শ্যামনগরে উপকূলীয় জনপদে খাল পুনঃখননে বদলে গেল কুলতলী কয়েক শত কৃষক পরিবার
পীযুষ বাউলিয়া পিন্টু মুন্সীগঞ্জ (শ্যামনগর): শ্যামনগরে উপকূলীয় জনপদে এক সময় কুলতলী খালটি ছিল এলাকার কৃষক ও প্রকৃতির অন্যতম ভরসা। যেখানে মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের তিনটি কৃষি নির্ভর প্রায় ৭ হাজার বিঘা জমির পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ। খনন হওয়ার পূর্বে কুলতলী গ্রামের মানুষ আমন মৌসুমে একটি ফসল উৎপাদন করার শেষে কাজের জন্য বাইরে ইটভাটাতে চলে যেতে হতো। খালটি খনন করার পর বদলে গেছে কুলতলী গ্রামের কয়েক শতাধিক পরিবারের জীবন জীবিকার ধরন। একই জমিতে পানি সাশ্রায়ী একাধিক ফসল উৎপাদন করা সহ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
বর্ষার মৌসুমে পানি ধরে রাখা, শুষ্ক মৌসুমে সেচের চাহিদা মেটানো এবং দেশীয় মাছ ও জলজ প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত কুলতলী খাল। সময়ের সঙ্গে নানা কারণে খালটির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে একদিকে কৃষকের সেচসংকট বাড়ে, অন্যদিকে কমতে থাকে খালের জীববৈচিত্র্য। এছাড়াও বর্ষার মৌসুমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
পুনঃখননের পর সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। খালে পানি ধারণক্ষমতা বেড়েছে, তৈরি হয়েছে সেচের নতুন সুযোগ।
এতে শ্যামনগর উপজেলার কুলতলী, ধানখালী এবং জেলেখালী গ্রামে কৃষক পরিবারের মধ্যে দেখা দিয়েছে নতুন আশার সঞ্চার। কৃষকের কাছে খালটি এখন শুধু একটি দেশীয় প্রজাতির মাছের জলাধার নয়, বরং বছরজুড়ে ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনার প্রতীক।
ধানখালী ও কুলতলী খালেতে ছিপ বাইতে দেখাযায় পুষ্পারাণী ও মলিনা রানীকে । তাঁর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আগে খালে ছিপ বাইতে দিতে না, জল ব্যবহার করার সুযোগ পেত না মাছ ধরা তো দূরে থাক । প্রয়োজনে বীজতলা সংরক্ষণ করার সহজ ছিল না এই কৃষকের।
খালটি খনন করে অবমুক্ত করে দেওয়ার পর থেকে ছিপ বেয়ে মাছ ধরে পরিবারে মাছের চাহিদা মিটাই। মাছ কেনা লাগে না। বীজতলা সহ পারিবারিক প্রয়োজনেও এই খালি খালের পানি ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে স্থানীয় কৃষকরা।
শ্যামনগর উপজেলার কুলতলী ও ধানখালী খালটি খননের মধ্য দিয়ে সে জমির পানি নিষ্কাশনের ও কৃষি ফসল উৎপাদনের কয়েক হাজার কৃষক পরিবারের শান্তি ফিরে এসেছে। মুন্সিগঞ্জ কুলতলী গ্রামের খালটি ফুলতলা বাউলিয়া বাড়ি ঘেরি ধানখালী ও জেলেখালীর ঘেরির পানি নিষ্কাশনের মধ্যে কুলতলী ২:২ কি: মি দীর্ঘ খালটি পুনঃখননের ফলে পানি সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, খালে সংরক্ষিত পানি ব্যবহার করে শুষ্ক মৌসুমেও কৃষিকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। । বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা ও পানির সংকট যখন কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন খাল পুনঃখনন স্থানীয় কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হয়ে উঠেছে।
খালের পানি সংরক্ষণ করে বছরব্যাপী জলবায়ু সহনশীল সবজি ও বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে খালে দেশীয় মাছ ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণেরও সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে কৃষির পাশাপাশি স্থানীয় জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষাতেও ভূমিকা রাখবে এই খাল।
স্থানীয় কৃষক উদয় মন্ডল বলেন, উপকূলীয় এলাকায় কৃষিকাজ অনেকটাই পানির ওপর নির্ভরশীল। বর্ষার শেষে খালে পানি না থাকলে সেচের জন্য বাড়তি খরচ করতে হয়। আবার লবণাক্ততার কারণে অনেক সময় মিঠা পানির সংকট দেখা দেয়। খালে পানি ধরে রাখা গেলে সেচের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি ফসলের আবাদ বাড়ানো সম্ভব হবে।
স্থানীয় কৃষক সুবোল মন্ডল বলেন খালটি দীর্ঘ বছর ধরে দখলদারদের দখলে ছিলো। তা ছাড়াও খালটি প্রায় ভরাট হয়ে গিয়েছিল। খালটি পুনঃখনন করে দখলদারদের হাত থেকে দখল মুক্ত করে, জনসাধারণের জন্য অবমুক্ত করা দেওয়ায় কয়েক হাজার মানুষ উপকৃত হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষাণী টুম্পা রানীর এর ভাষ্য, খালটি পুনঃখনন করে অবমুক্ত করায় কুলতলী বিলের কয়েক হাজার বিঘা জমি জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেয়েছে। এবং খালের মিষ্টি পানি ব্যবহার করে এলাকাবাসি সবজি চাষ করছে, মাছ ধরে খাচ্ছে ও খালের পাড়ে ছাগল, গরু ও ভেড়া পালন করছে। এছাড়াও খালের পানি ব্যবহার করে গরমের মৌসুমে কৃষকেরা শতশত বিঘা ধান চাষ করতে পারবে।
অপরদিকে মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের জেলে খালির একটি খাল খনন হওয়ার পরে স্থানীয় ভূমিদস্যদের কপালে খালটি বর্তমানে দখল হয়ে থাকার কারণেই একটি অংশ কৃষক ব্যবহার করতে পারছে না। বিগত কয়েক বছর দেখা গেছে জেলেখালী কৃষি জমি সহ খালের পানি নিষ্কাশনের পথ গইয়ের খাল নামক খননের দাবি তুলে ধরা হয়েছে। একই সাথে জেলে খালির খালের পানি নিষ্কাশন জন্য দখলদারদের মুক্ত করে জনসাধারণের ব্যবহার উপযোগী করার দাবি জানান এলাকার কৃষকরা।
২৫ নম্বর মথুরাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মোহাদেচ্ছুর রহমান বলেন , উপকূলীয় জনপদে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত দিন দিন বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় স্থানীয় জলাধার ও খালগুলোকে পুনরুদ্ধার করা কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্তাখালী খালের পুনঃখনন সেই সম্ভাবনারই একটি উদাহরণ। একসময় যে খালটি হারিয়ে যেতে বসেছিল, পুনঃখননের পর সেটিই আবার পানি ধরে রাখার সক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। সেই পানিকে ঘিরে কৃষকের মাঠে নতুন ফসলের স্বপ্ন, জলজ প্রাণের নিরাপদ আশ্রয় এবং ভবিষ্যতের টেকসই কৃষির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।









