রাজধানীর বায়ুদূষণে পরিবহন খাতের দায় ৫০ শতাংশ
রাজধানীর বায়ুদূষণের বড় একটি অংশের জন্য দায়ী পরিবহন খাত। এ দূষণ নিয়ন্ত্রণে ফিটনেসবিহীন ও অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন চলাচল বন্ধ, মানসম্মত জ্বালানি ও লুব্রিকেন্টের ব্যবহার নিশ্চিত এবং চালকদের পরিবেশবান্ধব গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা। একই সঙ্গে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, যানজট কমানো এবং পরিবহন খাতে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর বনানীতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
ক্যাবের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামানের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিআরটিএর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান ও স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার।
সভাপতির বক্তব্যে এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ঢাকার বায়ুদূষণের অন্তত ৫০ শতাংশের জন্য পরিবহন খাত দায়ী। এ দূষণের কারণে ক্যানসার, হৃদরোগসহ নানা ধরনের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। পরিবহন খাতের দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলে অন্তত ১০ শতাংশ স্বাস্থ্যব্যয় কমানো যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে আইন অমান্য করাকে এখন কিছু মানুষের কাছে গর্বের বিষয় হিসেবে দেখা হয়। এ মানসিকতার কারণে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতির পরিবর্তনে ক্যাব, বাপাসহ অন্যান্য নাগরিক সংগঠনকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা যেন নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করেন, সে বিষয়ে নাগরিক সংগঠনগুলোকে সোচ্চার হতে হবে।
মূল প্রবন্ধে ঢাকার বায়ুদূষণের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে অধ্যাপক কামরুজ্জমান বলেন, রাজধানীর আব্দুল্লাহপুর, মিরপুর-১০, গুলিস্তান ও গাবতলীসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা অত্যন্ত বেশি। এমনকি ধানমন্ডি, গুলশান ও শাহবাগের মতো এলাকাতেও মাত্রাতিরিক্ত দূষণ হচ্ছে।
গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু দিনের বেলাতেই নয়, মাঝরাত ও ভোররাতেও রাজধানীতে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ সিটি করপোরেশনের রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার কার্যক্রম, ভবন নির্মাণকাজ এবং ভারী পণ্যবাহী ট্রাকের চলাচল। আব্দুল্লাহপুর থেকে সদরঘাট পর্যন্ত বাসরুটের অধিকাংশ এলাকাই বায়ুদূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে নিকুঞ্জ ও বিমানবন্দর এলাকায় বায়ুর মান তুলনামূলক ভালো।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, পরিবেশদূষণ রোধে ইমারত নির্মাণসংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা থাকলেও সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। ফলে নগরবাসী কার্যত একটি গ্যাস চেম্বারের মধ্যে বসবাস করছে। দূষণের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি চিকিৎসাব্যয়ও বাড়ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের একটি অংশ নিজেরাই বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ফলে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কাছে সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে।
সভায় সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা প্রতিনিধিরা বলেন, রাজধানীর সড়ক ও ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় যানজট বাড়ছে। এতে যানবাহনের জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বারবার ব্রেক করা ও পুনরায় গতি বাড়ানোর কারণে কার্বন নিঃসরণও বাড়ছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) আয়োজিত আলোচনা সভা
তাদের মতে, পরিবেশ সুরক্ষায় সড়কে যানবাহনের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি গতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
অন্যদিকে, গণপরিবহনে পুরোনো ইঞ্জিন ব্যবহার করা হচ্ছে না বলে দাবি করেন সড়ক পরিবহন মালিকপক্ষের নেতারা। তাদের মতে, মানহীন জ্বালানি তেল ও ভেজাল মবিলের কারণে যানবাহন থেকে কালো ধোঁয়া নির্গমনের পরিমাণ বাড়ছে। এ সমস্যা সমাধানে জ্বালানি তেল ও লুব্রিকেন্টের মান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনকে (বিএসটিআই) আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান তারা। পাশাপাশি গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে মান যাচাই এবং চালকদের জন্য সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
বিআরটিএর পরিচালক রুবাইয়াত-ই-আশিক বলেন, ঢাকার বায়ুদূষণ কমাতে যানবাহনের ফিটনেস ও নির্গমন পরীক্ষা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। মেয়াদোত্তীর্ণ, অনুপযুক্ত ও অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পরিবহন মালিকদের নিয়মিত যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ এবং চালকদের পরিবেশবান্ধব গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. এস এম সালাউদ্দীন বলেন, রাজধানীর বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু আইন ও নীতিমালা প্রণয়নই যথেষ্ট নয়। এগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন, নিয়মিত নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, চালক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নাগরিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান বলেন, নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রতিদিন যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা করা হচ্ছে। পরীক্ষায় ফিটনেসবিহীন অন্তত ১৫ থেকে ২০টি গাড়ি প্রতিদিন ডাম্পিং করা হচ্ছে। পাশাপাশি নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও পরিবেশ সুরক্ষায় বিআরটিএর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।






