্পে দুটি ফিশ পাস নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে বৃহৎ নদীতে নির্মিত অনেক ফিশ পাস প্রত্যাশিত কার্যকারিতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন আসলে নদীতীরবর্তী জলাভূমি, চরাঞ্চল, বন্যপ্রাণী এবং জলজ উদ্ভিদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে গড়াই নদীর মাধ্যমে সুন্দরবনে প্রবাহিত মিঠাপানির পরিমাণে পরিবর্তন হলে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনটির পরিবেশগত ভারসাম্যেও প্রভাব পড়তে পারে।

ভাটির অঞ্চলে পানিপ্রবাহ হ্রাস ও নতুন পরিবেশগত ঝুঁকি: পদ্মা ব্যারাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনার একটি হলো এর সম্ভাব্য “জিরো-সাম” প্রভাব। অর্থাৎ উজানে যে পরিমাণ পানি সংরক্ষণ ও পুনর্বণ্টন করা হবে, ভাটিতে সেই পরিমাণ পানি কমে যাবে। পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যারাজ নতুন পানি সৃষ্টি করবে না; বরং বিদ্যমান প্রবাহের পুনর্বিন্যাস করবে। প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ব্যারাজের মাধ্যমে গড়াই-মধুমতী ও অন্যান্য নদীতে অতিরিক্ত পানি সরবরাহ করা হবে। কিন্তু এর ফলে গোয়ালন্দের নিচে পদ্মার প্রবাহ হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাব আড়িয়াল খাঁ, লৌহজং, ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা এবং মেঘনা মোহনার ওপর পড়তে পারে।

 

মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা আরও গভীরে প্রবেশ করতে পারে, যা কৃষি, মৎস্য এবং সুপেয় পানির নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাটির অঞ্চলের এই সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি, যা প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে।

পানি কূটনীতি ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান: পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রভাব কেবল দেশের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আঞ্চলিক পানি কূটনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে এবং ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা। এই প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশ যদি নিজস্ব অবকাঠামোর মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজে, তাহলে গঙ্গার ন্যায্য হিস্যা আদায়ের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল হতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, বাংলাদেশকে প্রথমে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবহার সম্পর্কিত জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের কনভেনশন অনুসমর্থন করা, গঙ্গা চুক্তির নবায়নে ন্যূনতম প্রবাহের গ্যারান্টি নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক পানি সহযোগিতা জোরদার করার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। কারণ উজান থেকে পর্যাপ্ত পানি নিশ্চিত না করে কেবল একটি ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তা অর্জন করা সম্ভব নয়। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ পানি অবকাঠামো উদ্যোগ। এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, সেচ ও নদী পুনরুজ্জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

 

তবে একই সঙ্গে পলি জমা, নদীর গতিশীলতা পরিবর্তন, জলাবদ্ধতা, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, ভাটির অঞ্চলে পানিপ্রবাহ হ্রাস এবং আঞ্চলিক পানি কূটনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাবের মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে একটি স্বচ্ছ, স্বাধীন ও বহুমাত্রিক পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে উন্নয়নের পাশাপাশি নদী ও পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বও রক্ষা পায়।

বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি: অবকাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ নয়, নদীর প্রাকৃতিক পুনরুদ্ধার: পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সমালোচকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মনে করেন যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট ও নদী অবক্ষয়ের মূল কারণ পানির ঘাটতি নয়; বরং নদী ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ত্রুটি। তাদের মতে, নতুন একটি বৃহৎ ব্যারাজ নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান নদী ব্যবস্থার পুনর্বাসন, প্রাকৃতিক প্রবাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নদীকেন্দ্রিক পানি ব্যবস্থাপনা অধিক কার্যকর, কম ব্যয়বহুল এবং পরিবেশবান্ধব সমাধান হতে পারে।

 

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গত কয়েক দশকে শত শত কিলোমিটার পোল্ডার, সুইসগেট, রেগুলেটর ও প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব অবকাঠামো প্রাথমিকভাবে কৃষিজমি রক্ষা এবং লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হলেও অনেক ক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, জোয়ার-ভাটার চক্র এবং পলি পরিবহন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলস্বরূপ নদীর তলদেশ উঁচু হয়েছে, খাল ও শাখা নদীগুলো ভরাট হয়েছে এবং জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ ধারণ করেছে।

পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন পানি ধরে রাখার পরিবর্তে প্রথমে বিদ্যমান নদী ব্যবস্থার প্রাকৃতিক কার্যকারিতা পুনরুদ্ধার করা অধিক জরুরি।

এই দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থকরা নদীর ওপর নির্মিত অকার্যকর সুইসগেট, রেগুলেটর ও কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা অপসারণের পক্ষে মত দেন। তারা মনে করেন, অনেক নদী বর্তমানে দখল, ভরাট এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। ফলে নদীগুলোকে দখলমুক্ত করা, প্রাকৃতিক সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং নদী-খাল-জলাভূমির সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হলে পানি প্রবাহ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো পোল্ডার ব্যবস্থার সংস্কার এবং টিআরএম (ঞরফধষ জরাবৎ গধহধমবসবহঃ) বা জোয়ারভাটা নির্ভর নদী ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেজেরডাঙ্গা, কপোতাক্ষ, হরি এবং শ্রী নদী অববাহিকায় পরিচালিত টিআরএম কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে নদীতে স্বাভাবিকভাবে পলি প্রবেশ ও নিষ্কাশনের সুযোগ সৃষ্টি করলে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি এবং জলাবদ্ধতা হ্রাস করা সম্ভব।

 

যদিও এই পদ্ধতির কিছু সামাজিক ও ভূমি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও এটি তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল এবং পরিবেশগতভাবে অধিক টেকসই বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নদীর সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শাখা নদী ও খালের সংযোগ পুনঃস্থাপনকেও বিকল্প কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী ও খাল বর্তমানে প্রধান নদীর সঙ্গে কার্যকর সংযোগ হারিয়েছে।

 

এসব সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা গেলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং স্থানীয় জলজ পরিবেশের উন্নতি ঘটতে পারে। বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থকরা বড়াল নদীর উদাহরণও উল্লেখ করেন। বিভিন্ন সময়ে গ্লুইসগেট আংশিক উন্মুক্ত করা এবং নদীর সঙ্গে গঙ্গার সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠার ফলে বড়াল নদীতে পুনরায় পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

 

তাদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার অনেক ক্ষেত্রে বৃহৎ অবকাঠামোগত হস্তক্ষেপ ছাড়াই ইতিবাচক ফল দিতে পারে। সুতরাং, সমালোচকদের মতে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট মোকাবিলায় শুধুমাত্র নতুন পানি সংরক্ষণ বা নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর না করে নদী পুনরুদ্ধার, প্রাকৃতিক প্রবাহ নিশ্চিতকরণ, টিআরএম সম্প্রসারণ, নদী-খাল পুনঃখনন এবং সমন্বিত অববাহিকা ব্যবস্থাপনার মতো বিকল্প কৌশলগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাদের মতে, নদীকে নিয়ন্ত্রণ করার পরিবর্তে নদীকে তার স্বাভাবিক গতিশীলতা ফিরিয়ে দেওয়াই দীর্ঘমেয়াদে অধিক কার্যকর ও টেকসই সমাধান হতে পারে।

উন্নয়ন, পরিবেশ ও পানি নিরাপত্তার ভারসাম্য: পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারাজ প্রকল্প বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনার ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ, ব্যয়বহুল এবং কৌশলগত অবকাঠামোগত উদ্যোগ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানি সংকট, নদীর নাব্যতা হ্রাস, কৃষি উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটি একটি সম্ভাবনাময় সমাধান হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

 

প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, এর মাধ্যমে প্রায় ২৮.৮ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, বছরে অতিরিক্ত ২৪ লাখ টন ধান উৎপাদন, মৎস্যসম্পদের উন্নয়ন, নদী পুনরুজ্জীবন এবং ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফলের পাশাপাশি বেশ কিছু মৌলিক প্রশ্ন ও উদ্বেগও সামনে এসেছে।

 

বিশেষ করে পদ্মার মতো উচ্চ পলিবাহী নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের ফলে পলি জমা, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব এবং ভাটির অঞ্চলে পানিপ্রবাহ হ্রাসের মতো বিষয়গুলো এখনো ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রকৃত সমস্যা পানির অভাব নাকি নদী ও পানি ব্যবস্থাপনার সংকট-এই প্রশ্নও প্রকল্পটির যৌক্তিকতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও পদ্মা ব্যারাজ একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ। গঙ্গা অববাহিকার পানিবণ্টন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক পানি কূটনীতির সঙ্গে প্রকল্পটির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে প্রকল্পটির সফলতা শুধু প্রকৌশলগত সক্ষমতার ওপর নয়; বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ন্যায্য পানিবণ্টন এবং সমন্বিত অববাহিকা ব্যবস্থাপনার ওপরও নির্ভরশীল। অতএব, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং একটি পরিবেশগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

 

প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে এবং বাস্তবায়নকালীন সময়ে স্বচ্ছ ও স্বাধীন পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ, জনপরামর্শ এবং বিশেষজ্ঞ মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য। পাশাপাশি বিকল্প পানি ব্যবস্থাপনা কৌশল, নদী পুনরুদ্ধার কার্যক্রম এবং প্রাকৃতিক প্রবাহভিত্তিক সমাধানগুলোও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

 

বাংলাদেশের নদী ও পানি ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে পদ্মা ব্যারাজ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে এর চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা, পরিবেশগত স্থায়িত্ব, নদীর স্বাভাবিক গতিশীলতা এবং জাতীয় স্বার্থের মধ্যে কতটা কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা যায় তার ওপর। একটি নদীমাতৃক দেশের জন্য সেই ভারসাম্যই হবে টেকসই পানি নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের মূল ভিত্তি।

লেখক: মূখপাত্র, সিভিক ভয়েজ বাংলাদেশ

Ads small one

খেলাধূলা হতে পারে পরিবার ও সমাজে সম্প্রীতির সেতুবন্ধন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ২:০৬ অপরাহ্ণ
খেলাধূলা হতে পারে পরিবার ও সমাজে সম্প্রীতির সেতুবন্ধন

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬

নিকোলাস বিশ্বাস

খেলাধূলা যুগে যুগে মানুষের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম এবং সামাজিক সংযোগের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গণ্য হয়েছে। খেলার মাঠের রোমাঞ্চ শুধুমাত্র শারীরিক সক্ষমতার প্রদর্শনী নয়, এটি মানব সম্পর্কের জটিল রসায়নকে সহজ উপায়ে মানুষের সামনে তুলে ধরে। খেলাধূলার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর নিরপেক্ষতা-এটি ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের ধার ধারে না। বরঞ্চ, একটি দলের বিজয় বা একটি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ কোটি কোটি মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে রাখতে পারে।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের ২৩তম আসর, যা ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত উত্তর আমেরিকার তিনটি দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোতে যৌথভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারই প্রথমবারের মতো রেকর্ড ৪৮টি জাতীয় দল অংশ নিচ্ছে, যার ফলে ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সর্বমোট ১০৪টিতে। উত্তর আমেরিকার মোট ১৬টি দৃষ্টিনন্দন শহরে এই ম্যাচগুলো আয়োজন করা হচ্ছে। টুর্নার্মেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচটি মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও অ্যাজটেকাতে অনুষ্ঠিত হয় এবং আগামী ১৯ জুলাই নিউইয়র্ক-এর নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে জমকালো ফাইনাল খেলার মধ্য দিয়ে এই বিশ্বমঞ্চের পর্দা নামবে।

বিশ্বকাপের এই জোয়ার বাংলাদেশেও আছড়ে পড়েছে। সম্প্রতি মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার ৭৮ নং রামারপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের রাস্তায় একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্য ধরা পড়েছে, যা ফুটবলপ্রেমী বাংলাদেশের সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। সেখানে দুটি বড় মাপের পতাকা-একটি ব্রাজিলের এবং অন্যটি আর্জেন্টিনার-পাশাপাশি টাঙানো হয়েছে। এই ছবি শুধুমাত্র দুটি ফুটবল দলের প্রতীক নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক বার্তা বহন করছে। এই প্রবন্ধের মাধ্যমে আমরা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব কিভাবে এই ধরনের প্রতীকী সম্প্রীতি এবং সামগ্রিকভাবে খেলাধূলা পরিবার, সমাজ, ধর্ম এবং রাজনীতির মতো মৌলিক সামাজিক কাঠামোগুলোতে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে পারে; পাশাপাশি এর বিপরীত পিঠের উগ্রতা কীভাবে সমাজকে ধ্বংস করে।

কালকিনির দৃশ্যপট এবং এর গুরুত্ব: মাদারীপুরের কালকিনিতে দেখা এই দৃশ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশে ফুটবল নিয়ে, বিশেষ করে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার মধ্যে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কাজ করে, তা অনেক সময় উগ্র রূপ ধারণ করে। বিশ্বকাপ মৌসুমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের দোকান পর্যন্ত চলে তর্ক-বিতর্ক, যা কখনো কখনো ঝগড়া বা মারামারিতে রূপ নেয়। এই প্রেক্ষাপটে যখন কালকিনির রাস্তায় আড়াআড়িভাবে গাছের সঙ্গে উভয় দলের পতাকা পাশাপাশি টাঙানো হয়, তা একটি নীরব অথচ শক্তিশালী ঘোষণা: প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতে পারে, কিন্তু তা যেন ঘৃণা বা বিভেদে পরিণত না হয়। এই পদক্ষেপটি প্রমাণ করে যে, স্থানীয় বাসিন্দারা বোঝেন-বড় উৎসব বা আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায় যখন আমরা একে অপরের মত ও পছন্দকে সম্মান করি। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা মানেই অন্য দলের সমর্থকদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া নয়। এই শান্ত সহাবস্থানের প্রতীক সামাজিক শান্তি ও সৌহার্দ্যের এক বিরল দৃষ্টান্ত।

দেলদুয়ারের সহিংসতা-ক্রীড়া সংস্কৃতির অন্ধকার দিক: কালকিনির সেই সম্প্রীতির ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া সহিংসতা ক্রীড়া সংস্কৃতির এক অন্ধকার দিককে উন্মোচন করে। সেখানে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে সামান্য কথা কাটাকাটি চরম রূপ ধারণ করে। একপর্যায়ে লাঠিসোঁটা, রামদা এবং দা নিয়ে উন্মত্ত জনতা একটি টিনের বসত-বাড়িতে আক্রমণ চালায় এবং বেপারোয়াভাবে বাড়িটি ভাঙচুর করে। খেলার মতো একটি বিনোদনমূলক বিষয়কে কেন্দ্র করে কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা এমন ধ্বংসাত্মক ও হিংস্্র তান্ডব কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই কেড়ে নেয়নি, বরং স্থানীয়দের মনে গভীর আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

এই দুঃখজনক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, খেলাধূলার প্রতি অতি-আবেগ যখন অন্ধত্বে রূপ নেয়, তখন তা সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলা সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট করে। যে দলগুলো হাজার মাইল দূরে খেলছে, যাদের অধিকাংশ খেলোয়াড় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব সম্পর্কেও অবগত নয়, তাদের জন্য নিজের প্রতিবেশী বা দেশের মানুষের ওপর চড়াও হওয়া অত্যন্ত হীন মানসিকতার পরিচয় দেয়। দেলদুয়ারের এই সংঘর্ষ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, খেলাধূলাকে উপভোগের অনুষঙ্গ হিসেবে না দেখে উগ্রতা ছড়ালে তা পরিবার ও সমাজকে কতটা বিপর্যস্ত করতে পারে। এলাকাবাসী ইতিমধ্যেই এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত এই সংঘাতের সুষ্ঠু সমাধান ও জড়িতদের শাস্তি দাবি করছেন।

পরিবারে খেলাধূলার প্রভাব: পরিবার সমাজের ক্ষুদ্রতম একক। খেলাধূলা পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি ম্যাচে যখন পুরো পরিবার একসাথে বসে খেলা দেখে, তখন তাদের মধ্যে একটি অভিন্ন আনন্দের উপলক্ষ তৈরি হয়। এটি প্রজন্ম ব্যবধান (Generation Gap) কমিয়ে আনতে সাহায্য করে। আমরা অনেক সময় দেখি, বাবা ব্রাজিল এবং ছেলে আর্জেন্টিনা সমর্থক। কালকিনির উদাহরণের মতো, পরিবারগুলো যদি শিখতে পারে যে, এই ভিন্নতা শুধুমাত্র একটি খেলা নিয়ে এবং এটি পারিবারিক ভালোবাসার উপরে স্থান পেতে পারে না, তবে পরিবারে শান্তি ও বোঝাপড়া বৃদ্ধি পায়। পারিবারিক আড্ডায় সুস্থ আলোচনা এবং সুস্থ কৌতুক পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি করে। এটি শিশুদেরকে শিক্ষা দেয় যে, জীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে অপর পক্ষের সাথে শত্রুতা করতে হবে। খেলাধূলার এই নিরপেক্ষ প্রকৃতি পরিবারগুলোকে সুস্থ মানসিকতা নিয়ে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

সমাজে খেলাধূলার প্রভাব: সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা এবং সৌহার্দ্য স্থাপনে খেলাধূলার গুরুত্ব অপরিসীম। একটি গ্রামে বা শহরে যখন স্থানীয় খেলাধূলার আয়োজন করা হয়, তখন তা সমগ্র সম্প্রদায়কে এক জায়গায় নিয়ে আসে। এটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা দলীয় কোন্দল ভুলে একটি সুস্থ বিনোদনের ক্ষেত্র তৈরি করে। কালকিনির ঘটনাটি সামাজিক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এটি প্রমাণ করে যে, সমাজকে বিভক্ত করার বদলে, একটি অভিন্ন সংস্কৃতি আমাদের একত্রিত করতে পারে। এই ধরনের প্রতীকী পদক্ষেপ সামাজিক অসহিষ্ণুতা কমাতে সাহায্য করে। মানুষ যখন দেখে যে তাদের গ্রামের রাস্তায় দুটি দলের পতাকা শান্তিতে পাশাপাশি অবস্থান করছে, তখন তাদের মনেও এই বার্তা পৌঁছায় যে, ভিন্নমতের সাথে বসবাস করা সম্ভব। এটি সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ বিনোদন ও অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে। এই ধরনের পদক্ষেপ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ঐক্য জোরদার করে।

রাজনীতি এবং খেলাধূলা: রাজনীতি বা রাজনৈতিক দিক থেকে চিন্তা করলে, খেলাধূলা প্রায়শই কূটনীতির একটি অংশ হয়ে ওঠে। যেমন ‘পিং-পং ডিপ্লোম্যাসি’ বা ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ। কালকিনির এই দৃশ্য স্থানীয় রাজনীতিতে না হলেও, সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়। আমরা দেখি রাজনৈতিক কারণে মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি হয়। কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপ এমন একটি সময় যখন রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে মানুষ একটি অভিন্ন উদ্দেশ্যে বা একটি অভিন্ন আবেগে উদ্বুদ্ধ হয়। কালকিনির প্রতীকী সম্প্রীতি আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও সহাবস্থান সম্ভব। যদি দুটি ভিন্ন দেশের সমর্থক (যাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা চরম) শান্তিতে থাকতে পারে, তবে কেন একই দেশের রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষেরা ভিন্নমত সত্ত্বেও সম্প্রীতির সাথে বসবাস করতে পারবে না? এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে উদারতা এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অভাব দূর করতে একটি উদাহরণ হিসেবে কাজ করতে পারে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, খেলাধূলা শুধুই একটি বিনোদন নয়, এটি একটি শক্তিশালী সামাজিক বার্তা বাহক। মাদারীপুরের কালকিনিতে পাশাপাশি টাঙানো ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার পতাকা শুধুই একটি বিশ্বকাপ মৌসুমে তৈরি হওয়া সাময়িক দৃশ্য নয়; এটি একটি উন্নত এবং শান্তিকামী মানসিকতার প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে, দেলদুয়ারের সহিংসতা আমাদের জন্য এক সতর্কবার্তা।

এই চিত্রগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভিন্নতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবেই, কিন্তু দিনশেষে আমরা সবাই একটি মানব সম্প্রদায়ের অংশ। এই প্রতীকী সম্প্রীতি যদি আমরা আমাদের পরিবার, সমাজ, ধর্ম এবং রাজনীতির মতো ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারি, তবে একটি শান্ত, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের সকলের উচিত কালকিনির এই উদাহরণ থেকে শিক্ষা নেওয়া, দেলদুয়ারের মতো উগ্রতা পরিহার করা এবং দৈনন্দিন জীবনে ভিন্নমতের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অভ্যাস গড়ে তোলা। খেলাধূলা হোক সম্প্রীতির প্রতীক, বিভেদের নয়।

নিকোলাস বিশ্বাস: একজন ডেভেলপমেন্ট প্রাক্টিশনার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল মিডিয়া এ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগ: gonomaddyom@gmail.com 

 

পাইকগাছায় নার্সারীতে জোড় কলম তৈরীতে ব্যস্ত শ্রমিক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ১:৫১ অপরাহ্ণ
পাইকগাছায় নার্সারীতে জোড় কলম তৈরীতে ব্যস্ত শ্রমিক

প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা (খুলনা): বর্ষার শুরুতে পাইকগাছায় নার্সারীতে চারা উৎপাদনে জোড় কলম তৈরীতে শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় পার করছে। তীব্র গরম ও রোদের মধ্যে শ্রমিকরা মাথার উপর ছাতা দিয়ে কাজ করছে। মে থেকে জুলাই পর্যন্ত কলম করার উপযুক্ত সময়। কারণ এ সময় বাতাসের আদ্রতা ও গাছের কোষের কার্যকারিতা বেশি থাকে। তাড়াতাড়ি জোড়া লাগে এবং সফলতার হারও বেশি থাকে।

মাতৃগুণ বজায় রাখা, দ্রুত ফলন, রোগ প্রতিরোধে ক্ষমতা বাড়ানো এবং অধিক ফলন পেতে অঙ্গজ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। গাছের চারা তৈরীর পদ্ধতির নাম কলম। এ কলম তৈরীতে রয়েছে নানা নাম ও পদ্ধতি। যেমন, গুটি কলম, শাখা কলম (কাটিং), চোখ কলম বা বাডিং। তবে কলম তৈরীতে গ্রাফটিং বা জোড় কলম, কাটিং বা উপজোড় কলম উল্লেখযোগ্য পদ্ধতি। এ কলম তৈরী করতে গ্রাফটিং চাকু, ব্লেড, সিকাচার, পলিথিন ক্যাপ, পলিথিন ফিতা, সুতলী, গাছের ডগা বা সায়ন এবং কলম তৈরীতে দক্ষ কারিগর বা মালির প্রয়োজন হয়।

উপজেলার গদাইপুর ইউনিয়ন ও পাশের বিভিন্ন গ্রামে ছোট-বড় প্রায় ৫ শতাধিত নার্সারী গড়ে উঠেছে। যার উল্লেখযোগ্য সংখ্যা রয়েছে গদাইপুর গ্রামে। মৌসুম শুরুতে চারা তৈরীর জন্য নার্সারী মালিক ও কর্মচারীরা ব্যস্ত হয়ে ওঠে। জোড় কলম তৈরী করতে গাছের ডালের সঙ্গে গাছের ডাল জোড়া লাগিয়ে জোড় কলম তৈরী করা হয়।

 

তেজপাতার সঙ্গে কাবাবচিনি, আম সঙ্গে আম, ছবেদার সঙ্গে খিরখাজুর, আতা সঙ্গে দেশী আতা জোড় দিয়ে জোড় কলম তৈরী করা হয়। কাঁটা জাতীয় কুল সহ বিভিন্ন ফলের চারা চোখ বসিয়ে বাডিং কলম তৈরী করা হয় এবং ফুল জাতীয় গাছের ডাল কেঁটে সরাসরি মাটিতে পুতে কমল তৈরী করা হয়।

জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন নার্সারীতে চলতি মৌসুমে আম, পেয়ারা, জামসহ বিভিন্ন ফলের ১০ লাখ ও কুলের প্রায় ১৫ লাখ কলম তৈরী হচ্ছে। গদাইপুর গ্রামের নার্সারী মালিক সামসুর রহমান জানান, এ বছরও তিনি নার্সারীতে ৬০ হাজার চারা উৎপাদনে ব্যস্ত রয়েছে। হিতামপুর গ্রামের রজনীগন্ধা নার্সারীর মালিক সুকনাথ পাল জানান, তার নার্সারীতে প্রায় ৪০ হাজার কলম তৈরীর কাজ চলছে। গদাইপুর গ্রামের অবস্থিত সততা নার্সারীর মালিক অশোক কুমার পাল জানান, তার নার্সারীতে বিভিন্ন জাতের কুলের প্রায় এক লাখ কলম তৈরী করছেন।

 

শ্রমিকের অভাবে কলম তৈরী করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে কলম তৈরীর সময় পার হয়ে গেলে এ মৌসুমের আর কলম তৈরী করা যাবে না। সে কারনে কলম তৈরীতে অধিক পয়সা খরচ হচ্ছে। নার্সারীতে বিভিন্ন জাতের হাইব্রীড জাত কাটিমন আম, মাল্টা, পিয়ারা, সফেদা, জামরুল। তাছাড়া এ সব কলমের মধ্যে থাই পেয়ারা, জামরুল, কুল, মালাটা, কদবেল, কমলালেবু, আমসহ বিভিন্ন জাতের কলম রয়েছে।

পাইকগাছা উপজেলা নার্সারী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন জানান, বিগত বছর আশানারুপ চারা বিক্রি হয়নি, এতে নার্সারী মালিকরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তবে এবছর চারার চাহিদা প্রচুর, তাই কলমও তৈরিতে ব্যস্ত রয়েছে শ্রমিক। কলম তৈরীর শ্রমিক ঠিকমত না পাওয়ায় উচ্চ মূল্যে শ্রমিক নিয়ে কলম তৈরী করতে হচ্ছে। কারণ সময় চলে গেলে এ মৌসুমে আর জোড় কলম তৈরী করা যাবে না।

গদাইপুর এলাকার তৈরী কলম দেশের চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, রংপুর, সিলেট, বরিশাল, কুমিল্লা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হচ্ছে। তবে ঠিকমত বাজার দর না পাওয়ায় নার্সারী মালিকরা আশানারুপ ব্যবসা করতে পারছে না। নার্সারী ব্যবসায়ীরা জানান, চারা উৎপাদনে সরকারি ভাবে লোনের ব্যবস্থা করলে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নার্সারী শিল্প আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ একরামুল হোসেন জানান, পাইকগাছার নার্সারী শিল্প খুলনা জেলা শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে। নার্সারী ব্যবসায়ীরা চারা বিক্রি করার আশানারুপ বাজার ধরতে না পারায় তারা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। নার্সারী ব্যবসা করে মালিক ও ব্যবসায়ীরা সাবলম্বী হচ্ছে, তেমনি নার্সারীতে নিয়জিত হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। নার্সারীতে উৎপাদিত চারা সবুজ বননায়নে উল্লেখ যোগ্য ভূমিকা রেখে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে। তেমনি ভাবে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখছে।

বাংলাদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাস: একটি সমাজ-নির্দেশিকা গ্রন্থ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ১২:১৫ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাস: একটি সমাজ-নির্দেশিকা গ্রন্থ

বাবুল চন্দ্র সূত্রধর

জাতীয় অধ্যাপক ও সমাজ বিজ্ঞানী ড. রংগলাল সেন (১৯৩৩-২০১৪) বাংলাদেশে সমাজ বিজ্ঞানের বিকাশে রেখে গিয়েছেন অসামান্য অবদান। তাঁর মূল্যবান গ্রন্থসম্ভার এরই সাক্ষ্য বহন করে চলছে। এই গ্রন্থসম্ভারই তাঁকে যুগ যুগ ধরে বাঁচিয়ে রাখবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা জীবন সম্পন্ন হওয়ার পরও যতদিন সুস্থ ছিলেন, ততদিনই কলম চালিয়েছেন দুর্নিবার নেশায়। তাঁর লেখাপড়ার নিয়মটি ছিল একেবারে অধ্যবসায়ী পরীক্ষার্থীর মত। শুধু তাই নয়, দিনের ২৪টি ঘণ্ট্ইা কাটাতেন কঠোর ছকের অধীনে। আমার প্রত্যক্ষ শিক্ষক ছিলেন বিধায় তাঁকে খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো আমার।

সময় ও সুযোগ পেলে একটু পড়াশুনার চেষ্টা করি। তিন-চারদিন আগে বই পত্র গোছাতে গিয়ে হাতে পড়লো অধ্যাপক সেনের‘ বাংলাদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাস’ নামক বিখ্যাতগ্রন্থটি। মনে পড়ে গেলো প্রায় তিন যুগ আগেকার কথা, যখন ছাত্র ছিলাম। বইটি আলাদা করে রাখি। পড়ে একবারও মনে হয়নি পুরোনো কোনো বই। সম্প্রতিকালে বাংলাদেশের যে সমাজ চিত্র আমরা প্রত্যক্ষ করি, তা উক্ত গ্রন্থে বর্ণিত চিত্রের চেয়ে খুব একটা ভিন্নতর বলেনি। মনে প্রেরণা জাগে বইটি সম্পর্কে কিছু লেখার। সামাজিক স্তরবিন্যাস ছিলো অধ্যাপক সেনের অত্যন্ত প্রিয় বিষয়গুলোর অন্যতম, এটি সমাজ বিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক প্রত্যয়ও বটে।

সামাজিক স্তর বিন্যাস ব্যবস্থার মাধ্যমেই সমাজের সামাজিক চেহারার সন্ধান মিলে। গ্রন্থটি প্রথমে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয় ভাষা শহীদ গ্রন্থমালার অন্যতমগ্রন্থ রূপে, ১৯৮৫ সালে। ২০০২ সালের দিকে ড. সেন এতে কিছু সংযোজন ও পরিমার্জনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। বাংলা একাডেমীর অনুমতি সাপেক্ষে পরে নিউ এজ পাবলিকেশনস থেকে দ্বিতীয় বারের মত এটি প্রকাশ লাভ করে, ২০০৩ সালে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, গ্রন্থটির ব্যাপক চাহিদার কারণে বাংলা একাডেমী থেকে ১৯৯৭ সালে ও নিউ এজ পাবলিকেশনস থেকে ২০০৬ সালে পুনর্মুদ্রিত হয়।

অগণতাান্ত্রিক ও স্বার্থবাদী সামাজিক স্তরবিন্যাস এবং এর পেছনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতার ফলে সমাজে উঁচু-নীচু নানা শ্রেণী জন্ম লাভ করে। উঁচু শ্রেণীর লোকজন অধিকতর মাত্রায় সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ভোগের মাধ্যমে সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি করে। রংগলাল সেনের অনেক লেখায় বিষয়টি সুস্পষ্ট ভাবে ওঠে এসেছে। তাঁর সুপরিচিত ও পাঠকনন্দিত গ্রন্থ ̒বাংলাদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাস’-এ বিষয়টির বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়‘ সামাজিক স্তরবিন্যাস, অসমতা, এবংসচলতার তত্ত্ব ও প্রত্যয়’ -এ বর্ণিত ধারণা সমূহের তাত্ত্বিক কাঠামো অঙ্কন করে এসবের মার্কসীয় ও ওয়েবারীয় দৃষ্টিভঙ্গী উপস্থাপন করা হয়েছে। বিশেষত, সামাজিক স্তর বিন্যাসের উদ্ভব ও বিকাশ তথা ঐতিহাসিক পটভূমি, প্রাচ্য-প্রতীচ্যে স্তরবিন্যাসের বিভিন্ন ধরনের প্রকাশিতরূপ, স্তর বিন্যাসের মাত্রা প্রভৃতি সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে।

দ্বিতীয় অধ্যায় ‘বাংলাদেশের সামাজিক স্তর বিন্যাসের সূচনা ও প্রাক-মুসলিমযুগে দাস-সামন্ত তন্ত্রের প্রথম পর্যায়ে এর স্বরূপ’ -এ বাংলায় কিভাবে সামাজিক স্তর বিন্যাস উৎপত্তি লাভ করে এবং মুসলিমদের আগমনের পূর্বে অর্থাৎ হিন্দু-বৌদ্ধ যুগে সামাজিক স্তর বিন্যাসের ব্যবস্থাটিকি অবস্থায় ছিল, তা আলোচিত হয়েছে। বর্ণ ব্যবস্থাকে স্তর বিন্যাসের মূল সূচক হিসেবে চিহ্নিত করে ড. সেন লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের সমাজেবর্ণ ব্যবস্থার বিকাশের দিক থেকে গুপ্ত যুগছিল সূচনা পর্ব, পালদের আমল হল বিস্তৃতিকাল আর সেন যুগ হল সুনির্দিষ্ট পর্যায়। গুপ্ত যুগেই বাংলাদেশের ব্রাহ্মণেতর জাতিসমূহ দত্ত, পাল, মিত্র, বর্মণ, দাস, ভদ্র, সেন, দেব, ঘোষ, কু-ু, পালিত, নাগ, চন্দ, দাম ইত্যাদি উপাধি ধারণ করে। … বর্ণ বিন্যাসের সাথে রাষ্ট্রের ঘনিষ্ট সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। বস্তত প্রাচীন বাংলার সমাজে ক্ষমতার কাঠামোর স্বরূপ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এ সম্পর্কটি বিবেচনা করতে হয়।” তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বাংলার সামাজিক স্তরবিন্যসের প্রত্যয়টিকে ‘দাসপ্রথা ও সামন্তবাদের আবিস্কার’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

তৃতীয় অধ্যায় ‘মুসলিম শাসনামলে দাস-সামন্ততন্ত্রের দ্বিতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাস’-এ বর্ণিত হয়েছে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দাস ও সামন্ততন্ত্রের ধারাবাহিকতায় বাংলা অঞ্চলে সামাজিক স্তরবিন্যাসের ধরন ও প্রকৃতি। লেখক বলেছেন, ‘বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাংলার মুসলিম সমাজে চারটি গোষ্ঠীলক্ষ্য করা যায়। প্রধমটিতে রয়েছেন বহিরাগত আমীর-ওমরাহ। তারা মূলত নগরবাসী, কিংবা নগরের আশে পাশে সপরিবারে বসবাস করতেন। দ্বিতীয় আগন্থক মুসলিম জনগোষ্ঠী, যারা বাংলায় বিয়ে-শাদী করে বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি বিস্তার করেন। তৃতীয়, বাংলার ধর্মান্তরিত মুসলমানরা- এরা মূলত গ্রামের বাসিন্দা এবং চতুর্থ, মিশ্র মুসলমান- যাদের পিতা বা মাতার কেউ হিন্দু ছিলেন।’ এ সময়ে নানা উপাদানের প্রভাবে বিশেষত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে স্তরবিন্যাসে নানা উত্থান-পতনের মাত্রা পরিলক্ষিত হয় বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

‘ঔপনিবেশিক বৃটিশ আমলে সামন্ত-ধনতান্ত্রিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাস’ শীর্ষক চতুর্থ অধ্যায়ে সামন্ততন্ত্রের ভেতর থেকে উদ্ভূত ধনতন্ত্রের আওতায় (যাকে আধা সামন্ততন্ত্র ও আধা ধনতন্ত্র বলা যায়) সামাজিক স্তরবিন্যাসের স্বরূপ আলোচনা করা হয়েছে। ড. সেনের কথায়, ‘‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, পত্তনীপ্রথ, খাজনা ও প্রজাস্বত্ত¦ আইনের প্রভাবে উনিশ শতকে বাংলার কৃষি সমাজে যে উলম্বী ধরনের সামাজিক স্তরবিন্যাস বিকাশ লাভ করে, তার একটি বাস্তব চিত্র হলোÑ জমিদারীর আয়তন ভেদে জমিদাররা ছিল প্রধানত দুটি স্তরে বিভক্ত; স্তরবিন্যাসের উচ্চমঞ্চের একদিকে ছিল গুটিকয়েক বড় জমিদার, অন্যদিকে ছিল সংখ্যাগরিষ্ট ক্ষুদে জমিদার। স্থায়ীইজারা দান ও অব্যাহত পত্তনী প্রথার ফলে ক্রম-প্রসারমান একটি বহুস্তর বিশিষ্ট মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী। খাজনা ও প্রজাস্বত্ব আইন সত্ত্বেও রায়তদের ভেতর প্রচ- পার্থক্য সমন্বিত এক বিরাট কৃষক জনগোষ্ঠী। স্তর বিন্যাসের সর্বনি¤েœ একটি ভূমিহীন কৃষি-শ্রমিক শ্রেণীর সৃষ্টি।”

পরবর্তীতে বৃটিশ আমলের শেষ দিক পর্যন্ত সামাজিক স্তর বিন্যাসের অবস্থা কেমন ছিল, তা এ অধ্যায়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পঞ্চম অধ্যায় ‘পাকিস্তান আমলে পুঁজিবাদী পর্যায়ে বাংলাদেশের সামাজিক স্তর বিন্যাস’- এ নতুন ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার অধীনে সামাজিক স্তর বিন্যাস এক নবতররূপ পরিগ্রহ করে। সরকারের নীতিমালা ও পৃষ্টপোষকতায় শুরু হয় নি:স্বকরণের এক নগ্ন প্রক্রিয়া। ড. সেন লিখেছেন, ‘‘১৯৫১ সালে ভূমিহীনের সংখ্যা ছিল শতকরা ১৪.৩ ভাগ, যা ১৯৬১ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ১৭.৫ ভাগে দাঁড়ায়; এবং ১৯৬৭-৬৮ সালে এর পরিমাণ শতকরা ২০ ভাগে উন্নীত হয়। উক্ত ধনবাদী ধারায় সৃষ্ট গ্রামের বিত্তবান শ্রেণীর হাতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভুত হয়।

 

১৯৬০-৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামীণ জনসংখ্যার মধ্যে শতকরা ৫২ ভাগ পরিবার ও জনসংখ্যার শতকরা ৪০ ভাগ ছিল সম্পূর্ণ দরিদ্র। আর ঐ সময় গ্রামীণ জনসংখ্যার মধ্যে পরিবার হিসেবে শতকরা ১০ ভাগ ও জনসংখ্যার শতকরা ৫ ভাগ ছিল চূড়ান্ত দরিদ্র। কিন্তু ১৯৬৮-৬৯ সালে এটি বেড়ে সম্পূর্ণ দরিদ্র পরিবারের শতকরা হার দাঁড়ায় ৮৪ ভাগে, গরীব জনসংখ্যা হয় শতকরা ৭৬ ভাগ। তেমনি চূড়ান্ত দরিদ্র পরিবারের শতকরা হার প্রায় শতকরা ৩৫ ভাগে পৌছায়, যা মোট জনসংখ্যার ২৫ ভাগ।”ষষ্ঠ অধ্যায় ‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের পুজিবাদী পর্যায়ে সামাজিক স্তরবিন্যাস’- এ বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পর থেকে সামাজিক স্তরবিন্যাসের গতি-প্রকৃতি বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

উপসংহারে এসে বাংলাদেশের সামাজিক শ্রেণী সমূহ চিহ্নিত করার প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়। চিহ্নিত আটটি শ্রেণী হল, ‘‘ক. শিল্প শ্রমিক শ্রেণী, খ. বিরাট সংখ্যক গ্রামীণ সর্বহারা, গ, কৃষক, ঘ. শহরের বস্তিবাসী, ঙ. মধ্যবিত্ত বা মধ্য স্তরের জনসমষ্টি, চ. বুর্জোয়া, ছ. জোতদার।” অত:পর তিনি সামাজিক স্তরবিন্যাসের আলোকে বাংলাদেশের জনসমষ্টির তিনটি স্তর নিরূপণ করে যে মূল্যবান দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেছেন তা সকল স্তরের গবেষক ও চিন্তাবিদের জন্য অবশ্য পঠিতব্য বলে আমার মনে হয়: ‘‘বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৮৭ জন নি¤œস্তরে, শতকরা ৮ জন মধ্যস্তরে ও শতকরা ৫ জন উচ্চস্তরে অবস্থান করছে।

 

বর্তমান বাংলাদেশে যে অর্থনীতি, শিল্পনীতি, ভূমিনীতি ও উন্নয়ন-কৌশল চালু আছে তার মাধ্যমে মাত্র ঐ ৫ ভাগ লোকই উপকৃত হচ্ছে। …অতএব বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণ সাধনে যারা সত্যিকার আগ্রহী তাদেরকে অবশ্যই উক্ত সামাজিক স্তরবিন্যাসের বাস্তব চিত্র বিবেচনায় রেখে এমন মৌলিক পরিবর্তনের কথা ভাবতে হবে, যার ফলে ঐ ধরনের বৈষম্যমূলক সমাজ- ব্যবস্থার চিরতরে অবসান ঘটে এবং এর পরিবর্তে একটি শোষণহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানেই রাজনীতির সাথে উন্নয়ন পদ্ধতির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বিদ্যমান।”

গ্রন্থের আলোচনা পদ্ধতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ভূমিকাংশে ড. সেন বলেছেন, ‘যে কোন দেশের সামাজিক স্তর বিন্যাস ঐতিহাসিকভাবে বিকশিত হওয়ার কারণে আমি বাংলাদেশের সামাজিক স্তর বিন্যাসকে উৎপাদন ব্যবস্থা তথা মৌলিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আলোকে বিন্যস্ত করেছি।” তাইতো গ্রন্থের আলোচনায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা ও সহায়তায় কিভাবে সামাজিক স্তর বিন্যাসের ধারা ও ধরন প্রকাশিত হয়েছে, তা অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

 

তাই মনে করি যে, গ্রন্থটি সকলের পাঠকরা প্রয়োজন। বিশেষ করে যারা সুষম উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, মানবাধিকার, মানবসম্পদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, কিংবা নৈতিক ও সমতা ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেন বা অন্তত ভাবনা চিন্তা করেন, তাদের নিকট বইটি দিক-নির্দেশক হিসেবে কাজ করতে পারে।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী ও গবেষক