প্রশ্ন তৈরি করে স্কুল থেকে টাকা নেওয়া অভিযোগ উপজেলা শিক্ষক সমিতির বিরুদ্ধে
ইব্রাহিম খলিল: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উদ্যোগে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরির নিয়ম থাকলেও সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় বিভিন্ন বিদ্যালয়ের পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি ও সরবরাহ করছে উপজেলা শিক্ষক সমিতি। এর বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ১০ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। শুধু এসএসসি পরীক্ষার্থীদের নির্বাচনী পরীক্ষা নয়, অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নও সমিতির মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ নিয়ে প্রশ্ন তৈরির এখতিয়ার ও অর্থ আদায়ের বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে এবং অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক মিজ কাওসার আজিজ। সাতক্ষীরা সদর উপজেলা শিক্ষক সমিতির আওতায় থাকা ৪৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০ থেকে ২২টি প্রতিষ্ঠান সমিতির কাছ থেকে প্রশ্ন নেয় বলে জানিয়েছেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল্লাহ। তবে কোন প্রতিষ্ঠান কত টাকা দেয় এবং প্রশ্ন তৈরির খরচ কীভাবে নির্ধারণ করা হয়, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সমিতির কাছ থেকে সব বিষয়ের প্রশ্ন নিতে একেকটি প্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষাভেদে ১০ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। সদর উপজেলার কুশখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল জব্বার এই প্রতিবেদককে জানান, তাঁদের বিদ্যালয়ে ৪৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে এবং শিক্ষক সমিতির কাছ থেকে প্রশ্ন নেওয়ায় গত অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় সব বিষয়ের প্রশ্নের জন্য ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
সাতক্ষীরা রসুলপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আশরাফুর রহমান বলেন, শিক্ষকদের নিজেদের প্রশ্ন তৈরির দক্ষতা বাড়ানোর জন্য চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি শিক্ষকদের সিলেবাস দিয়ে প্রশ্ন তৈরির প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেন এবং এর আগে একবার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার জন্য সমিতির কাছ থেকে প্রশ্ন নেওয়ায় ১৮ হাজার টাকা বিল এসেছিল। পরে হিসাব করে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী নিজেরা প্রশ্ন তৈরি করলে ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকার মধ্যে খরচ করা সম্ভব, যা ব্যয় কমার পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশ্ন তৈরির দক্ষতাও বাড়াবে। তাঁর ভাষ্যমতে, সাতক্ষীরা রসুলপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পুলিশ লাইন সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় নিজেদের প্রশ্ন নিজেরাই তৈরি করে।
যশোর শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের নির্বাচনী পরীক্ষা ১৫ অক্টোবর থেকে ১৫ নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও সাতক্ষীরার কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১৫ অক্টোবর থেকে পরীক্ষা শুরু করলেও শিক্ষক সমিতির কাছ থেকে প্রশ্ন নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো ২৭ অক্টোবর থেকে সমিতির নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা শুরু করে। অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নও সমিতির মাধ্যমে সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল্লাহ বলেন, “সব স্কুল তো আসে না, ২০-২২টি স্কুল যে পারে, তারা নেয়। সমিতির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে হয়। তবে এটা এখন পার্ট পার্ট হয়ে গেছে।” এটা হয়ে আসছে ৩০ বছর আগে থেকে। এখন নিয়ম হচ্ছে, সরকারি নিয়ম হলো প্রশ্ন করবে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান। সরকারি নিয়মের বাইরে তো আমরা যেতে পারি না। সমিতির প্রশ্ন করার কোনো নিয়ম নেই। এখন করা হয়ে গেছে, আর করা হবে না, যা হয়েছে তাতে পরীক্ষা নেয়া হোক।”
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবুল হোসেন বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উদ্যোগে প্রশ্নপত্র তৈরির কথা এবং আগে শিক্ষক সমিতির মাধ্যমে প্রশ্ন তৈরির প্রচলন থাকলেও এ নিয়ে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কোনো অভিযোগ তাঁরা পাননি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের প্রশ্ন নিজেরা তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে; লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নিতে সুবিধা হবে।
জেলা প্রশাসক মিজ কাওসার আজিজ বলেন, শিক্ষক সমিতির প্রশ্ন তৈরির কোনো এখতিয়ার আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। বিষয়টি তিনি সাংবাদিকের কাছ থেকেই প্রথম জেনেছেন এবং সমিতিকে সতর্ক করার পাশাপাশি এ ধরনের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।









