ফুলদানির নিঃশব্দ কান্না
মোঃ নাজির হোসেন
ড্রয়িংরুমের মাঝখানে রাখা কাঁচের ফুলদানিটা দেখে যে কেউ মুগ্ধ হতো। রঙিন ফুলগুলো যেন হাসতে জানত। অতিথিরা বলতেন, “কী সুন্দর সাজানো!” কিন্তু কেউ জানত না, ফুলগুলোর বেশির ভাগই ছিল কৃত্রিম। দূর থেকে অপূর্ব, কাছে গিয়ে প্রাণহীন।
একদিন গ্রামের স্কুল শিক্ষক আবদুল করিম তাঁর ছাত্রদের নিয়ে আলোকপাত করছিলেন। তিনি ফুলদানির দিকে তাকিয়ে বললেন, জীবনে এমন অনেক কিছু আছে, যা বাইরে থেকে সুন্দর মনে হয়; কিন্তু ভেতরে থাকে শূন্যতা। মানুষের চরিত্রও তেমন হতে পারে। ছাত্ররা নীরবে শুনছিল।
সেই গ্রামেই থাকত মেজবাহ ও মেহজাবীন। তাদের সংসার একসময় ছিল ঈর্ষণীয়। ছোট্ট মহুয়া , বৃদ্ধ মা আর সুখী পরিবার যাহা ছিলো ফুলদানিতে সাজানো একটি স্বপ্নভরা ফুলঘর। কিন্তু ধীরে ধীরে বিশ্বাসের জায়গায় ফাটল ধরল। অযথা গোপনীয়তা, অকারণ ব্যস্ততা, লুকানো ফোনালাপ-সবকিছু মিলিয়ে সম্পর্কের ভিত দুর্বল হতে লাগল।
একদিন সত্য প্রকাশ পেল। বৈবাহিক অঙ্গীকার ভেঙে অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল একজন। যে সম্পর্ককে শুরুতে স্বাধীনতা ও আনন্দ মনে হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল অনুশোচনা, অশান্তি আর বিচ্ছেদের কারণ। সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেল ছোট্ট রাফি। সে বুঝতে পারত না, কেন তার বাবা-মা আর একসঙ্গে বসে খায় না, কেন তাদের ঘরের হাসি হারিয়ে গেছে।
শিক্ষক আব্দুল করিম সাহেব একদিন গ্রামের সভায় বললেন, যে কোনো অবৈধ সম্পর্ক শুধু দুজন মানুষের বিষয় নয়। এর প্রভাব পড়ে সন্তান, পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং পুরো সমাজে। বিশ্বাস ভেঙে গেলে ঘর ভাঙে; আর ঘর ভাঙলে সমাজও দুর্বল হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বললেন, অন্যায়ের প্রতিকার আইন করতে পারে, চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক রোগের ওষুধ আবিষ্কার করেছে। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা, অসততা আর নৈতিক অবক্ষয়ের একমাত্র প্রতিষেধক হলো আত্মসংযম, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সততা এবং মূল্যবোধ। সেদিন সভায় উপস্থিত অনেকেই মাথা নিচু করে ছিলেন। কেউ নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন, কেউ পরিবারকে আরও সময় দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছেন।
কয়েক মাস পরে গ্রামের মসজিদ, মন্দির, স্কুল এবং সামাজিক সংগঠনগুলো মিলে পরিবারকে কেন্দ্র করে সচেতনতামূলক আলোচনা শুরু করল। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মান, সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে নিয়মিত কথা হতে লাগল। ধীরে ধীরে গ্রামের পরিবেশ বদলাতে শুরু করল।
করিম সাহেব আবার সেই ফুলদানির সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, কৃত্রিম ফুল দেখতে সুন্দর হতে পারে, কিন্তু তার কোনো সুগন্ধ নেই। তেমনি প্রতারণা ও অবৈধ সম্পর্ক হয়তো সাময়িক মোহ সৃষ্টি করে, কিন্তু সেখানে প্রকৃত ভালোবাসা, শান্তি ও মর্যাদা থাকে না। সত্যিকারের সুখ ফুটে ওঠে বিশ্বাস, বিশ্বস্ততা এবং পারস্পরিক সম্মানের বাগানে। ফুলদানির পাশে রাখা একটি তাজা গোলাপ তখন হালকা বাতাসে দুলছিল। তার সুগন্ধে যেন ঘর ভরে উঠল। শুধু নিঃশব্দে কান্না করতে লাগলো ফুলদানিটা তাজা গোলাপ আঁকড়ে রাখতে না পারার কারণে। একটি পরিবার টিকে থাকে বিশ্বাস, সততা ও দায়িত্ববোধের ওপর। সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা, আত্মসংযম এবং পারস্পরিক সম্মানই একটি সুস্থ পরিবার ও সুন্দর সমাজ গঠনের ভিত্তি।
কোনো ব্যক্তিকে উদ্যেশ্য প্রনোদিত করে নয়। সম্পূর্ণ কাল্পনিক ঘটনা।








