যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্ভাব্য চুক্তি কি ভেস্তে দিতে পারে ইসরায়েল
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আশ্বস্ত করেছেন যে, তেহরানের সঙ্গে যেকোনও চূড়ান্ত চুক্তির শর্ত হিসেবে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে দেওয়ার দাবিতে অটল থাকবেন। রবিবার ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই তথ্য জানিয়েছেন।
শনিবার রাতে দুই নেতার মধ্যকার ফোনালাপের বরাত দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে দেওয়া এবং ইরানি ভূখণ্ড থেকে সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার দীর্ঘদিনের দাবিতে তিনি আলোচনায় অবিচল থাকবেন। এই শর্তগুলো পূরণ না হলে তিনি কোনও চূড়ান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন না।’
তবে ইরানের সংবাদ সংস্থা ফার্স এবং তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনও ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সাম্প্রতিক সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো তেহরান সফরের পর শনিবার ট্রাম্প বলেছিলেন যে, যুদ্ধ অবসানের জন্য ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি ‘মোটামুটি চূড়ান্ত হয়ে গেছে’ এবং এখন শুধু তা আনুষ্ঠানিক রূপ পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এর পরেই মূলত পারমাণবিক বিষয় নিয়ে এই ভিন্নধর্মী তথ্য সামনে এলো।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই শনিবার বলেছেন, পারমাণবিক বিষয়টি প্রাথমিক কোনও রূপরেখার অংশ ছিল না। এটি পরবর্তী পর্যায়ে ‘পৃথক আলোচনার বিষয়’ হিসেবে থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইরান যুদ্ধের সূত্রপাত করা ইসরায়েল এখানে একটি চুক্তি ভেস্তে দেওয়ার ভূমিকা নিতে পারে। এর আগে ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানিয়েছিল, ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে ইরানের পারমাণবিক নথিপত্র মার্কিন প্রশাসনের দেখভালের পদ্ধতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন নেতানিয়াহু।
ইসরায়েলের পাবলিক ব্রডকাস্টার কেএএন একটি ইসরায়েলি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, লেবাননে যুদ্ধবিরতি এবং সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির মধ্যে কোনও যোগসূত্র তৈরি হতে পারে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নেতানিয়াহু।
ইরানি সংবাদমাধ্যম তাসনিম জানিয়েছে, ‘প্রথমে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ঘোষণা করা হবে, যেখানে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে লড়াই বন্ধের ওপর জোর দেওয়া হবে।’ এতে আরও বলা হয়, ‘এই ব্যবস্থার অধীনে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে ইসরায়েলও লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
ইরানি গণমাধ্যম আরও জানিয়েছে যে, তেহরান প্রথমে একটি সমঝোতা স্মারক বা এক ধরনের রূপরেখা চুক্তি তৈরি করতে চায়, যার পরবর্তী ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হবে। তবে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের একটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, নেতানিয়াহু এবং ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থা মনে করে যে ‘ইরানিরা মূলত সময়ক্ষেপণ করছে এবং ৬০ দিন পর তেহরান কোনও ধরনের ছাড় দিতে তাদের অনীহার কথা জানিয়ে দেবে।’
এই পরিস্থিতির মধ্যেই, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার আলোচনায় অগ্রগতির খবরের মধ্যে রবিবার সন্ধ্যায় ইসরায়েলি নিরাপত্তা ক্যাবিনেটের বৈঠক বসার কথা রয়েছে বলে কেএএন জানিয়েছে। নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের একটি বিবৃতির বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ওয়াশিংটন চলমান আলোচনা সম্পর্কে তেল আবিবকে প্রতিনিয়ত অবহিত রাখছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, শনিবার রাতে ট্রাম্পের সঙ্গে আলাপকালে নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইসরায়েল ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যেকোনও হুমকির বিরুদ্ধে তাদের নিজস্ব পদক্ষেপ নেওয়ার স্বাধীনতা বজায় রাখবে।’
এদিকে ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যে চুক্তিটি গড়ে উঠছে তা অত্যন্ত ‘খারাপ’। সূত্রটি চ্যানেলটিকে বলে, এটি মূলত এই বার্তাই দেয় যে হরমুজ প্রণালি হলো ‘ইরানের হাতে থাকা একটি অস্ত্র, যা কোনও পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়ে কম কার্যকর নয়’।
ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, চুক্তির খসড়ায় শর্ত রাখা হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা ইরান বা তার মিত্রদের ওপর আক্রমণ করবে না এবং এর বিনিময়ে ইরানও তাদের ওপর কোনও আগাম বা প্রতিরোধমূলক হামলা না করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ বেনি গান্তজ বলেছেন, লেবাননে যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়া ইসরায়েলের জন্য একটি কৌশলগত ভুল হবে, যেখানে যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও তেল আবিব এখনও বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে এই সব আলোচনার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ লিখেছেন যে, নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার ফোনালাপ ‘খুব ভালো’ হয়েছে।
আর রবিবার নেতানিয়াহু সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, তিনি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিষয়ে একমত হয়েছেন যে ইরানের সঙ্গে যেকোনও চূড়ান্ত চুক্তিতে পারমাণবিক হুমকি দূর করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। পারমাণবিক হুমকি দূর করার অর্থ হলো, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলো সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলা বা গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং দেশটির ভূখণ্ড থেকে সব সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদান সরিয়ে নেওয়া।
তবে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স ইরানের একটি জ্যেষ্ঠ সূত্রকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তিতে তেহরান তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ হস্তান্তর করতে রাজি হয়নি।
ওই সূত্র মতে, ‘পারমাণবিক ইস্যুটি মূলত একটি চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনায় সমাধান করা হবে এবং সে কারণে এটি বর্তমান চুক্তির অংশ নয়। ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার বা স্থানান্তরের বিষয়ে কোনও ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা হয়নি।’
ততক্ষণে ট্রাম্প আবার নিজের অবস্থান কিছুটা পাল্টে ফেলেছেন। ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনা ‘সুশৃঙ্খল ও গঠনমূলকভাবে অগ্রসর হচ্ছে’ বলে দাবি করলেও তেহরানের সঙ্গে চুক্তি করার ক্ষেত্রে কোনও ধরনের তাড়াহুড়ো না করতে নিজের প্রতিনিধিদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই তথ্য জানিয়েছেন।
ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমি আমার প্রতিনিধিদের চুক্তির জন্য তাড়াহুড়ো না করতে জানিয়ে দিয়েছি এবং সময় এখন আমাদের পক্ষেই রয়েছে।’
সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড












