সুন্দরবনে নিষেধাজ্ঞায় পুরুষরা বেকার, সংসারের দায়িত্ব নারীর কাঁধে
আসাদুজ্জামান সরদার: সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ পূর্ব কালিনগর এলাকার সাবিনা খাতুন উপকূলীয় পেশাগত সংকটের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তার স্বামী আব্দুস সালাম সুন্দরবন-নির্ভরশীল একজন জেলে। বনের পাস-পারমিট বা প্রবেশাধিকার যখন বন্ধ থাকে, তখন সরকারি নিষেধাজ্ঞার মুখে সালাম কর্মহীন হয়ে বাড়িতে বসে থাকতে বাধ্য হন। কিন্তু পরিবারের দৈনন্দিন ক্ষুধা কিংবা এনজিও ও মহাজনের ঋণের কিস্তি তো আর নিষেধাজ্ঞা বোঝে না।
সাবিনা খাতুন বলেন, “বন বন্ধ থাকলে স্বামী কাজ পায় না। কিন্তু সংসারের খরচ আর ঋণের কিস্তি ঠিকই চালানো লাগে। তাই বাধ্য হয়ে আমাকেই রোদে পুড়ে, জলে ভিজে পরের চিংড়ি ঘেরে ‘জোন’ (মজুরি) দিতে হয়। আগে মিষ্টি পানিতে ধান হতো, এখন লোনা পানির কারণে আবাদি জমি শেষ। বিকল্প কাজ বলতে শুধু ঘেরের শারীরিক শ্রমই বাকি আছে।”
সুন্দরবনের জোয়ার-ভাটায় নির্ধারিত হয় সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জ উপজেলার হাজার হাজার মানুষের ভাগ্য। সুন্দরবনের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বছরে দু’দফায় (জুন থেকে আগস্ট-তিন মাস পর্যটনসহ সব বনজ সম্পদ এবং জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি-দুই মাস কাঁকড়া আহরণ) প্রবেশাধিকার বন্ধ রাখে বন বিভাগ। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে ৫৮ দিনের মৎস্য আহরণ নিষেধাজ্ঞা থাকে।
তবে বনজীবীদের অভিযোগ, সরকারি বিধিনিষেধের কারণে বন বা সাগরে যাওয়া বন্ধ হলে উপকূল জুড়ে নেমে আসে এক ধরনের নীরব অর্থনৈতিক বিপর্যয়। এই সংকটকালে স্থানীয় বাজারে বিকল্প কাজ বা নির্দিষ্ট দক্ষতার অভাবে অধিকাংশ পুরুষ যখন পুরোপুরি কর্মহীন হয়ে পড়েন, তখন পরিবার টিকে রাখার মূল দায়িত্ব এসে পড়ে নারীদের কাঁধে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা রেঞ্জে নিবন্ধিত জেলে, বাওয়ালী ও মৌয়ালীর সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জন হলেও পরোক্ষভাবে দেড় লাখেরও বেশি মানুষ এই বনের ওপর নির্ভরশীল। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা, প্রাণপ্রকৃতি সংরক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয়টি মাথায় রেখে বছরের নির্দিষ্ট সময় বনে সম্পদ আহরণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকে। এর মধ্যে জুন, জুলাই ও আগস্ট-এই তিন মাস সুন্দরবনের পর্যটনসহ সব ধরনের বনজ সম্পদ আহরণ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। এছাড়া জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি-এই দুই মাস কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুম হওয়ায় সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরা নিষিদ্ধ থাকে (তবে এই সময়ে মাছসহ অন্যান্য সম্পদ আহরণ কার্যক্রম চালু থাকে)।
অদক্ষতা, কাজের অভাব ও নারী শ্রমিকের কম মজুরি
মুন্সীগঞ্জ এলাকার বনজীবী নেপাল সানা তাঁর কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকে শুধু সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরি। অন্য কোনো কাজের দক্ষতা আমাদের নেই। ঘেরে যে ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি হয়, তার সংখ্যা সীমিত এবং মজুরিও অত্যন্ত কম। ফলে পরিবারের পুরুষরা খুলনা বা ঢাকায় রিকশা চালানো বা ইটভাটায় না গেলে কাজ পায় না। বাধ্য হয়ে পরিবারের নারীদের দিনমজুরি দিতে পাঠাতে হয়।
উপকূলীয় এই সংকটকালে নারীদের কাজের সুযোগ তৈরি হলেও তা জন্ম দিচ্ছে কঠোর শ্রম শোষণের। শেফালী বিবি, রহিমা বুলি দাসীসহ একাধিক স্থানীয় নারী শ্রমিক জানান, যে কাজের জন্য একজন পুরুষ দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরি পান, সেখানে একই শারীরিক পরিশ্রমের কাজে নারীদের দেওয়া হয় মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। মজুরি কম হওয়ায় স্থানীয় ঘের মালিকরাও পুরুষ শ্রমিকের বদলে নারী শ্রমিক নিতে বেশি আগ্রহী হন। পরিবারের অন্ন সংস্থান এবং মহাজনের কিস্তির তাগিদই তাদের এই বৈষম্যমূলক কম মজুরিতে শারীরিক ক্ষতিকারক শ্রমে যুক্ত হতে বাধ্য করে।
দাতিনাখালী বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক শেফালী বিবি বলেছেন, উপকূলীয় এলাকার পুরুষেরা জন্মগতভাবেই সুন্দরবনের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল। ফলে বনে প্রবেশ বন্ধ থাকলে বা পাস না মিললে তারা বিকল্প কোনো কাজে যুক্ত না হয়ে অলস সময় পার করেন। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তাদের পরিবার ও নারীদের ওপর।
তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনে যাওয়া বন্ধ থাকলে পুরুষেরা কাজের সন্ধানে না গিয়ে তাস খেলে বা সময় কাটিয়ে দিন পার করেন। অথচ তখন সন্তানদের পড়াশোনা, প্রাইভেটের খরচ ও সংসারের যাবতীয় খাবারের খরচ মেটাতে নারীদের চরম হিমশিম খেতে হয়। উপকূলীয় এলাকার পুরুষেরা ইটভাটার কাজ, মাটি কাটা, ধান রোপণ কিংবা ভ্যান চালানোর মতো কষ্টকর ও কায়িক শ্রমের কাজে যুক্ত হতে চান না। অনেকেই এসব কাজকে মান-সম্মানের পরিপন্থী মনে করেন, আবার দীর্ঘদিন ধরে বনে কাজ করার অভ্যাসের কারণে এসব কাজের মানসিক ও শারীরিক ধকল তারা সহ্য করতে পারেন না।
মজুরি বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে শেফালী বিবি বলেন, ঘের বা স্থানীয় কাজে নারী ও পুরুষের কাজের মধ্যে এখনো চরম বৈষম্য রয়েছে। পুরুষ শ্রমিকেরা দিনে সাড়ে চারশত টাকা মজুরি পেলেও নারীদের দেওয়া হয় মাত্র দুইশত থেকে আড়াইশত টাকা। অথচ অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীরা কাজ বেশি বোঝেন ও করেন।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, স্থানীয় পুরুষেরা বিকল্প কাজ না করায় পরিবারে অভাব-অনটন ও সহিংসতা লেগেই থাকে। সুন্দরবনকেন্দ্রিক জীবনের বাইরে এসে বিকল্প জীবিকায় অভ্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত এই অঞ্চলের পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক সংকট স্থায়ীভাবে দূর করা সম্ভব নয়।
নিবন্ধিত বনাম অনিবন্ধিত জেলে: সহায়তা ও কার্ডের বৈষম্য
উপকূলীয় অঞ্চলে বনজীবী ও জেলেদের সরকারি সহায়তা প্রাপ্তি নিয়ে দেখা গেছে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা ও বৈষম্য।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরায় বর্তমানে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৯ হাজার জন। এর মধ্যে ১২ হাজার ৮৮৯ জন গভীর সমুদ্রে যান, যাদের মধ্যে শ্যামনগর উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে সবচেয়ে বেশি-৭ হাজার ৩৫৫ জন। সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ থাকাকালীন ৫৮ দিনের জন্য ১২ হাজার ৮৭৯ জন নিবন্ধিত জেলেকে প্রতি মাসে ভিজিএফ চাল হিসেবে মোট ৭৭.৩৩ কেজি করে দেওয়া হয়।
তবে স্থানীয় জেলে ও ট্রলার মালিক সমিতির মতে, জেলায় প্রকৃত জেলের সংখ্যা দেড় লক্ষাধিক। ফলে প্রায় এক লাখের বেশি অনিবন্ধিত জেলে সরকারের ভিজিএফ সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা জানান দাতিনাখালী গ্রামের জেলে শাহজাহান সরদার।
তিনি বলেন, “যাদের কার্ড আছে তারাই সাহায্য পায়। বছরের পর বছর ধরে পেশায় থেকেও আমি কার্ড পাইনি। বন্ধের দিনগুলোতে কোনো কাজ না পেয়ে চরম কষ্টে দিন কাটাতে হয়।”
অন্যদিকে, সহায়তা পাওয়া নিবন্ধিত জেলে আজগর আলী জানান, “যে চাল দেওয়া হয় তা কিছুটা স্বস্তি দিলেও পাঁচ সদস্যের পরিবার চাল দিয়ে তো আর পুরো মাস চলে না। চালের সাথে তেল, ডাল বা নুন কেনার মতো টাকা থাকে না, তাই আবার দাদন বা ঋণ নিতে হয়।”
জেলেদের কার্ড ও সহায়তা সংকট নিয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বলেন, “আমাদের নিবন্ধিত ৪৯ হাজার জেলের একটি বড় অংশকে সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে। তবে শুধু চাল দিয়ে একটি পরিবারের খরচ চলে না, তাই আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চালের পাশাপাশি ডাল, তেল বা আলুর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস অন্তর্ভুক্ত করার লিখিত প্রস্তাব পাঠিয়েছি।”
প্রকৃত জেলে ও বনজীবীদের বাদ পড়ার অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি আরও যোগ করেন, “জেলে কার্ড এবং বন বিভাগের বিএলসি’র (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) ডেটাবেজে সমন্বয়ের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে অনিবন্ধিতদের তালিকাভুক্ত করা হবে। পাশাপাশি মৎস্যজীবীদের স্বাবলম্বী করতে সমবায়, সমাজসেবা ও মহিলা বিষয়ক দপ্তরের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণ এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সরকারি পুকুর ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।”
ঋণের জাঁতাকল ও স্থায়ী সমাধানের তাগিদ
স্থানীয় সুন্দরবন গবেষক পিযুষ বাউলিয়া পিন্টুর মতে, সুন্দরবন সংলগ্ন হাজার হাজার পরিবার কেবল বনজ সম্পদের ওপর অভ্যস্ত। বিকল্প কাজের সুযোগ না থাকায় তারা দাদনচক্র বা মহাজনী ঋণের জালে আটকে পড়ছেন। বন বিভাগের পক্ষ থেকে সহব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য ২৯ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলা হলেও মাঠে সাধারণ বনজীবীদের কাছে এই সুবিধা এখনো অপ্রতুল।
মানবাধিকার কর্মী মাধব দত্ত জানান, “শুধু চাল দিয়ে একটি উপকূলীয় পরিবার বাঁচতে পারে না। নিষেধাজ্ঞার সময়ে পরিবারপ্রতি চালের পাশাপাশি অন্তত ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া জরুরি। সেই সাথে উপকূলীয় অঞ্চলে মৎস্যজীবী-বান্ধব ক্ষুদ্র শিল্প ও বিকল্প কাজের সুযোগ সৃষ্টি না করলে এই মানুষগুলো চরম মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হবে এবং ঋণের চাপে পিষ্ট হয়ে নারীদের চরম শ্রম শোষণের শিকার হতে হবে।”
সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আশেক ই এলাহী মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লোনা পানির আগ্রাসনে উপকূলীয় অঞ্চলের আবাদি জমি ও কাজের সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। পুরুষরা কাজের খোঁজে পরিযায়ী হয়ে ‘জলবায়ু উদ্বাস্তুর’ মতো জীবন কাটাচ্ছেন, আর তাদের অনুপস্থিতি ও বেকারত্বের সময়ে পুরো সংসারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঢাল হয়ে দাঁড়াচ্ছেন এই উপকূলের নারীরাই। সরকারি খাদ্য, মৎস্য ও বন বিভাগের সমন্বিত পদক্ষেপই পারে এই চরম মানবিক সংকটের টেকসই সমাধান আনতে।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের বন কর্মকর্তা ফজলুল রহমান মতে, বন বিভাগের বিএলসি অনুযায়ী সরাসরি খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলে তা হবে শতভাগ নির্ভুল এবং প্রকৃত বনজীবীরাই তা পাবে। বনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে বর্তমানে সহব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য ২৯ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার আওতায় মাছ-কাঁকড়া চাষ ও হাঁস-মুরগি পালনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
তবে বন বিভাগ এককভাবে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারবে না। বন কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, খাদ্য,মৎস্য ও বন বিভাগের মধ্যে একটি সমন্বিত ও ইনক্লুসিভ পরিকল্পনা থাকলে এবং দাদন চক্র নিরসনে বিশেষ ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বনজীবীদের জীবনমানের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।












