বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩

বজ্রধ্বনি ও সাতক্ষীরার অরক্ষিত জনপদ/ আখলাকুর রহমান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬, ৩:১৯ অপরাহ্ণ
বজ্রধ্বনি ও সাতক্ষীরার অরক্ষিত জনপদ/ আখলাকুর রহমান

আখলাকুর রহমান

‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই’-খনা যখন তাঁর চিরন্তন বচনে এই সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন, তখন বাঙালির বিজ্ঞানচেতনা হয়তো আজকের মতো ল্যাবরেটরির কাচে বন্দি ছিল না, কিন্তু প্রকৃতির মেজাজ চেনার এক মায়াময় প্রজ্ঞা তাঁদের ছিল। আজ ২৮শে জুন, আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস। জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম সংকটের দিনে ক্যালেন্ডারের এই তারিখটি আমাদের কাছে কেবলই এক লৌকিক আয়োজন হয়ে আসে, অথচ খোদ জাতিসংঘের জলবায়ু বিজ্ঞানীরা এই বজ্রপাতকে অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

 

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে প্রতি এক ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়ার কারণে বজ্রপাতের আশঙ্কা প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। আজ এই দিবসের আলোয় যখন আমাদের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, বিল আর নদীপাড়ের প্রান্তিক মানুষের দিকে তাকাই, তখন প্রকৃতির এই রুদ্র রূপকে এক অনিবার্য মরণফাঁদ বলে মনে হয়।

 

বাঙালি সাহিত্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের ঔপন্যাসিকরা প্রকৃতির এই রুদ্রলীলাকে মানুষের নিয়তির সাথে বারেবারে এক সুতোয় বেঁধেছেন। কালজয়ী কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসের সেই অমোঘ ট্র্যাজেডির কথা কি আমরা ভুলতে পারি? ঝুমুর দলের নর্তকী বসন্ত যখন নিতাইয়ের জীবনের সমস্ত আলো কেড়ে নিয়ে অকাল বসন্তেই বিদায় নিল, তার আগে সেই কালবোশেখীর রাতে আকাশ চিরে নেমে আসা বজ্রপাত যেন তাদের নিয়তিরই এক নিষ্ঠুর অট্টহাসি ছিল।

 

আবার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’তে কিংবা রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে ঝড়ের রাতের যে বর্ণনা, তা কেবল রোমান্টিকতা নয়, প্রকৃতির এক আদিম ও অমোঘ শক্তির জানান দেয়। বজ্রপাত তো আসলে কোনো আকস্মিক দৈব দুর্ঘটনা নয়, এটা আমাদের প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করার এক চরম প্রতিশোধ। সাতক্ষীরার সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলোতে আজ অপরিকল্পিতভাবে তালগাছসহ সব বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করা হয়েছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে মাঠের কৃষক আর মৎস্যজীবীদের। খোলা বিলে বা মৎস্য ঘেরে কাজ করার সময় একটু অসচেতনতার কারণেই প্রতি বছর কতশত তাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে, কত সোনার সংসার মুহূর্তের মধ্যে ছাই হয়ে যাচ্ছে।

আইনের শুষ্ক বিধি বা লিফলেট বিলি করে প্রকৃতির এই মরণকামড় থেকে মানুষকে বাঁচানো যাবে না, এর জন্য প্রয়োজন আমাদের মজ্জাগত অভ্যাসের আমূল পরিবর্তন। খনার সেই প্রাচীন সূত্রকে আজ আমাদের আধুনিক জীবনের বর্ম বানাতে হবে; আকাশে মেঘের প্রথম গুড়গুড়ানি শুনলেই সমস্ত অবহেলা দূরে ঠেলে নিরাপদ আশ্রয়ে বা পাকা দালানের নিচে চলে যাওয়াটাই বেঁচে থাকার একমাত্র পথ। ইসলামে বজ্রপাতকে আল্লাহর মহিমার এক পরম নিদর্শন ও সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এই সময়ে বিশেষ দোয়া পড়ার নির্দেশ রয়েছে, যা মানুষের মনকে শান্ত ও সচেতন করে।

 

স্থানীয় প্রশাসনের উচিত কেবল কাগজে-কলমে দিবস পালন না করে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে, বিশেষ করে আমাদের সাতক্ষীরার ঘের অঞ্চল ও কৃষিমঠে বজ্রপাত নিরোধক দন্ড স্থাপন এবং ব্যাপক হারে তালগাছ রোপণের এক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। এই আন্তর্জাতিক দিবসে আমরা সর্বস্তরের মানুষ একটাই প্রতিজ্ঞা করি, প্রকৃতির নিয়মকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং নিজস্ব সচেতনতাকে ঢাল বানিয়ে আমরা এই অদৃশ্য মরণ আঘাত থেকে আমাদের প্রিয়জনদের রক্ষা করবই।

লেখা : আখলাকুর রহমান, উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা : আসিফা

Ads small one

কোহলির ব্র্যান্ডের জুতা পরে এশিয়া কাপে পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫৪ অপরাহ্ণ
কোহলির ব্র্যান্ডের জুতা পরে এশিয়া কাপে পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা

ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চিরন্তন। কিন্তু সেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরেও যে অন্যরকম যোগসূত্র তৈরি হতে পারে, সেটিই যেন দেখা গেল নারী এশিয়া কাপে। মাঠে পাকিস্তানের জার্সি, আর পায়ে ভারতের সাবেক অধিনায়ক বিরাট কোহলির স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড ওয়ান-এইট এর জুতা! বিষয়টি চোখ এড়ায়নি ক্রিকেটভক্তদের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয়েছে আলোচনা।

চলমান নারী এশিয়া কাপে হংকংয়ের বিপক্ষে ম্যাচে পাকিস্তানের বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারকে ওই ব্র্যান্ডের স্নিকার্স পরতে দেখা গেছে। সোমবার দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে বাঁহাতি স্পিনার নাশরা সান্ধু ও ডানহাতি ব্যাটার আইমান ফাতিমাসহ কয়েকজনের পায়ে ছিল সেই জুতা।

খেলোয়াড়দের জুতা পরা ছবি ও ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম বড় তারকা কোহলির সঙ্গে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের এই অপ্রত্যাশিত যোগসূত্র নিয়ে ভক্তদের মধ্যে তৈরি হয় নানা আলোচনা।

ওয়ান-এইট এখন শুধু কোহলির নামের সঙ্গে যুক্ত একটি ব্র্যান্ড নয়। ফুটওয়্যার, পোশাকসহ বিভিন্ন স্পোর্টস পণ্য নিয়ে নিজেদের পরিসর বাড়িয়েছে ব্র্যান্ডটি। ‘অ্যাজিলিটাস’এর সঙ্গে মিলে চালু হওয়া এই ব্র্যান্ডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিরাট কোহলি।

ভারতের সাবেক অধিনায়ক কোহলি নিজেও অ্যাজিলিটাসের একজন বিনিয়োগকারী। প্রতিষ্ঠানটিতে তিনি ৪০ কোটি রুপি বিনিয়োগ করেছেন।

‘মেয়ে হয়ে কেন ছেলেদের কোচ হতে পারবো না’

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৪৬ অপরাহ্ণ
‘মেয়ে হয়ে কেন ছেলেদের কোচ হতে পারবো না’

মেয়েদের কুস্তির মঞ্চ পেরিয়ে এবার ছেলেদের কোচের ভূমিকায় শিরিন সুলতানা। একসময় নিজেই প্রতিপক্ষের সঙ্গে কুস্তির ম্যাটে লড়েছেন। খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করেছেন ছয় বছর আগে। এরপর হাতে তুলে নিয়েছেন কোচিংয়ের দায়িত্ব। গত এক বছর ধরে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে কাজ করছেন। তবে মেয়েদের নয়, শিরিন এখন কোচিং করাচ্ছেন ছেলেদের জাতীয় দলকে। আর সেটিই তাকে নিয়ে এসেছে আলোচনার কেন্দ্রে।

এশিয়ান গেমসে অংশ নেবে বাংলাদেশের কুস্তি দল। সেই দলের ছেলেদের দুই বেলা অনুশীলন করিয়ে যাচ্ছেন ময়মনসিংহ থেকে উঠে আসা সাবেক এই কুস্তিগীর। ৩৭ বছর বয়সী শিরিনের ছেলেদের কোচ হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। ছেলেদের দলের কোচ হওয়ার জন্য আরও অনেকে থাকলেও ফেডারেশন বেছে নিয়েছে শিরিনকে। সিদ্ধান্তটি নিয়ে কারও কারও আক্ষেপ থাকলেও তাতে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি ফেডারেশন।

তবে আলোচনা-সমালোচনায় কান দিচ্ছেন না শিরিন। অনুশীলনের এক ফাঁকে তিনি বলেছেন, ‘কে কী বললো তা কানে নিচ্ছি না। আমার কাজ কোচিং করানো তাই করে যাচ্ছি। তা সেটা ছেলে বা মেয়েদের কোচ হই না কেন। একজন মেয়ে হয়ে কেন ছেলেদের কোচ কিংবা শেখাতে পারবো না। কোথায় কী লেখা আছে। আমি তো ছেলে কোচদের কাছ থেকে শিখেছি। ছেলেদের কাছ থেকে যদি শিখতে পারি, তাহলে আমি কেন কোচিংয়ে এসে ছেলেদেরই আবার শেখাতে পারবো না।’

বাংলাদেশের ফুটবলে মিরোনা, হ্যান্ডবলে ডালিয়ার পর এবার কুস্তিতেও ছেলেদের কোচের ভূমিকায় একজন নারী। তবে শিরিনের পথচলা শুরু হয়েছিল খেলোয়াড় হিসেবে। ২০০৯ সালে কুস্তির সঙ্গে তার যাত্রা শুরু। ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমানতালে নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন তিনি।

২০১২ সালে ইন্দো-বাংলা রেসলিং চ্যাম্পিয়নশিপে ৫৫ কেজি ওজনশ্রেণিতে জিতেছিলেন স্বর্ণপদক। ২০১৬ সালে গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত এসএ গেমসে ৬৮ কেজি ওজনশ্রেণিতে পেয়েছিলেন রৌপ্যপদক। পরের বছর আজারবাইজানের বাকুতে ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে অর্জন করেন ব্রোঞ্জ। ২০১৮ সালের গোল্ড কোস্ট কমনওয়েলথ গেমসে হয়েছিলেন চতুর্থ। অংশ নিয়েছেন এশিয়ান ইনডোর অ্যান্ড মার্শাল আর্টস গেমসেও। ২০১৯ সালে কুস্তির ম্যাট থেকে বিদায় নেন শিরিন।

ম্যাটের সেই অভিজ্ঞতা ও অর্জনকে কাজে লাগিয়েই এখন নতুন প্রজন্মের কুস্তিগীর তৈরি করছেন তিনি। কোচ হিসেবেও নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। সম্পন্ন করেছেন সলিডারিটি কোচেস কোর্স লেভেল-২।

শিরিন কুস্তি ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও। এ কারণে সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেন, ফেডারেশনে নিজের প্রভাব কাজে লাগিয়েই কোচ হয়েছেন তিনি। তবে এমন অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন শিরিন। তিনি বলেছেন, ‘আমি কোচ হওয়ার জন্য কাউকে প্রভাব বিস্তার করিনি। এমন কাজ আমি কেন করবো। আমার যোগ্যতা আছে বলেই জাতীয় দলের কোচ হয়েছি। আর কে কী বললো তা নিয়ে আমি ভাবছি না। আমার মনোযোগ অনুশীলনে।’

জ্বালানি সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে মাসের সংসার খরচ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ণ
জ্বালানি সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে মাসের সংসার খরচ

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজিচালিত পরিবহন, বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাসের কম চাপের কারণে সিএনজি চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে বাসাবাড়িতে রান্নার জন্য গ্যাস না পেয়ে অনেকে সিলিন্ডার ও বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করছেন। এতে মাসের সংসার খরচের সঙ্গে যোগ হয়েছে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়।

রাজধানীর হাজিপাড়া পেট্রোলপাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজিচালক হালিম উদ্দিন বলেন, ‘একবার গ্যাস নিতে আসলেই দুই থেকে তিন ঘণ্টা চলে যায়। আগে যেখানে একবার গ্যাস নিতে আসলে ৩৫০ টাকার গ্যাস ঢুকতো, এখন সেখানে ১৩০ টাকার বেশি নেওয়া যায় না। কারণ গ্যাসের চাপ কম। এই গ্যাস দিয়ে ৪ ঘণ্টার বেশি সিএনজি চালানো যায় না। আবার গ্যাস নিতে আসলে ২ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়। অর্থাৎ কেউ ৮ ঘণ্টা সিএনজি চালাতে হলে তাকে ৪ ঘণ্টা গ্যাসের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এদিকে আয় হোক আর না হোক মালিকের জমা তো দিতেই হয়।’

গ্যাসচালিত পরিবহনে এক চাপে যতটা গ্যাস নেওয়া যায়, তাই নিতে হয়। স্বাভাবিকভাবে গ্যাসের চাপ বেশি থাকলে সিলিন্ডারে বেশি গ্যাস ঢোকে, আর চাপ কম থাকলে কম গ্যাস নেওয়া যায়। একবার সিএনজিতে গ্যাস প্রবেশ করালে নির্দিষ্ট পরিমাণ শেষ না হলে নতুন করে গ্যাস নেওয়াও যায় না।

অন্যদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার আবাসিক বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কোনও কোনও এলাকায় একেবারেই গ্যাস থাকে না। আবার কিছু এলাকায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে টিমটিম করে চুলা জ্বলে। এতে গরম পানিও করা যায় না, রান্না তো দূরের কথা।

ফলে সকালে অফিসে যাওয়ার আগে রান্না করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন মানুষ। কেউ ভোরে উঠে রান্না করছেন, কেউ মধ্যরাতে রান্না করছেন। আবার কেউ সিলিন্ডার বা বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করছেন। এতে বাড়তি খরচের পাশাপাশি সময়ও নষ্ট হচ্ছে।

মিরপুরের বাসিন্দা রাসনা চৌধুরী বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরেই সকালে উঠে দেখি চুলায় গ্যাস নেই। দুপুরের আগে চুলা জ্বালানো যায় না। আগে সকালে রান্না করে রেখে বের হতাম। আর এখন অফিস থেকে এসে ক্লান্ত হয়েই রান্না করতে হয়। এই রান্না শুধু সেদিনের না, পরের দিনের দুপুরের রান্নাটাও সেরে ফেলতে হয়। দুপুরে যারা বাসায় থাকে তারা ওভেনে গরম করে সেই তরকারি খায়, আর ভাত রান্না করে রাইস কুকারে। সকালে নাস্তা করতে হলে হয় আগের দিনের বাসি খাবার ওভেনে গরম করি, না হলে বাইরে থেকে কিনে আনি। কারণ বিদ্যুতের চুলায় রান্না করতে সময় লাগে। সকালে এত সময় থাকে না। প্রতিদিন এভাবে চলা সম্ভব নয়।’

খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা আনজুম সুলতানা বলেন, ‘গ্যাসের চাপ কখন থাকবে, কখন থাকবে না, তার ঠিক নেই। সকাল ১০টার দিকে রান্না বসানোর পর হঠাৎ গ্যাসের চাপ কমে যায়। আধা রান্না করে পরে সেটা আবার সিলিন্ডার চুলায় নিয়ে যেতে হয়। সিলিন্ডারই যদি ব্যবহার করতে হয়, তাহলে আমরা গ্যাস বিল দেবো কেন? মাসের বাজারের খরচের সঙ্গে এখন গ্যাসের বাড়তি খরচও যোগ হয়েছে।’

শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতেও সংকট

শুধু সিএনজি বা বাসাবাড়ি নয়, গ্যাস সংকটে চাপে পড়েছে শিল্প খাতও। চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও মেশিন বন্ধ রেখে শ্রমিকদের বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।

চট্টগ্রামে প্রায় ১ হাজার ২০০টি ভারী শিল্পসহ প্রায় ৩ হাজার কারখানা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে বলে সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন কমছে। এর সঙ্গে কয়লা ও জ্বালানি তেলের সংকট এবং কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কম থাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও নাজুক হয়ে উঠেছে।

চলতি বছরের বিদ্যুতের হিসাবেও দেখা যাচ্ছে, গ্রীষ্মে গড়ে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। পিজিসিবির হিসাবে, গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় দেশে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৮৪৪ মেগাওয়াট। আজ একই সময়ে লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৯৪৩ মেগাওয়াট।

পেট্রোবাংলার হিসাবে, গ্যাসভিত্তিক ৭২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৪১টিতে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনে এসব কেন্দ্রের প্রয়োজন ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ৮৫২ মিলিয়ন ঘনফুট।

চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম

বর্তমানে দুটি এলএনজি টার্মিনাল সক্রিয় হওয়ার পরও রাজধানীতে গ্যাস সংকট কাটছে না। এর প্রধান কারণ, এলএনজি সরবরাহ ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি বাড়ানো যাচ্ছে না। ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহক্ষমতার এলএনজি টার্মিনাল থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট কম পাওয়ার কারণ হিসেবে আমদানি বিঘ্নিত হওয়াকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যদিও সরকার বলছে, চলতি মাসে বেশ কয়েকটি এলএনজি কার্গো আসার কথা রয়েছে। কিন্তু যতক্ষণ সেগুলো না আসবে, ততক্ষণ সাধারণ মানুষের কষ্ট কমানো যাচ্ছে না।

দেশে এখন মোট গ্যাসের চাহিদা ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিকেল ৪টার হিসেবে মোট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ৩২৯ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ৭০৯ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি থেকে পাওয়া যাচ্ছে। দেশীয় খনি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট।

সংসদে দুঃখ প্রকাশ

সাম্প্রতিক সময়ে সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ২ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে দেশের মানুষ কষ্টে আছে বলে স্বীকার করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

এ সময় বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। জাতীয় সংসদে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমরা লুকোচুরি করতে চাই না। মানুষ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে কষ্টে আছে। আমি আমার মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি। তবে আজকের এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। বিগত দেড় দশক ধরে ফ্যাসিস্ট সরকারের ভুল নীতির অনিবার্য পরিণতি আজ এ দেশের মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে।’

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তাৎক্ষণিকভাবে এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই সমাধান নয়। দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘এই পরিস্থিতি একদিনে হয়নি। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি আর এক শ্রেণিকে সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ওপর ভর্তুকির বোঝা চাপানোর ফলেই আজকের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সরকার এলএনজি টার্মিনাল করার কথা বলছে, এই টার্মিনাল করতেও কমপক্ষে তিন বছর সময় লাগবে। ফলে আজকের সংকট সমাধানের কোনও গতি নেই সরকারের হাতে।’

ফলে একদিকে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট, অন্যদিকে এলএনজি আনার পরিকল্পনা, ভোলার গ্যাস আনার পরিকল্পনা, স্থলভাগে বা সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান—যে পরিকল্পনাই করা হচ্ছে, তার কোনোটিই এখনকার গ্যাস সংকট কমাতে পারবে না। দীর্ঘমেয়াদে হয়তো চাহিদা পূরণ করা যাবে। সব মিলিয়ে গ্যাসের ভোগান্তি থেকে সহসাই মুক্তি মিলছে না সাধারণ মানুষের।