সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩

সাতক্ষীরায় ৭৬ শতাংশ নারীই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সহিংসতার শিকার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৩:৫৪ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় ৭৬ শতাংশ নারীই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সহিংসতার শিকার

মো: হোসেন আলী: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানি ও সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সাতক্ষীরায় পরিচালিত এক জরিপে অংশ নেওয়া ৬২ জন উত্তরদাতার মধ্যে ৪৭ জন (প্রায় ৭৬ শতাংশ) জানিয়েছেন, তারা কোনো না কোনো সময় অনলাইনে হয়রানি বা ডিজিটাল সহিংসতার শিকার হয়েছেন। অথচ ৪৮ জনই জানিয়েছেন, অনলাইন সহিংসতার ঘটনায় কোথায় অভিযোগ করতে হয়, সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই।

সোমবার (৬ জুলাই) সাতক্ষীরা সদর উপজেলা পরিষদের হলরুমে ‘যুব নেতৃত্বে ডিজিটাল নিরাপত্তা, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে এডভোকেসি সভায়’ এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অ্যাকশন ফর ট্রান্সফরমেশন প্রকল্পের আওতায় সাতক্ষীরার উন্নয়ন সংস্থা সিডো জরিপটি পরিচালনা করে। এতে সহযোগিতা করেছে একশনএইড বাংলাদেশ।

পরিচালিত এ জরিপে তালা উপজেলার ধানদিয়া ও নগরঘাটা ইউনিয়ন এবং সাতক্ষীরা সদর উপজেলার পৌরসভা, ফিংড়ী ও ব্রহ্মরাজপুর ইউনিয়নে যুব সদস্য, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, ভুক্তভোগী নারী ও কমিউনিটির সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হয়। জরিপে মোট ৬২টি কী ইনফরমেন্ট ইন্টারভিউ (নারী ৩৮, পুরুষ ২৪) এবং চারটি ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনে (এফজিডি) ৪৬ জন (নারী ২৩, পুরুষ ২৩) অংশ নেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করলেও একই সঙ্গে নারীদের জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকিরও সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয়ে হয়রানি, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অপব্যবহার, সাইবার বুলিং, ব্ল্যাকমেইল, যৌন হয়রানি, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, চরিত্রহনন, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করে হয়রানির মতো ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে।

জরিপে অংশ নেওয়া সবাই ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইউটিউব ব্যবহার করেন। এছাড়া ২৫ জন টিকটক, ১৫ জন ই-মেইল, ৮ জন ইমো এবং ৫ জন ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করেন। হয়রানির মাধ্যম হিসেবে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে ফেসবুক। জরিপ অনুযায়ী, ২০ জন ফেসবুকের মাধ্যমে এবং ৫ জন মেসেঞ্জারের মাধ্যমে হয়রানির শিকার হয়েছেন। এছাড়া ফোন মেসেজ ও ইমোর মাধ্যমেও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে।

হয়রানির ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ১৯ জনের নামে ভুয়া আইডি খোলা হয়েছে। ১৬ জন অশালীন বার্তা পেয়েছেন। ১১ জনের ছবি বা ভিডিও অপব্যবহার করা হয়েছে এবং সমানসংখ্যক ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া ৯ জন হুমকি, ৭ জন ব্ল্যাকমেইল এবং ৪ জন সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন।

ডিজিটাল সহিংসতার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে ভুক্তভোগীদের মানসিক স্বাস্থ্য। ২৯ জন জানিয়েছেন, তারা তীব্র মানসিক চাপের মধ্যে পড়েছেন। ২২ জন ভয় ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছেন। ১৩ জনের শিক্ষা বা কর্মজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ৮ জন আত্মবিশ্বাস হারিয়েছেন এবং ৭ জন সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন।

জরিপে দেখা গেছে, হয়রানির শিকার হওয়ার পর মাত্র একজন পুলিশকে এবং একজন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যকে বিষয়টি জানিয়েছেন। ১৫ জন পরিবারের সদস্যদের এবং ২০ জন বন্ধুদের সঙ্গে বিষয়টি ভাগাভাগি করেছেন। একজন শিক্ষককে জানিয়েছেন। তবে ৮ জন কাউকেই কিছু জানাননি।

কেন অভিযোগ করেননি? এমন প্রশ্নে ১৬ জন বলেছেন, প্রতিকার পাবেন বলে বিশ্বাস করেননি। ১৫ জন ভয় পেয়েছেন, ১৪ জন সামাজিক লজ্জার কথা বলেছেন। ৯ জন জানিয়েছেন, কোথায় অভিযোগ করবেন তা জানতেন না। আর ৬ জন পরিবারের বাধার কথা উল্লেখ করেছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ৬২ জনের মধ্যে ৪৮ জনই জানিয়েছেন, অনলাইন সহিংসতার ঘটনায় কোথায় অভিযোগ করা যায়, সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কেউই অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে নারীদের জন্য ‘খুব নিরাপদ’ মনে করেননি। ২৪ জন বলেছেন, কিছুটা নিরাপদ। অন্যদিকে ২৩ জন এটিকে অনিরাপদ এবং ১৫ জন খুবই অনিরাপদ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। অংশগ্রহণকারীদের মতে, সামাজিক কুসংস্কার, প্রযুক্তি সম্পর্কে সীমিত জ্ঞান, ব্যক্তিগত তথ্য অসতর্কভাবে শেয়ার করা, দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অপরাধীদের পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ নারীদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

প্রতিবেদনে নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি পর্যায়ে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, অনলাইন লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা, কিশোরী ও তরুণীদের জন্য কাউন্সেলিং ও আইনি সহায়তা সহজলভ্য করা, যুব নেতৃত্বে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা।

প্রতিবেদনটি বলছে, ডিজিটাল প্রযুক্তির সুবিধা ভোগ করতে হলে নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এ জন্য শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগই হতে পারে ডিজিটাল সহিংসতা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর পথ।

উন্নয়ন সংস্থা সিডোর নির্বাহী পরিচালক শ্যামল কুমার বিশ্বাসের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য দেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্ণব দত্ত, জেলা তথ্য কর্মকর্তা মো. জাহারুল ইসলাম, সদর উপজেলা ভারপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবুল হোসেন, এটিএন বাংলার স্টাফ রিপোর্টার ও সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম. কামরুজ্জামান, স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্ত, সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মমতাজ পারভীন, সাতক্ষীরা পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শফিক উদ দৌলা সাগর, সমাজকর্মী অ্যাডভোকেট এস এম বিপ্লব হোসেন, সিডোর প্রকল্প সমন্বয়কারী তৌহিদুর রহমান, প্রোগ্রাম অফিসার চন্দ্র শেখর হালদার, যুব সংগঠক মো. সাকিব হোসেন, মাহফুজ আহমেদ প্রমুখ।

সভায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী, উন্নয়নকর্মী, যুব প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। এ সময় প্রকল্পের আওতায় গঠিত যুব সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।

 

 

Ads small one

সাতক্ষীরায় ২৬০ কেজি জেলি পুশ করা চিংড়ি জব্দ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৪:৩৮ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় ২৬০ কেজি জেলি পুশ করা চিংড়ি জব্দ

পত্রদূত রিপোর্ট: সাতক্ষীরা শহরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে প্রায় ২৬০ কেজি জেলি পুশ করা চিংড়ি মাছ জব্দ করা হয়েছে। গতকাল রোববার রাতে শহরের সংগীতা মোড় থেকে এ মাছগুলো জব্দ করা হয়। পরে জনসম্মুখে গাড়ির চাকায় পিষ্ট করে মাছগুলো ধ্বংস করা হয়।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে নেতৃত্ব দেন, জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহেদ হোসেন।

তিনি জানান, সাতক্ষীরা শহরের সঙ্গীতা মোড় এলাকায় ঢাকাগামী পরিবহন যোগে বিপুল পরিমাণ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর জেলি পুশ করা চিংড়ি মাছ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালানো হয়। এসময় সেখান থেকে ২৬০ কেজি চিংড়ি মাছ জব্দ করা হয়। চিংড়ি মাছ গুলো পরে জনসম্মুখে গাড়ির চাকায় পিষ্ট করে ধ্বংস করা হয়।

তিনি আরো জানান, খাদ্যে ভেজাল ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। জেলি বা অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থ পুশ করে মাছের ওজন বৃদ্ধি করা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। খাদ্যে ভেজাল ও প্রতারণার সঙ্গে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আরো জানান।

লেখক, গায়ক ও সুরকার: সংস্কৃতির ত্রয়ী, সমাজের বিবেক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৪:২৫ অপরাহ্ণ
লেখক, গায়ক ও সুরকার: সংস্কৃতির ত্রয়ী, সমাজের বিবেক

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সভ্যতার ইতিহাসে মানুষ যতই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্জন করুক না কেন, তার আত্মপরিচয় নির্মিত হয় সংস্কৃতির ভিত্তিতে। রাষ্ট্রের অর্থনীতি, রাজনীতি বা প্রশাসনিক কাঠামো একটি জাতিকে টিকিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু তার আত্মাকে জীবন্ত রাখে সাহিত্য ও সংগীত। আর এই সাহিত্য ও সংগীতের প্রাণ ভোমরা হলেন লেখক, গায়ক ও সুরকার। এই তিন সৃজনশীল শক্তির সমন্বয়েই একটি গান জন্ম নেয়, একটি কবিতা সমাজকে আন্দোলিত করে, একটি সুর মানুষের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করে।

 

তাঁরা কেবল শিল্পী নন; তাঁরা সময়ের দালিলিক সাক্ষী, সমাজের নৈতিক দিক নির্দেশক এবং মানবিকতার অনন্ত প্রবাহের বাহক। একজন লেখক শব্দের মাধ্যমে সমাজের প্রতিচ্ছবি আঁকেন। তাঁর কলমে ধরা পড়ে মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, প্রতিবাদ ও আকাক্সক্ষা। একজন সুরকার সেই শব্দকে সুরের আবরণে নতুন জীবন দেন। তিনি অনুভূতির এমন এক ভাষা তৈরি করেন, যা শব্দ ছাড়িয়ে সরাসরি হৃদয়ে পৌঁছে যায়। আর একজন গায়ক সেই সৃষ্টি কণ্ঠে ধারণ করে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। এই তিনজনের সম্মিলিত সৃষ্টিই একটি গানকে কেবল বিনোদন নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করে।

 

বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের ইতিহাস এই ত্রয়ীর শক্তির উজ্জ্বল উদাহরণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ও কবিতা যেমন মানবিকতার গভীরতা শেখায়, তেমনি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টি শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। তাঁদের পরবর্তী যুগেও অসংখ্য লেখক, সুরকার ও গায়ক মানুষের জীবন ও সমাজকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছেন। একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি উৎসব, পারিবারিক আনন্দ-বেদনা এমনকি রাজনৈতিক চেতনার বিকাশেও গান ও সাহিত্য ছিল অবিচ্ছেদ্য অংশ।কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এই ত্রয়ীর ভূমিকা ও অবস্থান অনেকটাই বদলে গেছে। বর্তমানে প্রযুক্তির বিস্তার, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থান এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব সাহিত্য ও সংগীতকে এক নতুন বাস্তবতায় দাঁড় করিয়েছে।

 

এখন একটি গান বা লেখা মুহূর্তেই কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে এক বিশাল সুযোগ। কিন্তু একই সঙ্গে এটি শিল্পের গভীরতা ও মানের জন্য এক ধরনের চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে।আজকের দিনে জনপ্রিয়তা অনেকাংশে নির্ধারিত হচ্ছে ভিউ, লাইক, শেয়ার বা ট্রেন্ডের ওপর। ফলে অনেক সময় গভীর সাহিত্য গুণ সম্পন্ন লেখা বা সুর অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত থেকে যাচ্ছে, আর চটকদার ও দ্রুতগ্রাহ্য কনটেন্ট সহজেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

 

এই প্রবণতা ধীরে ধীরে শিল্পের মানদ-কে পরিবর্তন করছে। শিল্প এখন আর শুধু সৃষ্টিশীলতার প্রতিফলন নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে বাজার প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের একটি বড় সমস্যা হলো বাণিজ্যিকীকরণ। সাহিত্য ও সংগীত যখন কেবল বাজারের পণ্য হয়ে ওঠে, তখন তার মূল উদ্দেশ্যÑমানবিকতা, চিন্তার গভীরতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাÑঅনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। একটি গান কত দ্রুত ভাইরাল হলো, একটি বই কত বিক্রি হলোÑএই হিসাবই যেন অনেক ক্ষেত্রে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ প্রকৃত শিল্পের মূল্য কখনো তাৎক্ষণিক সাফল্যে নির্ধারিত হয় না; বরং সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকার মধ্যেই তার প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায়।

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট হলো স্বীকৃতির অসমতা। একটি গান জনপ্রিয় হলে সাধারণত গায়কের নামই বেশি আলোচিত হয়, অথচ সেই গানের পেছনে থাকা গীতিকার ও সুরকার অনেক সময় আড়ালেই থেকে যান। এটি শুধু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়, বরং শিল্পের সামগ্রিক মর্যাদার প্রশ্নও বটে। একটি গান কোনো একক ব্যক্তির সৃষ্টি নয়; এটি একাধিক সৃজনশীল মস্তিষ্কের সম্মিলিত ফল। তাই গীতিকার, সুরকার ও গায়কÑতিনজনেরই সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমান ডিজিটাল যুগে আরেকটি নতুন বাস্তবতা হলো কপিরাইট লঙ্ঘন।

 

অনেক সময় অনুমতি ছাড়া গান, লেখা বা সুর ব্যবহার করা হয়। এতে প্রকৃত স্রষ্টারা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এটি সৃজনশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি। যদি একজন শিল্পী তাঁর সৃষ্টির যথাযথ স্বীকৃতি ও সম্মান না পান, তবে নতুন সৃষ্টির প্রতি তাঁর আগ্রহও কমে যেতে পারে। প্রযুক্তির আরেকটি দিক হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার। এখন গান, সুর এমনকি লেখা পর্যন্ত এআই দিয়ে তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। এটি একদিকে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুললেও অন্যদিকে মৌলিক সৃষ্টির প্রশ্নে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করছে। প্রযুক্তি অবশ্যই সৃজনশীলতার সহায়ক হতে পারে, কিন্তু তা যদি মানুষের মৌলিক সৃষ্টিকে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করে, তবে সাংস্কৃতিক জগতের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

 

এই পরিস্থিতিতে লেখক, গায়ক ও সুরকারদের সামাজিক দায়বদ্ধতা আরও বেড়ে যায়। তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজের বাস্তবতা, অন্যায়, বৈষম্য, ভালোবাসা, মানবিকতা ও প্রতিবাদের ভাষা প্রকাশ পায়। তাঁরা কেবল বিনোদন দেন না; তাঁরা মানুষের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করেন। একটি ভালো গান বা লেখা মানুষের মনোভাব পরিবর্তন করতে পারে, সমাজে নতুন চেতনার জন্ম দিতে পারে। রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

 

কপিরাইট আইন কার্যকর করা, নতুন প্রতিভাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া, মানসম্মত শিল্পচর্চার পরিবেশ তৈরি করা এবং প্রকৃত শিল্পীদের স্বীকৃতি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি গণমাধ্যমকে কেবল জনপ্রিয়তার পেছনে না ছুটে গুণগত মানকেও গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেও দীর্ঘমেয়াদে সাংস্কৃতিক চর্চা গড়ে তোলা প্রয়োজন। শিশুদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস, সংগীত শোনার রুচি এবং সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটাতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেবল ভোক্তা হবে, স্রষ্টা নয়। সবশেষে বলা যায়, লেখক, গায়ক ও সুরকার কেবল শিল্পের মানুষ নন; তাঁরা সমাজের আত্মা। তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে একটি জাতি নিজের পরিচয় খুঁজে পায়, নিজের স্বপ্ন দেখে এবং ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করে।

 

যদি তাঁদের সৃষ্টি মানবিকতা, সত্য ও ন্যায়বোধে সমৃদ্ধ হয়, তবে সমাজও সমৃদ্ধ হবে। আর যদি শিল্প কেবল বাজারের চাপে পরিচালিত হয়, তবে তা ধীরে ধীরে তার আত্মা হারাবে। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কেবল জনপ্রিয়তাকে মনে রাখে না; ইতিহাস মনে রাখে তাঁদেরই, যাঁরা সময়কে ছাড়িয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেন। তাই এই ত্রয়ীর মর্যাদা রক্ষা করা, তাঁদের সৃজনশীল স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং শিল্পকে আবারও মানবিকতার পথে ফিরিয়ে আনা আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক দায়িত্ব।

লেখক: সংবাদকর্মী

মতামত: অবৈধ পাইপে ভাঙছে ইছামতির বাঁধ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৪:১৯ অপরাহ্ণ
মতামত: অবৈধ পাইপে ভাঙছে ইছামতির বাঁধ

তরিকুল ইসলাম

সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তঘেঁষা ইছামতি নদী শুধু একটি নদী নয়; এটি এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং পরিবেশের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বছরের পর বছর ধরে কিছু অসাধু ব্যক্তি ব্যক্তিস্বার্থে নদীর তীরবর্তী বেড়িবাঁধ কেটে কিংবা ফুটো করে অবৈধভাবে পাইপ বসিয়ে নদীর পানি ওঠানামার ব্যবস্থা করছে। সাময়িক আর্থিক লাভের আশায় তারা যে ক্ষতি করছে, তার মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে পুরো জনপদকে।

কালিগঞ্জ উপজেলার শুইলপুর থেকে দেবহাটা উপজেলার ভাতশালাসহ ইছামতি নদীর বিভিন্ন অংশে বর্তমানে এমন অসংখ্য অবৈধ পাইপের অস্তিত্ব দেখা যায়। কোথাও বাঁধ কেটে, কোথাও আবার বাঁধের নিচ দিয়ে পাইপ বসিয়ে নদীর পানি মাছের ঘেরে বা চিংড়ি চাষে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাইরে থেকে বিষয়টি সাধারণ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি একটি ভয়াবহ পরিবেশগত ও প্রকৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করছে।

একটি বেড়িবাঁধ কেবল মাটির স্তূপ নয়; এটি একটি বৈজ্ঞানিক নকশায় নির্মিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। পানি উন্নয়ন বোর্ড কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে যে বাঁধ নির্মাণ করে, তার প্রতিটি স্তর নির্দিষ্ট প্রকৌশলগত মান অনুসরণ করে তৈরি করা হয়। সেই বাঁধের কোনো অংশ কেটে বা ফুটো করে পাইপ বসানো মানে পুরো কাঠামোকেই দুর্বল করে দেওয়া। বর্ষাকাল কিংবা পূর্ণ জোয়ারের সময় পানির তীব্র চাপ সবচেয়ে আগে আঘাত হানে এই দুর্বল অংশগুলোতে। ফলাফল-একসময় হঠাৎ করেই বাঁধ ভেঙে যায়, আর মুহূর্তের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।

প্রতিবছর সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় বেড়িবাঁধ ভাঙার ঘটনা ঘটে। তখন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সরকারের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলে, দ্রুত বাঁধ নির্মাণের দাবি জানায়, মানববন্ধন করে, সংবাদ সম্মেলন করে। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই আত্মসমালোচনা হয়-এই বাঁধ দুর্বল হওয়ার পেছনে স্থানীয়ভাবেই কতটা অবহেলা বা অবৈধ কর্মকান্ড দায়ী ছিল।

বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই যেসব বাঁধ পরে ভেঙে যায়, সেগুলোর গায়ে আগেই অসংখ্য অবৈধ পাইপ বসানো হয়েছিল। ব্যক্তিগত ঘেরে পানি ওঠানোর সুবিধার জন্য বাঁধের স্থায়িত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া হয়। পরে যখন দুর্যোগ আসে, তখন ক্ষতির বোঝা বহন করে পুরো সমাজ এবং রাষ্ট্র।

এর আরেকটি ভয়াবহ প্রভাব পড়ে কৃষিতে। লবণাক্ত নদীর পানি যখন বাঁধ ভেঙে ফসলি জমিতে ঢুকে পড়ে, তখন শুধু একটি মৌসুম নয়, বহু বছর ধরে সেই জমির উৎপাদনক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। ধান, পাট, শাকসবজি কিংবা অন্যান্য ফসল চাষ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কৃষক হারান তাঁর পুঁজি, শ্রম এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

শুধু কৃষিই নয়, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হয়। অপরিকল্পিতভাবে পাইপ বসানোর ফলে জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়। এতে নদীর তীর ক্ষয়, পলি জমার ধরন এবং জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে একটি সুস্থ নদী ধীরে ধীরে পরিবেশগত ভারসাম্য হারাতে শুরু করে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব কর্মকান্ড কোনোভাবেই বৈধ নয়। সরকারি বেড়িবাঁধ কাটা, ক্ষতিগ্রস্ত করা কিংবা অনুমতি ছাড়া নদী থেকে পানি উত্তোলনের জন্য বাঁধে পাইপ বসানো বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী দন্ডনীয় অপরাধ। তারপরও প্রকাশ্যে দিনের পর দিন এই কাজ চললেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি বা আইন প্রয়োগ চোখে পড়ে না। কোথাও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়া, কোথাও প্রশাসনিক উদাসীনতা-সব মিলিয়ে অবৈধ কর্মকান্ড যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। শুধু পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে হবে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সর্বোপরি স্থানীয় জনগণকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। কোথাও নতুন করে বাঁধ কেটে পাইপ বসানো হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে অবৈধ পাইপ অপসারণ, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে বিকল্প ব্যবস্থার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। মাছ বা চিংড়ির ঘেরে পানি নেওয়ার প্রয়োজন থাকতেই পারে। কিন্তু তার জন্য নদীর বাঁধ ধ্বংস করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। প্রকৌশলগতভাবে অনুমোদিত স্লুইসগেট, নিয়ন্ত্রিত খাল অথবা পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। নদী রক্ষা করেও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চালানো যায়-প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা।

স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আজ একজন ব্যক্তি নিজের সুবিধার জন্য বাঁধ কাটছেন, কিন্তু আগামীকাল সেই বাঁধ ভেঙে তাঁর নিজের ঘরবাড়ি, জমি কিংবা ব্যবসাও পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে। তাই এটি শুধু প্রশাসনের বিষয় নয়; এটি সামাজিক দায়বদ্ধতারও প্রশ্ন।

ইছামতি নদী আমাদের ঐতিহ্য, সীমান্তের নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই নদী ও এর প্রতিরক্ষা বাঁধ রক্ষা করা মানে হাজারো মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। ব্যক্তিস্বার্থের কাছে জনস্বার্থকে বিসর্জন দেওয়া কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না।

আজ যদি আমরা অবৈধভাবে বাঁধ কাটাকে ‘ছোটখাটো বিষয়’ ভেবে এড়িয়ে যাই, তাহলে আগামী দিনের ভয়াবহ বন্যা, নদীভাঙন ও কৃষি বিপর্যয়ের দায় আমাদের সবাইকেই বহন করতে হবে। তাই এখনই সময়-অবৈধ পাইপ অপসারণ, বাঁধ কাটা বন্ধ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের। কারণ, বেড়িবাঁধ ভাঙে একদিনে; কিন্তু তার ক্ষত শুকাতে লেগে যায় বহু বছর।

লেখক: তরিকুল ইসলাম, সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী, মোবাইল: ০১৭১৫২৬১৮২৭
ইমেইল: tarikulbdnews@gmail.com