সাতক্ষীরার জলবায়ু সংকট ও বেঁচে থাকার লড়াই
মো. মামুন হাসান
সাতক্ষীরা বাংলাদেশের সেই জেলাগুলোর একটি, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন আর দূরের কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নয়, বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা। উপকূলবর্তী এই জেলার মানুষ প্রতিনিয়ত লড়ছেন লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় আর ভাঙনের সঙ্গে, আর এই লড়াইয়ের ক্ষতচিহ্ন এখনো দগদগে।
২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা আঘাত হানে সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায়। প্রায় পনেরো ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় গোটা উপকূল। সতেরো বছর পার হলেও সেই ক্ষত এখনো শুকায়নি।
একসময় সবুজ বনানী ও কৃষি ফসলে ভরপুর ছিল গাবুরা, পদ্মপুকুরসহ উপকূলীয় অঞ্চল, ধান, পাট, শাকসবজিতে সমৃদ্ধ ছিল পুরো এলাকা। কিন্তু আইলার পর লবণাক্ততায় অনাবাদি হয়ে পড়েছে বিস্তীর্ণ জমি, চারদিকে এখন শুধু মাছের ঘের, সবুজের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে।
এই সংকট শুধু অতীতের নয়, বর্তমানেও প্রবহমান। সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী জেলায় মোট আটশ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে আড়াইশ কিলোমিটারই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সিডর ও আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত এসব বাঁধে ব্যাপক ভাঙন ও ফাটল দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি জুন মাসের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, শুধু শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলাতেই চল্লিশটি পয়েন্টে প্রায় বিশ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে, যা বর্ষা মৌসুমে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করছে। কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া, ইছামতি ও বেতনা নদীর তীরবর্তী এলাকার লক্ষাধিক মানুষ প্রতি বর্ষা মৌসুমে বাঁধ ভাঙার আশঙ্কায় দিন কাটান।
লবণাক্ততার প্রভাব শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ নয়, তা মানুষের সুপেয় পানির অধিকারকেও কেড়ে নিয়েছে। প্রথম আলোর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী শ্যামনগর উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে সুপেয় পানির তীব্র সংকট চলছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। বিষয়টি এতটাই গুরুতর যে সম্প্রতি উচ্চ আদালত পর্যন্ত এই সংকট নিরসনে নেওয়া পদক্ষেপের অগ্রগতি প্রতিবেদন চেয়েছেন। উপকূলের বহু পরিবারকে এখন পানি কিনে ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রায় নতুন সংকট তৈরি করছে। কৃষিকাজে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও তাদের শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়া, যা জলবায়ু সংকটের সামাজিক মাত্রাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
তবে হতাশার মধ্যেও কিছু আশার আলো দেখা যাচ্ছে। রাইজিংবিডির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে সাতাশ কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে, যার অগ্রগতি বর্তমানে বাষট্টি শতাংশে পৌঁছেছে। পাশাপাশি জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির অর্থায়নে শ্যামনগরে আরও আড়াই কিলোমিটার স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মিত হচ্ছে। এই উদ্যোগগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে উপকূলবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কিছুটা হলেও লাঘব হতে পারে।
সাতক্ষীরার এই সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
প্রথমত বেড়িবাঁধ সংস্কারের কাজ কেবল প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও দুর্নীতিমুক্ত পরিকল্পনা প্রয়োজন, কেননা এই খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে সংকট রয়েই যাবে।
তৃতীয়ত লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের জাত সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের বিকল্প জীবিকার প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা কেবল চিংড়ি ঘেরের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না থেকে বহুমুখী আয়ের পথ খুঁজে পান।
চতুর্থত জলবায়ু অভিযোজনে নারীর ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
সাতক্ষীরার মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই বেঁচে থাকতে শিখেছেন, কিন্তু এই লড়াই একা তাদের চালিয়ে যাওয়ার কথা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত ও আন্তরিক উদ্যোগ, যাতে উপকূলের এই জনপদ আবারও তার হারানো সবুজ ও জীবনের ছন্দ ফিরে পেতে পারে।
লেখক: মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।









