মৃত্যুকে নয়, আমরা আসলে অসমাপ্ত জীবনকেই ভয় পাই
মোঃ আবু সাঈদ সরদার
আমরা সারা জীবন মৃত্যুকে খুব বড় একটি নাটকীয় ঘটনা মনে করি। ভাবি-মৃত্যু আসবে ধামাকা করে, আকাশ ভেঙে পড়বে, চারপাশ থমথমে হয়ে যাবে। অথচ মৃত্যু বোধহয় খুবই সাদামাটা একটি ঘটনা।
একদিন সকালে সূর্য উঠবে। রিকশাওয়ালা বেল বাজাবে। পাশের বাসার মহিলা হয়তো কাজের মেয়েকে বকা দেবেন। পাড়ার দোকান খুলবে, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠবে। পৃথিবী তার নিজস্ব নিয়মেই চলতে থাকবে শুধু আমি থাকব না। ব্যস, এতটুকুই। পৃথিবীর তাতে খুব বেশি কিছু এসে যাবে না।
অথচ যে বিষয়টি নিশ্চিত, যা একদিন না একদিন ঘটবেই এবং যার সময়ের ওপর আমার-আপনার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, সেই মৃত্যুর কথা ভেবে মানুষের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়।
তবুও কিছু কিছু রাতে চোখের পাতা দুটোকে একসঙ্গে করার চেষ্টা করাটাই যেন এক মহাযুদ্ধ।
বাইরে নিঝুম অন্ধকার। নিশাচর কোনো অচেনা পাখির ডাক মাঝেমধ্যে সেই অন্ধকার কেটে দিয়ে যায়। ঘরের কোণে টিকটিকিটা ক্ষণে ক্ষণে ডেকে ওঠে মনে হয়, ঘরের ভেতরের সময়টাকেও যেন টুকরো টুকরো করে কেটে দিচ্ছে। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে হঠাৎ প্রশ্ন জাগে মৃত্যুর দিন-তারিখ অজানা হলেও তার আগমন যে নিশ্চিত, তা আমরা জানি। তাহলে মানুষ সারা রাত জেগে থাকে কেন?
জীবনের এই অনির্দিষ্ট অস্থিরতা, এই না-পাওয়ার দোলাচল এ কি কখনো কখনো মৃত্যুর শেষ নিঃশ্বাসের চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে? মৃত্যুর যন্ত্রণা হয়তো এক মুহূর্তের ঠান্ডা বাতাস। কিন্তু জীবনের অস্থিরতা হলো দীর্ঘ এক পথচলা, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে মানুষ কখনো কখনো নিজের ছায়াকেও শত্রু মনে করে। মানুষ হয়তো আসলে মৃত্যুকে ভয় পায় না; সে ভয় পায় জীবনের অসমাপ্তিগুলোকে।
একটি ছোট্ট গল্প মনে পড়ে। এক গ্রামে কবির আহমদ নামে এক বৃদ্ধ বাস করতেন। জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ ছিলÑতাঁর মেজো ছেলে বাড়ি ছেড়ে ইউরোপ চলে যাওয়ার পর তাকে শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরতে পারেননি। বৃদ্ধ বয়সে রোগশয্যায় শুয়ে কবির আহমদ মৃত্যুর ভয়ে জেগে থাকতেন না। তিনি রাত জেগে থাকতেন একটি অসম্ভব প্রত্যাশায়।
যদি আজ রাতেই ছেলেটা দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকে? যদি হঠাৎ সে এসে বলে “বাবা, আমি এসেছি!”
কবির আহমদ জানতেন, মৃত্যু একদিন আসবেই। কিন্তু তাঁর অস্থিরতা মৃত্যুকে নিয়ে ছিল না। তাঁর ছটফটানি ছিল জীবনের একটি অসম্পূর্ণ পাতা পূর্ণ করার জন্য। জীবনের মূল যন্ত্রণাটা বোধহয় এখানেই।
মৃত্যু একটি পরিচ্ছেদে পূর্ণচ্ছেদ দিয়ে বই বন্ধ করে দেয়। আর জীবন? জীবন প্রতিদিন অসংখ্য প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে যায়। রাতের বেলা যখন চারপাশের সব কোলাহল থেমে যায়, তখন আমাদের ভেতরের ভেজা স্মৃতিগুলো আস্তে আস্তে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। যে কথাগুলো কাউকে বলা হয়নি, যে ক্ষমাটা চাওয়া হয়নি, যে ভুলটি না করলেও পারতাম তারা সবাই অন্ধকার ঘরের ভেতর ছায়ার মতো হেঁটে বেড়ায়।
দিনের ব্যস্ততায় আমরা তাদের আড়াল করে রাখতে পারি। মানুষের ভিড়, কাজের চাপ, রাস্তাঘাটের কোলাহল, চায়ের কাপের টুংটাং শব্দÑসবকিছুর আড়ালে জীবনের ছোট ছোট দীর্ঘশ্বাসগুলো চাপা পড়ে থাকে। কিন্তু রাত বড় চতুর। রাত এসে যখন সমস্ত কোলাহল কেড়ে নেয়, তখন যেন নিঃশব্দে প্রশ্ন করেÑ
“এবার বলো, তোমার বুকের ভেতরের সেই পুরনো ব্যথাটার খবর কী?”
তখনই ঘুম চটে যায়। মাঝে মাঝে গভীর রাতে জানালাটা খুলে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকালে নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হয়। মনে হয়, এই পৃথিবী কত হাজার বছর ধরে একই নিয়মে রাত নামিয়েছে, মানুষ ঘুমিয়েছে, ভোর হয়েছে, আবার দিন শুরু হয়েছে। কত মানুষ এসেছে, কত মানুষ চলে গেছে। পৃথিবী তার নিজের গতিতেই ঘুরে চলেছে। শুধু মানুষের বুকের ভেতরটাই কখনো কখনো সারারাত ছাইচাপা আগুনের মতো জ্বলতে থাকে। ঘুম যে আসে না, তার মূল কারণ হয়তো মৃত্যু নয়। আমরা মৃত্যুকে ভেবে জেগে থাকি না; আমরা বেঁচে থাকার না-মেলা হিসাবগুলো মেলাতে গিয়ে জেগে থাকি।
একটি শূন্য ডায়েরির পাতা নিয়ে বসে থেকে রাত পার করে দেওয়া সহজ। কিন্তু যে ডায়েরির পাতায় পাতায় ভুলের দাগ, কাটাকুটি আর অর্ধেক লেখা বাক্য জমে আছে, সেটি বন্ধ করা বড় কঠিন।
আমাদের জীবনটাও যেন তেমনই একটি ডায়েরি। শেষ পাতায় কোথাও একটি ফুলস্টপ অপেক্ষা করছে আমরা তা জানি। তবু বারবার ফিরে যাই মাঝের পাতাগুলোয়। কোথায় ভুল হয়েছিল, কোন কথাটি বলা হয়নি, কোন মানুষটি হারিয়ে গেল, কোন স্বপ্নটি অসম্পূর্ণ থেকে গেলÑসেসবের হিসাব মেলাতে মেলাতে আমরা শেষ পাতাটির কথা ভুলে থাকি। তাহলে কি জীবনের এই অস্থিরতা মৃত্যুর চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক? হয়তো। মৃত্যু একটি চূড়ান্ত সত্যÑযেখানে পৌঁছালে জীবনের সব বিভ্রান্তি, দ্বিধা ও অপেক্ষার অবসান ঘটে। আর জীবন হলো এক দীর্ঘ নাটক, যেখানে প্রতিটি অঙ্কে দৃশ্য বদলায়। চরিত্র বদলায়। সম্পর্ক বদলায়। স্বপ্ন বদলায়। অথচ শেষ দৃশ্যটি কেমন হবে, তা কেউ জানে না। এই না-জানাটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য, আবার সবচেয়ে বড় যন্ত্রণাও। মৃত্যু শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। আর জীবন সেই পেরেক ঠোকার আগের প্রতিটি মুহূর্তকে অনিশ্চয়তার চাবুক দিয়ে আঘাত করতে থাকে। তবু জীবনের প্রতি আমাদের এত অভিযোগ কেন? জীবন এত চঞ্চল, এত অস্থির বলেই তো দিনশেষের বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগে। জোছনার আলোয় একা দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগে। কোনো প্রিয় মানুষের কণ্ঠ শুনলে বুকের ভেতর হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠে। বহুদিন পর কারও সঙ্গে দেখা হলে মনে হয় এখনো কিছু পাওয়া বাকি আছে। জীবনের এই যন্ত্রণাটুকু না থাকলে মৃত্যুর শান্তিরই বা কী মূল্য থাকত?
সম্ভবত জীবনের সৌন্দর্য এখানেই আমরা জানি, একদিন সব শেষ হবে; তবু প্রতিদিন নতুন করে শুরু করি। যে মানুষ রাতের পর রাত জীবনের না-পাওয়ার হিসাব কষেছে, যে মানুষ হারানোর ব্যথা বয়ে নিয়ে ভোর পর্যন্ত জেগে থেকেছে, সেই মানুষই ভোরের প্রথম একচিলতে রোদ জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকতে দেখে সবচেয়ে গভীরভাবে বলতে পারে-“আহা, আর একটা দিন তো অন্তত বেঁচে থাকা গেল!”
(মোঃ আবু সাঈদ সরদার, সংবাদকর্মী)











