Oplus_131072
ভিডিওতে ভাইরাল, জামায়াত এখন কী করবে
পত্রদূত রিপোর্ট: সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী নজরুল ইসলামের একটি ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি কেন্দ্র করে সংসদ সদস্য, তাঁর প্রথম স্ত্রী, দ্বিতীয় স্ত্রী, শ্বশুর ও দলীয় নেতাদের কাছ থেকে নানা ব্যাখ্যামূলক ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ইন্টারনেটে দ্বিতীয় স্ত্রীর একটি বিতর্কিত জীবনবৃত্তান্ত (বায়োডাটা) ও কাবিননামা ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি নতুন মোড় নিয়েছে। বিষয়টি মঙ্গলবার টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। দেশের সীমানা পেরিয়ে বিবিসির খবরেও স্থান পায় এমপি গাজী নজরুল ইসলাম। বিবিসির খবরে বলা হয়Ñ এক তরুণীর সাথে নিজের ‘ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের একটি ভিডিও’ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম বলছেন, ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। তার দাবি, তিনি তার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে গত ১৭ই জুন ওই তরুণীকে বিয়ে করেছেন।
যদিও সামাজিক মাধ্যমে ওই তরুণীর একটি জীবন বৃত্তান্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এতে সবুজ কালির কলমে ‘জোর সুপারিশ করছি’ লিখে স্বাক্ষর করেছেন মি. ইসলাম, যাতে তারিখ উল্লেখ আছে ২২শে জুন ২০২৬। ওই জীবন বৃত্তান্তে তরুণীটির বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ রয়েছে।
ভাইরাল হয়ে পড়া ওই জীবন বৃত্তান্ত অনুযায়ী তরুণীটি ২০০৮ সালের ২২শে মে জন্মগ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ ৭৭ বছর বয়েসি মি. ইসলামের দাবি অনুযায়ী ১৭ই জুন বিয়ে হলে ওই দিন তরুণীটির বয়স ছিল ১৮ বছর ২৬দিন।
গাজী নজরুল ইসলাম এর আগে পঞ্চম ও অষ্টম জাতীয় সংসদে জামায়াত দলীয় সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের স্পীকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে জানিয়েছিলেন যে, মি ইসলাম একজন মুক্তিযোদ্ধা।
এদিকে তরুণীর সাথে ঘনিষ্ঠতার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ‘মেয়েদের শালীনভাবে চলাফেরা ও মাথায় পর্দা রাখার পরামর্শ’ দেওয়া নিয়ে মি. ইসলামের একটি বক্তব্যের পুরনো ভিডিও নতুন করে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারের সময় তিনি ওই মন্তব্য করেছিলেন।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে ঘটনাটির দিকে তারা দলীয়ভাবে নজর রাখছেন এবং বেআইনি বা অবৈধ কিছুর প্রমাণ পেলে সে অনুযায়ী দল ব্যবস্থা নিবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তার দল জামায়াতে ইসলামীর দিক থেকেও একই বক্তব্য দিয়ে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে পাঞ্জাবি পরিহিত অবস্থায় গাজী নজরুল ইসলামকে সালোয়ার কামিজ পরিহিত এক তরুণীর সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা গেছে। তার এই ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য মি. ইসলাম ওই তরুণীর এক মামাকে দায়ী করেছেন।
কিন্তু ওই তরুণী তার বিবাহিত স্ত্রী হয়ে থাকলে তার মামা কেন এটি করবে সেই প্রশ্নের কোনো জবাব আসেনি কোনো পক্ষ থেকে।
সোমবার বিকেল থেকেই ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়াতে শুরু করলে প্রথম দিকে ফেসবুকে তার সমর্থকরা এটি ‘এআই ব্যবহার করে করা হয়েছে’ উল্লেখ করে পাল্টা প্রচারণা শুরু করে। কিন্তু মঙ্গলবার সকাল নাগাদ কয়েকটি ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান দাবি করে যে ভিডিও এআই দিয়ে বানানো নয়।
এসব নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই মঙ্গলবার বেলা ১২টা ০১ মিনিটে নিজের ফেসবুক পাতায় একটি বিবৃতি দিয়েছেন গাজী নজরুল ইসলাম।
এতে তিনি দাবি করেন, গত ১৭ই জুন পারিবারিকভাবে তার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার বাসভবনে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। ফলে তার বিরুদ্ধে ‘প্রচারিত অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের কোনো সত্যতা নেই’ বলে দাবি করেন তিনি।
বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন যে, গত ১৩ জুলাই, ২০২৬ ইং তারিখে তিনি তার প্রথমা ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে তার দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার ব্যবসায়িক অফিসে যান।
“সেখানে আমরা আনুমানিক সোয়া এক ঘণ্টা অবস্থান করি। আমরা উক্ত অফিসে অবস্থানকালে যোহরের নামাজ আদায়ের পূর্বে আমার গাড়িচালক ও আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ গাড়ি দেখার কথা বলে বাইরে যায়। পরবর্তীতে সে ৫/৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে আমাদের কক্ষে প্রবেশ করে এবং আমাদের জিম্মি করে ১ লক্ষ টাকা আদায় করে”।
তিনি ওই বিবৃতিতে আরও বলেন, “আমি চলাচলের জন্য যে ভাড়াকৃত গাড়িটি ব্যবহার করি, ওবায়দুল্লাহর যোগসাজশে পরবর্তীতে সেটিও আটকে রেখে দফায় দফায় আমাদের কাছে কয়েক লক্ষ টাকা দাবি করা হয়। আমরা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আমাদের বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। আমি এসময় জানতে পারি, আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতা মোঃ মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর পূর্বশত্রুতা ও পারিবারিক বিরোধের জের ধরেই এই ষড়যন্ত্রের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
‘’পরবর্তীতে, হিংসা ও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ওবায়দুল্লাহ আমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে ও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কতিপয় অসাধু ব্যক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিডিওটিকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ঘটনা হিসেবে প্রচার করছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত”।
কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতের একজন এমপিকে তার বৈধ দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা বা তার লোকেরা জিম্মি করে টাকা আদায় করবেন- এ দাবি কতটা যৌক্তিক তাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নজরুল ইসলামের দাবি অনুযায়ী ঘটনাটি ঘটেছে মগবাজারে, যেটি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কাছেই। সাধারণত ওই এলাকায় জামায়াতের বহু কর্মী সমর্থকের উপস্থিতি থাকে।
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আজিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “কথাটা হয়তো যৌক্তিক মনে হচ্ছে না কিন্তু এমপি সাহেব আমাদের জানিয়েছেন যে তিনি তার স্ত্রীদের নিয়েই সেখানে গিয়েছিলেন। তার স্ত্রীরাও সামাজিক মাধ্যমে বলেছেন। তারপরেও আমরা সাংগঠনিকভাবে দেখবো যে তাকে হেয় করার চেষ্টা হয়েছে নাকি অন্য কিছু হয়েছে। সেটি দেখে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিবো আমরা”।
মঙ্গলবার দুপুরের পর পর গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী পরিচয় দিয়ে মাকসুদা ইসলাম একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন সামাজিক মাধ্যমে। সেখানে তাকে লিখিত বিবৃতি পড়তে দেখা গেছে।
এতে তিনি বলেছেন, “আমার স্বামী গাজী নজরুল ইসলামের সহিত মরিয়মের (দ্বিতীয় স্ত্রী) সাথে বিবাহ হয়েছে। যারা এটা নিয়ে কুৎসা রটাচ্ছে তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এ থেকে বিরত না থাকলে আমি আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবো”।
এরপর নিজেকে গাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রী পরিচয় দিয়েও আরেকটি বক্তব্য দেন গাজী নজরুল ইসলামের সাথে দেখা যাওয়া তরুণী। এই ভিডিওতে তাকে মুখে মাস্ক পরা দেখা গেছে। সেখানে ওই তরুণী বলেছেন, “আমার স্বামী সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যে ভিডিও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে সে বিষয়ে আমি দেশবাসীর সামনে প্রকৃত ঘটনা সংক্ষেপে তুলে ধরতে চাই।’’
তিনি বলেন, “প্রথমত আমাদের বিয়ে কোনো গোপন বা অনৈতিক বিষয় নয়। ২০২৬ সালের ১৭ই জুন সাতক্ষীরার শ্যামনগর আমার বাবার বাসায় উভয় পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। এ সময় আমার স্বামীর প্রথম স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। তেরই জুলাই গাজী নজরুল ইসলাম তার দুই স্ত্রীকে নিয়ে মগবাজারে আমার বাবার অফিসে যান”।
জামায়াতের নায়েবে আমির ও সংসদীয় দলের উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বিবিসি বাংলাকে বলছেন, বিষয়টি তাদের দৃষ্টিতে এসেছে এবং তারা এ বিষয়ে নজর রাখছেন।
“সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি নানাভাবে এসেছে। ওনার ও তার স্ত্রীদের বক্তব্যও এসেছে। তিনি যদি বেআইনি ও অবৈধ কিছু না করেন তাহলে সেটি তার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু তিনি যদি বেআইনি ও অবৈধ কিছু করে থাকেন তাহলে অবশ্যই জামায়াত দল হিসেবে ব্যবস্থা নিবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আজিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “এমপি সাহেব বলেছেন সাথে তার স্ত্রী ছিল। এখন সেই ভিডিও কিভাবে ভাইরাল হলো সেই তথ্য উদঘাটন করতে হবে। এটি কী তাকে হেয় করার চেষ্টা নাকি অন্য কোনো বিষয় সেটি সাংগঠনিকভাবে দেখে, শুনে ও বুঝে আমরা পদক্ষেপ নিব”।
গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তুমুল শোরগোলের মধ্যেই জামায়াতে ইসলামী বিবৃতি দিয়ে বলেছে যে, “গাজী নজরুল ইসলামকে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত খবরের দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নজর রাখছে”।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সাতক্ষীরা-৪ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য জনাব গাজী নজরুল ইসলাম কে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব খবরাখবর প্রচারিত হয়েছে তার প্রেক্ষিতে আজ ২১শে জুলাই (মঙ্গলবার) এক বিবৃতি প্রদান করেছেন।
তিনি বলেন, “অতি সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত খবরের দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নজর রাখছে”।
“ইতোমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে জনাব গাজী নজরুল ইসলামের নিজের বিবৃতি, তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার ভিডিও বক্তব্য মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে আরও খোঁজখবর নিয়ে এবং প্রকৃত ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে,” বিবৃতিতে দলটি বলেছে।