আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস: বিচারহীনতার অন্ধকার দূর করার বৈশ্বিক অঙ্গীকার
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতি বছর ১৭ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস, যা আন্তর্জাতিক অপরাধবিচার দিবস নামেও পরিচিত। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং আগ্রাসনের মতো গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করা।
১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই রোম সম্মেলনের মাধ্যমে ‘রোম সংবিধি’ গৃহীত হয়, যা আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে। ২০০২ সালের ১ জুলাই নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আদালতটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীতে ২০১০ সালে কাম্পালা সম্মেলনে ১৭ জুলাইকে ‘আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ আদালতের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিরুদ্ধে জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী বিচারিক প্রতিষ্ঠান।
ন্যায়বিচার কেবল আন্তর্জাতিক আইনের বিষয় নয়, বরং ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের মৌলিক ভিত্তি। পবিত্র কোরআনে একে সমাজ পরিচালনার অন্যতম প্রধান নীতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আর যখন তোমরা লোকদের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করবে’ (সূরা আন-নিসা: ৫৮)। এমনকি স্বজনপ্রীতি বা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে ন্যায়ের পক্ষে সাক্ষী হওয়ার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সূরা আন-নিসা: ১৩৫) এবং শত্রুর প্রতিও ন্যায়পরায়ণ আচরণের নির্দেশ রয়েছে (সূরা আল-মায়েদাহ: ৮)।
ইসলামের ইতিহাসে ন্যায়বিচার বাস্তবায়নে রয়েছে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত—মসজিদ নির্মাণের জমি অধিগ্রহণে অনিয়ম দেখে খলিফা ওমর (রা.) তা অবিলম্বে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এছাড়া প্রভাবশালী গোত্রের এক নারীর অপরাধের প্রেক্ষিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছিলেন, আইনের বিচারে কোনো ছাড় নেই। এমনকি তাঁর নিজের মেয়ে ফাতেমা (রা.)-ও অপরাধ করলে তিনি একই শাস্তি নিশ্চিত করতেন। এসব দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে, প্রকৃত ন্যায়বিচারে অপরাধীর পরিচয় নয়, বরং অপরাধের ধরনই মুখ্য।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সুশীল সমাজের বিভিন্ন সংস্থা বিশ্বজুড়ে কাজ করছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা World Justice Project (WJP)–এর ২৮ অক্টোবর ২০২৫ প্রকাশিত জঁষব ড়ভ খধি ওহফবী অনুযায়ী, ১৪৩টি দেশের মধ্যে ডেনমার্ক (স্কোর ০.৯০) আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এর পরেই রয়েছে নরওয়ে (০.৮৯), ফিনল্যান্ড (০.৮৭), সুইডেন (০.৮৫) এবং নিউজিল্যান্ড (০.৮৩)। অপরদিকে সূচকের সর্বনি¤œ অবস্থানে রয়েছে ভেনেজুয়েলা, এরপর আফগানিস্তান, কম্বোডিয়া, হাইতি ও নিকারাগুয়া। সরকারের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ, উন্মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রক প্রয়োগ, দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচারসহ ৮টি সূচকের ভিত্তিতে এই মূল্যায়ন করা হয়। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিশ্বের প্রায় ৬৮ শতাংশ দেশে আগের বছরের তুলনায় আইনের শাসনের অবনতি ঘটেছে, যা বৈশ্বিকভাবে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের সংবিধানও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক লক্ষ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ১০২ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের সমতা, আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট করার সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার ক্ষমতা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সাংবিধানিক ভিত্তি গড়ে তুলেছে। তবে মামলার দীর্ঘসূত্রতা, বিচারাধীন মামলার জট এবং প্রান্তিক মানুষের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার এখনও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের জন্য আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০-এর অধীনে ২০০১ সালে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা’ (লিগ্যাল এইড) গঠিত হয়। পরবর্তীতে আইন সংশোধনের মাধ্যমে সংস্থাটিকে পুনর্গঠন করে ‘বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এছাড়া ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার পরিচালনার জন্য ২০১০ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। একই বছর বাংলাদেশ রোম সংবিধি অনুসমর্থন করে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রতি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে বিচার অস্বীকার করাÑএই উক্তিটির মূল কথা হলো, ন্যায়বিচার কেবল সঠিক হলেই চলে না, তা সঠিক সময়ে হওয়াও জরুরি। বিচার পেতে যদি অহেতুক দেরি হয়, তবে তা ভুক্তভোগীকে সুবিচারের পরিবর্তে অনিশ্চয়তা ও হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রমাণের সংকট দেখা দেয়, বিচারপ্রার্থী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং আইন ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারান। তাই একটি সুশৃঙ্খল সমাজে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে মামলার দ্রুত ও সময়মতো নিষ্পত্তি করা অপরিহার্য, কারণ বিলম্বে পাওয়া ন্যায়বিচার অনেক সময় প্রকৃত বিচারের মর্যাদা হারায়।
আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস নিছক কোনো প্রতীকী দিবস নয়, বরং বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিপরীতে জবাবদিহিতার এক বলিষ্ঠ অঙ্গীকার। রাজনৈতিক বা সামরিক ক্ষমতার দোহাই দিয়ে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়; বরং অপরাধীর পরিচয়ের চেয়ে অপরাধের ধরনই বিচারের মূল ভিত্তি। বর্তমান বিশ্বে শান্তি ও মানব মর্যাদা রক্ষায় ন্যায়বিচারের কোনো বিকল্প নেই, কারণ এর অনুপস্থিতিতেই বৈষম্য ও সহিংসতা ঘনীভূত হয়। তাই স্থানীয় পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গন পর্যন্ত সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনাই একটি মানবিক ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।












