প্রবন্ধ/আহমদ ছফা: আমাদের সক্রেটিস
ড. রাশিদ আসকারী
আহমদ ছফা বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। এক বহুমাত্রিক মনীষা। তাঁর সুবিশাল সৃষ্টিধনুতে যুক্ত ছিল অনেকগুলো রজ্জু: প্রবন্ধ, কবিতা, উপন্যাস, আড্ডা, প্রতিভা অন্বেষণ, সাহিত্য-সমাজ ও রাজনীতি ভাবনা এবং আরো অনেক কিছু। স্বীকার করি, তাঁর সকল রজ্জুই সমান দীপ্তি
ছড়াতে পারেনি। কিন্তু সেটি নিতান্তই গৌণ বিষয়। আমাদের সাহিত্যের প্রধান পুরুষদের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। রবীন্দ্রনাথের হাত দিয়ে কি করে “বৌঠাকুরাণীর হাট” লেখা হলো তা এখনোও অনেকের বিস্ময়। নজরুলের উপন্যাস “বাঁধন হারা”, “মৃত্যুক্ষুধা” কিংবা “কুহেলিকা” কি তাঁর গান ও কবিতার মতো এতো মূল্যবান হয়ে উঠতে পেরেছে? যাই হোক, মহাত্মা ছফার কীর্তির মৌল বিষয় দুটি: প্রথমত-কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ উপদ্রুত ও প্রথা-পীড়িত বাঙালি মুসলমান সমাজে এক উদার, যুক্তিবাদী, মুক্তচিন্তার
পরিবেশ গড়ে তোলার বৌদ্ধিক পরিবেশ সৃষ্টি করা, যার উদ্দীপনা নব্য স্বাধীন দেশে একধরনের গণমানুষের রেনেসাঁ সৃষ্টি করেছিলো। দ্বিতীয়ত- দীর্ঘদিনের সাম্রাজ্যবাদী, উপনিবেশবাদী, ইউরোকেন্দ্রিক ভাবনাভুবন যা প্রতীচী ঔপনিবেশিকতার ধুম্রজাল দিয়ে ব্রিটিশ বঙ্গে বাঙালির চিন্তাজগতকে যুগ যুগ ধরে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো, ভেঙে দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের এক প্রান্তিক জনপদে বি (উত্তর) ঔপনিবেশিক চিন্তার জানালা খুলে দিয়ে বাঙালি মুসলমানের মনজগতকে ডিকলোনাইজ করার প্রচেষ্টা চালানো। উপনিবেশিত
মানবমনের বিউপনিবেশায়নের এই প্রচেষ্টা উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ এবং জগতবিখ্যাত কেনিয় লেখক ও বুদ্ধিজীবী নগুগি ওয়া থিয়ঙ্গো তাঁর সাড়াজাগানো “উবপড়ষড়হরংরহম ঃযব গরহফ” গ্রন্থে এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। দক্ষিন আমেরিকার বিউপনিবেশায়ন বিশ্বের প্রবক্তা যেমন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, মারিও ভার্গাস লোসা, অক্টাভিও পাজ, হোসে মার্টি; কিংবা আফ্রিকার যেমন চিনুয়া অ্যাচেবে, ওলে সোইংকা ও নগুগি ওয়া থিয়ঙ্গো; বাঙালি মুসলিম সমাজের বৌদ্ধিক ভাবনার
বিউপনিবেশায়নের অন্যতম পথিকৃৎ তেমনি আহমদ ছফা। তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ “বাঙালি মুসলমানের মন” ও “বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস” কিংবা উপন্যাস “ওঙ্কার” ও পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ” ঔপনিবেশিক, খুদে-ঔপনিবেশিক, কর্তৃত্ববাদী, আধিপত্যবাদী ভাবনার কারাগার থেকে মুক্তির মহা ইশতেহার।
এগুলোর মধ্যে প্রকাশ্যে ও প্রতীকী ব্যঞ্জনায় বিধৃত বিউপনিবেশায়নের সকল উপাদানÑ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিউপনিবেশায়নের দেশজ ও স্বনির্ধারিত সুত্র খুঁজে পাওয়া যাবে। এর প্রধান শক্তি শেকড়ের প্রতি সুগভীর অনুরাগ, নৈয়ায়িক শৃঙ্খলা, দৃষ্টিভঙ্গির ঋজুতা ও
মুখোশ উন্মোচনের তাগিদ যা একজন উপনিবেশোত্তর লড়াকু লেখকের প্রধান অস্ত্র। এই অস্ত্র প্রয়োগ করে প্রখ্যাত ইটালীয় মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক অ্যান্টোনিয় গ্রামসি তাঁর “কালচারাল হেজেমনি” তত্ত্ব গড়ে তুলেছেন। গ্রামসি মনে করেন যে শোষক শ্রেণি কেবল বলপ্রয়োগে ক্ষমতা ধরে রাখে না, রকমারি সামাজিক বিশ্বাস সৃষ্টির মাধ্যমেও হেজেমনি সংরক্ষণ করে যাতে তাদের আধিপত্য মানুষের কাছে অত্যন্ত স্বাভাবিক মনে হয় এবং মানুষ তা শর্তহীন আনুগত্যে গ্রহণ করে। গ্রামসির তত্ত্ব আরো দেখায় যে কিভাবে শোষিতেরা নিজেদের অধীনস্থ করার প্রক্রিয়াকে শিক্ষা, মিডিয়া ও ধর্মের মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রহণ করে। আহমদ ছফাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখান কিভাবে আমাদের শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা আমাদের শোষণ ও অধীনস্থকরণ প্রক্রিয়াকে সহনীয় ও পোক্ত করে তুলছে। আর এর থেকে নিস্তারের পথ ছফা দেখিয়েছেন
তাঁর লেখায়।
বিশ্ববিখ্যাত জার্মান সাহিত্যিক যোহান ভন গ্যেটের কালজয়ী কাব্যনাট্য “ফাউস্ট”-এর বঙ্গানুবাদ আহমদ ছফার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি। ১৯৭০ সালে শুরু করে এই কাজ শেষ করতে তাঁর লেগেছে দেড় দশকেরও বেশি সময়। অনুবাদকর্মটি মূলানুগ করার জন্যে তিনি দীর্ঘদিন জার্মান ভাষাও রপ্ত করেন এবং এই মহাকাব্যিক রচনার আঙ্গিক সৌকর্য ও ভাবগাম্ভীর্য অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করেন। সৃষ্টিকর্মের পেছনে এতো সময়, অধ্যাবসয় ও নিষ্ঠা দিতে এদেশে সচরাচর কাউকে দেখা যায় না। অনুদিত ফাউস্টের শুরুতে ছফার দীর্ঘ ভূমিকা গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক কর্তৃক ইংরেজিতে অনূদিত জাক দেরিদার “অফ গ্রামাটোলোজি”র ভূমিকার কথা মনে করিয়ে দেয়। ছফার এই কষ্টসাধ্য অনুবাদ একদিকে যেমন বঙ্গভূমিতে ফাউস্ট অধ্যয়নে এক নতুন মাত্রা যুক্ত করে, অন্যদিকে তেমনি এক প্রাতিস্বিক সাহিত্যকর্ম হিশেবেও গণ্য হয়ে ওঠে ছফা আপাদমন্তক একজন গণবুদ্ধিজীবী। প্রখ্যাত ফিলিস্তিনি-মার্কিন বিউপনিবেশায়নের অন্যতম পথিকৃৎ তেমনি আহমদ ছফা। তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ “বাঙালি মুসলমানের মন” ও “বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস” কিংবা উপন্যাস “ওঙ্কার” ও পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ” ঔপনিবেশিক, খুদে-ঔপনিবেশিক, কর্তৃত্ববাদী, আধিপত্যবাদী ভাবনার কারাগার থেকে মুক্তির মহা ইশতেহার। এগুলোর মধ্যে প্রকাশ্যে ও প্রতীকী ব্যঞ্জনায় বিধৃত বিউপনিবেশায়নের সকল উপাদান- রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক উত্তর-উপনিবেশিক তাত্ত্বিক ও গণবুদ্ধিজীবী এডওয়ার্ড সাইদ তাঁর “রেপ্রেজেন্টেশনস অফ দ্য ইন্টেলেকচুয়াল” গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, গণবুদ্ধিজীবীরা ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতা বা কর্পোরেশনের করিডরে পা রাখে না, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে কথা বলে এবং সমাজ/রাষ্ট্রচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও কায়েমি শক্তির চোখে চোখ রেখে কথা বলে। আহমদ ছফা ঠিক সেই ধরনের একজন বুদ্ধিজীবী যিনি চিরকাল সরকার-প্রশাসন-পাওয়ার সযতেœ পরিহার করেছেন, বঞ্চিত- নিপিড়িতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং কর্তৃপক্ষের চোখে চোখে রেখে কথা বলেছেন। তিনি পাশে না দাঁড়ালে অনেক প্রতিভাই অংকুরেই বিনষ্ট হতো।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, কতিপয় ঘোষিত ছফা-শিষ্য, যারা প্রবলভাবে মানস-সাম্প্রদায়িক, অসাম্প্রদায়িক ছফার দর্শনের স্বত্বাধিকারী সেজে নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্যে গুরুকে যথেচ্ছ ব্যবহার করছেন। এঁদের ছফাবন্দনা প্রয়াত পীরের প্রতি জীবিত মুরিদের অতিরঞ্জিত স্তব ছাড়া আর কিছুই না। পীরকে সবার ওপরে স্থান দিতে গিয়ে তারা লাগামহীনভাবে অন্যদের খাটো করে চলেছেন। প্রকারান্তরে তারা খাটো করছেন তাদের গুরুকেই আর নিজেদের করছেন তামাশাপাত্র। “বাঙালি মুসলমানের মন” এবং “বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস” সুঅনূদিত হয়ে আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশিত হলে আহামদ ছফা বাঙালি মুসলমান সমাজে চলমান বিউপনিবেশায়নের অগ্রগণ্য দূত হিশেবে নতুন উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হবেন। প্রাগৈতিহাসিক ভাবনার
ভ- খাদেমরা সর্বচ্চো তাঁকে এক গোষ্ঠীপীরের আসনে বসাতে পারেন, কিন্তু বৈশ্বিক উচ্চতায় উন্নীত করতে পারেন না, যদিয় তাঁর সেই যোগ্যতা আছে। গুরুমারা শিষ্যের কথা আমাদের সবারই জানা। শিষ্য যদি প্লেটোর মতো হয়, তবে গুরু সক্রেটিসের মহিমা প্রকাশে সমস্যা হয় না। কিন্তু যদি জেনোফোন কিংবা অ্যারিস্টোফেনিসের মতো হয়, তাহলেই তো সর্বনাশ আমাদের সক্রেটিস আহামদ ছফার মূল্যায়নে প্লেটোদেরই এগিয়ে আসতে হবে। মোটাবুদ্ধির জেনোফোন গুরুর সত্যিকার বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ পরিমাপ
করতে পারেন নাই। আবার অ্যারিস্টোফেনিসের বিকৃত মূল্যায়ন গুরুকে মিথ্যে অভিযোগে হেমলকের পাত্র পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলো। আহমদ ছফার সে ধরনের শিষ্যের দরকার নেই। স্বঘোষিত ছফাবাদীদের হাত থেকে ছফাকে বাঁচাতে হবে ।
ড. রাশিদ আসকারী: দ্বিভাষিক লেখক, অনুবাদক, অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ ও প্রাক্তন উপাচার্য,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ।









