সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩

বিশ্ব চকোলেট দিবস: ভালোবাসা, উপহার ও বৈশ্বিক সংস্কৃতির যাত্রা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৭:৫৬ অপরাহ্ণ
বিশ্ব চকোলেট দিবস: ভালোবাসা, উপহার ও বৈশ্বিক সংস্কৃতির যাত্রা

সাকিবুর রহমান বাবলা

৭ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব চকোলেট দিবস। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খাদ্যপণ্যের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, এর দীর্ঘ ইতিহাস এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অবদানকে স্মরণ করতেই দিনটি উদযাপিত হয়। ২০০৯ সাল থেকে দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ১৫৫০ সালের ৭ জুলাই ইউরোপে চকোলেটের বিস্তৃত পরিচিতির সূচনা হয়। সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করেই বিশ্ব চকোলেট দিবস পালিত হয়।

চকোলেটের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। মধ্য আমেরিকার মায়া ও অ্যাজটেক সভ্যতার মানুষ কোকো বীজ থেকে তৈরি পানীয়কে মূল্যবান সম্পদ ও বিনিময় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করত। বর্তমানে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ড ভোগের দিক থেকে শীর্ষে। উন্নত উৎপাদন ও ঐতিহ্যের কারণে সুইজারল্যান্ড ও বেলজিয়াম বিশেষভাবে সমাদৃত। সুইজারল্যান্ড এবং বেলজিয়াম চকোলেটকে তাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ও অন্যতম “জাতীয় প্রতীক” বা গৌরব হিসেবে গণ্য করে।

বিশ্বের বিলাসবহুল ও উচ্চমূল্যের চকোলেট ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে ইকুয়েডরের টো’আক চকোলেট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিরল ‘ন্যাসিওনাল’ কোকো বীজ দিয়ে তৈরি এই পণ্যটি বিশ্বের অন্যতম দামি ও অভিজাত চকোলেট হিসেবে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব নিপশিল্ট-এর তৈরি ‘লা মাদেলিন ও ট্রাফল’ বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল ট্রাফল চকোলেট হিসেবে খ্যাত। ইতালির আমেদেই ব্র্যান্ডের ‘আমেদেই পোর্সেলানা’ ডার্ক চকোলেট বিরল সাদা কোকো বীজ থেকে প্রস্তুত হওয়ায় এটি অত্যন্ত মূল্যবান ও সমাদৃত। সুইজারল্যান্ডের টয়শার ও লিন্ডট দীর্ঘ ঐতিহ্য, উৎকৃষ্ট মান এবং প্রিমিয়াম উৎপাদনের জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত।

 

একইভাবে বেলজিয়ামের গোদাইভা ও গাইলিয়ান তাদের আভিজাত্য, নান্দনিক উপস্থাপন এবং রাজকীয় স্বাদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। অন্যদিকে ফেরেরো রোশে, ক্যাডবেরি ডেইরি মিল্ক, কিন্ডার, হার্শেজ, টোব্লেরোন ও লিন্ডট-এর মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলো আজ বিশ্বজুড়ে উৎসব, উদ্যাপন, উপহার প্রদান এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

বাংলাদেশে আশির দশকে ‘মিমি’ চকোলেটের মাধ্যমে এ দেশে চকোলেট সংস্কৃতির পরিচিতি ঘটে। বর্তমানে দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের সমন্বয়ে বাজার বিস্তৃত হয়েছে। মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা ও উপহার সংস্কৃতির প্রসারে জন্মদিন, বিবাহোত্তর সংবর্ধনা, করপোরেট অনুষ্ঠান ও ভালোবাসা দিবসে চকোলেটের ব্যবহার বেড়েছে। একই সঙ্গে ‘ফেয়ার ট্রেড’ সার্টিফিকেশন কোকো চাষিদের ন্যায্য মূল্য ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখছে।

শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও অতিরিক্ত গ্রহণ দাঁতের ক্ষয় ও স্থূলতার কারণ হতে পারে। তবে ডার্ক চকোলেটে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষের সুরক্ষা, হৃদ্স্বাস্থ্যের উন্নতি, রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি ও মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। পরিমিতি বজায় রেখে সচেতন খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবেই এটি গ্রহণ করা শ্রেয়।

বিশ্ব চকোলেট দিবসে আমরা কোকো চাষি, শ্রমিক ও উৎপাদনশিল্পের সঙ্গে জড়িত লাখো মানুষের অবদানকে স্মরণ করি। একটি চকোলেট বারের পেছনে থাকে দীর্ঘ শ্রম ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিশাল শৃঙ্খল। এই দিবস কেবল স্বাদের উদযাপন নয়; বরং মানুষের সৃজনশীলতা, পরিশ্রম ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের এক অনন্য স্বীকৃতি।

Ads small one

প্রাচীন যুগের সূচনা: ফুটবলের আদি উৎস/ শেখ সিদ্দিকুর রহমান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ১০:৫১ অপরাহ্ণ
প্রাচীন যুগের সূচনা: ফুটবলের আদি উৎস/ শেখ সিদ্দিকুর রহমান

শেখ সিদ্দিকুর রহমান

আজকের আধুনিক ফুটবল হুট করে একদিনে তৈরি হয়নি। হাজার বছর আগে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বল পায়ে খেলার প্রচলন ছিল: চীন (চু জু): খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে হান রাজবংশের আমলে চীনে ‘চু জু’ নামের একটি খেলার প্রচলন ছিল। চামড়ার তৈরি বল পায়ে মেরে জালে জড়ানো হতো। ফিফা একেই ফুটবলের সবচেয়ে প্রাচীন রূপ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। গ্রিস ও রোম: প্রাচীন গ্রিসে ‘এপিস্কিরোস’  এবং রোমে ‘হারপাসটাম’ নামে বল খেলার চল ছিল, তবে সেগুলোতে পায়ের পাশাপাশি হাতের ব্যবহারও হতো। মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ড: মধ্যযুগে ইংল্যান্ডে এক ধরণের ‘মব ফুটবল’  খেলা হতো। কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না, পুরো গ্রাম মিলে বল নিয়ে হুড়োহুড়ি করত। সহিংসতা বেশি হওয়ার কারণে বিভিন্ন সময়ে রাজারা এই খেলা নিষিদ্ধও করেছিলেন।

২. আধুনিক ফুটবলের জন্ম: ইংল্যান্ডের অবদান: ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে ইংল্যান্ডের পাবলিক স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর (যেমন ক্যামব্রিজ ও অক্সফোর্ড) মাধ্যমে খেলাটি একটি সুনির্দিষ্ট রূপ পেতে শুরু করে। ১৮৬৩ সালের ঐতিহাসিক বৈঠক: ১৮৬৩ সালের ২৬ অক্টোবর লন্ডনের ‘ফ্রিমেসন্স ট্যাভার্ন’-এ কয়েকটি স্কুল ও ক্লাবের প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ঋঅ) গঠন করেন। এখানে প্রথমবারের মতো ফুটবলের লিখিত নিয়মকানুন বা ‘লজ অব দ্য গেম’ তৈরি হয়। হ্যান্ডবল ও ফুটবলের বিভাজন: এই বৈঠকেই নিয়ম করা হয় যে বল হাতে ছোঁয়া যাবে না। যারা বল হাতে নিয়ে খেলার পক্ষে ছিলেন, তারা আলাদা হয়ে গিয়ে ‘রাগবি’  খেলা শুরু করেন। বিশ্বের প্রথম টুর্নামেন্ট: ১৮৭১ সালে বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো ফুটবল টুর্নামেন্ট ‘এফএ কাপ’ শুরু হয়। আর ১৮৭২ সালে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের মধ্যে ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়।

 

৩. ফিফা গঠন ও বৈশ্বিক রূপ : ইংল্যান্ডে ফুটবলের নিয়ম ঠিক হওয়ার পর তা দ্রুত ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। খেলাটিকে বিশ্বজুড়ে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ফিফার প্রতিষ্ঠা: ১৯০৪ সালের ২১ মে ফ্রান্সের প্যারিসে ফিফা  প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলো ছিল ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড। অলিম্পিকে অন্তর্ভুক্তি: ১৯০৮ সালের লন্ডন অলিম্পিকে ফুটবল প্রথমবারের মতো অফিসিয়াল প্রতিযোগিতা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

৪. বিশ্বকাপ ফুটবলের যুগ: ফুটবলকে জনপ্রিয়তার শিখরে নিয়ে যায় বিশ্বকাপ। ফিফা সভাপতি জুল রিমে-র উদ্যোগে এই মহাযজ্ঞ শুরু হয়। প্রথম বিশ্বকাপ (১৯৩০): ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। মাত্র ১৩টি দেশ এতে অংশ নিয়েছিল। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করে স্বাগতিক উরুগুয়ে। টেলিভিশন ও বিশ্বায়ন: ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ প্রথম টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়। এরপর থেকে ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, বরং কোটি কোটি মানুষের আবেগ ও বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদনে পরিণত হয়। পেলে, ম্যারাডোনা থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের মেসি-রোনালদোদের হাত ধরে ফুটবল আজ এক বৈশ্বিক মহোৎসবে রূপ নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার মাঠের মাপ, গোল বক্সের পরিমাপ এবং খেলোয়াড় পরিবর্তন সংক্রান্ত ফিফা (ঋওঋঅ) এর আন্তর্জাতিক নিয়মাবলির বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো: ১. আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার মাঠের পরিমাপ : আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য ফুটবল মাঠের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ফুট হিসেবে নিচে দেওয়া হলো: দৈর্ঘ্য : সর্বনি¤œ ৩০০ ফুট থেকে সর্বোচ্চ ৩৬০ ফুট (১০০ থেকে ১১০ মিটার)। প্রস্থ : সর্বনি¤œ ২১০ ফুট থেকে সর্বোচ্চ ২৫০ ফুট (৬৪ থেকে ৭৫ মিটার)। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোর (যেমন বিশ্বকাপ) জন্য সাধারণত ৩৩০ ফুট দ্ধ ২৩০ ফুট (১০৫ মিটার দ্ধ ৬৮ মিটার) সাইজের মাঠ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। ২. গোল বক্স এবং পেনাল্টি এরিয়ার পরিমাপ পোস্টের সামনে মূলত দুটি বক্স থাকে একটি ছোট (গোল বক্স) এবং একটি বড় (পেনাল্টি বক্স)। এদের পরিমাপ নিচে দেওয়া হলো:

গোল বক্স : প্রতিটি গোলপোস্টের ভেতরের দিক থেকে দুই পাশে ১৮ ফুট (৬ গজ) লম্বা দুটি রেখা মাঠের ভেতরের দিকে টানা হয় এবং সে দুটিকে আরেকটি রেখা দিয়ে জুড়ে দেওয়া হয়। এটি গোলপোস্ট থেকে মাঠের ভেতরের দিকে ১৮ ফুট চওড়া হয়। পেনাল্টি বক্স : প্রতিটি গোলপোস্টের ভেতরের দিক থেকে দুই পাশে ৪৮ ফুট (১৬.৫ গজ) লম্বা দুটি রেখা মাঠের ভেতরের দিকে টানা হয়। এটি গোলপোস্ট থেকে মাঠের ভেতরের দিকে ৪৮ ফুট চওড়া হয়। পেনাল্টি স্পট : গোললাইন থেকে ঠিক ৩৬ ফুট (১২ গজ বা ১১ মিটার) দূরে পেনাল্টি শট নেওয়ার জন্য একটি বিন্দু বা স্পট চিহ্নিত থাকে।

গোলপোস্টের পরিমাপ: দুই পোস্টের ভেতরের দূরত্ব ২৪ ফুট (৮ গজ বা ৭.৩২ মিটার) এবং মাটি থেকে ক্রসবারের উচ্চতা ৮ ফুট (২.৪৪ মিটার)। ৩. খেলোয়াড়ের সংখ্যা : মাঠে খেলোয়াড়: খেলা চলাকালীন উভয় দলে মাঠের ভেতরে ১১ জন করে মোট ২২ জন খেলোয়াড় থাকেন (যার মধ্যে ১ জন গোলরক্ষক বা গোলকিপার)। স্কোয়াড বা অতিরিক্ত খেলোয়াড়: আন্তর্জাতিক ম্যাচে মূল একাদশের বাইরে বেঞ্চে বা স্কোয়াডে সাধারণত ১২ থেকে ১৫ জন পর্যন্ত অতিরিক্ত  খেলোয়াড় রাখার অনুমতি থাকে। ৪. খেলোয়াড় বদল বা সাবস্টিটিউশন নিয়ম বর্তমান ফিফা নিয়ম অনুযায়ী একটি ম্যাচে খেলোয়াড় বদলের নিয়মটি নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো: সর্বোচ্চ পরিবর্তন: নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলায় একটি দল সর্বোচ্চ ৫ বার (৫ জন) খেলোয়াড় বদল করতে পারবে। সুযোগ বা উইন্ডোজ : খেলা চলাকালীন সময় অপচয় রোধ করার জন্য এই ৫ জন খেলোয়াড়কে সর্বোচ্চ ৩টি সুযোগে  বদল করতে হবে। অর্থাৎ, এক সুযোগে একসাথে ২ বা ৩ জন খেলোয়াড়ও বদল করা যাবে। তবে হাফ-টাইম বা মধ্যবিরতির সময় খেলোয়াড় বদল করলে তা এই ৩টি সুযোগের মধ্যে গণনা করা হয় না। অতিরিক্ত সময় : নক-আউট পর্বের ম্যাচে খেলা যদি অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে গড়ায়, তবে দলগুলো আরও ১ জন অতিরিক্ত খেলোয়াড় (৬ষ্ঠ খেলোয়াড়) বদল করার সুযোগ পায় এবং এর জন্য আরও ১টি বাড়তি সুযোগ পাওয়া যায়।

কনকাশন সাবস্টিটিউশন: কোনো খেলোয়াড়ের মাথায় মারাত্মক আঘাত লাগলে, বিশেষ নিয়মে অতিরিক্ত আরও একজন খেলোয়াড় বদল করা যায়, যা মূল ৫টি পরিবর্তনের নিয়মের বাইরে থাকে। ফুটবল মাঠের এই আন্তর্জাতিক নিয়মগুলো মূলত খেলাটিকে বিশ্বজুড়ে একই মানে পরিচালনা করতে সাহায্য করে। এই বিষয়ে আপনার আর কোনো নির্দিষ্ট অংশ জানার থাকলে জানাতে পারেন। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চ ফিফা বিশ্বকাপ এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত অধ্যায় হলো চ্যাম্পিয়নদের গৌরবগাথা এবং মাঠ কাঁপানো সেরা গোলদাতাদের কীর্তি। আপনার অনুরোধ অনুযায়ী, বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা গোলদাতা (যাদের পারিবারিক বা বাবার নাম ও ক্লাবের তথ্য পাওয়া যায়) এবং ১৯৩০ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত কোন দেশ কোন সালে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, তার একটি বিস্তারিত এবং বিশাল প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের সেরা গোলদাতাদের প্রোফাইল
বিশ্বকাপের ইতিহাসে গোল করাকে বলা হয় সবচেয়ে কঠিন কাজ। চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপসহ বিশ্বমঞ্চের ইতিহাসে শীর্ষ গোলদাতাদের বিশদ বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

১. লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা) বাবার নাম: হোর্হে হোরাসিও মেসি দেশ: আর্জেন্টিনা বর্তমান ক্লাব: ইন্টার মায়ামি (সাবেক বার্সেলোনা ও পিএসজি) বিশ্বকাপে গোল সংখ্যা: ২০টি (সর্বোচ্চ) সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: জন্ম : ২৪ জুন ১৯৮৭। ২০২৬ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফর্ম করে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসেকে টপকে তিনি এখন বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকালের একক শীর্ষ গোলদাতা। ২০২২ সালে তিনি আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দেন।

২. কিলিয়ান এমবাপে  বাবার নাম: উইলফ্রেড এমবাপে (ডরষভৎরবফ গনধঢ়ঢ়ল্ক) দেশ: ফ্রান্স । বর্তমান ক্লাব: রিয়াল মাদ্রিদ (সাবেক পিএসজি) বিশ্বকাপে গোল সংখ্যা: ১৮টি
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: জন্ম : ২০ ডিসেম্বর ১৯৯৮। বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা এই ফরাসি ফরোয়ার্ড ২০১৮ সালে ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ জেতেন এবং ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে হ্যাটট্রিকসহ গোল্ডেন বুট লাভ করেন। মাত্র তিন বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই তিনি অল-টাইম গোলদাতার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছেন।

৩. মিরোস্লাভ ক্লোসে  বাবার নাম: জোসেফ ক্লোসে (ঔড়ংবভ কষড়ংব – তিনিও একজন ফুটবলার ছিলেন) দেশ: জার্মানি ঐতিহাসিক ক্লাব: বায়ার্ন মিউনিখ, লাৎসিও, ওয়ের্ডার ব্রেমেন (অবসরপ্রাপ্ত) বিশ্বকাপে গোল সংখ্যা: ১৬টি। সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: জন্ম : ৯ জুন ১৯৭৮। ২০০২ থেকে ২০১৪ টানা চারটি বিশ্বকাপে জার্মানির গোলমেশিন ছিলেন ক্লোসে। ২০১৪ সালে জার্মানির বিশ্বকাপ জয়ের পেছনে তার বিশাল অবদান ছিল।

৪. রোনালদো নাজারিও  বাবার নাম: নেলিও নাজারিও লিমা সিনিয়র (ঘল্কষরড় ঘধুপ্সৎরড় ফব খরসধ ঝবহরড়ৎ) দেশ: ব্রাজিল ঐতিহাসিক ক্লাব: রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, ইন্টার মিলান (অবসরপ্রাপ্ত) বিশ্বকাপে গোল সংখ্যা: ১৫টি। সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: জন্ম : ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬। ‘দ্য ফেনোমেনন’ নামে পরিচিত রোনালদো ১৯৯৪ (খেলেননি) ও ২০০২ সালের বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য। ২০০২ বিশ্বকাপের ফাইনালে জোড়া গোল করে ব্রাজিলকে পঞ্চম শিরোপা এনে দিয়েছিলেন তিনি।

৫. গার্ড মুলার (ডবংঃ এবৎসধহু) বাবার নাম: হাইনরিখ মুলার দেশ: পশ্চিম জার্মানি (বর্তমান জার্মানি) ঐতিহাসিক ক্লাব: বায়ার্ন মিউনিখ (প্রয়াত) বিশ্বকাপে গোল সংখ্যা: ১৪টি। সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:জন্ম : ৩ নভেম্বর ১৯৪৫। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ী এই কিংবদন্তি স্ট্রাইকারকে বলা হতো বক্সের ভেতরের সবচেয়ে বিপজ্জনক শিকারী। মাত্র ২টি বিশ্বকাপ খেলেই তিনি ১৪টি গোল করেছিলেন।

কোন দেশ কোন কোন সালে চ্যাম্পিয়ন (১৯৩০-২০২২/২০২৬)
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ফুটবল বিশ্ব বেশ কিছু ঐতিহাসিক চ্যাম্পিয়ন পেয়েছে। নিচে চ্যাম্পিয়ন দেশগুলোর তালিকা সালভিত্তিক বিস্তারিত দেওয়া হলো: বিশ্বকাপের ইতিহাসে শিরোপার স্বাদ পেয়েছে কেবল মাত্র ৮টি দেশ। নিচে তাদের অর্জনের পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:

১. ব্রাজিল (৫ বার – রেকর্ড চ্যাম্পিয়ন) ১৯৫৮: সুইডেনের মাটিতে মাত্র ১৭ বছর বয়সী পেলের জাদুতে প্রথম শিরোপা জেতে ব্রাজিল। ১৯৬২: পেলে ইনজুরিতে পড়লেও গারিঞ্চার দুর্দান্ত নৈপুণ্যে টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয় সেলেসাওরা। ১৯৭০: পেলের শেষ বিশ্বকাপে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবল খেলে ইতালিকে হারিয়ে তৃতীয় শিরোপা ঘরে তোলে তারা। ১৯৯৪: ইতালিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ২৪ বছর পর রোমারিও-বেবেতোর হাত ধরে চতুর্থ শিরোপা জয়। ২০০২: এশিয়ার মাটিতে (জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া) রোনালদো নাজারিওর জাদুতে জার্মানিকে হারিয়ে পঞ্চম ও শেষ শিরোপা।

২. জার্মানি/পশ্চিম জার্মানি (৪ বার) ১৯৫৪: হাঙ্গেরির ঐতিহাসিক ‘ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স’ দলকে হারিয়ে ‘মিরাকল অব বার্ন’ খ্যাত ম্যাচে প্রথম জয়। ১৯৭৪: টোটাল ফুটবলের জনক ইয়োহান ক্রুইফের নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে ঘরের মাঠে দ্বিতীয় শিরোপা। ১৯৯০: ডিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে হারিয়ে রোমায় তৃতীয় শিরোপা উদযাপন। ২০১৪: লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ের গোলে হারিয়ে ব্রাজিলের মাটিতে চতুর্থ শিরোপা লাভ।

৩. ইতালি (৪ বার) ১৯৩৪: ঘরের মাঠে চেকোস্লোভাকিয়াকে হারিয়ে প্রথম শিরোপা জয়। ১৯৩৮: হাঙ্গেরিকে হারিয়ে ইতিহাসের প্রথম দেশ হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড। ১৯৮২: পাওলো রসি-র একক নৈপুণ্যে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে বিদায় করে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে তৃতীয় শিরোপা। ২০০৬: ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে জিনেদিন জিদানের বিদায়ী বিশ্বকাপে চতুর্থবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় ইতালি।

৪. আর্জেন্টিনা (৩ বার) ১৯৭৮: ঘরের মাঠে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে মারিও কেম্পেসের হাত ধরে প্রথম বিশ্বকাপ জয়। ১৯৮৬: মেক্সিকোর মাটিতে ডিয়েগো ম্যারাডোনার একক জাদুতে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে দ্বিতীয় শিরোপা। ২০২২: কাতারের মাটিতে কিলিয়ান এমবাপের ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফাইনাল খেলে টাইব্রেকারে লিওনেল মেসির হাত ধরে তৃতীয় শিরোপা।

৫. ফ্রান্স (২ বার) ১৯৯৮: ঘরের মাঠে জিনেদিন জিদানের জোড়া হেডের গোলে ফাইনালে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ৩-০ ব্যবধানে উড়িয়ে প্রথম শিরোপা। ২০১৮: রাশিয়ার মাটিতে তরুণ কিলিয়ান এমবাপে ও আঁতোয়ান গ্রিজম্যানের নৈপুণ্যে ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয় শিরোপা।

৬. উরুগুয়ে (২বার) ১৯৩০: ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ১৯৫০: ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে প্রায় ২ লাখ দর্শকের সামনে স্বাগতিক ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটিয়ে দ্বিতীয় শিরোপা জেতে (যা ‘মারাকানাজো’ নামে পরিচিত)।
৭. ইংল্যান্ড (১ বার) ১৯৬৬: ঘরের মাঠে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে জিওফ হার্স্টের বিতর্কিত হ্যাটট্রিকে একমাত্র বিশ্বকাপটি জেতে ইংল্যান্ড।

৮. স্পেন (১ বার) ২০১০: আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপে নিজেদের বিখ্যাত ‘টিকি-টাকা’ ফুটবল শৈলী দিয়ে ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার অতিরিক্ত সময়ের গোলে হারিয়ে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন।

সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের শীর্ষে যাঁরা
পেলে (ব্রাজিল): একমাত্র ফুটবলার যিনি ৩টি ফিফা বিশ্বকাপ (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০) জিতেছেন। তাঁর অবিশ্বাস্য গোল করার রেকর্ড এবং খেলার ধরন তাঁকে ফুটবল সম্রাটের মর্যাদা দিয়েছে।

দিয়েগো ম্যারাডোনা (আর্জেন্টিনা): ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে তাঁর একক নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানো এবং ড্রিবলিংয়ের জাদুকরী ক্ষমতা তাঁকে ফুটবলের অন্যতম সেরা আইকন করে তুলেছে।

লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা): আধুনিক ফুটবলের রেকর্ড ৮ বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এবং ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী মেসিকে অনেকে ইতিহাসের সবচেয়ে পরিপূর্ণ ও ধারাবাহিক ফুটবলার মনে করেন।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল): ফুটবলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ অফিশিয়াল গোলদাতা। তাঁর অবিশ্বাস্য ফিটনেস, গোল করার ক্ষুধা এবং ৫টি ব্যালন ডি’অর জয় তাঁকে সর্বকালের সেরাদের কাতারে মজবুত স্থান দিয়েছে।

উপসংহার: বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায় যৌথভাবে ৪৮ দলের অংশগ্রহণে চলছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞ। ফুটবল ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় লুকিয়ে আছে এমন অসংখ্য বীরত্বগাথা, যা প্রতি চার বছর পর পর বিশ্ববাসীকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে। ইতিহাসের এই গৌরবময় পথ বেয়ে ফুটবল এগিয়ে যাচ্ছে তার চিরন্তন সৌন্দর্যের দিকে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: বর্তমানে উত্তর আমেরিকায় (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা) ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ অত্যন্ত জমজমাটভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে মেসি ও এমবাপের মতো তারকারা তাদের গোলের রেকর্ডকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাচ্ছেন। লেখক: সাবেক ব্যাংকার, গবেষক

 

কুয়ালালামপুরের মালুরি রাতের বাজারে বাংলাদেশি নাগরিকসহ ২০০ বিদেশি আটক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ১০:২৩ অপরাহ্ণ
কুয়ালালামপুরের মালুরি রাতের বাজারে বাংলাদেশি নাগরিকসহ ২০০ বিদেশি আটক
মোঃ শাহিনুর রহমান শাহিন, মালয়েশিয়া: মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের চেরাস (মালুরি) রাতের বাজারে ৫ জুলাই পরিচালিত অপ কুটিপ (Op Kutip) অভিযানে ইমিগ্রেশন বিভাগ এবং কুয়ালালামপুর সিটি হল (DBKL) যৌথভাবে ২০০ জন অবৈধ বিদেশিকে আটক করেছে।
কুয়ালালামপুর ইমিগ্রেশন বিভাগের পরিচালক হামশা ইনজাউ (Hamsha Injau) জানান, সন্ধ্যা ৬টায় শুরু হওয়া অভিযানে মোট ৫০০ জনকে তল্লাশি করা হয়। এর মধ্যে ৪০৭ জন বিদেশি এবং ৯৩ জন স্থানীয় নাগরিক ছিলেন। যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় ২০০ জন বিদেশিকে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ১২৫ জন পুরুষ এবং ৭৫ জন নারী।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, ভিয়েতনাম, চীন ও ভারতের নাগরিক রয়েছেন।
তদন্তে যেসব অপরাধ ধরা পড়েছে, তার মধ্যে রয়েছে বৈধ ভ্রমণ নথি না থাকা, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া, ভিজিট পাস বা কর্মসংস্থানের অনুমতিপত্রের অপব্যবহার এবং ইমিগ্রেশন আইনের শর্ত লঙ্ঘন।
আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন আইন ১৯৫৯/৬৩ অনুযায়ী পরবর্তী তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জালান দুতা ইমিগ্রেশন ডিপোতে পাঠানো হয়েছে।

ন্যায়বিচারের রাষ্ট্র, নাকি প্রতিহিংসার রাজনীতি?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৭:৪৬ অপরাহ্ণ
ন্যায়বিচারের রাষ্ট্র, নাকি প্রতিহিংসার রাজনীতি?

‎গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

‎‎বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল গণতন্ত্রের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু প্রতিটি ক্ষমতার পরিবর্তনের পর যদি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে গণগ্রেপ্তার, মামলা, হয়রানি, রাজনৈতিক প্রতিশোধ কিংবা বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ সামনে আসে, তাহলে একটি মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে আমরা কি সত্যিই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে এগোচ্ছি, নাকি প্রতিহিংসার এক অন্তহীন রাজনৈতিক চক্রের মধ্যেই আবর্তিত হচ্ছি?

‎বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতির কাঙ্খিত পরিবর্তন সব সময় ঘটেনি। যে দল বিরোধী অবস্থায় থেকে দমন-পীড়নের অভিযোগ করেছে, ক্ষমতায় গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। এই পুনরাবৃত্তি বাস্তবতা জনগণের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে এবং গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা দুর্বল করে।

‎আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক হয়রানি ও বিরোধী মত দমনের অভিযোগ তুলেছে। এসব অভিযোগের যেগুলো তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হবে, সেগুলোর অবশ্যই আইনানুগ বিচার হওয়া উচিত। একইভাবে বর্তমান সময়ে যে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠলে তারও স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ আইনের শাসনের মূলনীতি হলো আইন ব্যক্তি বা দলের পরিচয় নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে প্রয়োগ হবে।

‎বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন মহলে এমন অভিযোগও আলোচিত হচ্ছে যে, আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের কিছু নেতা-কর্মী, যাদের বিরুদ্ধে অতীতে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ ছিল না এবং যারা নিজ নিজ এলাকায় সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিলেন, তারাও বিভিন্ন মামলায় আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হচ্ছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের একমাত্র বৈধ ক্ষেত্র আদালত। তবে এ ধরনের আলোচনা যখন জনপরিসরে বিস্তৃত হয়, তখন বিচারব্যবস্থা ও আইনের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

‎একইভাবে আইনজীবী মহল ও রাজনৈতিক অঙ্গনে মাঝে মাঝে এমন অভিযোগও উঠে আসে যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আদালত থেকে জামিন লাভের পর অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে পুনরায় কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। এসব অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট আদালত ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অনুসন্ধান ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়। তবে এমন ধারণা যদি জনমনে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

‎একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অপরাধের দায় ব্যক্তির, কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের নয়। কোনো দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত বা কর্মকান্ডের দায় সেই দলের প্রতিটি সাধারণ কর্মীর ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বর্তায় না। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিচার অবশ্যই হতে হবে। আবার নির্দোষ ব্যক্তি যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানির শিকার না হন, সেটিও সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এটাই আইনের শাসনের প্রকৃত চেতনা।

‎বাংলাদেশের ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় প্রতিহিংসার রাজনীতি কখনো স্থায়ী সমাধান এনে দেয় না। আজ যারা ক্ষমতায়, কাল তারা বিরোধী দলে যেতে পারেন; আবার আজ যারা বিরোধী, ভবিষ্যতে তারাই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারেন। ফলে আজ যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হবে, আগামী দিনে তার প্রভাব পড়বে সব রাজনৈতিক দলের ওপরই।
‎গণতন্ত্রের শক্তি প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার মধ্যে নয়; বরং ভিন্নমতকে সাংবিধানিক ও আইনসম্মত কাঠামোর মধ্যে নিরাপদ রাজনৈতিক পরিসর দেওয়ার মধ্যেই নিহিত। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নিষ্পত্তি হওয়া উচিত জনগণের রায়ে, প্রশাসনিক প্রভাব বা প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে নয়।

‎বাংলাদেশের মানুষ বহু সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন লালন করেছে। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে তখনই, যখন আইনের শাসন বাস্তব অর্থে প্রতিষ্ঠিত হবে, বিচারব্যবস্থা হবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ, মানবাধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং কোনো নাগরিক তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে বৈষম্য বা অনিশ্চয়তার শিকার হবেন না।
‎আজ সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করা। সেই আস্থার ভিত্তি হতে পারে একটিই অপরাধীর বিচার হবে, কিন্তু নির্দোষের অধিকারও সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে; আইন হবে নিরপেক্ষ, বিচার হবে প্রমাণভিত্তিক এবং রাষ্ট্র হবে সব নাগরিকের সমান আশ্রয়স্থল।

‎প্রতিহিংসার রাজনীতি কোনো জাতির জন্য স্থায়ী সমাধান নয়। ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ওপর দাঁড়িয়েই একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠে।

‎‎‎লেখক: গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ, সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা