মাদকবিরোধী দিবস : সাতক্ষীরার প্রান্তিক মরণোৎসব
আখলাকুর রহমান
গাছের পাতায় আষাঢ়ের প্রথম মেঘের ছায়া নামার আগেই বিশ্বজুড়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে পালিত হচ্ছে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস। ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘ নামের সেই মস্ত বড় বৈশ্বিক পর্ষদটি খাতা-কলমে প্রস্তাব পাস করে ২৬শে জুন তারিখটিকে ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল দাগ দিয়ে চিহ্নিত করেছিল। এই উদযাপনের একটা ঐতিহাসিক গৌরবও আছে; চীনের কিং রাজবংশের আমলে লিন জেক্সু নামের এক অকুতোভয় ম্যান্ডারিন যখন ক্যান্টন বন্দরে ব্রিটিশ বণিকদের আনা জাহাজ জাহাজ আফিম পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিলেন, সেই ঔপনিবেশিকতাবিরোধী প্রতিরোধকে সম্মান জানাতেই এই দিবসের পত্তন।
ইতিহাস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, মাদক কেবল মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে অবশ করে না, ওটা একটা গোটা সমাজ, রাষ্ট্র এবং তরতাজা প্রজন্মকে ভেতরে ভেতরে ফোঁকড় করে ফেলে। আজ এই দিবসের রাষ্ট্রীয় কাগুজে স্লোগানের পাশে দাঁড়িয়ে যখন আমাদের নিজেদের সীমান্তঘেঁষা জেলা সাতক্ষীরার দিকে তাকাই, তখন মেরুদ- বেয়ে এক তীব্র আতঙ্কের গ্রোত নেমে যায়।
আমাদের সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদগুলোর বর্তমান চেহারা বড় রূঢ়, বড় নির্মম। যে গ্রামগুলো একসময় ফজরের আজানের পবিত্র সুর, মসজিদের মক্তবে শিশুদের সুমধুর কুরআন তেলাওয়াত, চ-ীম-পের আড্ডা আর জারি-সারির শান্ত স্নিগ্ধতায় এক পরম আত্মিক শান্তিতে বেঁচে থাকত, আজ সেখানে এক অদ্ভুত ও বিষাক্ত নৈঃশব্দ্য। ইসলামের যে অমোঘ শিক্ষা মানুষের আত্মশুদ্ধি নিশ্চিত করত, যুবসমাজকে দেখাত নৈতিকতার সরল পথ, সেই চিরন্তন মূল্যবোধকে আজ ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি আজ এমন এক জঘন্য পর্যায়ে ঠেকেছে যে, গ্রামের পর গ্রাম মেপে প্রতি একশোটি বসতবাড়ি পার হতেই কোনো না কোনো ঝোপের আড়ালে, কিংবা ভাঙা চায়ের দোকানের পেছনে গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা বা আইসের মতো মরণনেশার কেনাবেচা চোখে পড়ে।
সীমান্ত অঞ্চলের ভৌগোলিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে একদল ফড়িয়া ও চোরাকারবারি এ দেশের চালিকাশক্তি যুবসমাজের মগজে এই বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। আমাদের স্থানীয় প্রশাসন মাঝেমধ্যে লোকদেখানো দুই-চারটে ঝটিকা অভিযান চালায়, কিছু চুনোপুঁটি ধরে বাহবা নেয়; কিন্তু এই লৌকিক তৎপরতা দিয়ে ব্যাধির আসল শেকড় উপড়ানো কোনোদিনই সম্ভব নয়। রাষ্ট্র ও প্রশাসন যদি সত্যি এই সর্বনাশা খেলা বন্ধ করতে চায়, তবে তাদের নজরদারি শহরকেন্দ্রিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ থেকে বের করে প্রান্তিক গ্রামের ধুলোবালিতে নামিয়ে আনতে হবে। মাদকের আসল গডফাদার ও পৃষ্ঠপোষকদের রাজনৈতিক বা সামাজিক ক্ষমতার ঠাট ঠুংরো কাচের মতো ভেঙে তাদের আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানোই এখন প্রধান জরুরি কাজ।
আইনের লাঠি দিয়ে কোনোদিন মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকে নেশার ভূত তাড়ানো যায়নি, যাবেও না। এর জন্য প্রয়োজন সমাজের একদম নিচ থেকে গড়ে ওঠা এক স্বতঃস্ফূর্ত ও গণমুখী প্রতিরোধ। ইসলামে নেশাজাতীয় সব দ্রব্যকে স্পষ্টাক্ষরে হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা মানবজাতির বুদ্ধি ও আত্মাকে কলুষিত করে। এই ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিকতার বোধকে আমাদের তরুণদের অন্তরে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। প্রতিটা গ্রামের তরুণদের নিজেদের তাগিদেই দলবদ্ধ হতে হবে, গড়ে তুলতে হবে খাঁটি মাদকবিরোধী যুব সংগঠন। এই যুবকরা কোনো করপোরেট এনজিওর অনুদানে চলবে না, তারা হবে নিজ নিজ মাটির অতন্দ্র প্রহরী; তারা চোখ কান খোলা রেখে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করবে এবং যেখানেই এই বিষের কারবার দেখবে, যৌথ শক্তিতে রুখে দাঁড়াবে।
তরুণের এই বিপথগামিতা তো আসলে আমাদের বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থারই এক চরম ব্যর্থতা; তাদের সুস্থ বিনোদন আর আধ্যাত্মিক বিকাশের জায়গা আমরা কেড়ে নিয়েছি। তাই প্রতিটি পাড়ায় খেলার মাঠগুলো উদ্ধার করা, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো, লাইব্রেরি আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ ঘটানো ছাড়া এই অন্ধ কুয়ো থেকে ফেরার আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। এই আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষের মুখে কোনো ফাঁপা স্লোগান নয়, একমাত্র কঠিন সত্য উচ্চারিত হওয়া উচিত যে রাষ্ট্রের সৎ সদিচ্ছা, ইসলামের সুমহান নৈতিক আদর্শ আর যুবসমাজের দ্রোহের যুগলবন্দিতেই কেবল এই উর্বর মাটিকে আমরা মেকি সুখের মরণব্যাধি থেকে মুক্ত করতে পারি। লেখক: উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা আসিফা




