বাথরুমে কেন ঘটে স্ট্রোকের ঘটনা?
‘অমুক বাথরুমে গিয়ে স্ট্রোক করেছেন’ এমন খবর মাঝেমধ্যেই শোনা যায়। কখনও গোসল করতে গিয়ে, কখনও আবার শৌচকর্মের সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন কেউ। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, বাথরুমের সঙ্গে স্ট্রোকের ঘটনার কি বিশেষ কোনও যোগ রয়েছে, নাকি এটি নিছক কাকতালীয়?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি একটু জটিল। বাথরুমে গেলেই স্ট্রোক হয়, এমন নয়। তবে গোসলের সময় তাপমাত্রার আকস্মিক পরিবর্তন, শৌচকর্মের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া, রক্তচাপের ওঠানামা এবং আগে থেকে থাকা কিছু অসুস্থতা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আবার বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পাওয়াও গুরুতর বিপদের কারণ হয়।
বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সতর্ক থাকা জরুরি। তবে বাথরুমে ঘটে যাওয়া সব আকস্মিক অসুস্থতাকে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাক ভেবে নেওয়াও ঠিক নয়। অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং স্ট্রোক এগুলোর কারণ ও লক্ষণ আলাদা হতে পারে।
বাথরুমে স্ট্রোকের ঝুঁকির পেছনে কী কী কারণ থাকতে পারে?
১. হঠাৎ ঠান্ডা পানির সংস্পর্শ: খুব ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে এলে শরীরের রক্তনালি সংকুচিত হতে পারে এবং রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। এতে হৃদ্যন্ত্রের ওপর চাপও বাড়ে। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঠান্ডা পানির আকস্মিক প্রভাব এড়ানো ভালো। তবে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করলেই স্ট্রোক হবে, এমন প্রমাণ নেই। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ঠান্ডা পানির প্রভাবে রক্তনালির সংকোচন ও রক্তচাপ বৃদ্ধির মতো পরিবর্তন হতে পারে।
২. শৌচকর্মের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া: কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দিতে হলে শরীরে রক্তচাপ ও হৃদ্স্পন্দনের পরিবর্তন ঘটতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কারও কারও মাথা ঘুরতে পারে বা অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন। একে কখনও কখনও ভ্যাসোভ্যাগাল সিনকোপ বলা হয়। তবে এ ধরনের অজ্ঞান হয়ে যাওয়া আর স্ট্রোক এক বিষয় নয়। মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, শৌচকর্মের সময় চাপ দেওয়া অজ্ঞান হওয়ার একটি সম্ভাব্য উদ্দীপক।
৩. ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়া: রাতের ঘুম থেকে উঠে দ্রুত বিছানা ছেড়ে দাঁড়ালে কারও কারও রক্তচাপ সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে। একে অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন বলা হয়। এর ফলে মাথা ঘোরা, চোখে অন্ধকার দেখা কিংবা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। রাতে প্রস্রাব করতে উঠে এমন সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। মায়ো ক্লিনিকের ব্যবাখ্যা অনুযায়ী, প্রস্রাবের সময় বা ঠিক পরেই রক্তচাপ হঠাৎ কমে গিয়ে অজ্ঞান হওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে।
৪. অতিরিক্ত গরম পানি দিয়ে গোসল: খুব গরম পানি বা বাষ্পযুক্ত পরিবেশে থাকলে রক্তচাপ কমে মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। বিশেষত বয়স্ক ব্যক্তি, পানিশূন্যতায় ভোগা মানুষ এবং রক্তচাপ কমানোর ওষুধ গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। তাই অতিরিক্ত গরম পানিতে দীর্ঘক্ষণ গোসল না করা এবং গোসলের পর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ানো ভালো। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক এ বিষয়ে সতর্ক করেছে।
কারা বেশি সতর্ক থাকবেন?
বয়স বাড়ার সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, ধূমপান, হৃদ্রোগ এবং আগে স্ট্রোক বা সাময়িক স্ট্রোকের মতো উপসর্গের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। আমেরিকান স্ট্রোক অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকির কারণ।
বাথরুমে দুর্ঘটনা এড়াতে কী করবেন?
কোষ্ঠকাঠিন্য এড়াতে পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং আঁশযুক্ত খাবার খান। শৌচকর্মের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া এড়িয়ে চলুন। ঘুম থেকে উঠে প্রথমে কিছুক্ষণ বসুন, তারপর ধীরে ধীরে দাঁড়ান। খুব ঠান্ডা বা অতিরিক্ত গরম পানির আকস্মিক সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। বাথরুমের মেঝে শুকনো রাখুন এবং প্রয়োজনে পিছলে যাওয়া রোধ করে এমন ম্যাট বা হাতল ব্যবহার করুন। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগ থাকলে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং নির্ধারিত ওষুধ নিয়মমতো গ্রহণ করুন।
স্ট্রোকের লক্ষণ চিনবেন কীভাবে?
হঠাৎ মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশের হাত-পা দুর্বল হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, দৃষ্টিতে সমস্যা, ভারসাম্য হারানো কিংবা অস্বাভাবিক তীব্র মাথাব্যথা এসব স্ট্রোকের সতর্কসংকেত হতে পারে। এমন লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। উপসর্গ কয়েক মিনিটের মধ্যে সেরে গেলেও অবহেলা করা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) নির্দেশিকা অনুযায়ী, স্ট্রোকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা মস্তিষ্কের ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সুতরাং, বাথরুমে স্ট্রোকের ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু বাথরুমে যাওয়াই স্ট্রোকের নির্দিষ্ট কারণ এমন নয়। শৌচকর্মের সময় চাপ দেওয়া বা গোসলের সময় রক্তচাপের পরিবর্তনের কারণে মাথা ঘোরা ও অজ্ঞান হওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। অন্যদিকে, স্ট্রোকের মূল কারণ সাধারণত মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া অথবা রক্তনালি ফেটে যাওয়া। তাই বাথরুমে কেউ হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়লে সেটিকে সাধারণ দুর্বলতা ভেবে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করাই সবচেয়ে জরুরি।
তথ্যসূত্র: মায়ো ক্লিনিক, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, আমেরিকান স্ট্রোক অ্যাসোসিয়েশন ও যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)।












