সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতি বছর ৪ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস। যৌন স্বাস্থ্য, যৌন অধিকার, ন্যায়বিচার এবং সবার জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ যৌন কল্যাণ নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরতেই এ দিবসের সূচনা। বর্তমান বিশ্বে স্বাস্থ্য, মানবাধিকার ও সামাজিক উন্নয়নের আলোচনায় যৌন স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও অনেক সমাজে এটি এখনও সংকোচ, কুসংস্কার এবং ভুল তথ্যের আড়ালে রয়ে গেছে। ফলে এই দিবসের গুরুত্ব দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস প্রথম উদযাপিত হয় ২০১০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন ফর সেক্সুয়াল হেলথ’ এ দিবসটির প্রবর্তন করে। প্রথম বছরের প্রতিপাদ্য ছিল “আসুন এটি নিয়ে কথা বলি”, যার মূল লক্ষ্য ছিল যৌনতা সম্পর্কিত সামাজিক ভয়, সংকোচ ও ট্যাবু ভাঙা। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে “এভরি বডি”, যা প্রত্যেক মানুষের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বার্তা বহন করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যৌন স্বাস্থ্য বলতে কেবল যৌন রোগ বা শারীরিক সমস্যার অনুপস্থিতিকে বোঝায় না; বরং এটি যৌনতার সঙ্গে সম্পর্কিত শারীরিক, মানসিক, আবেগগত এবং সামাজিক সুস্থতার একটি ইতিবাচক ও সমন্বিত অবস্থা। অর্থাৎ যৌন স্বাস্থ্য মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা বলে যেখানে ব্যক্তি জোর-জবরদস্তি, বৈষম্য ও সহিংসতা থেকে মুক্ত থেকে নিরাপদ, সম্মানজনক ও দায়িত্বশীল সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যৌন স্বাস্থ্যের প্রধান কয়েকটি ভিত্তি রয়েছে। শারীরিক সুস্থতাÑযেখানে প্রজননতন্ত্রের সঠিক কার্যকারিতা, হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য এবং রোগমুক্ত অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক ও আবেগগত সুস্থতাÑযেখানে নিজের শরীর ও যৌনতা সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব, আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক স্বস্তি প্রয়োজন। সামাজিক সুস্থতাÑযেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মতি এবং সুস্থ যোগাযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অধিকার ও নিরাপত্তাÑযেখানে ব্যক্তি তার শরীর ও প্রজননসংক্রান্ত বিষয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পায় এবং সহিংসতা ও বৈষম্য থেকে সুরক্ষা লাভ করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, পৃথিবীতে প্রতিদিন ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষ ক্ল্যামাইডিয়া, গনোরিয়া, সিফিলিস ও ট্রাইকোমোনিয়াসিসের মতো যৌনবাহিত সংক্রমণে আক্রান্ত হন এবং এইচপিভি সংক্রমণের কারণে নারীদের জরায়ুমুখের ক্যান্সার হয়, যা সঠিক সময়ে টিকাদান ও স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য। গবেষণায় দেখা যায়, অনিরাপদ যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের কারণে নারীদের সামগ্রিক অসুস্থতার ২০% এবং পুরুষদের ১৪% ঘটে থাকে, পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩১% পুরুষ ও ৪৩% নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে যৌন কার্যকারিতাজনিত সমস্যার মুখোমুখি হন; যা প্রমাণ করে যৌন স্বাস্থ্য কোনো ব্যক্তিগত বা সীমিত বিষয় নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ইস্যু।
যৌন স্বাস্থ্য সমস্যার পেছনে শারীরিক সংক্রমণ বা জটিলতার পাশাপাশি মানসিক চাপ, উদ্বেগ, স্থূলতা ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন অন্যতম প্রধান কারণ, যা শরীরবৃত্তীয় হরমোন ও রক্ত সঞ্চালনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে। তাই যেকোনো ধরনের সামাজিক কুসংস্কার বা অপচিকিৎসার ফাঁদে না পড়েÑনিরাপদ যৌন আচরণ, নিয়মিত ব্যায়াম, পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান বর্জন এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখার মাধ্যমে জীবনধারা সংশোধন করা প্রয়োজন; আর যেকোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যায় প্রশিক্ষিত ও নিবন্ধিত চিকিৎসকের সময়োপযোগী পরামর্শ গ্রহণ করাই একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ জীবন গঠনের মূল চাবিকাঠি।
বাংলাদেশে রক্ষণশীল সামাজিক মানসিকতার কারণে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়টি এখনো চরম অবহেলিত, যার ফলে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কিশোর-কিশোরীরা সঠিক দিকনির্দেশনা পাচ্ছে না। শ্রেণীকক্ষে প্রজনন স্বাস্থ্যের অধ্যায় এড়িয়ে যাওয়া, মাসিকসংক্রান্ত কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ, অল্প বয়সে গর্ভধারণ এবং প্রান্তিক ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর অপর্যাপ্ত ও সংবেদনশীলতাহীন স্বাস্থ্যসেবা এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করেছে।
যৌন স্বাস্থ্য কেবল স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়; এটি মানবাধিকারের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতে যৌন স্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক মানুষের নিজের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে। একইসঙ্গে সহিংসতা, জবরদস্তি ও বৈষম্য থেকে মুক্ত থাকার অধিকারও নিশ্চিত করা জরুরি। সঠিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য পাওয়ার সুযোগ, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা লাভ এবং সম্মানজনক আচরণ পাওয়াও এই অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।
আইনের ক্ষেত্রেও যৌন স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা এবং অন্যান্য যৌন অপরাধ প্রতিরোধে কঠোর আইন বিদ্যমান। পাশাপাশি মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা অনেক রাষ্ট্র তাদের জাতীয় নীতিমালার অংশ। তবে এখনও অনেক সমাজে যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা সামাজিক ট্যাবুর কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে মানুষ প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা থেকে বঞ্চিত হয়, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সামাজিক সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবসের অন্যতম লক্ষ্য হলো এই সামাজিক নীরবতা ভাঙা। যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা, দায়িত্বশীল এবং বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করে, কুসংস্কার দূর করে এবং তরুণ প্রজন্মকে সঠিক তথ্য জানতে সহায়তা করে। একইসঙ্গে এটি পারস্পরিক সম্মান, সমতা, দায়িত্ববোধ এবং নিরাপদ আচরণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং তথ্যপ্রবাহের যুগে সঠিক যৌন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসচেতনতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভুল তথ্য, গুজব এবং সামাজিক সংকোচ অনেক সময় মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। তাই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বিজ্ঞানসম্মত যৌন স্বাস্থ্য শিক্ষা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে যৌন স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়, বরং মানবকল্যাণ, সামাজিক উন্নয়ন এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি অপরিহার্য উপাদান। একটি সুস্থ, সচেতন, বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গঠনের জন্য যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান, সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।