সচ্চিদানন্দ দে সদয়
শরতের নীল আকাশ, কাশফুলের দোলা, শিউলির সুবাস আর ঢাকের শব্দ জানান দিচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসবের বার্তা। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিক সূচনা শুক্রবার মহাষষ্ঠীতে। ২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর, শুক্রবার পালিত হবে এই তিথি। দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু মহাষষ্ঠীর তাৎপর্য প্রতিমা প্রতিষ্ঠা কিংবা আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল শিক্ষা অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জাগরণ, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। হিন্দু পুরাণের কাহিনি অনুসারে, মহিষাসুরের অত্যাচার থেকে দেবতাদের রক্ষা করতে আবির্ভূত হন দেবী দুর্গা। দীর্ঘ সংগ্রামের পর তাঁর হাতে মহিষাসুরের পরাজয় ঘটে। এই কাহিনি ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ হলেও এর অন্তর্নিহিত বার্তা সর্বজনীন। অহংকার, নিপীড়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহার যত প্রবলই হোক, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজন কখনো ফুরায় না। দেবী দুর্গার অসুরবিনাশী রূপ তাই অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার প্রতীক। মহাষষ্ঠীর অন্যতম প্রধান আচার দেবীর বোধন।
প্রচলিত বিশ্বাসে, এদিন দেবীকে জাগ্রত করে মর্ত্যে আহ্বান জানানো হয়। এই বোধনের একটি সামাজিক তাৎপর্যও রয়েছে। দেবীকে জাগ্রত করার পাশাপাশি মানুষের বিবেকও কি জাগ্রত হচ্ছে? প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিনাশ কামনা করি আমরা, অথচ বাস্তব জীবনে অন্যায় দেখেও অনেক সময় নীরব থাকি। নারী নির্যাতন, দুর্নীতি, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিলে অসুরবিনাশিনীর আরাধনা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় আটকে থাকে। এবারের দুর্গাপূজায় দেবীর আগমন ও গমনের বাহন নিয়েও প্রচলিত শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা রয়েছে। পঞ্জিকার গণনা অনুযায়ী, দেবীর আগমন ঘোটকে বা ঘোড়ায় এবং গমন নৌকায়। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় ঘোটকে আগমনকে ‘ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে’ বলা হয়, যা বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয়ের আশঙ্কার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। অন্যদিকে, নৌকায় গমনকে শস্যবৃদ্ধি ও সুখ-সমৃদ্ধির লক্ষণ মনে করা হয়; পাশাপাশি জলবৃদ্ধি বা বন্যার আশঙ্কার কথাও প্রচলিত রয়েছে।
এসব বিশ্বাস ধর্মীয় ঐতিহ্য ও লোকাচারের অংশ। তবে দেবীর বাহনের সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্কের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই এসব ব্যাখ্যাকে আতঙ্কের কারণ না করে বাস্তব দায়িত্ব পালনের তাগিদ হিসেবে দেখা উচিত। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করে গণতান্ত্রিক আচরণ, সহনশীলতা ও আইনের শাসনের ওপর। আর দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রয়োজন আগাম সতর্কতা, কার্যকর প্রস্তুতি ও দ্রুত ব্যবস্থা। দেবীর কাছে শান্তি কামনা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; শান্তি রক্ষার কাজটিও মানুষকেই করতে হয়। দুর্গোৎসবের আরেকটি বড় শক্তি সামাজিক সম্প্রীতি।
বাংলাদেশে এই উৎসব হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আয়োজন হলেও এর আনন্দ বহু মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। পূজাম-পে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের উপস্থিতি, শুভেচ্ছা বিনিময় ও সাংস্কৃতিক আয়োজন পারস্পরিক সৌহার্দ্যের সুযোগ তৈরি করে। এই মিলনই উৎসবের সামাজিক সৌন্দর্য। কিন্তু সম্প্রীতির প্রকৃত পরীক্ষা ম-পের আলোকসজ্জায় নয়, বরং উৎসবের বাইরের দৈনন্দিন জীবনে। সংখ্যালঘু মানুষের নিরাপত্তা, ধর্মীয় উপাসনালয়ের সুরক্ষা ও সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পূজার কয়েকটি দিনে নিরাপত্তা জোরদার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সারা বছরই নাগরিকদের নিরাপদে ধর্ম পালন ও জীবনযাপনের নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
প্রতিমা ভাঙচুর, উপাসনালয়ে হামলা, ভয়ভীতি কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের ঘটনা ঘটলে দ্রুত তদন্ত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীর পরিচয় যা-ই হোক, আইনের প্রয়োগে পক্ষপাতের সুযোগ থাকা উচিত নয়।দুর্গোৎসবের সঙ্গে বহু মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে। প্রতিমাশিল্পী, ঢাকি, মৃৎশিল্পী, বাঁশ ও কাঠের কারিগর, আলোকসজ্জাকর্মী এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মাসের পর মাস প্রস্তুতি নেন। তাঁদের শ্রমেই উৎসবের আয়োজন পূর্ণতা পায়।
অথচ ম-পের জাঁকজমক নিয়ে আলোচনা হলেও এই শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য পারিশ্রমিক ও কাজের নিরাপত্তা সব সময় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। উৎসবের সাফল্য বিচার করতে হলে তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদার বিষয়টিও সামনে আনতে হবে। পরিবেশ ও জন নিরাপত্তাও আয়োজকদের দায়িত্বের অংশ। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, অগ্নিনিরাপত্তা, যানজট ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিমা বিসর্জনে নদী-জলাশয়ের দূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা ও যাতায়াতের নিরাপত্তায় বাড়তি সতর্কতা জরুরি। আয়োজক কমিটি ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত প্রস্তুতি থাকলে অনাকাক্সিক্ষত ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
মহাষষ্ঠী আমাদের সামনে তাই দুটি প্রশ্ন রাখে: আমরা কীভাবে দেবীর আরাধনা করছি, আর তাঁর শিক্ষাকে জীবনে কতটা ধারণ করছি? দেবী দুর্গার শক্তি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়। সেই সাহসের বাস্তব প্রকাশ ঘটতে হবে নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থানে, ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রত্যাখ্যানে এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে। এবারের মহাষষ্ঠীতে অঙ্গীকার হোকÑধর্মের পরিচয় দিয়ে কাউকে ভয় দেখানো যাবে না, অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা যাবে না, আর নাগরিক অধিকার কারও দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় হতে পারে না।
দেবীর বোধন তখনই সার্থক হবে, যখন মানুষের বিবেক জাগবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে উঠবে এবং রাষ্ট্র প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ম-পে অসুরবিনাশিনীর বন্দনা আর বাস্তবে অন্যায়ের সঙ্গে আপসÑএই দ্বিচারিতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ, দেবীর আরাধনার সার্থকতা প্রতিমার উচ্চতায় নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের অবস্থানে; উৎসবের আলোকসজ্জায় নয়, প্রতিটি মানুষের নিরাপদে বাঁচার অধিকারে।
লেখক: সংবাদকর্মী