ভাড়ার সাইকেল: সময়ের চাকার নিচে হারিয়ে গেল এক পেশা
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
একসময় গ্রামের হাটবাজার, উপজেলা শহর কিংবা বড় কোনো বাজারের প্রবেশমুখে সারি সারি সাইকেল দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত। সাইকেলগুলো কারও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নয়, ভাড়ায় দেওয়ার জন্য। প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষ ঘণ্টা, অর্ধদিবস কিংবা দিনের হিসাবে সাইকেল ভাড়া নিতেন। সেই ভাড়ার সাইকেলকে ঘিরেই চলত একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পেশা। সময়ের পরিবর্তনে সেই পেশা আজ প্রায় হারিয়ে গেছে।
একসময় সবার ঘরে সাইকেল থাকত না। অথচ দূরের গ্রামে যেতে হবে, হাটে যেতে হবে, জমিতে যেতে হবে কিংবা কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে জরুরি কাজে যেতে হবে। তখন সহজ ও সাশ্রয়ী বাহন ছিল সাইকেল। যাঁদের নিজেদের সাইকেল ছিল না, তাঁদের ভরসা ছিল ভাড়ার সাইকেল। বাজারের নির্দিষ্ট জায়গায় ছিল সাইকেল ভাড়ার দোকান। দোকান বলতে কখনো টিনের ছাউনি, কখনো বাঁশের বেড়া দেওয়া ছোট্ট ঘর।
সামনে সারি করে রাখা থাকত সাইকেল। কোনোটি নতুন, কোনোটি পুরোনো। তবে প্রতিটি সাইকেলই ছিল দোকানির কাছে সম্পদ। সকালে দোকান খোলার পর থেকেই শুরু হতো ব্যস্ততা। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীÑবিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ প্রয়োজন মতো সাইকেল ভাড়া নিতেন। কেউ বলতেন, ‘দুপুরের মধ্যে দিয়ে দেব।’ কেউ আবার দিনের জন্য নিয়ে যেতেন। সাইকেল দেওয়ার আগে দোকানি ভালো করে দেখে নিতেন চাকা ঠিক আছে কি না, ব্রেক কাজ করছে কি না, চেইনে সমস্যা আছে কি না।
অনেক সময় সাইকেলের টায়ারে বাতাস কম থাকলে পাম্প দিয়ে বাতাস ভরে দেওয়া হতো। তারপর শুরু হতো পথচলা। সেই সময় সাইকেল ভাড়া দেওয়ার পেশায় শুধু অর্থের লেনদেন ছিল না, ছিল পারস্পরিক বিশ্বাসও। পরিচিত গ্রাহকের কাছ থেকে অনেক সময় আগাম টাকা নেওয়া হতো না। কেউ হয়তো বলতেন, ‘সন্ধ্যায় এসে টাকা দিয়ে যাব।’ দোকানিও বিশ্বাস করে সাইকেল তুলে দিতেন। হাটের দিনগুলোতে ভাড়ার সাইকেলের চাহিদা থাকত বেশি।
ভোর থেকেই মানুষ বাজারের দিকে ছুটতেন। অনেক দূরের গ্রামের মানুষও সাইকেল ভাড়া করে হাটে আসতেন। বাজারের কাজ শেষ করে আবার সাইকেল ফিরিয়ে দিতেন দোকানে। গ্রামের যোগা যোগ ব্যবস্থায় তখন সাইকেলের গুরুত্ব ছিল অনেক। কাঁচা রাস্তা, সরু মেঠোপথ কিংবা বাঁধের ওপর দিয়েও সাইকেল চালিয়ে মানুষ এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যেতেন। সাইকেল ছিল স্বাধীনভাবে চলাচলের সহজ মাধ্যম।
ভাড়ার সাইকেলের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল অনেক মানুষের জীবিকা। কেউ সাইকেল কিনে ভাড়ায় দিতেন, কেউ আবার কয়েকটি সাইকেল নিয়ে ছোট ব্যবসা করতেন। সাইকেলের মেরামত, টায়ার-টিউব বদলানো, চেইন ঠিক করাÑএসব কাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন স্থানীয় মিস্ত্রিরা। কিন্তু সময় বদলাতে বেশি সময় লাগেনি। ধীরে ধীরে মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ল। অনেক পরিবার নিজেদের সাইকেল কিনতে শুরু করল।
পরে গ্রামাঞ্চলে মোটর সাইকেলের ব্যবহার বাড়তে থাকল। এরপর এল ব্যাটারিচালিত ভ্যান, ইজিবাইক ও অটোরিকশা। ফলে মানুষের যাতায়াতের ধরন বদলে গেল। দূরের পথ দ্রুত অতিক্রম করার জন্য মানুষ সাইকেলের বদলে মোটরসাইকেল বা ইজিবাইককে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করল। নিজেদের সাইকেল থাকা পরিবারও বাড়তে থাকায় ভাড়া করে সাইকেল নেওয়ার প্রয়োজন কমে গেল।
একসময় যে দোকানে দশ-বিশটি সাইকেল সারিবদ্ধভাবে রাখা থাকত, সেখানে সাইকেলের সংখ্যা কমতে কমতে শূন্যের কোঠায় নেমে এল। একের পর এক বন্ধ হয়ে গেল সাইকেল ভাড়ার দোকান। এই পেশার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই জীবিকার পথ বদল করেছেন। কেউ মুদি দোকান দিয়েছেন, কেউ ভ্যান চালিয়েছেন, কেউ কৃষিকাজে ফিরে গেছেন। কেউ আবার বয়সের কারণে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন।
তাঁদের অনেকের কাছেই ভাড়ার সাইকেলের দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। আজকের প্রজন্মের কাছে বিষয়টি কিছুটা অবাক করার মতো। এখন একটি সাইকেল কেনা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন বিষয় নয়। শহর কিংবা গ্রামÑপ্রায় সর্বত্রই সাইকেল পাওয়া যায়। কিন্তু একসময় একটি সাইকেল ছিল অনেকের কাছে প্রয়োজনীয় অথচ নাগালের বাইরে থাকা একটি জিনিস। সেই প্রয়োজনই জন্ম দিয়েছিল ভাড়ার সাইকেল ব্যবসার।
এই পেশার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মানুষের সামাজিক সম্পর্কও। সাইকেল নিতে এসে দোকানির সঙ্গে গল্প হতো, গ্রামের খবরাখবর বিনিময় হতো। কেউ সাইকেল ফেরত দিতে দেরি করলে দোকানি চিন্তিত হতেন। পরিচিত মানুষকে নিয়ে হাসিঠাট্টাও চলত। একটি ছোট দোকান হয়ে উঠত অনেকের আড্ডার জায়গা। আজ সেই দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়।
কোথাও হয়তো পুরোনো একটি সাইকেল পড়ে আছে। মরিচা ধরেছে তার চেইনে, শুকিয়ে গেছে টায়ার। অথচ একসময় সেই সাইকেলই কত মানুষের পথের সঙ্গী ছিল। ভাড়ার সাইকেলের পেশা হারিয়ে যাওয়াকে শুধু একটি ব্যবসার বিলুপ্তি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্য দিয়ে গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তনের একটি চিত্রও পাওয়া যায়।
মানুষের আয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রযুক্তি ও জীবনযাত্রা বদলেছে। আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন ফুরিয়েছে একটি পুরোনো পেশার। তবে হারিয়ে যাওয়া পেশার গল্প কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। মানুষের স্মৃতিতে সেগুলো বেঁচে থাকে। প্রবীণরা এখনো হয়তো বলতে পারবেন, কোন বাজারে কোথায় সাইকেল ভাড়া পাওয়া যেত, এক দিনের ভাড়া কত ছিল, কোন সাইকেলটি সবচেয়ে ভালো চলত।
স্মৃতির পাতায় সেই দোকান, সেই সাইকেল আর সেই দোকানির মুখ হয়তো এখনো স্পষ্ট। বিকেলের আলোয় একে একে সাইকেল ফিরে আসছে, দোকানি হিসাব লিখছেন, কেউ টাকা দিচ্ছেন, কেউ পরদিন দেওয়ার কথা বলে চলে যাচ্ছেনÑএমন দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যায়। কিছু পরিবর্তন মানুষের জীবনকে সহজ করে, আবার কিছু পরিবর্তন মুছে দেয় পুরোনো পেশা ও ঐতিহ্যের চিহ্ন। ভাড়ার সাইকেলও তেমনই এক হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়। আজকের দ্রুতগতির জীবনে ভাড়ার সাইকেলের প্রয়োজন হয়তো নেই। কিন্তু একসময় এই সাইকেলই ছিল অনেক মানুষের ভরসা।
একজন মানুষের জীবিকা, একটি পরিবারের আয় এবং একটি এলাকার সহজ যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এই ছোট্ট পেশাটি। ভাড়ার সাইকেল আজ আর চোখে পড়ে না। কিন্তু তার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñসময়ের চাকা শুধু মানুষকে সামনে নিয়ে যায় না, পথের পাশে ফেলে যায় অনেক পরিচিত পেশা, মানুষ ও স্মৃতি।
লেখক: সংবাদকর্মী









