বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস: দক্ষ তারুণ্যই আগামীর টেকসই ভিত্তি
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতি বছর ১৫ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০১৪ সালে দিবসটি ঘোষণা করে এবং ২০১৫ সাল থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্যাপিত হয়ে আসছে। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো তরুণদের শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতা, কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরা এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী তাদের প্রস্তুত করে তোলা।
বর্তমান বিশ্বে যুবসমাজ শুধু একটি দেশের জনসংখ্যার অংশ নয়; তারা অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সামাজিক পরিবর্তন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ। কিন্তু দক্ষতার ঘাটতি, বেকারত্ব, প্রযুক্তিগত বৈষম্য এবং শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের অমিল অনেক দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতায় বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবসের গুরুত্ব দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২০২৬ সালের বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবসের প্রতিপাদ্যÑ ‘সবার জন্য এক অভিন্ন ভবিষ্যতের দক্ষতা’। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে জাতিসংঘ এমন একটি ভবিষ্যতের কথা বলছে, যেখানে দক্ষতা শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির উপায় নয়; বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই সমাজ নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবটিক্স এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে কর্মক্ষেত্রের প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে। ফলে আগামী দিনের তরুণদের শুধু কারিগরি জ্ঞান নয়, ডিজিটাল সাক্ষরতা, সবুজ দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ এবং নেতৃত্বের মতো বহুমাত্রিক দক্ষতায় সমৃদ্ধ হতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য তরুণ ইতোমধ্যে তাদের কর্মদক্ষতা ও উদ্ভাবনী শক্তির মাধ্যমে পরিবর্তনের নজির স্থাপন করেছেন। যেমনÑ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে আলেকজান্ডার ওয়াং ও এইডান গোমেজ, সাইবার বুলিং প্রতিরোধে তৃষা প্রভু, জলবায়ু আন্দোলনে গ্রেটা থুনবার্গ ও অটাম পেলটিয়ার, শিক্ষার অধিকারের জন্য মালালা ইউসুফজাই, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উইলিয়াম কামকোয়াম্বা এবং উদ্যোক্তা হিসেবে রিতেশ আগরওয়াল কিংবা প্যাট্রিক ও জন কলিসনের মতো তরুণরা প্রমাণ করেছেন যে সৃজনশীলতা, জ্ঞান ও সাহস থাকলে তরুণ বয়সেই বিশ্বব্যাপী ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
ইসলামের ইতিহাসে তরুণদের নেতৃত্বের অসংখ্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে উসামা ইবনে যায়িদ (রা.)-কে একটি বৃহৎ বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়েছিল। আত্তাব ইবনে আসিদ (রা.) তরুণ বয়সেই মক্কার গভর্নর হন। মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) ইয়ামেনে বিচারক ও শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর সাহসিকতা এবং মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.)-এর প্রজ্ঞা ইসলামের ইতিহাসে আজও অনুকরণীয়। এছাড়া বর্তমান বিশ্বে তরুণরা প্রতিনিয়ত বিশ্বের পটপরিবর্তন করে চলেছে।
আমাদের দেশের যুব’রাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখছেন। প্রযুক্তি, ফিনটেক, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল সেবায় বাংলাদেশের অনেক তরুণ ইতোমধ্যে বৈশ্বিক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ যদি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে সফল হয়, তবে এই যুবসমাজই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
তরুণদের উন্নয়নে জাতিসংঘও বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। Youth2030 Strategy, UN Youth Office, ECOSOC Youth Forum, UNDP Youth Engagement Strategy, UN Youth Volunteers Programme এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণদের নীতিনির্ধারণ, জলবায়ু কার্যক্রম, মানবাধিকার, সামাজিক উদ্ভাবন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। জাতিসংঘের দৃষ্টিতে তরুণসমাজ কেবল সুবিধাভোগী নয়; বরং ভবিষ্যৎ বিশ্বের সমান অংশীদার ও নির্মাতা।
বাংলাদেশ সরকারও যুব উন্নয়নকে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচির অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে কারিগরি প্রশিক্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন, কৃষিভিত্তিক দক্ষতা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, যুবঋণ, ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি এবং বিভিন্ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থান প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা তরুণদের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য বিশেষ সুবিধাও প্রদান করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ দক্ষ, আত্মনির্ভর ও উৎপাদনমুখী যুবশক্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ইসলাম ধর্মও যুবসমাজকে মানবসভ্যতার অন্যতম মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেছে। পবিত্র কোরআনে কর্মদক্ষতা, সততা এবং দায়িত্বশীলতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। হজরত মুসা (আ.)-এর প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আপনার চাকরিতে নিযুক্ত করার জন্য সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।” (সূরা আল-কাসাস: ২৬)। এই আয়াত দক্ষতা ও আমানতদারিতাকে নেতৃত্ব ও কর্মজীবনের মৌলিক যোগ্যতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) যুবকদের শ্রম, উদ্যোগ ও আত্মনির্ভরতার শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর যৌবনকালের ‘হিলফুল ফুজুল’-এ অংশগ্রহণ মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য উদাহরণ।
আজকের বিশ্ব একদিকে প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, বৈষম্য, বেকারত্ব, যুদ্ধ-সংঘাত ও সামাজিক অস্থিরতার মতো জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ, সৃজনশীল, নৈতিক ও মানবিক যুবসমাজের বিকল্প নেই। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, রাষ্ট্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, মূল্যবোধ গঠন এবং নেতৃত্ব বিকাশে বিনিয়োগ করতে হবে।
বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস আমাদের প্রতিনিয়তই স্মরণ করিয়ে দেয় যে কোনো দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং দক্ষ ও মানবিক জনগোষ্ঠী। আজকের তরুণদের হাতে শুধু নিজেদের ভবিষ্যৎ নয়, মানবসভ্যতার আগামী দিনের ভাগ্যও নির্ধারিত হবে। তাই দক্ষতা অর্জন, জ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয়ে গড়ে উঠুক এমন এক যুবসমাজ, যারা একটি শান্তিপূর্ণ, সমতাভিত্তিক, টেকসই এবং সমৃদ্ধ পৃথিবী নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।





