মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

বাড়তে পারে যেসব পণ্যের দাম

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ৫:২২ অপরাহ্ণ
বাড়তে পারে যেসব পণ্যের দাম

তামাকপণ্য থেকে আমদানি করা গাড়ি, কাজুবাদাম, মধু ও নির্মাণসামগ্রীতে নতুন অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক ও কর বৃদ্ধির প্রভাবে বাড়তে পারে। কারণ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বেশ কয়েকটি পণ্য ও সেবার ওপর শুল্ক ও কর বৃদ্ধি করেছে সরকার। এর ফলে বাজারে কিছু পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সিগারেট, আমদানি করা জ্বালানিচালিত গাড়ি, বিদেশি কাজুবাদাম, মধু, সুপারি, রড এবং বিভিন্ন আমদানিনির্ভর ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব শুল্ক ও কর সংশোধনের প্রস্তাব দেন। বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই এসব পরিবর্তন কার্যকর হয়েছে।

সিগারেটে বাড়ছে করের চাপ

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার যুক্তিতে সিগারেটের সব স্তরের ন্যূনতম খুচরা মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। নিম্নস্তরের ১০ শলাকার সিগারেটের মূল্য ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরের ৯২ টাকা, উচ্চ স্তরের ১৬০ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তরের ২১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে নিকোটিন গ্র্যানুলস ও নিকোটিন পাউচের ওপর ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

তেলচালিত গাড়ি কেনা হবে আরও ব্যয়বহুল

পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহ দিতে অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন (আইসিই) চালিত গাড়ির ওপর করভার বাড়িয়েছে সরকার। বিশেষ করে ১,২০০ থেকে ১,৬০০ সিসি ক্ষমতাসম্পন্ন আমদানি করা পেট্রল, অকটেন বা ডিজেলচালিত গাড়ির করভার ১৩২ শতাংশের বেশি থেকে প্রায় ১৫৬ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে।

এতে মধ্যম আয়ের ক্রেতাদের মধ্যে জনপ্রিয় গাড়িগুলোর দাম আরও বেড়ে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিদেশি কাজুবাদাম, মধু ও সুপারিতে বাড়তি শুল্ক

দেশীয় উৎপাদনকে সুরক্ষা দিতে অপ্রক্রিয়াজাত ও প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক যথাক্রমে ১ ও ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে বিদেশি কাজুবাদামের দাম বাড়বে।

এছাড়া আমদানি করা প্রাকৃতিক মধুর ন্যূনতম শুল্কায়ন মূল্য প্রতি ইউনিটে ২ ডলার বাড়ানো হয়েছে। একইভাবে সুপারি আমদানির ক্ষেত্রেও শুল্কায়ন মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে এসব পণ্য আমদানিতে করের পরিমাণ বাড়বে এবং বাজার দরেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

বিদেশি খাদ্যপণ্যের দামও বাড়ার আশঙ্কা

সুগার কনফেকশনারি, কফি, প্রস্তুতকৃত খাবারসহ বিভিন্ন আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্যের শুল্কায়ন মূল্য বাড়ানো হয়েছে। ফলে আমদানিকারকদের কর ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিলাসী ও প্রক্রিয়াজাত বিদেশি খাদ্যপণ্যের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হবে।

এলপিজি সিলিন্ডার ও প্রসাধনীতে বাড়তি খরচ

কম্পোজিট এলপিজি সিলিন্ডার আমদানির ওপর ভ্যাট আরোপ করায় এসব সিলিন্ডারের দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে লিপলাইনার, লিপজেলসহ কিছু প্রসাধনী পণ্যের শুল্কায়ন মূল্যও বাড়ানো হয়েছে।

ফলে বিদেশি ব্র্যান্ডের প্রসাধনী ব্যবহারকারীদের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হতে পারে।

দেশি মাছ ও কৃষিপণ্যেও প্রভাব

দেশীয় মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পকে সুরক্ষা দিতে আমদানি করা পাঙাশ মাছের ফিলের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এতে বিদেশি পাঙাশের ফিলের বাজার আরও ব্যয়বহুল হতে পারে।

নির্মাণ খাতে বাড়তে পারে ব্যয়

বাজেটে রড উৎপাদনের বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর ভ্যাট বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে নির্মাণ খাতের অন্যতম প্রধান উপকরণ রডের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রডের মূল্যবৃদ্ধি হলে আবাসন ও অবকাঠামো খাতের নির্মাণ ব্যয়ও বাড়তে পারে। এতে ফ্ল্যাট, বাড়ি ও বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পের খরচে নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার ও গৃহস্থালি পণ্যেও মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা

শুল্ক ও শুল্কায়ন মূল্য বৃদ্ধির কারণে বিদেশি টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার, বেসিন, ফোম, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, সাইকেল, খেলনা এবং বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্যের দামও বাড়তে পারে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানিনির্ভর এসব পণ্যের ক্ষেত্রে কর বৃদ্ধির পুরো চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই পড়ার সম্ভাবনা বেশি।

কী বলছেন বিশ্লেষকরা

অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন বাজেটে একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর কমিয়ে সাধারণ মানুষের স্বস্তি বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে, অন্যদিকে বিলাসী ও আমদানিনির্ভর পণ্যের ওপর কর বাড়িয়ে রাজস্ব আহরণ এবং দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষার কৌশল নেওয়া হয়েছে।

তবে কর বৃদ্ধির কারণে কিছু পণ্যের বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নির্মাণসামগ্রী, ব্যক্তিগত পরিবহন এবং বিদেশি ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে এর প্রভাব দ্রুত দৃশ্যমান হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে

সিগারেট ও নিকোটিন পাউচ
১২০০-১৬০০ সিসি তেলচালিত গাড়ি
বিদেশি কাজুবাদাম
বিদেশি মধু
বিদেশি সুপারি
আমদানি করা কফি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য
বিদেশি পাঙাশ মাছের ফিলে
এলপিজি সিলিন্ডার
লিপলাইনার ও লিপজেল
রড
বিদেশি টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যার
মাইক্রোওয়েভ ওভেন
সাইকেল ও খেলনা।

Ads small one

শ্যামনগরের কৈখালীতে পাচারের অভিযোগে বিএডিসির ৭৫ বস্তা সার আটক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ৬:৫৩ অপরাহ্ণ
শ্যামনগরের কৈখালীতে পাচারের অভিযোগে বিএডিসির ৭৫ বস্তা সার আটক

0-4480x2016-0-0-{}-0-12#

সংবাদদাতা: সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী ইউনিয়নে পাচারের অভিযোগে বিএডিসির ৭৫ বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই), সকাল ১০ টায় কৈখালী ইউনিয়নের জয়াখালী চেয়ারম্যান বাড়ী মোড়ে চেয়ারম্যান শেখ আব্দুর রহিমের নেতৃত্বে উক্ত সার জব্দ করা হয়। চেয়ারম্যান শেখ আব্দুর রহিম জানান, বিএডিসির সার মূলত নিবন্ধিত সার ডিলার ও কৃষকেরা পেয়ে থাকেন।

 

সরকারের সমন্বিত নীতিমালা অনুযায়ী লাইসেন্সপ্রাপ্ত ডিলাররা বিএডিসি থেকে সরকারি মূল্যে ও কোটায় সার তুলে মাঠ পর্যায়ে প্রান্তিক কৃষকদের কাছে বিক্রি করেন। কিন্তু নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কৈখালী ইউনিয়নের বোশখালী গ্রামের আদর আলীর পুত্র, আরিক এন্টারপ্রাইজের স্বত্ত্বাধিকারী মোঃ আমিনুর রহমান শাপলা এন্টারপ্রাইজ নামীয় একটি লাইসেন্স নিয়ে বিএডিসির সার উত্তোলন করেন। শাপলা এন্টারপ্রাইজের লাইসেন্সের মালিক সাতক্ষীরার জনৈক রোজিনা খাতুন।

কৈখালী ইউপি চেয়ারম্যান শেখ আব্দুর রহিম আরো বলেন, আমিনুর রহমানের বিএডিসির লাইসেন্স না থাকার পরেও সাতক্ষীরার রোজিনা খাতুনের নামীয় শাপলা এন্টারপ্রাইজের লাইসেন্স ব্যবহার করে সার উত্তোলন করে কৈখালী ইউনিয়নের প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে ন্যায্য মূল্যে বিক্রয় না করে কৌশলে উচ্চ দামে অন্য ইউনিয়নে বিক্রয় করে আসছেন। আমার ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শাপলা এন্টারপ্রাইজের ট্রেড লাইসেন্স নাই বা ইউনিয়নে সারের কোন গোডাউন নাই। বিষয়টি নিয়ে আমি বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে অভিযোগ করলেও সমাধান হয়নি। অবশেষে মঙ্গলবার সকালে ইউনিয়নে সার পাচার করার সময় আমি জব্দ করি।

জয়াখালী গ্রামের কৃষক মোহাম্মাদ আলীর পুত্র হাফিজুর রহমান বলেন, আমরা বিএডিসির ডিলালের কাছে গিয়ে সার ক্রয় করতে পারি না। সার নিলে বিষ নিতে হবে এমন শর্ত বেধে দেন ডিলার। এ কারনে বাইরে থেকে বেশি দামে সার ক্রয় করতে হয়।
এ বিষয়ে আমিনুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করার জন্য তার মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি।

শ্যামনগর উপজেলা উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা দিবাশীষ দাস বলেন, বিষয়টি চেয়ারম্যান জানানোর পরে স্যারকে অবগত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামসুজ্জাহান কনক বলেন, বিষয়টি জানার পরে কৃষি অফিসারকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

যশোরে জামায়াতের এমপির বাড়ি ভাঙচুর, মহাসড়ক অবরোধ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ৫:৪৯ অপরাহ্ণ
যশোরে জামায়াতের এমপির বাড়ি ভাঙচুর, মহাসড়ক অবরোধ

অনলাইন ডেস্ক: যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম রসুলের শহরের নীলগঞ্জের বাড়ি ভাঙচুর ও বিক্ষোভ করেছে স্থানীয়রা। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকালে এ বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে যশোর-নড়াইল মহাসড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানায় বিক্ষুব্ধ জনতা। এতে সড়কটিতে যান চলাচল ব্যাহত এবং এলাকায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, নীলগঞ্জ এলাকার আল মাদ্রাসাতুশ শারইয়াহ ও সংশ্লিষ্ট মসজিদকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। এ বিরোধের জের ধরে মঙ্গলবার সকালে এমপি গোলাম রসুল ও তার মেয়ে অনন্যার বিরুদ্ধে মাদ্রাসার শিশু শিক্ষার্থী আয়ান এবং রেক্সনা নামে এক নারীর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে ওই নারীর মাথা ফেটে যায়।

জানা যায়, বিরোধের এ ঘটনা সোমবার রাতে দুই পক্ষের মধ্যে মীমাংসা হয়। তবে মঙ্গলবার সকালে মাদ্রাসা খুললে গোলাম রসুল তা বন্ধ রাখতে বলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপরই স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। প্রতিবাদে সকাল ১০টার দিকে তারা একত্রিত হয়ে এমপির বাড়ির সামনে অবস্থান নেন এবং বিক্ষোভ শুরু করেন।

 

বিক্ষোভকারীদের আরও দাবি, সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসাটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। তাদের অভিযোগ, ওই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সব সময়ই গোলাম রসুল ও তার মেয়ে খারাপ আচরণ করে আসছেন। এরপর এমপির মেয়ে এক নারীকে পিটিয়ে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিক্ষোভ চলাকালে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিষয়টি মীমাংসার উদ্দেশ্যে গোলাম রসুলের এক স্বজন ঘটনাস্থলে এলে বিক্ষুব্ধ জনতার একাংশ তার ওপর চড়াও হয়। এ সময় তাকে মারপিটের ঘটনাও ঘটে। পরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিক্ষোভকারীরা যশোর-নড়াইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। তারা এমপি গোলাম রসুল ও তার মেয়ের বিচারের দাবিতে দীর্ঘ সময় সড়কে অবস্থান করে।

খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাসুম খানসহ একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তিনি জানান, দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়েছে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করেন।

 

এ বিষয়ে যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের স্ত্রী শারমিন ভিনা জানান, তার মেয়ে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তিনি বলেন, মাদ্রাসা বন্ধ থাকলেও সেখানে শিশুরা বিভিন্ন সময় এসে গোলযোগ সৃষ্টি করে। এর প্রতিবাদ করেছিলেন তার মেয়ে অন্যনা। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের সঙ্গে শত্রুতা তৈরি হয়েছে। এখন অহেতুক তাদের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

উপকূলের জীবন, দেশের ভবিষ্যৎ/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ৫:২৫ অপরাহ্ণ
উপকূলের জীবন, দেশের ভবিষ্যৎ/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে সহজেই বোঝা যায়, এই দেশ নদীর দেশ, বদ্বীপের দেশ এবং একই সঙ্গে উপকূলের দেশ। দক্ষিণের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে নদী, খাল, মোহনা ও সমুদ্রের যে মিলনভূমি, সেখানে গড়ে উঠেছে এক অনন্য জীবনব্যবস্থা। সুন্দরবনঘেরা উপকূলের মানুষের জীবন যেন জোয়ার-ভাটার ছন্দে বাঁধা। এখানে প্রকৃতি শুধু পরিবেশ নয়, জীবিকার উৎস; আবার সেই প্রকৃতিই অনেক সময় হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ।সুন্দরবন উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা নিয়ে আলোচনা মানে কেবল দারিদ্র্য বা দুর্যোগের কথা বলা নয়; এটি বাংলাদেশের পরিবেশ, অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও জলবায়ু ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলা। কারণ এই উপকূল বেঁচে থাকলে দেশের একটি বড় অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভিত্তি বেঁচে থাকবে।

 

একসময় দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জীবন ছিল নদীনির্ভর স্বয়ংসম্পূর্ণ এক অর্থনীতির উদাহরণ। নদী ছিল মাছের ভা-ার, খাল ছিল পানির আধার, পলি ছিল কৃষির প্রাণ। কৃষক বর্ষায় নদীর আশীর্বাদ পেতেন, শুষ্ক মৌসুমে জমিতে ধান ফলাতেন। জেলে নদীতে মাছ ধরতেন, মৌয়াল সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতেন, বাওয়ালিরা বনজ সম্পদ আহরণ করতেন। কিন্তু গত কয়েক দশকে এই চিত্র দ্রুত বদলে গেছে।

 

নদীর নাব্যতা কমেছে, খাল ভরাট হয়েছে, জলাবদ্ধতা বেড়েছে এবং লবণাক্ততা ভেতরের দিকে অগ্রসর হয়েছে। ফলে ঐতিহ্যগত জীবনব্যবস্থার ভারসাম্য ভেঙে পড়ছে। সুন্দরবনকে অনেকেই শুধু রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল হিসেবে দেখেন। বাস্তবে এটি উপকূলীয় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। ঘূর্ণিঝড়ের গতি কমানো, জলোচ্ছ্বাসের আঘাত প্রশমিত করা, নদীর তীর রক্ষা করা এবং জীববৈচিত্র্েযর ভারসাম্য বজায় রাখতে সুন্দরবনের ভূমিকা অপরিসীম। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের হাজার হাজার পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল।

 

মধু, গোলপাতা, মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ির পোনাÑএসব শুধু বনজ সম্পদ নয়; এগুলো অসংখ্য পরিবারের দৈনন্দিন আয়ের উৎস। কিন্তু বনও সীমাহীন সম্পদের আধার নয়। অতিরিক্ত আহরণ, দূষণ, নদী দখল, অবৈধ কর্মকা- এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন সুন্দরবনের স্বাভাবিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সুন্দরবনের ক্ষতি মানে উপকূলের মানুষের নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়া। উপকূলের সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটগুলোর একটি হলো লবণাক্ততা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী লোনা পানির অনুপ্রবেশের কারণে অনেক এলাকায় কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে। সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর, কালীগঞ্জ কিংবা খুলনার কয়রা ও দাকোপ অঞ্চলে এখন সুপেয় পানির জন্য মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়।

 

পুকুরের পানি লবণাক্ত, নলকূপে লবণ, জমিতে লবণÑএই বাস্তবতা শুধু কৃষিকে নয়, মানুষের স্বাস্থ্যকেও হুমকির মুখে ফেলছে। বিশেষ করে নারীদের ওপর এর প্রভাব বেশি। অনেক এলাকায় প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হয়। এটি সময়ের অপচয় নয়; এটি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নও। উপকূলীয় কৃষি এখন গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় যেখানে ধান ছিল প্রধান ফসল, সেখানে এখন চিংড়িঘেরের বিস্তার ঘটেছে। চিংড়ি রপ্তানি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও এর পরিবেশগত মূল্য কম নয়।

 

চিংড়ী চাষের ফলে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়,মিঠাপানির উৎস নষ্ট হয়,
কৃষিজমি কমে যায়, ক্ষুদ্র কৃষক জমি হারান, কৃষিশ্রমিকদের কর্মসংস্থান কমে যায়। ফলে উপকূলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈষম্য বাড়ছে। কিছু মানুষ লাভবান হলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠী অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। উপকূলের অর্থনীতির আরেকটি বড় ভিত্তি মৎস্যসম্পদ। কিন্তু নদীর পরিবর্তিত পরিবেশ, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, অতিরিক্ত আহরণ এবং দূষণের কারণে দেশীয় মাছের প্রজাতি কমে যাচ্ছে।

জেলেদের আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। অনেকেই ঋণের বোঝায় জর্জরিত। মাছ কমে গেলে শুধু জেলের ক্ষতি হয় না; স্থানীয় বাজার, পরিবহন, বরফকল, আড়তÑসমগ্র অর্থনৈতিক শৃঙ্খল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উপকূলের মানুষ দুর্যোগের সঙ্গে বসবাস করতে শিখেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সহনশীলতার সীমা কোথায়?সিডর, আইলা, আম্পান, ইয়াস কিংবা সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়গুলো দেখিয়েছে, একটি দুর্যোগ কয়েক দশকের উন্নয়নকে মুহূর্তে ধ্বংস করে দিতে পারে। ঘরবাড়ি ভাঙে, ফসল নষ্ট হয়, মাছের ঘের ভেসে যায়, পানির উৎস দূষিত হয়। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। প্রতিবার দুর্যোগের পর ত্রাণ ও পুনর্বাসন হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি জীবিকা পুনর্গঠন খুব কম ক্ষেত্রেই নিশ্চিত হয়। উপকূলের আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো নদীভাঙন। বেতনা, কপোতাক্ষ, শিবসা, পশুরসহ বিভিন্ন নদীর তীরবর্তী মানুষ প্রতিনিয়ত ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কায় থাকেন।

 

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল বেড়িবাঁধ। অনেক বাঁধ বছরের পর বছর মেরামতের অপেক্ষায় থাকে। কোথাও সামান্য ফাটল বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দেয়। বাঁধ ভেঙে লোনা পানি ঢুকে পড়লে শুধু একটি মৌসুম নয়, বহু বছরের জন্য জমির উৎপাদনক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এখানেই উন্নয়ন পরিকল্পনার বড় দুর্বলতা স্পষ্ট হয়। একই বাঁধ বারবার মেরামত করা হয়, কিন্তু নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি উপকূল ব্যবস্থাপনার প্রশ্নগুলো উপেক্ষিত থেকে যায়। উপকূলের সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করেন নারীরা।

 

পানি সংগ্রহ, পরিবার রক্ষা, দুর্যোগের পর ঘর পুনর্গঠন, হাঁস-মুরগি পালন, ক্ষুদ্র ব্যবসাÑসবক্ষেত্রেই তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষ সদস্যরা অনেক সময় কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে গেলে নারীদেরই পরিবার টিকিয়ে রাখতে হয়। অথচ নীতিনির্ধারণী আলোচনায় তাদের অভিজ্ঞতা খুব কমই গুরুত্ব পায়। সংকটের মধ্যেও উপকূলের মানুষ অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে। তারাÑলবণসহিষ্ণু ধানের জাত ব্যবহার করছে, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করছে,ভাসমান কৃষি করছে, কাঁকড়া ও হাঁস পালন বাড়াচ্ছে, ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে তুলছে। এই উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে, উপকূলের মানুষ শুধু সাহায্যপ্রার্থী নয়; তারা পরিবর্তনের সক্রিয় অংশীদার হতে সক্ষম।

 

উপকূলের জীবন-জীবিকা রক্ষায় বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, সমন্বিত নীতি প্রয়োজন। প্রথমত, নদী ও খাল পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, টেকসই ও বিজ্ঞানভিত্তিক বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। তৃতীয়ত, সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, কৃষি ও মৎস্যখাতে জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করতে হবে। পঞ্চমত, সুন্দরবন সংরক্ষণকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় অংশ করতে হবে।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্থানীয় জনগণকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। উপকূলের বাস্তবতা বোঝার সবচেয়ে বড় উৎস সেখানকার মানুষ। বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে আমরা যখন বড় বড় পরিসংখ্যানের কথা বলি, তখন মনে রাখতে হবেÑউপকূলের মানুষের নিরাপত্তা ছাড়া সেই উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। উপকূল শুধু একটি ভৌগোলিক প্রান্ত নয়; এটি দেশের খাদ্য, মৎস্য, পরিবেশ ও জলবায়ু নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি।

 

সুন্দরবন বাঁচলে উপকূল বাঁচবে, উপকূল বাঁচলে নদী বাঁচবে, আর নদী বাঁচলে বাংলাদেশ তার প্রকৃত নদীমাতৃক পরিচয় ধরে রাখতে পারবে। তাই উপকূলের জীবন-জীবিকার প্রশ্নকে আর প্রান্তিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আজ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্ন। উন্নয়ন, পরিবেশ ও মানুষের জীবিকার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই কেবল উপকূলের মানুষ নিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে এগোতে পারবে, আর সেই ভবিষ্যৎই হবে বাংলাদেশের টেকসই অগ্রগতির সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি।

লেখক: সংবাদকর্মী