ইউটিউব দেখে জি-নাইন কলা চাষে ভাগ্য বদল প্রবাস ফেরত যুবক সামাদের
১৩ কাঠা জমিতে গ্র্যান্ড নাইন, ৮০ হাজার টাকায় আড়াই লাখের স্বপ্ন
সৈয়দ অনুজ, ফকিরহাট (বাগেরহাট):
একসময় প্রবাস থেকে দেশে ফিরে কর্মহীন দিন কাটছিল বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার পাগলা শ্যামনগর গ্রামের যুবক হাফেজ আব্দুস সামাদ। তবে ইউটিউবে দেখা একটি ভিডিওই বদলে দিয়েছে তার জীবনযাত্রার পথ। ‘জি-নাইন’ বা ‘গ্র্যান্ড নাইন’ জাতের কলা চাষ করে এখন তিনি হয়ে উঠেছেন এলাকার আলোচিত চাষী।
সামাদ জানান, প্রবাস থেকে ফেরার পর তিনি চাল আড়তের ব্যবসা শুরু করেন। তবে ব্যবসায় লোকসান হওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় চালের দোকান। একদিন ইউটিউবে গ্র্যান্ড নাইন কলার বাণিজ্যিক চাষের ভিডিও দেখে তিনি আগ্রহী হন। পরে স্থানীয় কৃষি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রশিক্ষণ ও চারা সংগ্রহের চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানে কাঙ্খিত চারা না পেয়ে খামারী পর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। খোঁজ নিয়ে উপজেলার নলধা মৌভোগ এলাকার এক কৃষকের কাছ থেকে তিনি ২১৩টি চারা সংগ্রহ করেন।
এরপর নিজের ১৩ কাঠা পতিত জমি উঁচু করে সেখানে চারা রোপণ করেন তিনি। ইউটিউব দেখে নিয়মিত পরিচর্যা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার ফলে মাত্র আট মাসের মধ্যেই গাছে ফল আসতে শুরু করে। বর্তমানে তার বাগানের প্রায় প্রতিটি গাছেই দৃষ্টিনন্দন ও ভারী কাঁদি ঝুলছে। একেকটি কাঁদিতে ২২০ থেকে ২৮০টি পর্যন্ত কলা ধরেছে। ফলের অতিরিক্ত ভারে গাছ যাতে ভেঙে না পড়ে, সে জন্য বাঁশের খুঁটি দিয়ে গাছগুলোকে সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে।
বিশাল আকৃতির এসব কলার কাঁদি দেখতে প্রতিদিন আশপাশের মানুষ সামাদের বাগানে ভিড় করছেন। স্থানীয়দের কাছে বাগানটি এখন এক ধরনের আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। সামাদ জানান, আর এক সপ্তাহের মধ্যেই কলা কেটে বাজারজাত করার উপযোগী হবে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন।
হৃষ্টপুষ্ট ও কাঁদির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় একই আকারের কলা থাকায় দামও ভালো বলছেন পাইকারেরা। গড়ে প্রতি কাঁদি (ছরা) কলা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা দামে বাগান থেকে কিনে নিতে চাইছেন পাইকারেরা বলে জানান চাষি আব্দুস সামাদ।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাজারে প্রচলিত অনেক কলার কাঁদিতে সাধারণত ৮০ থেকে ১৪০টি পর্যন্ত কলা থাকে। সেখানে গ্র্যান্ড নাইন জাতের একটি কাঁদিতে ২২০ থেকে ২৮০টি পর্যন্ত কলা উৎপাদিত হতে পারে। পাশাপাশি এ জাতের কলা তুলনামূলক কম সময়ে উৎপাদন উপযোগী হয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি হওয়ায় সার ওষুধ কম দিতে হয়। ফলে উৎপাদন খরচ কম ও কৃষক বেশি লাভবান হন। খেতে যেমন সুস্বাদু তেমনি পুষ্টিগুণ ও বাজার চাহিদাও তুলনামূলক বেশি।
সামাদ শেখ বলেন, “পুরো বাগান করতে আমার প্রায় ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বর্তমান ফলন অনুযায়ী অন্তত আড়াই লাখ টাকার কলা বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কলা চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।”
তিনি জানান, তার সাফল্য দেখে গ্রামের আরও কয়েকজন কৃষক জি-নাইন কলার বাগান গড়ে তুলতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
একই গ্রামের কৃষক আবুল কালাম বলেন, “সামাদের বাগানের ফলন দেখে আমি খুবই উৎসাহিত হয়েছি। আমিও জমি প্রস্তুত করছি, আগামী মৌসুমে গ্র্যান্ড নাইন কলার চাষ শুরু করব।”
ফকিরহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শেখ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ৫ হেক্টর জমিতে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭০টি গ্র্যান্ড নাইন কলার বাগান রয়েছে। এছাড়া অনেকেই বাড়ির আঙিনায় এই জাতের কলা রোপণ করেছেন। চলতি বছরে এ জাতের কলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫০ মেট্রিক টন, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি টাকা।”
তিনি আরও বলেন, “ফকিরহাট উপজেলার স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে এই কলা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বাণিজ্যিকভাবে গ্র্যান্ড নাইন কলার চাষ কৃষকদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে গড়ে উঠছে।”









