0-0x0-0-0#
মিলন বিশ্বাস: নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর কাশের দোলায় মোড়ানো শরতের শান্ত বিকেলে অনন্য এক প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে সাতক্ষীরার শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে। শৈশবের সোনালি স্মৃতি, প্রিয়জনদের সান্নিধ্য আর খেটে খাওয়া মানুষের জীবিকার আলোÑসবকিছুর মোহনীয় সংমিশ্রণ ঘটে চলেছে ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুর মেলায়। দুই বছরের দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে প্রায় তিন শ বছরের প্রাচীন এ মেলা যেন এক নতুন ভোরে জেগে উঠেছে। মেলার দশম দিনে উৎসবমুখর আবহের মাঝে আগত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় দায়িত্বশীল পুলিশ প্রশাসনের কর্মতৎপরতাও ছিল লক্ষণীয়।
মেলার তোরণ পেরিয়ে ভেতরে পা রাখতেই নজরে আসে সব বয়সের মানবের মিলনমেলা। পরিবারের হাত ধরে খুদে পথচলা, সন্তানের হাসিমুখের জন্য খেলনার বায়না মেটানো আর কেনাকাটার নানা আয়োজনে চারপাশটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। নাগরদোলার দোলাচল, দূর থেকে ভেসে আসা পথশিশুদের রেলগাড়ির হুইসেল, রকমারি মিষ্টির সুবাস আর গৃহস্থালি পণ্যের ঝলকানিÑসব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ।
মেলা প্রাঙ্গণে বিরাজ করছিল এক স্নিগ্ধ ও স্বাভাবিক সুর। দর্শনার্থীরা যখন আনন্দ উদযাপনে মগ্ন, তখন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে মেলার বিভিন্ন কোণে ঘুরে নজরদারি চালাচ্ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তাঁদের এমন পদচারণায় নিশ্চিত নিরাপদ পরিবেশ পেয়ে আগতদের চোখেমুখে ছিল স্বস্তির ছাপ।
কেবল কেনাকাটার ধুম নয়, এই গুড়পুকুর মেলার ধূলিকণায় মাখানো রয়েছে সাতক্ষীরার প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতিচিহ্ন ও আবেগ। বয়সের ভারে নয়ে পড়া প্রবীণদের কাছে এই মেলা যেন দূর শৈশবের দিনগুলো নতুন করে ছুঁয়ে দেখার এক সুযোগ, আর নবীনদের কাছে আনন্দ ও অভিজ্ঞতার দিগন্ত ছোঁয়ার রঙিন প্রান্তর। ছোটদের উচ্ছ্বল চোখের তারা আর মা-বাবার মমতাময় হাত ধরে ঘেঁষে হাঁটার দৃশ্যটি ছিল অনবদ্য।
উৎসবের এই আবহের অন্তরালে রয়েছে বহু শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম ও স্বপ্নপূরণের গল্প। দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা পসরা সাজিয়ে বসেছেন। জামাকাপড়, প্রসাধনী, শিশুদের খেলার সামগ্রী কিংবা খাবারÑসব দোকানঘিরেই মানুষের উপচে পড়া ভিড়। শরতের এই মেলার বেচাকেনা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি কিছু উপার্জনের এক বড় পথ খুলে দিয়েছে। তাই তো ক্রেতাদের উপস্থিতিতে ফুটে ওঠে তাঁদের আশাজাগানিয়া হাসি।
পণ্য বিক্রির মিষ্টি হাঁকডাক, ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম আর নিষ্পাপ শিশুদের খিলখিল হাসিতে এক মোহময় আবহের সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রাঙ্গণ আর কেবল বেচাকেনায় সীমাবদ্ধ নেই, পরিণত হয়েছে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার এক মানবিক উদ্যানে। শিকড় আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্য আগামীতেও যেন স্বমহিমায় টিকে থাকে, সে প্রত্যাশাই স্থানীয়দের।
এদিকে দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে মেলার সময়সীমা আরও দুই ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। মেলা কমিটির সদস্য হাসান শিকদার জানান, নতুন সময়সূচি অনুযায়ী প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে। সময় বাড়ায় কেনাকাটা ও ভ্রমণের জন্য পর্যাপ্ত অবকাশ পাবেন দর্শনার্থীরা।
জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার সার্বিক তত্ত্বাবধানে শহরতলির শহীদ আবদুর রাজ্জাক পার্কে ১ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ২০ দিনব্যাপী এই মিলনমেলা চলবে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত। শিশু-কিশোরের আনন্দ-হাসি, প্রবীণদের স্মৃতিমেদুরতা আর খেটে খাওয়া মানুষের বেঁচে থাকার প্রেরণা নিয়ে গুড়পুকুর মেলা শরতের হাওয়ায় ডানা মেলেছে অনন্য এক রূপ নিয়ে।