সম্পাদকীয়/প্রসঙ্গ: উপকূলের জলবায়ু উদ্বাস্তু ও পেশা বদল
জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখন আর কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় মানুষের জীবনে তা এক নির্মম ও প্রাত্যহিক বাস্তবতা। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আশঙ্কাজনক হারে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে এই অঞ্চলের প্রাতাষ্ঠানিক ও ঐতিহ্যবাহী জীবন-জীবিকা সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। সিডর, আইলা, আম্পানের মতো একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষত শুকানোর আগেই নতুন নতুন দুর্যোগ এসে উপকূলের মানুষকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। এই বহুমুখী সংকটের সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে মানুষের পেশা এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর, যা অবিলম্বে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের, বিশেষ করে কয়রা, পাইকগাছা, শ্যামনগর ও আশাশুনি এলাকার মানুষের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষি ও মৎস্য চাষ। কিন্তু জমিতে ও মিষ্টি পানির উৎসে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করার ফলে ফসলি জমি উর্বরতা হারাচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী ধান চাষ বা মিষ্টি পানির মাছ চাষ এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। ফলস্বরূপ, টিকে থাকার তাগিদে উপকূলের মানুষ বাধ্য হয়ে তাঁদের আদি পেশা পরিবর্তন করছেন। জেলেরা মাছ ধরার ঝুঁকি ও আকাল দেখে ঝুঁকছেন কাঁকড়া বা কুঁচে চাষে। কৃষকেরা সনাতন চাষাবাদ ছেড়ে লবণ-সহিষ্ণু জাতের ধান কিংবা তরমুজ চাষের চেষ্টা করছেন। এমনকি পুরুষেরা কর্মহীন হয়ে পড়ায় নারীরা বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ বা কাঁকড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো কঠিন পরিশ্রমে যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু জলবায়ুর এই আগ্রাসী পরিবর্তনের সামনে এই স্থানীয় অভিযোজন কৌশলগুলোও দীর্ঘমেয়াদে টিকতে পারছে না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যখন স্থানীয়ভাবে জীবনধারণের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন মানুষ বাধ্য হয় নিজের ভিটেমাটি ত্যাগ করতে। গত দুই দশকে উপকূলীয় অঞ্চল থেকে বিভাগীয় শহর ও ঢাকামুখী মানুষের স্রোত অভাবনীয় হারে বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তৈরি হওয়া এই ‘জলবায়ু উদ্বাস্তুরা’ যখন শহরে আসছেন, তখন তাঁদের পূর্বপুরুষ থেকে পাওয়া কৃষিজ্ঞান বা মাছ ধরার দক্ষতা পুরোপুরি অর্থহীন হয়ে পড়ছে। গ্রামের একজন স্বাধীন ও দক্ষ কৃষক কিংবা খামারি শহরে এসে স্রেফ বেঁচে থাকার তাগিদে রিকশাচালক, ইটভাটার দিনমজুর কিংবা নির্মাণশ্রমিক হিসেবে অত্যন্ত কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। খুলনা, ঢাকা বা চট্টগ্রামের বস্তিগুলোতে তাকালে দেখা যাবে, সেখানকার বাসিন্দাদের একটি বিশাল অংশ এসেছেন এই উপকূলীয় অঞ্চল থেকে। জলবায়ুর এই মরণকামড় কেবল তাঁদের সম্পদই কেড়ে নেয়নি, তাঁদের পেশাগত পরিচয় ও সামাজিক মর্যাদাটুকুও ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
গবেষণা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের চাল উৎপাদন ৮ শতাংশ এবং গম উৎপাদন ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও উপকূলের অর্থনীতিতে। বাংলাদেশ বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে সপ্তম স্থানে রয়েছে, যার অগ্রভাগে আছে এই উপকূলের বাসিন্দারা। অথচ বিশ্বমঞ্চে কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের ভূমিকা নগণ্য হলেও এর চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে আমাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে।
এই চরম সংকট মোকাবিলায় কেবল ত্রাণ বিতরণ বা সাময়িক পুনর্বাসন কোনো টেকসই সমাধান নয়। প্রথমত, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা প্রতিরোধী কৃষি ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সরকারি উদ্যোগে ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, টেকসই ও শক্তিশালী বেড়িবাঁধ নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ফসলি জমিতে নোনা জলের প্রবেশ ঠেকানো যায়। তৃতীয়ত, জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা কমাতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মমুখী প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। বিশ্ব জলবায়ু তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে। উপকূলের মানুষের এই নীরব কান্না ও পেশা হারানোর দীর্ঘশ্বাস বন্ধ করতে রাষ্ট্রকে এখনই সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।









